তীর্থঙ্কর নন্দীর গল্প

ক্রম ঘূর্ণন

আজ বিকালে লহমাকে নিয়ে ঘুরতে বেরবার কথা। কোথায় ঘুরবে! আনলকডাউনে দেখতে বেরবে কোন কোন মল খুলল! কী কী নিয়ম মেনে মলে ঢুকতে হচ্ছে এইসব। লহমায় সঙ্গে দেখা করার কথা পাঁচটায়। নতুন পাড়ায় বাস স্ট্যান্ডে। নালক বিকালে ঘড়ি দেখে বেরিয়ে পড়ে। এখন চারটে। রোদ অল্প কম। তাপ আছে। শরীরে কেমন চিটচিটে ভাব। বাতাসে জলীয় বাষ্প আছে। বর্ষা এসে যাবে কিছুদিনের ভিতর। লহমা আসবে তো! নাকি নতুন পাড়ায় বোকার মতন দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করবে! লহমা তো গতকাল বলল আসবে। তবুও চিন্তা হয় যদি না আসে। কথা দিয়েও যদি কথা না রাখে! ইদানীং লহমা খুবই কথা কম রাখে। নালক অযথা লহমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। সময় নষ্ট করে। লহমার পাকে ঘুরতে থাকে। ঘুরে যায়।

নালক নতুন পাড়ার বাস স্ট্যান্ডে না গিয়ে সোজা বিমানবন্দরের বাস ধরে। অনেকদিন বিমানবন্দরে যায় না। লকডাউনে সব বিমান ওঠা নামা বন্ধ থাকে। লহমা যদি না আসে শুধু শুধু বিমানবন্দরে যাওয়াটাও আটকে যাবে। আনলকডাউনের চিত্রটি দেখা থেকে বঞ্চিত হবে। বাস বিমানবন্দরের প্রায় কাছে এসে থামে। নালক নামে। একটু হাঁটতে হবে। হাঁটা শুরু করে। চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বন্দর এলাকা কেমন ফাঁকা ফাঁকা। লোকজন বেশ কম। অ্যাপ ক্যাবও বিশেষ দাঁড়িয়ে নেই। ধুলোহীন বন্দর কেমন ছবির মতন ফুটে ওঠে। নালক বন্দরের এদিক ওদিক ঘোরে। একটু দূরে দুটো বিমান দাঁড়িয়ে। মনে হয় একটা ছাড়বে। নালক হাঁ করে বিমানের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছাড়ায় বিমানে মানুষ উঠে পড়ে। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। একটু পরে ধীরে ধীরে পাখা দুটো ঘুরতে শুরু করে। নালক ঘুরন্ত পাখার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকে। পাখা দুটো ঘুরে চলে। ঘুরতেই থাকে। ক্রমাগত ঘুরে যায়। নালক ক্রম ঘূর্ণন পাখা দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

বাইরের রাতটা বেশ ভালো। আধঘণ্টা বৃষ্টি হয়। গরমের ভাপটা কেটে গেছে। অরুনিমা বারান্দায় বসে দিব্যকে ফোনে ধরে। আজ দিব্যর জন্মদিন। উলটো দিকে ফোনে দিব্য। অরুনিমা প্রথমেই ফোনে একটি চুম্বন পাঠায়। আশীর্বাদের চুম্বন। বলে আরও বড়ো হও। দীর্ঘজীবী হও। সিলভিয়ার খবর নেয়। কবে আসবি জিজ্ঞাসা করে। দিব্য এক নিঃশ্বা সে মা-র সব কথা শোনে। পরে জবাব দেয় এখানে সবাই ভালো। তোমরা ভালো থেকো। আগামী বছর যাওয়ার খুব চেষ্টায় আছি। মোট কুড়ি মিনিট অরুনিমা দিব্য কথা বলে। তারপর অরুনিমা ঘরে চলে আসে। রাত এখন বারোটা। বাইরেটা আস্তে আস্তে চুপ হয়ে আসে। মানুষ ঘুমের জন্য তৈরি হয়।

