হাঁসদা সৌভেন্দ্র শেখরের গল্প

ভয়ের অন্ধকার

ভাষান্তর: কবির দেব

একটা ব্যস্ত দিন — সকাল আটটা থেকে দুপুর দুটো অবদি— সদর হাসপাতালে, যখন আমার চারটে বিভাগ একসঙ্গে দেখতে হচ্ছিল, ঠিক তখনই হাসপাতালের সুপার আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমার কেবিনের সামনে একটা বেস ভালো ভিড় জমেছে— একটা অবশ ভিড় যা আমাদের কোনো অনুরোধ মানতে পারছে না অথবা চাইছে না যাতে এই হাসপাতালে একটা শান্তি বজায় থাকে। আমি তাদের কে বললাম যে আমি খুব শিগগিরই আসছি। এই বলে আমি ও.পি.ডি থেকে বেড়িয়ে চলে গেলাম।

বাইরে এসেও আমি দেখলাম ভিড়ের কোনো শেষ নাই, পুরো বারান্দা মানুষের ছায়ায় ঢাকা। আমাদের সরদার হাসপাতাল এই বিচ্ছিন্ন সাঁওতাল পরগনার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল। আমাকে ছাড়া এই হাসপাতালে ও.পি.ডি, ফিমেল ওয়ার্ড এবং লেবার রুমের জন্য একজন মহিলা ডাক্তার আর একজন দাঁতের ডাক্তার নিযুক্ত করা হয়েছে। বাইরে অনেক পুরুষ, মহিলা এবং সাহিয়া ভিড়ের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়াস করছিল। সাহিয়ারা মালদা এবং মুর্শিদাবাদের বাংলায় চিৎকার করতে শুরু করল। কিছু আবার ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে চিৎকার করতে লাগল তাদের পাওনা টাকার জন্য। সাহিয়ারা গর্ভবতী মহিলাদের গ্রাম থেকে নিয়ে আসে এবং তাদের ডেলিভারি থেকে কিছু টাকা তাদের জন্য থাকে। তাদের কাজ হল মমতা বাহন দিয়ে গর্ভবতী মহিলাদের সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা এবং যতো বেশি মহিলা তাদের তত বেশি লাভ— কিছু টাকা সরকার থেকে পাবে এবং কিছুটা হাসপাতাল থেকে বকশিশ হিসেবে। তাদের মুখ খুব বাজে এবং ঠিক ততটা কাজের মহিলা তারা কারণ তাদের ঘরের সম্পূর্ন দায়িত্ব তাদের পালন করতে হয়।

সাহিয়া এবং সাঁওতালদের ভিড় দেখে আমি একটুকু অবাক হয়ে নাই কিন্তু পুলিশ দেখে হয়েছি। তিন জন পুরুষ পুলিশ এবং একজন মহিলা পুলিশ। দুজন পুলিশ যখন বারান্দার উপর ঘুরাঘুরি করছিল, একজন পুলিশ একটা দম্পতির পেছন দাঁড়িয়েছিল। সেই দম্পতির পাসে একটা ছোট ছেলে ছিল। দম্পতির বয়েস তিরিশের কাছাকাছি হবে কিন্তু তাদের কে এতো মারধর করা হয়েছিল যে তাদের বয়েস বোঝা খুবই কঠিন হয়ে উঠেছিল। তারা বয়েসে কম হতে পারে আবার বেশি হতে পারে। তারা হিন্দু, মুসলিম, সাঁওতাল হতে পারে। সেই ছেলেটি— যার বয়েস নয় অথবা দশ বলে মনে হচ্ছে — তাদের ছেলে বলে মনে হচ্ছিল। পুরুষকে বেশ ঠান্ডা লাগছিল, কিন্তু মহিলার মধ্যে দুঃখের ছায়া দেখা যাচ্ছিল। পাশে তাদের ছেলেটি দেয়ালের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। মহিলা পুলিশকর্মী এক গোষ্ঠী সাঁওতালদের সাথে দাঁড়িয়েছিল। তুলনা মূলকভাবে তাদেরকে দম্পতির থেকে বেশ ভালো লাগছিল। ভালো কাপড় পড়া। তাদের মধ্যে পাঁচজন ছেলে এবং একজন মেয়ে ছিল। পুরুষগুলো ফিসফিস করে একজন আরেকজনকে কী বলছিল। মহিলাটির মাথা একটা গামছা দিয়ে ঢাকা ছিল। একটা ছোট্ট মেয়ে ছিল তাদের সঙ্গে— তিন থেকে চার বছরের, একটা জামা পড়া— যে একটা কোজেক সেলিনজের ছোটো কার্টুন নিয়ে খেলছিল।

