লেখক নয় , লেখাই মূলধন

তীর্থঙ্কর নন্দীর গল্প

ক্রম ঘূর্ণন

লোকে বলে হাওয়া থাকলে শিশুদের হাতে মেলা থেকে কেনা চড়কি পাখা ঘুরতে থাকে। মেলা থেকে ফেরার সময় শিশুরা বাবা মা-র হাত ধরে বাড়ি ফেরার পথে চড়কি পাখার ঘূর্ণন দেখে খুব মজা পায়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। এই চড়কি পাখা কেনার জন্যই কী শিশুরা মেলায় যায়! এই কথা একজন শিশু মনোবিদই বলতে পারে। সাধারণ মানুষ এই কথা বলতে পারে না।

নালক এখন বাসস্ট্যান্ডে। লহমার আসার কথা ফোনে দু-জনের তাই কথা হয়। সময় চলে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা নালক বাস স্ট্যান্ডে। লহমার দেখা নেই। লহমা কি কোনো কাজে আটকে গেল। নালক রাগ করেই ফোন করে না। অথচ হাতে ফোন। নালক এদিক ওদিক তাকায়। যদি লহমা আসে। এখন তো লকডাউন না। আন লকডাউন। গাড়িঘোড়া মোটামুটি আছে। তবে কেন দেরি! মানুষও বাড়ি থেকে বেরোতে শুরু করে। তবে সাবধানে। মাস্কটা নিতেই হবে। নালক বাস স্ট্যান্ডে চড়কির মতন ঘোরে। ঘোরে লহমার জন্য। লহমা নালকের সাত বছরের প্রেমিকা। মানে নালক যখন কলেজে পড়ে। সন্ধ্যা নামে। রাস্তায় আলোস্তম্ভে আলো জ্বলে। আলোতে নালককে কেন যেন রোগা লাগে। মানুষের ছায়া কি সর্বদা রোগা হয়! এই বিষয়ে পদার্থবিদরা ভালো জানে। আলো ছায়ার গল্প তাদের মুখস্থ।

দূর থেকে দেখা যায় এক রাতের ফেরিওয়ালাকে। রাতের ফেরিওয়ালাকে আমরা কখনো দেখিনি। ফেরিওয়ালার লম্বা ঝুড়িতে থাকে হাজারো খেলনা। বাঁশি কলের পুতুল চড়কি পাখা। হয়তো এই ফেরিওয়ালা বিক্রিবাটার পর বাড়ি ফেরে। চড়কি পাখার নাম কি ফিরকী! জানি না। তবে পাখাটা গোলাকার। হাওয়াতে চড়কির মতন ঘোরে। দেখতে ভালো লাগে শিশুদের। এই গল্পে চড়কি পাখার কোনও ভূমিকা নেই। নালক রাতের অন্ধকারে চড়কি পাখা ঘুরতে দেখে। চড়কি পাখা দেখতে দেখতে লহমার কথা ভুলে যায়। নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বাবার সঙ্গে ছোটোবেলায় কত মেলায় না যায়। প্রতি মেলাতেই কেনে চড়কি পাখা। মানে ফিরকি। যা নাকি খালি হাওয়াতে ঘুরে যায়। ঘূর্ণনই তার বৈশিষ্ট্য।
লহমা এল না। নালক দাঁড়িয়ে বাড়ি চলে আসে। বাড়ি এসে শৈশবের চড়কি পাখা দেখে। পড়ার টেবিলের পাশে কত চড়কি পাখা। নালক এখন আর পড়ায় টেবিলে বসে চড়কি পাখা দেখে না। এখন নালক চাকরি করে। যথেষ্ট বড়ো। প্রেম করায় উপযুক্ত সময়।

অরুনিমার এক ছেলে। দিব্য। দিব্য থাকে বিদেশে। গত সাত বছর আগে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায়। দিব্য এখন বিবাহিত। সিলভিয়াকে বিয়ে করে। নানান কাজের চাপে ব্যস্ততায় দিব্যর আর দেশে ফেরা হয়নি। কিন্তু প্রতি রাতে দিব্য মাকে আধঘণ্টার জন্য ফোন করে। প্রতিদিন ফোনে মাকে আশ্বাস দেয় শিগগিরিই দেশে আসবে। দরকারি কিছু কাজ মিটলেই আসবে। প্রতি রাতে অরুনিমা দিব্যর সঙ্গে ফোনে কথা বলে আশায় বুক বাঁধে। অরুনিমার এখন বয়স ষাট। একটা চোখে অপারেশন হয়। দিব্যই সব ব্যবস্থা করে। ফোনে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা। টাকা পাঠানো। সব। অরুনিমা শুধু চোখের হাসপাতালে হাজির হয়।

আজ রবিবার। পয়লা মার্চ। দিব্যর জন্মদিন। প্রতি পয়লা মার্চেই অরুনিমার ভোরে ঘুম ভাঙে। স্নান সারে। দিব্যর জন্য পায়েস রান্নায় মেতে যায়। অরুনিমার হাতের পায়েসে আলাদা এক গুণ আছে। দিব্য শৈশব থেকেই মার রান্না করা পায়েসে আলাদা তৃপ্তি অনুভব করে। পায়েস পাঁচ রকম ভাজা নতুন জামা প্যান্ট এই নিয়ে অরুনিমার হাতে তৈরি দিব্যর জন্মদিন। সামনে না থাকলেও অরুনিমা দিব্যর জন্য এতটুকু করবেই। না হলে মনটা খচখচ করে। তারপর রাতে ফোন। জন্মদিনের দিন অরুনিমাই ফোন করে। আজও করবে। পরে আশীর্বাদ জানাবে। কবে আসতে পারে খোঁজ নেয়। ঘরের কথা জিজ্ঞাসা করবে। সিলভিয়ার খবর নেবে। আজও ফোনে শুনবে কাজের চাপ কমলেই দেশে আসবে। অরুনিমা এই কথা গত সাত বছর ধরে শুনে ক্লান্ত। তবুও দিব্য যখন বলে অরুনিমার চোখ জোড়া জ্বল জ্বল করে। একটা আশার পিছনে ঘুরে চলে। ঘুরতে থাকে। একটা ঘূর্ণন যেন তাকে পায়।

এখন সন্ধ্যা। অরুনিমা বারান্দায় বসে। ভালোই গরম আছে। আনলকডাউনের জন্য রাস্তায় ভালই গাড়ি। বাস লরি ঠেলা গাড়ি রিকসা কত কি। অরুনিমা প্রতিটি গাড়ির চলন মন দিয়ে দেখে। শহর ধীরে ধীরে জাগছে। ঘুর চলা বাসের চাকা লরির চাকা ঠেলাগাড়ির চাকা রিকসার চাকা দেখতে দেখতে মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। সন্ধ্যায় নাকি বিষণ্ণতা ভাল না। এমনকি মুমূর্ষুরোগীরাও সন্ধ্যাবেলায় হাসপাতালের বিছানায় উঠে বসে। হাসে। গল্প করে। চলন্ত গাড়িগুলির ঘুরে যাওয়া চাকা দেখতে দেখতে অরুনিমার চোখে ঘুম এসে যায়। আচ্ছন্ন অবস্থায় মনে পড়ে রাতে দিব্যকে ফোন করতে হবে। আজ তো জন্মদিন।

শোনা যায় একটি ঘূর্ণিঝড় নাকি আসার কথা। ঘণ্টায় নব্বই কিলোমিটার বেগে। অনুষ্টুপ ছাদে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের চরিত্র উপলব্ধি করতে চায়। ঘূর্ণিঝড় দেখতে কেমন! কীভাবে আসে! কী কী জিনিস নিয়ে সেই ঝড় ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে যায় এইসব।

