লেখক নয় , লেখাই মূলধন

অসিত কর্মকারের গল্প

চাঁদবসত

চানুবুড়ির চোখে ঘুম নেই। বয়স হলে এমনটা হয়। তাই বলে একেবারেই জীবন থেকে বিদায় নিতে হবে? বিছানায় শরীরটা একটু এলাল তো অতীতের কত কথা মনে জাগে, সব মিলিয়ে শরীর-মন জুড়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি।

বাপমায়ের আদরের চিন্ময়ী, ওরফে চানু, আমলাবেড়ে গাঁয়ে বউ হয়ে এলে সে হল ‘চানুবউ’।

চানুর বয়স তখন নয় কি দশ, নারী-পুরুষের ভাগবোধও ঠিক করে মনে জন্মায়নি। মাটিতে আঁক কষে চানু লেখাপড়া শেখে। স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ, এক থেকে দশ।

যুক্তাক্ষর শেখা বাকি থেকে যায়। বাকি থেকে যায় যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ শেখা। জীবনে জীবন যোগের সময় এসে পড়ে।

বিয়ে হয়ে গেল চানুর। বিদায়বেলায় কেঁদে কেঁদে তার শরীর-মন ভেঙেচুরে একাকার। তা-ই বয়ে নিয়ে শ্বশুরঘর চলল চানু। শোলবেড়ে থেকে আমলাবেড়ে। মাঝে তিন গাঁ, পাঁচ খাল, দুই নদী।ধূ ধূ-র পর ধূ ধূ হাঁটা। শ্রান্তি-ক্লান্তি পথকে আরও বড়ো করে দেয়।

ছোট্ট চেহারা, কাঠি কাঠি হাত-পা, রোগা-পাতলা শরীরটা লাল শাড়িতে অবিন্যস্ত জড়ানো।আলতামাখা খালি পায়ে ফাল্গুনের ধুলো ওড়ে।চানুর পৃথিবী ঘোমটার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল। এক চিলতে ফাঁক দিয়ে পথ দেখে।ঠিকঠাক চোখ না ফেললে হোঁচট খাওয়ার ভয়। সাঁকো থেকে পা পিছলে খালে পড়ে যাওয়ার ভয়। টাল খেয়ে নৌকো থেকে নদীতে পড়ে যাওয়ার ভয়। ভয় তো তার আরও অনেক। কে রক্ষা করবে!

হাত পাঁচেক আগে আগে স্বামী মানুষটি। পরনে ধুতিপাঞ্জাবি, গলায় কাগজফুলের মালা। কপালে চন্দনের ফোঁটা। ধীর-স্থির, শান্ত স্বভাবের। ছিমছাম লম্বা চেহারা। ওকে অবলম্বন করে চানুকে বাকি জীবন কাটাতে হবে। চানুর কাছে সে এক অবাক ব্যাপার। কী যে এক কঠিন নাম ওর, গঙ্গাধর!

ময়না বারংবার সাবধান করে দিয়েছে, ’খপরদার, খপরদার, সোয়ামির নাম ভুলেও কক্কোনো মুখে আনবে নে। আনলি তোমার পাপ, সোয়ামির অমঙ্গল।’

স্বামীর ঘর করতে এল চানু। চাষবাস, পুকুর-জলা, গোয়ালভরা গোরু, ফলফলাদির বাগান ইত্যাদি নিয়ে বড়ো গৃহস্থঘর। খাটুনির সীমা-পরিসীমা নেই। তবুও সুখ চানুর, ভালো স্বামী-শ্বশুরঘর পেয়েছে সে।

চোদ্দ পেরোতেই চানু মেয়ের মা। বলাবলি হল, ‘ঘরে নক্কী আসা দিয়ি শুরু হল গঙ্গাধরের, এ ভারি শুভ নক্কন।‘

তারপর থেকে একরকম বছর বছর আঁতুড়ঘর নেয় চানু। গতরে মাংস লাগার আর সময় হয় না। আট-আটটা ছেলেপুলের মা সে। তারা সব গায়েগতরে ভালো। চানুর ওই ফিঙে চেহারার সঙ্গে মিল হয় না। তাই নিয়ে কত বলাবলি হয়।চানু হাসে। সে বড়ো সুখের হাসি। সন্তানের জন্ম দেওয়া, পালপোষ করে বড়ো করার কষ্ট-যন্ত্রণা এত বছরে মন থেকে উবে গেছে। সে যে মা, ও-সব মনে ঠাঁই দিতে হয়!