অরুনিমাও তৈরি হতে শুরু করে। রাতে। ঠাকুর দর্শন এক দীর্ঘদিনের অভ্যাস। দর্শনের পর আসনের পর্দা টেনে দেয়। ঠাকুরও অরুনিমার সঙ্গে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। সামনের বছর হয়ত দিব্য নিশ্চয়ই আসবে। আজ যখন বলল চেষ্টা ঠিকই করবে। অরুনিমা বাথরুম সেরে ঘরে ফিরে আসে। মশারি টানায়। এক গ্লাস জল খায়। মাথার ওপর পাখাটা বনবন করে ঘোরে। রাতে এই পাখাটা থেকে ঠান্ডা হাওয়া নামে। সেই ঠান্ডা হাওয়ায় অরুনিমার জোড়া চোখে ঘুম নামে। সেই ঘুম রাত কাটিয়ে ভোরে এসে থামে। অরুনিমা ঠান্ডা পাখার হাওয়ায় শান্তিতে পুরো রাতটা কাটায়।

পাখাটা বোধহয় দিব্যই কিনে ছিল। বহু বছর আগে। পাখার বয়স এখন পনেরো বছর হবেই। দিব্য তখন এই শহরেই। প্রথম চাকরিতে ঢোকে। মাইনের প্রথম টাকাতেই দুটো পাখা কেনে। পাখা দুটোও অত্যন্ত ভালো। এখনও ভালো মতন ঘোরে। পাখা দুটো ঘোরার সময় ব্লেডে কোনো আওয়াজ বা শব্দ হয় না। খুব মসৃণভাবে ঘোরে। অরুনিমা পাখার মসৃণ ঘূর্ণন দেখতে দেখতে বিছানায় ঢুকে পড়ে। মাথার ওপর ঘুরতে থাকে মসৃণভাবে তিনটে ব্লেড। অরুনিমা ঘুরন্ত ব্লেড দেখতে দেখতে দিব্যর কথা ভাবে। দিব্যর চেহারা মনে পড়ে। পাখাও ঘুরতে থাকে। পাখার ক্রম ঘূর্ণনে অরুনিমার চোখে ঘুম এসে যায়।

অনুষ্টুপ দু-দিনের জন্য কাছে পিঠে কোথায় বেড়াতে যেতে চায়। মনটা একদম ভাল নেই। ইন্টারভিউ দিতে দিতে ক্লান্ত। তাই বন্ধু পপকে নিয়ে কোথাও যেতে চায়। এই শহরের ধারে কাছে বলতে ওই সমুদ্র। চার ঘণ্টার মতন লাগে। পপকে ফোন করে। শনিবার সমুদ্রে যাবি! পপ রাজি হয়ে যায়।

আজ ভোরের ট্রেন অনু্ষ্টুপ আর পপ সমুদ্র স্টেশনে নামে। নেমে হোটেল খোঁজে। বিচের সামনেই হোটেল পায়। দোতলার ঘরটি যেন সামুদ্রিক হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। ঘরটিও বেশ বড়। জানালা দিয়ে উইন্ড মিল চোখে পড়ে। উইন্ড মিল হাওয়ায় ঘুরতে থাকে। ব্রেকফাস্ট করেই পপ আর অনুষ্টুপ বিচে আসে। প্রচুর ছোটো বড়ো লাল কাঁকড়া বালি মাঠে ঘোরাঘুরি করে। দৌড়াদৌড়ি করে। পায়ের শব্দে সঙ্গে সঙ্গে বালু সুড়ঙ্গে হারিয়ে যায়। সমুদ্র ঢেউ বালি মাঠে এসে ভেঙে ফেনা গুঁড়ো হয়ে পড়ে। পপ আর অনুষ্টুপ গুঁড়ো ফেনা টপকে টপকে সমুদ্রের কাছে আসে। শরীরে ঢেউ মাখে। ঢেউ ভাঙে। ঢেউ টপকে আরও ভিতরে যায়। সিঁড়ির মতন সারি সারি ঢেউ আসে। ঢেউ চলে যায়। পপ আর অনুষ্টুপ যেন সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উঠতেই চায় না। একেই কী বলে যুবকের ধর্ম! জানি না।
বিকালে পপ আয় অনুষ্টুপ সম্রাট হোটেল থেকে বেরিয়ে আবার বিচে আসে। এখন বিচ অনেক শান্ত। মানুষজন কম। লাল কাঁকড়ারা বালুসুড়ঙ্গে ঘুমিয়ে। জানি না লাল কাঁকড়াদের সঙ্গমক্ষণ কখন! সন্ধ্যেবেলায়! না গভীর রাতে! অনুষ্টুপ বালি মাঠ ধরে সমুদ্রে এগোয়। ভাবে আবার কোথায় কবে ইন্টারভিউ দেবে। সব ইন্টারভিউই তো ব্যর্থ। চাকরি কি পাব না। অনুষ্টুপ আর পপ হাল্কা পানীয় নেয়।সমুদ্রের জলকে কত গম্ভীর দেখায়। গম্ভীর গর্জন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অনুষ্টুপের জোড়া কানে সেই গর্জন যন্ত্রণার মতন ঠেকে। সামনে ছায়ার মতন উইন্ডমিল। উইন্ডমিলের পাখা ঘুরে চলে। অনুষ্টুপ ভাবে পরের ইন্টারভিউতে আরও ভালভাবে তৈরি হয়ে যাবে। কোনো ফাঁক ফোকর যেন না থাকে। গর্জনের যন্ত্রণাশুনতে শুনতে দুজনে হাঁটতে থাকে। অনুষ্টুপ টের পায় উইন্ডমিটলের খুব কাছে যেন চলে আসে। চোখের সামনে মিলের পাখা ঘুরতে থাকে। সেই ক্রম ঘূর্ণন পাখার দিকে তাকিয়ে অনুষ্টুপ কেমন খেই হারিয়ে ফেলে। সমুদ্রের খুব কাছে চলে যায়।