অনুষ্টুপ এখনও চাকরি পায়নি। অনেকেই আশ্বাস দেয় হয়ে যাবে। কিন্তু হয়নি। আগামীকাল একটি প্রাইভেট অফিসে ইন্টারভিউ আছে। অনুষ্টুপ যাবে। ধরে ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দেবে। জানে সব উত্তর দিলেও চাকরি হবে না। হতে পারে না। রাস্তায় বাস কম। অনুষ্টুপ বিকালে ঘুরতে বেরয়। ঝড়ের পূর্বাভাস আবহাওয়াবিদরা ঠিক মতো দিতে পারে না। ঝড় কি কাল আসবে! মানে আগামীকাল! কাল তো একটা গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারভিউ! যদি চাকরিটা হয়ে যায়! আর তো অনুষ্টুপকে চড়কি পাখার মতন ঘুরতে হবে না। পাখাটা স্থির হয়ে যাবে। অনুষ্টুপও স্থিতধী হবে। জীবনের ছটফট ভাবটা চলে যাবে। অনুষ্টুপ সংসারী হবে। ভালো মাইনে পাবে। বাসে লোক কম। বাসের ভিতর স্যানেটাইজারের এক ঝাঁঝাল মিষ্টি গন্ধ খেলা করে। গোলবাজারের কাছে অনুষ্টুপ নামে। গোলবাজারের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান মহাপ্রভু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে শুকনো মিষ্টি কেনে। কাল ইন্টারভিউতে যাওয়ার আগে এই মিষ্টি ঠাকুরের কাছে প্রসাদ হিসাবে অনুষ্টুপের মা দেবে। এই নিয়ম বহুদিনের।

এখন সকাল সাতটা। আকাশ কেমন যেন অন্ধকার। ঘূর্ণিঝড় কি আজই আসবে। অনুষ্টুপ ছাদে আসে। তাকিয়ে দেখে পুরো আকাশ কেমন অন্ধকার। হাল্কা একটা ঠান্ডা হাওয়া পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে যায়। গরমের দিনে এই ঠান্ডা ভাবটা ভালই লাগে। বাড়ির সামনে নারকেল গাছের পাতা বটগাছের পাতা হাওয়ায় কাঁপতে শুরু করে। অনুষ্টুপ বোঝে ঘূর্ণিঝড়ের আসার সময় হয়ে গেছে। দূরে ধুলো ঝড় দেখা যায়। প্রচণ্ড জোরে এক ধরনের হাওয়া ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির কাছে আসতে শুরু করে। ঝড়টিকে ঘুরন্ত লাট্টুর মতন লাগে। সেই ঘূর্ণায়মান ঝড়ে ঘুরতে থাকে গাছের শুকনো পাতা কাগজ কাপড়ের টুকরো হাগিস মেয়েদের ছেঁড়া ব্রা আরও কত কি। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে অনুষ্টুপ ঝড়ের চেহারা অভিমুখ দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। ঝড় আস্তে আস্তে পশ্চিমে চলে যায়। মাথায় ধুলো ভরতি হয়ে কেমন ভারী লাগে। অনুষ্টুপ নীচে নেমে আসে।

বাথরুমে ঢুকে মাথায় শ্যাম্পু দেয়। শাওয়ারে ভালভাবে স্নান করে। সমস্ত ধুলো পরিষ্কার করে। ঠাকুরকে মিষ্টি দিয়ে শুভ কামনা করবে। অনুষ্টুপ মাকে নমস্কার করে রাস্তায় পা রাখবে। যেতে যেতে বলবে ঠাকুর আর ঘুরিও না। চড়কি পাখা ঘূর্ণিঝড়ের মতন আমাকে যেন আর ঘুরতে না হয়। ক্রম ঘূর্ণন থেকে মুক্তি দাও।

দত্তাবাগানে আজ লাট্টু প্রতিযোগিতা আছে। খুব কম করে কুড়িজন প্রতিযোগী অংশ নেবে। রেমন ছোটবেলায় লাট্টু খেলত। এখন বিবাহিত। এক মেয়ে। শৈশবে লাট্টুর ঘূর্ণন দেখে দারুন উপভোগ করত। অনেক সময় ঘুরন্ত লাট্টুকে হাতের তালুতেও রেখে মজা পেত। চোখ বড়ো বড়ো করে হাতের তালুর ঘুরন্ত লাট্টুকে ভাবত লাট্টু যেন না থামে। অনন্তকাল ধরেই যেন ঘোরে। শৈশবের স্মৃতি আজ মায়া। অলীক। রেমন অনেকবার প্রতিযোগিতায় নামও দেয়। কত যে ঘুরন্ত লাট্টু ফাটায় মনে পড়ে না। আজও শোকেসে লাট্টু প্রতিযোগিতার মেডেল থরে থরে সাজানো আছে। সময় পেলে অথবা ছুটির দিন রেমন শোকেসের মেডেলগুলি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মনে পড়ে ঘুরন্ত লাট্টুর রহস্য। জাদু।

তমনা দত্তাবাগানের মেয়ে। রেমন তমনাকে শৈশব থেকেই চেনে। এক সঙ্গে বড় হয়। খেলাধুলা করে। দত্তাবাগানের মাঠে লাট্টু প্রতিযোগিতায় রেমন অংশগ্রহণ করলে তমনা থাকবেই। তমনা জানে রেমনই প্রতিবার প্রতিযোগিতায় প্রথম হবে। রেমন প্রথম হলেই তমনার যেন আহ্লাদ শেষ হয় না। তমনা কেই রেমনের বিয়ে করার কথা। কিন্তু কোনো অদৃশ্য কারণে হয়নি। শেষে তমনার বিয়ে হয় অন্যত্র। রেমনের বিয়ে হয় অন্যত্র। হলে কী হবে শৈশবের টান থেকে যায়। সেই টান রেমনেরই বেশি। রেমন তমনাকে ভুলতে পারে না। কতদিন তমনাকে ফোন করে দেখা করতে বলে! তমনা নানান অজুহাত দেখিয়ে সেই দেখা করাকে নাকচ করে দেয়। দু-জনের দেখা অবাস্তব হয়ে থাকে। কিন্তু রেমন হার মানে না। ঘরে বউ থাকা সত্ত্বেও তমনাকে ভুলতে পারে না। তমনার মোহে লাট্টুর মতন ঘোরে। ঘুরপাক খেয়েই যায়। তমনা বহুদিন ফোনে সাবধান করে। বলে তুমি এখন বিবাহিত। বাচ্চার বাবা। তুমি ভুলে যাও পুরোনো স্মৃতি। প্রেম। কিন্তু রেমন নাছোড়। বারবার ফোন করে দেখা করার জন্য।

রাত এখন অনেক। মনে হয় শহর স্থির। আনলকডাউনেও শহর স্বাভাবিক হয়নি। ফলে বেড়ে যাওয়া রাতে শহরের কোনও শব্দ নেই। গাড়িঘোড়া কম। মানুষের যাতায়াত নেই। পশুপাখিরাও যেন নিস্তেজ। রেমন বিছানায়। ঘুম নেই। পাশে সহধর্মিনী ছোট ছেলে। না ঘুম চোখে তমনাকে স্পষ্ট দেখতে পায়। তমনার গোল মুখ। টানা চোখ। টোল খাওয়া গাল। গোলাকার চিবুক। সব। শৈশবের কোনটা ভাল লাগে! রেমন মাঝ রাতেও মনে করার চেষ্টা করে। হয়ত সবটাই ভালো লাগে। মানে সমগ্র তমনাকে। এখন ফোন করবে! এই মাঝরাতে কেউ কি ফোন করে! রেমন শৈশবের লাট্টু খেলায় মেতে যায়। এখন মাঝরাত। মনে পড়ে দত্তবাগানের লাট্টু প্রতিযোগিতা। তমনা সামনে থাকে। লাট্টুগুলি ঘুরতে থাকে। প্রচুর লাট্টু দত্তবাগানে আজ ঘোরে। রেমন ঘুরন্ত লাট্টুকে ফাটিয়ে দেয়। হাতে লেত্তি গুটিয়ে তমনার কাছে গর্বিত হাসি হাসে। তমনা চোখ মেলে রেমনের হাসি দেখে। তুমি নায়ক। রেমন তুমি আমার চোখে বীর।

নালক এখনও লহমার কথা ভাবে। যদিও লহমা অন্য পুরুষে ব্যস্ত। নালক পরিষ্কার করে সেই কথা জানেও না। শুধু অনুমান। ফোনে প্রায় নিত্যই লহমার সঙ্গে কথা হয়। রোজই হয়। সেই কথা হওয়ার ভিতরেও অন্য কোন গন্ধ টের পায় না নালক। দশদিন আগেও লহমার বাড়ির নীচে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা হয়। লহমা যেন একটু ছাড়া ছাড়া। লহমা নালককে নিয়ে কী একটু খেলা করে!

শেষ পাতা

তীর্থঙ্কর নন্দীর গল্প

আমাদের নতুন বই