চানুবুড়ির এখন ভরা সুখের সংসার। কিন্তু স্বামী মানুষটাই যে আর নেই। তার আত্মার শান্তি কামনায় সে এখন অষ্টপ্রহর ‘গঙ্গা-গঙ্গা’ করে। মা-বাপ,শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়-অনাত্মীয় আরও কত জনায় চলে গেছে। তাদের জন্যও তার মনে ‘গঙ্গা-গঙ্গা’।

দুই

এখন চানুবুড়ি চাইলেই হাত-পা ঝাড়া হয়ে জীবন কাটাতে পারে। কিন্তু তাতে তার সুখবোধ হয় না।সংসারে কাজ নেই তো পাড়ায় আছে, পাড়ায় নেই তো বেপাড়ায় আছে। গাঁ-ভর মানুষের কি সমস্যার শেষ আছে?

আকাশে ভাতে ভরা থালার মতো চাঁদ।জ্যোৎস্নায় জড়ানো মিহি কুয়াশা। বিরামহীন ঝিঁঝি পোকার ডাক। ওই চাঁদ বড়ো প্রিয় চানুবুড়ির। রাতের দোসর। ক্ষয়ে যেতে থাকলে মন খারাপ হয়। তার বিশ্বাস, ওখানে চাঁদের বুড়ির সংসার আছে। দিনরাত সে চড়কা কাটে।সুতো তুলে সংসার চালায়। পৃথিবী থেকে যারা চলে যায় ওই বুড়ি তাদের ঠাঁই দেয়। ওই করে ওখানে তার মস্ত সংসার। সেও একদিন ওখানে চলে যাবে। সবার সঙ্গে মিলিত হবে। সে আরেক জীবন।

কিন্তু এই রাতদুপুরে ও কার বেয়াক্কেলে চিৎকার আর হম্বিতম্বি, সেই সঙ্গে মেয়ছেলের কান্না?একটু কান পাততেই চিনে নেয় চানুবুড়ি।মাখালপাড়ার অষ্ট মাখাল মাতাল হয়ে বউ পেটাচ্ছে।

শুধু ভোরটুকু হওয়ার অপেক্ষায় ছিল চানুবুড়ি।গুটগুট পায়ে ছায়াছায়া দৃষ্টি নিয়ে অষ্ট মাখালের উঠোনে হাজির। অষ্টর বউ মিনতি তখন বাসি বাসনকোষণ নিয়ে পুকুরঘাটের পথে।

— ‘হ্যাঁ রে বউ, কাল রেতির গতরের ব্যাতা তোর একনও আচে না জুইরেচে? তা অষ্ট কোতায়?ডাক তাকি, আঝ এর এ্যাট্টা বিহিত করব।’ ক্ষিপ্ত গলা চানুবুড়ির।

মিনতি বুঝতে পারছে কিসের কথা বলছে চানুবুড়ি। হাতের জিনিস উঠোনের একপাশে রেখে তড়িঘড়ি ঘরের দাওয়ায় পিঁড়ি পেতে দেয়।

— ‘সে একনও ঘুমোচ্চে। তুমি বসো ঠাগমা।’

— ‘বসতি আমি আসিনি বউ, তাকি ডাক’, কঠিন গলায় বলল,’ সে বেয়াক্কেলে তোর ওজগারে খাবে, নেশা-ফুত্তি করবে, ফের তোকিই পেটাবে!উলটে ঘা চারিক দিতি পারিস নে?’

বাজারে মাছ নিয়ে বসে মিনতি। বিক্রিবাট্টা হোক না হোক স্বামীর হাতে বিড়ি-দেশলাই-নেশার টাকা তুলে দিতেই হবে। অন্যথা হয়েছে তো মিনতির উপর অত্যাচার চালায় অষ্ট।

এখনও নেশাতুর অষ্ট চানুবুড়ির সামনে পড়ে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল।

— ‘হ্যাঁ রে অষ্ট, ভগমান তোকি এত বড়ো গতরটা দিয়িচে কি বউ পেটানোর ঝন্যি? তোকি আমি অনেক সাবধান করিচি কিন্তুক শুধরোসনি মোটে।’ মিনতির উদ্দেশ্যে বলল, ‘ও বউ, বাসন মাজা পরে হবে’ কুনি, তোলা শাড়িটা পিন্ধে আমার সঙ্গি থানায় চল! অষ্টকে জেলের ঘানি না টানায়েচি তো আমার নাম চানুবুড়ি নয়!’

মুহূর্তের মধ্যে অষ্ট চানুবুড়ির পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল, ‘আর হবে নে ঠাগমা। আঝ থিকিই আমি বাজারে মাছ নিয়ি বসব। নেশা ছাড়ব। বউ সমসার দেকবে।’ করুণ গলায় ইনিয়েবিনিয়ে একই কথা বার বার বলে অষ্ট।

চানুবুড়ি অটল। থানায় সে যাবেই। মিনতি না গেলে সে একাই যাবে।

গ্রামের সবার ভালোমন্দে পাশে থাকে সে। থানা-বিডিও-পঞ্চায়েত সবেতেই তাই তার অবাধ যাতায়াত, কথার আলাদা গুরুত্ব। সমীহ তার প্রতি।

— ‘তুই একনও দেঁইড়ে আচিস বউ, শাড়ি পিন্ধে এলি নে?’ ধমক দিল চানুবুড়ি।

ডুঁকরে কেঁদে ওঠে মিনতি, ‘একবার পুলিশি দেগি দিলি সে মানষি কি আর নোকসমাজি মুখ দেকাতি পারবে ঠাগমা? কতা দেচ্চে ঝকন তুমি ওকি ক্ষমা করি দাও!’

খানিক চুপ থেকে চানুবুড়ি কী যেন ভাবে।বলল, ‘বউয়ির দয়ায় এ যাত্রায় বেঁচি গেলি অষ্ট, নে পা ছাড়!’

ঘরে ফেরে চানুবুড়ি। বুধি ছাগলটার জন্য চিন্তা তার। গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বুধিকে আদর-সোহাগ করে, ’হ্যাঁ রে মা, মা হবি তুই। সমসার বাড়বে তোর। দায়িত্বও বাড়বে। চিন্তা করিসনি মা,আমি আচি নে!‘ যেন মানুষের সঙ্গেই কথা বলছে চানুবুড়ি।

এই খবর এল, মণ্ডলপাড়ার ভজন মণ্ডলের গাইটাকে কে বা কারা বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে।

আঁতকে ওঠে চানুবুড়ি, ‘কী সব্বনেশে কতা এ্যাঁ, এর এট্টা বিহিত করতি হবে!ওইটুকুনি কচি বাছুর মায়ের দুধ না পেলি বাঁঝবে কী করি।’

ভজন মণ্ডলের বাড়ির সামনে মানুষের জটলা।হায়-হুতাশ। ভজনের বউ মঙ্গলা কেঁদে পড়ল, ‘কী অলুক্কুনে কাণ্ড বল দিকি ঠাগমা, এ পাপ ঝে করেচে তার তো নরকেও ঠাঁই হবে নে গো!’

— ‘কাঁদিস নে বউ। দোষী সাঝা পাবেই।‘

গোয়ালঘরের সামনের নিমগাছটার সঙ্গে বাছুরটা বাঁধা। দু-চোখে অবিরল ধারায় জল নামছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে মাকে খুঁজছে আর থেকে থেকে করুণ গলায় ডেকে উঠছে।চানুবুড়ি বাছুরটার গা খানিক বুলিয়ে দিতে ও যেন মায়ের ছোঁয়া পায়। চানুবুড়ির বুকের কাছটায় বার কয়েক মুখ ঘষে যেন নিশ্চিত হয়, এ ওর মা-ই। দুধের জন্য বুকে একের পর এক ঢুঁ মারে।

কষ্টের হাসি হাসে চানুবুড়ি, ‘আমার ঝদি সে বয়স থাকত তা’লি তোকি আমি মাই দিতুম রে বাপ!’ ভজনকে বলল, ‘বাছুর নে আমার সঙ্গি চল, গলার দড়িটা খুলি দে।’

চানুবুড়ি সবার আগে আগে চলে। তার গায়ে গা লাগিয়ে বাছুরটা। তার চলার আগ্রহে মাকে পেয়ে ফের হারানোর আশঙ্কা। চানুবুড়ির সাদা থান আর গা থেকে নিজের মায়ের গায়ের রং আর গন্ধ খুঁজে পায় বুঝি বাছুরটা।

ওদের পিছনে কৌতূহলী সারা পাড়া। চানুবুড়ি কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করবে!

শেষ পাতা

অসিত কর্মকারের গল্প

আমাদের নতুন বই