বিয়ের পর দু-বার তমনার সঙ্গে দেখা হয়। প্রথমবার বড়বাজারের কাছে। তমনা শাড়ি কিনতে আসে। একাই। রেমন তমনাকে দেখে চোখ সরাতে পারেনি। চোখে চোখ আটকে যায়। কিছুক্ষণ বাদে দু-জনেই হেসে ফেলে। সেদিনই নতুন ফোন নাম্বারটা রেমন নেয়। দ্বিতীয়বার দেখা হয় বিয়ের চার বছর বাদে গোলপার্কের কাছে। তমনাকে দেখে সেদিন বেশ ভারী লাগে। রং যেন ফেটে বেরয়। রেমন তমনার ভারী চেহারা দেখতে দেখতে দত্তাবাগানের সেই ছোটো মেয়েটির কথা মনে পড়ে। ছোটো তমনা। তারপর রেমন তমনাকে নিয়ে চায়ের দোকানে ঢুকে গল্প করে। চা বিস্কুট খায়। টোল খাওয়া গালে একবার টোকাও মারে। তমনা লজ্জায় রঙিন হয়ে পড়ে। ফিরে যাওয়ার সময় রেমন বলে ফোন করব কিন্তু। তমনা রেমনের কথা শুনে হাসে। বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

রেমন কিন্তু ফোন করে। বহুবার। কিন্তু তমনা দেখা করেনি। একদিনও না। তবুও রেমন আশা ছাড়ে না। ভাবে তমনা ঠিকই কোনওদিন দেখা করবে। তমনাকে শৈশব থেকেই চেনে। অফিস থেকে রেমন আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোয়। বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করে। রাস্তায় বাস কম। তাছাড়া গাদাগাদি করে এই কঠিন সময় বাসে ওঠাও খুব বিপদের। এখনও মারণ ব্যাধির কোনো ওষুধ বেরোয় না। রেমন লালদিঘির কাছে এসে থামে। হাঁটার জন্য একটু ক্লান্তিও লাগে। তমনাকে একটা ফোন করবে! বলবে কি এই লালদিঘির কাছে চলে এস। দু-জনে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে বাড়ি চলে যাবে। ফোন করলেই কি তমনা আসে! আগে এসেছে কখনো!

রেলিঙের ধারে হাতে খেলনা বন্দুক নিয়ে এক বেলুনওয়ালা বসে ঝিমোয়। গোলাকার বড়ো চাকতিতে আটকানো থাকে নানা রঙের বেলুন। সবুজ মেরুন লাল নীল। রেমন গোলাকার চাকতির কাছে এসে বেলুন দেখে। ইচ্ছা করে সব বেলুনগুলো বন্দুকের গুলি দিয়ে ফাটিয়ে দেয়। বেলুনওয়ালা রেমনের হাতে বন্দুক তুলে চাকতিটা ঘুরিয়ে দেয়। বহুবর্ণের বেলুন নিয়ে চোখের সামনে চাকতি ঘুরতে থাকে। জোরে জোরে ঘোরে। রেমন চোখের সামনে ক্রম ঘূর্ণন চাকতির দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকে। হাতে বন্দুক থেকে যায়। কোনো গুলি বেরয় না। বেলুন ফাটে না। শুধু ঘুরে যাওয়া চাকতির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েই থাকে।

প্রথম পাতা

Spread the love
By Editor Editor গল্প 1 Comment

1 Comment

  • ভাল লাগল।

    সৌরভ চক্রবর্তী,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *