চুমকি চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

ভালোবাসা

— কেমন চলছে সবকিছু? বেরোচ্ছিস টেরোচ্ছিস না তো?
— এই সময়ে কেমন আর চলবে, সবারই তো এক অবস্থা। বেরোচ্ছি বলতে ওই খুব প্রয়োজন হলে তবেই। মানে খাদ্যবস্তুর অভাব হলে আর কী!
— সময় কাটাচ্ছিস কীভাবে? আমি তো বোরস্য বোর হচ্ছি। কাঁহাতক আর বৌয়ের সঙ্গে গল্প করা যায়! ছেলে তো আজকাল কথাই বলে না বিশেষ। বড়ো হয়ে গেলে যা হয়। নিজের জগতেই মস্ত্। দরজা বন্ধ করে কী যে করে। যাগগে, তুই বল শুনি।
— আমার তো এখনও অবধি ভালোই কাটলো। সোমা নানারকম রান্নাবান্না করছে। মানে পোলাও বিরিয়ানি নয় তা বলে। ওই শুক্তো, তেঁতোর ডাল, পাঁচমেশালি ডাল, থোড়ের ছেঁচকি — এইসব আরকী। অফিস থাকলে তো এতসব করার সময় পায় না।
— আরে বাহ! খুব ভালো। তা এত সোমার সময় কাটাবার ফিরিস্তি দিলি। তুই তো খাদক। সারাদিনই খাচ্ছিস নাকি? বাকি সময়টা কী করছিস? তুই তো আবার গল্পের বই বিশেষ পড়িস না, চোখের জন্য।
— হ্যাঁ রে, ঠিকই বলেছিস। সোমার সময় কাটাবার কথাই তো বললাম, আমার কথা আর বললাম কই। ওই ধর, বেশিরভাগই টিভিতে খবর শুনছি, মেজদা, ছোড়দা, বড়দি, টুবুল, শিউলিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছি। কতদিন পর এদের সঙ্গে কথা বলছি জানিস! কাজের চাপে সময়ই পেতাম না। ওদের কেউ কেউ কখনো-সখনো ফোন করলেও বেশি কথা বলে সময় নষ্ট করে যদি, সেই ভয়ে ফোনই ধরতাম না। স্কুল কলেজের দু-একজন পুরোনো বন্ধুর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি।
— এই বীরু, তাতুন কোথায় এখন? ওর কথা জিজ্ঞেস করব বলেই ফোনটা করেছিলাম আসলে। ওর চেন্নাই যাবার কথা ছিল নাকি একটা প্রজেক্টে? ফিরে এসেছে?
— আর বলিস না। কলেজ থেকেই নিয়ে গেছে চেন্নাইতে কি একটা কম্পিটিশনে। তার মধ্যেই তো এই লকডাউন ঘোষণা হয়ে গেল। ওখানেই আটকে আছে। যদিও ওরা দশজন স্টুডেন্ট আর দু-জন টিচার একসঙ্গে আছে, তাও একটু চিন্তা তো হচ্ছেই। সোমা তো ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে। খুব টেন্সড। কী যে এক রাক্ষুসে ভাইরাস এসে জুটল!
— আরে টেনশন করে কী হবে, এখন তো কোনোভাবেই আসা যাবে না। ওখানকার পরিস্থিতি কেমন? ইনফেকশনের রেট?
— পরিস্থিতি এখনও অবধি কন্ট্রোলে তবে সবে তো বারোদিন হল। ইনফেকশন তো আছেই। কী যে হবে! এবার মনে হচ্ছে কলিকাল শেষ হতে চলেছে। মানুষের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়ে গেছে, এবার ফলাফল। মানব সভ্যতা মুছে যাবার পথে।
— এই তো না! শুরু করলি আবার? এত পেসিমিস্টিক কেন তুই? রোগব্যাধি তো হতেই পারে, নাকি? এই জীবাণুটা নতুন তাই সামলাতে টাইম লাগছে। ভ্যাকসিন বেরিয়ে যাবে চটপট, দেখ না। তখন বেটা করোনা ভাইরাস কব্জায় এসে যাবে। তাতুনের সঙ্গে তুই নিজে কথা বলেছিস তো? সাবধানে থাকতে বলবি।
— তুই তো জানিস শ্যামল, তাতুন আমাকে একেবারেই পছন্দ করে না। আমি যে ওকে ভালোবাসি সেটা নাকি দেখনাই। সোমাকে হাতে রাখতে ন্যাকামি করি। বিশ্বাস কর শ্যামল, আমি কিন্তু সত্যিই ওকে ভালোবাসি। কখনো ভাবি না, ও আমার নিজের ছেলে নয়। কে জানে, হয়তো আমার প্রকাশভঙ্গি ওর ন্যাকামি মনে হয়।
— মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক তো ভালোই নাকি? তা ছাড়া ওর বাবা মারা যাবার পরেই তো তুই সোমাকে বিয়ে করেছিস, তাহলে অসুবিধে কোথায়?
— সোমা যেহেতু আমার পূর্বপরিচিত, তাতুনের ধারণা ওর বাবার সুইসাইডের পেছনে আমার হাত আছে। আগে থেকেই আমাদের সম্পর্ক ছিল, এমনটাই সন্দেহ বাসা বেঁধে আছে তাতুনের মাথায়। তা ছাড়া ওর বাবা ছিল ইঞ্জিনিয়ার, সুদর্শন এক পুরুষ, হাইলি স্মার্ট। আমি দাঁড়াতেই পারব না ওঁর পাশে। এ-সবই হয়তো কারণ…।
— আসল ঘটনাটা… তুই তো পছন্দ করতিস সোমাকে… তাই না?
— আমি পছন্দ করলেও কোনোদিন তা প্রকাশ করিনি রে বুড়ো। আর সোমার তরফ থেকে সে-সময় বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না আমার প্রতি। দেবর্ষি, মানে তাতুনের বাবার সঙ্গেই ওর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল কলেজে পড়াকালীনই।
— ভদ্রলোক সুইসাইড করতে গেলেন কেন?
— তুইও কি সন্দেহ করছিস নাকি আমাকে?
— আরে দুর বাবা! এত সফল একজন মানুষ হঠাৎ করে…
— পেশাগত সমস্যা বলেই শুনেছি সোমার কাছে। তা ছাড়া, শেয়ার বাজারে বেশ আগ্রহ ছিল এবং সেখানেও নাকি বড়ো ধরনের কিছু ওলট-পালট হওয়াতেই… যদ্দুর সোমা বলেছিল। আমি নিজে থেকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করি না।
— হুম্, বুঝলাম। যাক ও-সব কথা। সাবধানে থাক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আসব আড্ডা দিতে। সোমার হাতের বিউলির ডাল আর আলুপোস্ত খাব। অনেক্ষণ গ্যাঁজালাম, এবার রাখি তাহলে।
— হ্যাঁ রে। তুইও সাবধানে থাকিস।

*
লাল নীল সবুজের মেলা বসেছে… লাল নীল সবুজের…
মোবাইল বাজার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় শ্যামলের। সাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলতে গিয়ে ঘড়িতে চোখ পড়ে… ৫: ২৪। এত ভোরে কে ফোন করছে? তাও আবার এই লকডাউনের মধ্যে! মুখের সামনে আনতেই দেখে বীরেশ্বর কলিং… এত সকালে বীরু! ধক করে ওঠে বুকটা। কোনো বিপদ হল নাকি?
— হ্যাঁ রে বল বীরু… কী ব্যা…
কথা শেষ করার আগেই বীরুর উত্তেজিত গলা শুনতে পায় শ্যামল।
— জানিস শ্যামল, একটু আগে তাতুন ফোন করেছিল আমার ফোনে। কী বলল জানিস? বলল… বলল, আমার জন্যে নাকি ওর মন খারাপ লাগছে। ফিরতে চাইছে আমার কাছে!!

চুমকি চট্টোপাধ্যায়ের গল্প

আমাদের নতুন বই