হাসপাতালে পুলিশ মানে বিপদ। হয়তো একটা মারপিটের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পুরুষ এবং মহিলাদের মাথার রক্ত থাকবে কিন্তু সেরকম কোনো কেসই ছিল না। একজন মহিলা পুলিশকর্মী কী করছে? কোনো মহিলা মারপিট করেছে নাকি? কিন্তু সাধারণত মহিলাদের সঙ্গে পুরুষ পুলিশকর্মী আসে। তাহলে এখন কেন হলো? কোনো ধর্ষনের ঘটনা হয়ছে কী? মহিলা পুলিশকর্মী ভিড়ের সঙ্গে কেন দাঁড়ানো? কোনো মন্ত্রী, অথবা ব্যবসায়ী কি জড়িত আছে? আমি যখন ইমারজেন্সির চার্জে তাই মনে মনে ঠাকুরের নাম নিয়ে সুপারের রুমে ঢুকে পড়লাম।

‘আসতে পারি কি, জনাব?
‘আও ইয়ার’ সুপার বললেন, ‘আর বেঠো’
চেয়ারে বসলাম। আরেকটা মানুষ আমার পাশের চেয়ারে বসা ছিল। দেখতে ষাটের কাছাকাছি লাগছে এবং পুলিশের মতন লাগছে।
‘চায় পিওগে’
‘না জনাব। ধন্যবাদ’ আমি বললাম এইটা দেখা সত্তেও যে সামনে দুটো কাপ চা পড়ে আছে।
‘আচ্ছা ঠিক হে’, তিনি পুলিশকর্মীর দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, ‘ইনসে মিলো! তিনি টাউনের ইনস্‌পেকটর।
‘প্রণাম’ আমি আমার বুকে হাত রেখে তার হাতে হাতে মেলালাম। তিনে ভদ্রলোক, এবং বিনম্র।
‘দেখতেই পাচ্ছ আমাদের এইখানে একটা কেস এসছে’ সুপার বললেন।
‘হে জনাব’ আমি বললাম।
‘খুবই সংবেদনশীল কেস’ ইনস্পেক্টর মাথা নাড়ালেন। ‘এই মেয়ে— তিন বা চার বছর বয়স— কত হবে ইনস্‌পেকটর?
‘আমাদের কে চার বছর বলা হয়েছে’ ইনস্‌পেকটর বললেন।
‘হে’ সুপার আমার দিকে ঘুরলেন ‘এই চার বছরের মেয়ের ধর্ষন হয়েছে।’
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।
‘আমরা এখনও ঠিক বলতে পারছি না’ ইনস্‌পেকটর বললেন।
‘হে আমরা শিওর না’ সুপার বললেন ‘কারন… তুমি সেই ছেলেটা কে দেখেছ তো যাকে ধরে আনা হয়েছে? সেই দশ বছরের ছেলেটা?
‘হবে জনাব’ আমি বললাম।
‘তো’ সুপার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘মেয়েটার পরিবার বলছে যে এই ছেলের হাতে তাদের মেয়ের এই ধর্ষনের শিকার হতে হয়েছে।
আমি আরও অবাক হলাম।
‘আমরাও বুঝে উঠতে পারছি না যে একটা দশ বছরের বাচ্চা কী করে একটা মেয়ের সঙ্গে এই রকম করতে পারে’ সুপার বললেন। ‘কিন্তু মেয়ের পরিবার তো এই কথাই বারে বারে বলছে’।
‘হে জনাব’ আমি বিস্মৃত হয়ে বললাম।
‘তোমার চিন্তার কোনো কারন নেই’ সুপার আমাকে ঠান্ডা ভাবে বললেন ‘তোমার শুধু ছেলেটার টেস্ট করে দেখতে হবে। দেখো যে সেকি সাবালক নাকি, সেকেন্ডারি সেক্স বৈশিষ্ট্য গুলো দেখো। জানো তো এইসব, তাই না?
‘হে জনাব’ আমি উত্তর দিলাম।
‘আর ভাববে না। ভয়ের কিছু নেই। একটা বড়ো ভিড় এসছে মেয়ের সাথে। ওরা ছেলের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে। ভয় পেয়ো না, মাথা ঠান্ডা রেখে নিজের কাজ করে যাও।’
‘আচ্ছা জনাব’।
‘আর নার্ভাস লাগলে তুমি এক কাপ চা খেতে পারো’ সুপার হেসে আমাকে বললেন ‘ডাকবো কি? দেখ আমাদের চা কিন্তু এখনও গরম রয়েছে’
‘না জনাব, আমি এখন আমার কাজটা শুরু করি। ও.পি.ডি-র মধ্যে অনেকেই আমার অপেক্ষা করছে।
‘ঠিক আছে যাও। কোনো প্রবলেম হলে আমাকে এসে বলবে’।

আমি ভিড়ের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম। সুপার ঠিক ছিলেন, মেয়ের পুরো পরিবার সঙ্গে আছে। তারা মহিলা ও.পি.ডি-র বাইরে দাঁড়িয়েছিল মহিলা পুলিশকর্মীর সঙ্গে এই অপেক্ষায় যে কখন মহিলা ডাক্তার আসবে। তারা ঘুরে ফিরে হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছিল এবং পুলিশকে কি চিৎকার করে বলছিল। মেয়েটা এখন একটা W.H.O. পোস্টার দিয়ে খেলছিল, পুরো বারান্দার উপর গড়িয়ে গড়িয়ে। কেউ তাকে আটকানোর চেষ্টাও করছিল না।

ছেলেটার সঙ্গে শুধু তার পরিবার ছিল। ছেলের পাশে পাতলা, দাড়ি ভর্তি গাল, এবং নোংরা জিনস্‌ পরে তার বাবা ক্লান্ত হয়ে ভেঙে পড়েছিলেন। দেখে একজন লেবার লাগছিল। ঠিক বাবার পাশে বসেছিলেন ছেলের মা। দেখতে পাতলা, এবং সারাদিন ধরে কেঁদে যাচ্ছিলেন। ছেলের চোখ এখনও দেয়ালের উপর থেকে নড়ে নাই।

আমি পুলিশকর্মীর কাছে গিয়ে ছেলেকে ভেতরে ইমারজেন্সি রুমে নিয়ে আসতে বললাম।

‘ডাক্তার সাব, আমার ছেলে কিসু ভুল করে নাই!’ ছেলের মা দৌড়ে এসে আমার কাছে বলল। দুজন পুলিশকর্মী তার পেছনে ছুটে আসলো।
‘এই চলো! হটো হটো!’ ও.টি কর্মী মহিলাটি কে নিয়ে চলে গেলেন।
‘আইয়ে জনাব” ও.টি কর্মী মহিলাটি কে সরানোর পর আমাকে বললেন।
‘সিপাহী জি, লেটার?’ ঔ.টি. কর্মী পুলিশকর্মী কে বলল।

একজন পুলিশকর্মী এসে আমাকে থানা থেকে পাঠানো একটা চিঠি দিল। চিঠির মধ্যে মেডিক্যাল অফিসারকে অনুরোধ করা হয়েছে ছেলেটার মেডিক্যাল চেক আপ করার জন্য যাতে বোঝা যায় যে আদৌ কোনো ধর্ষনের ইঙ্গিত আছে কিনা। কোনো চোট আছে কি প্রাইভেট পার্টে? দশ বছরের ছেলের থেকে?

আমি ছেলেটার নাম দেখলাম। তার পদবি ঠাকুর ছিল। ঠাকুর নাপিত জাতিকে বলা হতো। ছেলের বয়েস দশ বছর লেখা ছিল।
‘ছেলেটা কে নিয়ে আসো!’ পুলিশকর্মীকে আমি বললাম।
‘এ! বচ্চে কো অন্দর লাও!’ পুলিশকর্মী ছেলের মা আর বাবাকে বলল।
‘ডক্টর সাব! আমার ছেলের কে ফাঁসানো হচ্ছে’ ছেলেটার মা ও.টি.-র দরজা খুলে ঢুকে বললেন। ‘ও নির্দোষ! ওই মানুষগুলো খুব খারাপ’ মেয়ের পরিবারের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল।
এই! এই! ডক্টর সাব কো অপনা কাম করনে দো! পুলিশকর্মী মহিলা কে বাইরে ধাক্কা দিতে দিতে বলল। ‘এই সুনো! লে জাও ইসকো! চিল্লাও মত হাসপাতাল মে!’
ছেলেটা কে ও.টি.-র ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করল। ‘বসো এইখানে’ আমি পরীক্ষা টেবিলে আঙ্গুল রেখে বললাম।
‘এ! ইয়হা বেঠ!’ ও.টি. কর্মী ছেলেটাকে বলল।
‘তোমার নাম কি?’
সে তার নাম বলল।
‘তোমার বয়েস কত?’
ছেলেটা চুপ করে রইল।
‘এ! উমর কিতনা হে বোল?’ ও.টি. কর্মী চেঁচিয়ে বলল।
ছেলেটা ভয় পেয়ে হাত পা গুটিয়ে নিল।
‘আমাকে বলো! কত বয়েস তোমার?’
‘দশ বছর’ ভয়ের গলায় ছেলেটা বলল।
‘দশ? তোমার বয়েস দশ বছর?’
ছেলেটা ঘাড় নাড়িয়ে হে বলল।
‘আমরা কি তার পরীক্ষা শুরু করে দিব?” ও.টি কর্মী কে জিজ্ঞেস করলাম।
‘হে জনাব’ সে বলল। ‘এ! নিচে উতর ওর প্যান্টে খোল!’
ছেলেটা আরো ভয় পেয়ে গেল।
‘দাঁড়াও দাঁড়াও’।
‘নিচে আসো! আমার কাছে আসো ভয় পেয়ো না।’ আমি মৃদু স্বরে বললাম।
‘কাপড় গুলো খুলো’।
ছেলেটা কর্মীর দিকে তাকাল।
‘চল খোল’।
‘কিচ্ছু ভয় পাওয়ার নেই’ আমি বললাম ‘কিচ্ছু হবে না। কাপড় গুলো খুলো। কেউ তোমাকে দেখবে না।’
আমি পরীক্ষা শুরু করলাম। ছেলেটা অনেক ছুটো। প্রাইভেট পার্টসে কোনো ইনজুরি নেই।
‘ছেলেটা নির্দোষ জনাব’ ও.টি কর্মী বলল ‘তারা এই ছেলেটাকে ফাঁসাচ্ছে’।
আমি হাত তুললাম।
‘কাপড় পড়ে ফেলো’ আমি বললাম। ‘দেখো বেটা, সত্যি কথা বলল। তুমি কী কিছু করেছ?’
‘না না! আমি কিচ্ছু করি নাই’ কান্নার আওয়াজে বলল।
‘তাহলে তুমি এইখানে কী করে?’

ছেলেটা চুপ করে রইল। আর একটা কথা আমি বললে সে ভেঙ্গে পড়ত। আমি একটু সময় দিলাম তাকে। কিছু সময় পর আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।
‘স্কুলে যাও?’
‘হে’
‘তুমি সত্যি কথা আমাকে নাই বললে তুমি তো স্কুলে যেতে পারবে না’।
চুপ করে থাকলো সে।
আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি। সত্যি কথা বললে তুমার ভালো হবে। কিছু ভুল না করলে ভয় কীসের?
‘আমি তাকে ছুঁয়েছি’ সে বলল।
‘কোথায়?’
সে তার শিশ্ন ধরল।
‘সেখানে? তুমি মেয়েটার এই জায়গায় ধরেছে?’
‘হে’।
‘কেন?’
‘আমার বন্ধুরা বলেছিল’।
‘কোন বন্ধু?’
‘আমার বন্ধু’
‘বুঝতে পেরেছি! কিন্তু কোন বন্ধু? কোন স্কুলের?’
‘তারা স্কুলে যায় না। তারা বড়ো ছেলে। অনেক বড়ো’।
‘ঠিক আছে। তুমি তাদেরকে কী করে চিনো?’
‘আমরা এক সাথে খেলি’।
আচ্ছা! তাহলে তারা তোমাকে বলেছিল মেয়েটার সেখানে ছুঁতে?
‘হুম’।
‘কী করে করলে? তুমি ডাকিয়ে পাঠিয়েছিলে মেয়েটাকে?’
‘একটা বড়ো ছেলে! সে এই মেয়েটার বড়ো বোনকেও ছুঁয়েছে!’
‘তারপর?’
‘সে আমাকে বলেছিল যে মেয়েটা চায় আমি তার এইখান ছুঁই’।
‘আর?’
‘সে আমাকে বলেছিল যে আমি শুয়ে মেয়েটাকে ছুঁতে’।
‘বড়ো ছেলেটা বলেছিল?’
‘হে’
‘সে কী করে জানতে পারলো তুমি শুতে চাইবে?’
‘সে মেয়েটার বড়ো বোনের সঙ্গে শুয়ে পড়ে’।
‘তারপর?’
‘আমি মেয়েটা কেও ডাকিয়ে এনে তারপর সাথে শুই’।
‘কোথায়?’
‘ময়দানে! যেখানে আমরা খেলি’।
‘ময়দান? মানে খোলা ময়দান?’।
‘হে। বড়ো ছেলেটা সেখানেই শুতে আসত’।
‘তারপর?’।
‘আমি তারপরও জামার ভেতর হাত ঢুকাই?’
‘ছুঁয়েছিলে?’
‘হে’।
‘তারপর?’
‘সেই পালিয়ে গেলো আর ঘরে গিয়ে বলে দিল’।
‘আর কিছু করেছ? ভেতরে আঙ্গুল ঢুকিয়েছিলে?’
‘না না’।
জনাব তাহলে এইটা ধর্ষন না। এই ছেলেটা ভুল করেছে কিন্তু তাকে জোর করা হয়েছে। একবার তার বয়েসের কথা ভাবুন। বাচ্চাদের কে জোর করা খুবই সোজা।
‘ঠিক আছে! ঠিক আছে! সিপাহী কে ডাকো?’
দরজা দিয়ে ছেলেটা বাইরে চলে গেল আর কিচ্ছু বলার আগে ছেলের মা বাবা ভেতরে ঢুকে পড়ল।
‘জনাব! মানুষগুলো মিথ্যে কথা বলছে। আমার ছেলে কিসু করে নাই। তারা বদলা নিচ্ছে কারণ, তারা আমাদের মেয়েকে বিক্রি করে দিয়েছিল কিন্তু আমরা তাকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসি’।
‘দরজাটা লাগাও’ আমি কর্মী কে বললাম।
‘তোমার গল্পটা কী?’
‘জনাব, তারা খুব বাজে। আমার বউ তাদের ঘরের একজন।’
তখন আমি বুঝতে পারলাম যে মহিলাটি সাঁওতাল আর সে একটা ঠাকুরকে বিয়ে করেছে।
‘তারা সাঁওতাল জনাব। কিরিসটান” সে বলল। ‘এবং এইটাই তাদের কাজ। তারা সাঁওতাল মেয়েদের তুলে আনে পড়াবে বলে এবং তাদের কে কাজ শেখায় আর বিক্রি করে দেয়।’

‘আমার বউ তাদেরই একজন কিন্তু সে পালিয়ে আমায় বিয়ে করেছে। সে এখন হিন্দু। কিরিসটান না। তারা আমাদের বিয়ে মেনে নেয়ে নাই আর তাই আমাদের ঘেন্না করে। আমি খুবই সাধারন মানুষ। মেহনত মজদুরি করি। তারা মেয়েদের বেঁচে অনেক ধনী। আমাকে অনেকবার বলেছে আমাকে ছাড়বে না ওরা। আমার পনেরো বছরের একটা মেয়ে আছে। কিছুদিন আগে সে হারিয়ে গেল। থানায় রিপোর্ট লেখালাম কিন্তু তারা কিছুই করল না। এক সপ্তাহ আগে আমাকেকে একজন ফোন করল। তুলে দেখি আমার মেয়ে। দিল্লি থেকে। সে বলল তারা বুঝি বলেছে আমাদেরকে তারা অনেক টাকা দিবে আর তাই সে চলে গেল। তারা আমার মেয়েকে বিক্রি করে দিল! আমরা ফোন পাওয়ার পর দিল্লি চলে গেলাম ট্রেনে। ছেলেকে রেখে গেলাম আর দেখুন তারা কী করে নিল! আমরা আমাদের মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি দেখে তারা এইরকম করল।’
‘আমাদের বাঁচান জনাব’ ছেলের মা ভেঙে পড়ল ‘আমার ছেলে নির্দোষ। তারা আমাদের ছেলে মেয়েকে মেরে ফেলবে।’
‘দেখুন আমরা আপনাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসি কিন্তু আমরা তো শুধু পরীক্ষা করে বলতে পারব যে আপনার ছেলে দোষি নাকি নির্দোষ। বাকি সব কাজ পুলিশের’
ছেলের বাবা কিচ্ছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
‘যা আমাকে বলেছ এবং যে সব প্রমাণ আমাকে দেখিয়েছ সেগুলো কোর্টে দেখান’
‘জি জনাব’।
‘আর একটা উকিল জোগাড় করুন। কোনো সংস্থাকে বলেছ দেখুন তারা সাহায্য করতে পারে’।

আমি আমার সব পাওয়া প্রমাণ পুলিশকে দিয়ে দিলাম। আমরা আর কোনোদিন জানতে পারলাম না যে এর শেষ কী হল। এই পুলিশ আরো হাজার হাজার কেস নিয়ে আসল হাসপাতালে। আমার মনে ইচ্ছা ছিল এই ঘটনার শেষ পর্যন্ত কথায় গেল জানার কিন্তু কথাও লাগল আমার বেশি যুক্ত হওয়া ভালো না।

আমাদেরকে কোর্ট এখনও ডাকে নাই। হয়তো আরে বছর দুই এক লাগবে। আরো এর মধ্যে জানিনা কতো সাঁওতাল মেয়েদেরকে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, কতো নির্দোষ ছেলে শাস্তি পাচ্ছে শুধু এই দেশের পরিবার গুলোকে ভয়ের অন্ধকারে রাখার জন্য।

Spread the love

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *