তৃষ্ণা বসাকের গল্প

অর্ধেক ভ্রমণ

কোনো কোনো জায়গায় মনে হয় এখানে না এলেই ভালো হত। রংলিং তেমন একটা জায়গা। এখানে যে কিছু নেই, তা আমরা জেনেই এসেছিলাম। কাঞ্চনজঙ্ঘা, সূর্যোদয় সূর্যাস্ত, সেভেন পয়েন্ট, লাভার্স বা সুইসাইড পয়েন্ট, ইকো পার্ক, সাফারি— যা যা কিছু দেখতে পর্যটক ভিড় করে, সে-সব কিছুই নেই। আছে শুধু একটা পাহাড়ি নদী আর তার ওপর একটা ব্রিজ, যেটা পেরিয়ে অনেকখানি হাঁটলে একটা ঝরনা দেখা যায়। এগুলো সবই নেটে দেখে এসেছিলাম। আর ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। এখন সেগুলোই অসহ্য লাগছে। কিছু না থাকা যে এত ভয়ানক তা কে জানত!
আমাদের অবশ্য তখন অন্য কথা মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল কিছু না থাকাটা একটা সুবিধে। কম ভিড় হবে এখানে। আর আমাদের চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও কমবে। চেনা মুখ এড়াতেই আমরা এমন একটা জায়গা খুঁজছিলাম। পেয়েও গেলাম। গুপ্ত রেসিডেন্সি।
‘হোম স্টে?’
‘না, হোটেল। নেটে দেখলাম। খুব ভালো রেটিং। অনেক ট্রাভেল ব্লগে এর খুব প্রশংসা দেখলাম।’
‘বাব্বা! রেসিডেন্সি! কোথায় না কোথায় বাঙালি হোটেল খুলেছে!’
শোনার পর থেকে হোটেল দেখার কৌতূহল বেশি হচ্ছিল, জায়গাটার থেকেও। কিন্তু যখন পৌঁছোলাম তখন অনেক রাত। আর সারাদিন গাড়িতে গাড়িতে, হা-ক্লান্ত শরীর না কিছু দেখতে চাইল, না কিছু শুনতে। এত রাত হত না। ড্রাইভার পথ ভুল করল। আসলে এন জে পি থেকে সোজা বেরিয়ে এলে এত রাত হত না। অলোক আবার বেঙ্গল সাফারিতে নামল। জায়গাটা অবশ্য অপূর্ব লাগছিল। অলক একবার আস্তে করে বলল, ‘রিমলির খুব ভালো লাগত’ আমি না শোনার ভান করে ছবি তুলছিলাম একটার পর একটা।
একটা শিমুল গাছের নীচে দুটো বাঘ পরস্পরকে ছুঁয়ে ঘুমোচ্ছিল। বসন্ত দুপুরের রোদ পড়েছিল ওদের গায়। যাত্রা এখন সবে শুরু, কিন্তু আমার কেমন কান্না পাচ্ছিল, নিজেকে প্রতারিত মনে হচ্ছিল। অলোক কি সারা ট্যুরেই রিমলিকে মিস করবে? রিমলিকে না রিমলির মাকে? আমি বাতাসের জন্যে ছটফট করতে করতে বললাম। ‘এখানে এত দেরি করছ কেন? অনেক দূর যেতে হবে, বেশি রাত না করাই ভালো’
ড্রাইভারও সেই কথাই বলল। সে আমাদের নিয়ে যেতে চাইছিল না আরও। বচসা এতদূর পৌঁছোল যে, গাড়ি ঘুরিয়ে আবার স্ট্যান্ডে পৌঁছে দিল সে। তারপর আবার এক প্রস্থ বচসা, শেষমেশ নতুন ড্রাইভার। সেই ড্রাইভার আবার প্রথমেই বলল, ‘আপনারা নিশ্চয় জানেন রাস্তা!’
অলক খেপে গিয়ে বলল, ‘তাই যদি জানব, তাহলে এই রুটে ড্রাইভারি করব, বেড়াতে আসব কেন?’
লোকটি একটুও না রেগে বলল, ‘সে কোনো ব্যাপার না। গুগল ম্যাপ ধরে ধরে যাব’
গুগল ম্যাপ শুনে অলোক ঠান্ডা হল। আর শুরুটা ভালোই হল। কিন্তু একটু পরেই মজা টের পাওয়া গেল। কারো ফোনেই আর নেট কাজ করছিল না। গুগল ম্যাপ তখন অর্থহীন। ড্রাইভার স্পষ্টই বোঝা গেল এ রাস্তায় কখনো আসেনি। যেখানে যেখানে রাস্তা দু-ভাগ হয়ে গেছে সেই সেই মোড়ে গাড়ি থামিয়ে সে বলতে লাগল, ‘ডানদিকে যাব? না বাঁ-দিকে?’
অলোক বিড়বিড় করে বলছিল, ‘মিডল পাথ ইজ দ্য গোল্ডেন পাথ’
ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলছেন স্যার?’
‘বলছি তুমি লোকাল লোককে জিজ্ঞেস করো। বলো রংলিং গুপ্ত রেসিডেন্সি’
আমি বাইরে তাকালাম। দূরে দূরে পাহাড়ের কোলে বাড়িগুলোর দু-চারটে আলো ছাড়া নিঃসীম অন্ধকার। রাস্তায় কোনো আলো নাই, গাড়ির হেডলাইট ভরসা। সেই হেডলাইট কয়েকটা কুকুর ছাড়া কাউকে খুঁজে পেল না। কাকে জিজ্ঞেস করবে?
অলোক অবশ্য স্থির বিশ্বাসে বলল, ‘কুকুর থাকলে মানুষও থাকবে’
সত্যি হলও তাই। অন্ধকার ফুঁড়ে দু-একটা লোক উদয় হল, যদিও তারা ‘এই তো আর একটু আগে’ ছাড়া কিছু বলতে পারল না। তবু মানুষ তো। কিছুটা তাদের দেখানো পথে, কিছুটা বিপথে এইভাবে আমরা একসময় একটা আলোকিত জায়গায় এসে পড়লাম। রাস্তার দু-ধারে একটা দুটো হোম স্টে, মোমোর দোকান। দেখে আশা জাগল। মোমোর দোকানে মহিলাকে জিজ্ঞেস করতে পাশ থেকে এক বৃদ্ধ বলল, ‘উয়ো বাঙ্গালিকা হোটেল তো? অউর দু-কদম আগে’
পাহাড়ি রাস্তায় ওই দু-কদম পৌঁছোতে পাক্কা পঁয়তাল্লিশ লেগে গেল। আমার ড্রাইভারটার জন্যে কষ্ট হচ্ছিল। এই পথে এত রাতে একা একা ফিরবে? পরে শুনলাম ওর রাতে থাকার একটা বন্দোবস্ত হয়েছে। কিন্তু ওকে ভোরের আলো ফোটার আগে বেরিয়ে যেতে হবে। কারণ, পরদিন এখানে একটা রাস্তা অবরোধ আছে। যেহেতু আটটার আগে কেউ জড়ো হয় না, তাই যত আগে সম্ভব বেরিয়ে যেতে হবে।
পা ধরে গেছিল। স্ট্রেচ করে নামতে নামতে শুনলাম কে বলছে, ‘আমাকে ট্রেনের টাইমটা জানালে আমার গাড়ি পাঠিয়ে দিতাম। তাহলে এত হ্যারাসড হতে হত না’
ডিকি থেকে লাগেজ নামাচ্ছিলেন ভদ্রলোক। লম্বা পেটানো চেহারা, শ্যামলা রং। বুঝলাম ইনিই মি. গুপ্ত।
আমার গোড়া থেকেই খারাপ লাগল লোকটাকে। এত অহংকারী মনে হল। হস্পিটালিটির মানেই জানে না, অথচ হোটেল খুলে বসেছে। অসম্ভব ক্লান্ত ছিলাম, তারপর নামতেই রাজ্যের শীত চেপে ধরল। রাস্তা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে কটেজ টাইপের বাড়ি কয়েকটা। মূল বাড়িতে আরও কয়েকটা রুম আছে, তাছাড়া ডাইনিং হল, গুপ্তরা ওখানেই থাকেন, আমাদের কটেজের সামনে একচিলতে বারান্দা, একটা বেঞ্চ পাতা। ঘরে ঢোকার আগে দেখলাম উলটো দিকে একটা বড়ো লন, তার বাঁ হাতে গ্যারাজ, আর একদম শেষ প্রান্তে কী যেন। একটা স্টেজের মতো মনে হল। এখানে স্টেজ? বুঝলাম না। বোঝার ইচ্ছেও ছিল না কোনো। ঘরের চেহারা দেখে কান্না পেল। এত ছোট্ট ঘর, দুটো ছোটো ছোটো আলাদা বেড। বিছানার চাদর ফ্রেশ বলে মনে হল না, কুটকুটে কম্বল, রমতা সাধুরা যেমনটা নিয়ে ঘোরেন, জঘন্য বাথরুম, গিজারের কোনো সিনই নেই, তারপর ইন্ডিয়ান স্টাইলে টয়লেট। আমি অলোকের মুখের দিকে চেয়ে বললাম, ‘গুপ্ত রেসিডেন্সি!’
অলোক আমার শ্লেষটা গায়ে মাখল না। বলল, ‘শুনতে পাচ্ছ?’
‘কী?’
জলের শব্দ। একদম আমাদের ঘরের নিচ দিয়ে রংলিং নদী বয়ে যাচ্ছে। কাল ফুলমুন, রাত্রে আমরা ওখানে একটা পাথরের ওপর শুয়ে শুয়ে…’
অলোকের এ-সব কথা আমাকে জাগিয়ে দেয়।আমি ওর হাত ধরে এক ঝটকায় কাছে টেনে বললাম,
‘শুয়ে শুয়ে?’
‘নদীকে আদর করব। কাল সকালে উঠলে দেখবে এই নদীর ওপরে একটা ব্রিজ আছে। ওখানেও যাব আমরা। তখন তোমার ঘর বাথরুম কিছু মনে থাকবে না। আর সোনা, এই লোকেশনে এটাই সেরা থাকার জায়গা, মনে রেখো।’
‘বুঝলাম। কিন্তু গরম জলের কী হবে?’
তখনই দরজায় টোকা। খুলতে দেখা গেল রূপকথার রাজকুমারের মতো একটি অপরূপ কিশোর এক বালতি গরম জল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটি অলীক মনে হতে পারত, যদি না সে ঝরঝরে ইংরেজিতে বলে উঠত, ‘ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং হলে চলে আসুন। ডিনার রেডি’
‘পাহাড়ি ছেলে নাকি? ভালো যোগাড় করেছে তো!’
‘নাও তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও। খুব খিদে পেয়েছে।’

ছবি: ইন্টারনেট


আমি ভয় পাচ্ছিলাম বাথরুমে আরশোলা থাকবে নির্ঘাত। অলোক বিজ্ঞের মতো বলল এই অল্টিচিউডে নাকি আরশোলা থাকে না। আরশোলা ছিল না সত্যি, তবু আমার ওর ওপর রাগ হচ্ছিল। এটা একটা হোটেল! আবার গালভরা নাম গুপ্ত রেসিডেন্সি! আমি শিওর পিয়ালি আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে এলে ও কখনো এখানে উঠতে পারত না। আর পিয়ালি যেরকম, জিন্দেগিতে এইসব পাণ্ডববর্জিত জায়গায় আসত না, ও তো বোঝে শুধু গোদা গোদা কটা নাম। গোয়া, সিমলা, উটি, ব্যাংকক, পাটায়া। এ বছর ওরা কন্টিনেন্ট ঘুরবে। মরা মরা আলোর অ্যাসবেস্টসের ছাদওলা বাথরুমে দাঁড়িয়ে আমার খুব কান্না পেল। আমি কি ঠকে গেলাম? আবার?
ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং হলে গিয়ে অনেকটা ভালো লাগছিল। স্বামী স্ত্রী আর বাচ্চার দুটি পরিবার, একসঙ্গে এসেছে, ওদের ছেলেমেয়ে দুটি একই স্কুলের একই ক্লাসের, কথা থেকে বুঝলাম। বউ দুটো আমাদের দিকে কৌতূহলী নজর দিচ্ছিল, বিশেষ করে আমার সিঁদুরের চিহ্নহীন ছোট চুল, খালি হাত, স্লিভলেস কুর্তি— এ-সব ওদের শান্তি দিচ্ছিল না। আমি বুঝতে পারলাম এরা হচ্ছে টিভি সিরিয়ালের খাঁটি দর্শক। এরা কখনোই নিজের জীবন নিয়ে খুশি নয়। অন্যের জীবনে উঁকি না মারলে ওদের চলে না। খাবার দিতে দেরি করছিল। আমি একটা সিগারেট ধরালাম। এবার বউ দুটো শুধু নয়, ওদের বরগুলোও হাঁ করে তাকাল। বাচ্চাগুলোর চোখে ফুটে উঠল বিস্ময়। অলোক চাপা স্বরে বলল, ‘সিগারেটটা নিভিয়ে দাও। এটা নো স্মোকিং জোন।’ আমি ওকে পাত্তা না দিয়ে সিগারেটটা নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ঠান্ডায় আমার হাড় অব্দি কেঁপে যাচ্ছে, তবু আমি বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা শেষ করলাম। দেখলাম লনে পাতা চেয়ার আর বড়ো ছাতা দুটো সরিয়ে নিচ্ছে লোকটা। এই গুপ্ত! তখন গাড়ি থেকে মালও নামাচ্ছিল। হেভি কিপ্টে তো। কোনো লোক রাখেনি! একটা বাচ্চা ছেলে রেখেছে, যাকে তেমন কিছু দিতে হয় না। রাত ক-টা হবে? দশটাও না। কি নিঝুম চারদিক। আমি পেছন ফিরে কাচের মধ্যে দিয়ে দেখলাম অলোক ওই লোক দুটোর সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে, আর দুটো ছেলে কোণের টেবিলে খাচ্ছিল, আগে লক্ষ করিনি, তারাও যোগ দিয়েছে ওদের আড্ডায়। কাচের ওপর জলকণা জমেছে, তবু ওদের মুখের আবেগ আমি টের পাচ্ছিলাম এপাশ থেকে। সবে কাল আমরা কলকাতা ছেড়েছি, এর মধ্যে অলোক এত হাঁপিয়ে উঠল, কলকাতার বাঙালির জন্যে? আমি সামনে তাকালাম। এখন লনে একটাও চেয়ার নেই। সেই মঞ্চ আর লোকটা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দূরে ব্রিজের সিলুয়েট আর নদীর কলকল শব্দ। হঠাৎ লোকটা বলে উঠল, ‘বাইরে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা লাগাবেন না ম্যাডাম। ভেতরে যান। খাবার রেডি। কাল উঠে দেখবেন কত সুন্দর আমাদের জায়গাটা’
কী যেন ছিল কথাটায়, বাকি সিগারেটটা নিভিয়ে পা দিয়ে চেপে ফেললাম। তারপর ওকে জিজ্ঞেস করতে গেলাম, ‘ওই মঞ্চটা কীসের?’ কোথায় সে? মুহূর্তের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে লোকটা। আর অমনি আমার খুব শীত করে উঠল, সমস্ত শরীর কেঁপে গেল ঠান্ডায়। আমি ভেতরে তাকালাম। জলকণায় আবছা কাচের মধ্যে দিয়ে মনে হল খুব সুখী পারিবারিক দৃশ্য। সবাই জমিয়ে খেতে খেতে গল্প করছে। আমাদের টেবিলেও খাবার এসে গেছে। খিদের চোটে অলোক খেতে শুরু করে দিয়েছে। এবার আমার চোখ দিয়ে সত্যিই জল বেরিয়ে এল। এই দুনিয়ায় আমিই তাহলে একা! সে-মুহূর্তেই অলোকের মনে পড়ে গেল আমি বাইরে আছি, ও চেয়ার ছেড়ে উঠে আমাকে ডাকতে আসছিল। তার আগেই আমি ভেতরে চলে এসেছিলাম।


ভোর হয়। আলো আসার সমস্ত ফাঁক-ফোকর দিয়ে আলো আসে, আমার চোখের পাতার ওপর আলতো করে পড়ে থাকে। কিন্তু আমি উঠি না। আমার উঠতে ইচ্ছে করে না। কাল রাতে কিছু কম ছিল না। এত ঠান্ডার মধ্যেও অলোক আদরে আদরে আমাকে জাগিয়ে তুলেছিল, আদরের নৌকায় ভাসতে ভাসতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘুম ভাঙতেই কষ্টের অনুভূতি ফিরে এল। অলোক আমার পাশে নেই, বহুক্ষণ উঠে গেছে। যে-কোনো জায়গায় গিয়ে এইটাই করে ও। অনেক আগে উঠে একেবারে তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়, আমাকে বাইরে থেকে বন্ধ করে। যখন ফেরে, তখনও আমি ঘুমোচ্ছি। ও বলে বাইরে এসে ভোর না দেখলে আসার কোনো মানে হয় না। কিন্তু আমি জানি, এই সময়টা আসলে ও বাড়িতে ফোন করে। বাড়িতে মানে পিয়ালিকে। ছেলেমেয়েরা তো এখন ঘুমোচ্ছে। ভোরে উঠে ঈশ্বর প্রণামের মতো এই ফোন আমার অসহ্য লাগে। তাই আমি কিছুতেই ভোরে উঠতে চাই না। ঘুম ভেঙে গেলেও শুয়ে থাকি আর ছটফট করি।
হঠাৎ মনে হল, অলোক দূরে কোথাও যায়নি, এই বারান্দাতেই আছে। খুব কাছ থেকেই ওর গলা শুনতে পাচ্ছি, আর সেটা পিয়ালির সঙ্গে নীচু গলার ফোনালাপ নয়, বেশ জোরে জোরে কারো সঙ্গে কথা। আমি চট করে পুলোভার আর শালটা গায়ে চড়িয়ে নিই। ঠান্ডা আমাকে পেড়ে ফেলার চেষ্টা করে, আমি দমি না। দরজার কাছে এসে দেখি দরজাটা ভেজানো, বাইরে থেকে বন্ধ নয়, আর একটু ফাঁক করে দেখলাম অলোক বারান্দার সরু বেঞ্চে বসে গুপ্ত লোকটার সঙ্গে কথা বলছে। লোকটা লনে চেয়ার পাতছিল। আমার এই শীতে উঠতে ইচ্ছে করে না, তবু কী যেন টানল আমায়। কই অদ্ভুত ভরাট গলা লোকটার। আমি চটপট ধড়াচুড়ো চাপিয়ে বাইরে এলাম, আর অমনি ঠান্ডায় আমার হাড় পর্যন্ত কেঁপে গেল। দেখলাম লোকটা জাস্ট একটা ফুল সোয়েটার চাপিয়ে লনে চেয়ার পাতছে। আমি ওকে অবাক হয়ে দেখছিলাম। ওর চেয়েও অবশ্য দর্শনীয় ওর পেছনের ব্রিজটা, ব্রিজের শেষে ঘুরে ঘুরে উঠে যাওয়া পাহাড়ি পথ, সকালের নরম রোদে কী অলীক লাগছিল। যেন সেটা পৃথিবীর কোনো পথই নয়, ব্রিজটা যেন স্বর্গ থেকে নীচের নদীটার ওপর ঝুঁকে আছে। কলকাতায় থাকতে কতবার ভেবেছি অলোকের সঙ্গে এরকম কোথাও যাব, কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হল, এটা এমন একটা ব্রিজ, যেখানে একাই যেতে হয়। আমার হঠাৎ প্রবল জানার ইচ্ছে হল, লনের শেষ প্রান্তে ওই মঞ্চমতো ওটা কী? অমনি আমি বারান্দা ছেড়ে নেমে পড়লাম, লনে গিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা, ওই স্টেজটা কীসের?’
‘এটা সুরেশ গুপ্ত স্টেজ। আমার বাবা। এখানকার যত জমি দেখছেন সব আমার বাবার। এই স্টেজে আমাদের স্কুলের প্রোগ্রাম হয়। ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে, রিপাব্লিক ডে, ক্রিসমাস’
‘স্কুল!’


ব্রেকফাস্টে জানা গেল, যে-ছেলেটি আমাদের রুমে গরম জলের বাকেট দিতে গেছিল, সে গুপ্তর ছেলে। ওর একটি বোনও আছে, সে-রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করে, আর ছেলেটি বাবাকে। যে রান্না খেয়ে আমরা ক্রমাগত মুগ্ধ হয়ে চলেছি, সেগুলো মিসেস গুপ্তর হাতের রাঁধা। এই চারজন ছাড়া এই হোটেলে কোনো কাজের লোক নেই। কখনো সখনো সিজনে খুব চাপ পড়লে বাইরের লোক ভাড়া নেওয়া হয়। এই খবরগুলো দিল অন্য দলের মহিলা দুটি। ওরা একদিন আগে এসেছে। লুচি তরকারি খেয়ে ওঠার পর পুরুষেরা যখন কোথায় যাওয়া যায় প্ল্যান করছিল, মেয়েরা ফিসফিস করে বলাবলি করছিল এ-সব। আমি একটু দূরে দূরেই থাকি, বেশি মিশলেই, আমরা কলকাতার কোথায় থাকি, কত বছর বিয়ে হয়েছে, ছেলেমেয়ে কোথায় পড়ে— এ-সব প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু আজ আমিও থাকতে না পেরে বলে ফেললাম— ওরা স্কুল যায় না?
মহিলা দুটির মধ্যে মোটাসোটা মিস্টি চেহারার যে, সে উচ্ছ্বল হাসিতে ফেটে পড়ে বলল, ওই যে স্কুল!
ওর হাত অনুসরণ করে আমি স্টেজটা দেখতে পেলাম। আমার খুব রাগ হল। ‘এটা খুব খারাপ। বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ এইভাবে নষ্ট করে দেওয়া। তাদের স্কুল না পাঠিয়ে এইভাবে বিনা পয়সায় খাটানো। দেখে তো চোদ্দ বছর হয়েছে বলে মনে হয় না’
রোগা পাতলা মহিলাটি বলল, ‘ভদ্রলোক তো বললেন, ছেলে এই বয়সে যা জানে, কোনো স্কুল ওকে শেখাতে পারত না। ও গেম ডেভেলপ করে। পেটেন্ট আছে নাকি’
আরেকজন বলল, ‘যাই বল, কীরকম ফিশি ব্যাপারস্যাপার এদের। কাল বললাম, দাদা, এত ভালো ভালো রেঁধে খাওয়াচ্ছেন যিনি, তাঁকে একবার দেখি, স্রেফ এড়িয়ে গেল।’
‘দেখ আদৌ বৌ কিনা! নইলে কী জন্যে বল এই বয়সে কলকাতা থেকে পালিয়ে এখানে এই নির্বান্ধব পুরীতে আসবে? কী আছে এখানে?’ আমি একটু সিঁটিয়ে গেলাম এই কথায়।
মোটাসোটা মহিলাটি বলছিল ‘আজ দেখা করেই ছাড়ব দাঁড়া। বলব— জাল ছেড়ে বেরিয়ে এসো রানি’
আমি ওদের ফেলে বাইরে এলাম। কী আছে এখানে? অলোক এগিয়ে এসে বলল, চলো হেঁটে আসি। ওদিকে একটা ঝরনা আছে।
ব্রিজের মাঝখানে গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। এখান থেকে গুপ্ত রেসিডেন্সিটা কী অপূর্ব দেখাচ্ছে। যেন রূপকথার প্রাসাদ। রানি ঘুমোচ্ছে, রাজকন্যা ঘুমোচ্ছে, রাজপুত্তুর ঘুমোচ্ছে। সত্যি কাউকে দেখা গেল না। সকালে হোটেলের যে প্রাণচঞ্চলতা থাকে, তা চোখে পড়ল না কোথাও। শুধু রাজামশাই জেগে আর কর্মব্যস্ত। দেখলাম দুটো বালতি হাতে, আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে নেমে যাচ্ছেন, আরে ওই তো নদী। আমাদের ঘরের ঠিক নিচেই। বড়ো বড়ো চ্যাটালো পাথর ছড়িয়ে আছে পাহাড়ি নদীর বুকে। এই নদীর নামই রংলিং। নদীর নামেই জায়গার নাম। অলক আমার কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, ‘কী দেখছ? চল। রোদ চড়ে গেলে হাঁটতে কষ্ট হবে।’ ব্রিজ যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি। না, বাড়ি নয়। একটা সাইনবোর্ড হেলে আছে, তাতে লেখা ‘ড্যানিজ হোম স্টে’। আমি বললাম, ‘দেখো এখানে একটা হোম স্টে ছিল, উঠে গেছে। উঠবেই তো। ক-জন আসে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায়। গুপ্তর পোয়া বারো। বাঁশবনে শেয়াল রাজা হয়ে বসে আছে।’
অলোক একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে বলল, ‘এজন্যেই বাঙ্গালিকে বলে কাঁকড়ার জাত। শেয়ালরাজা হবে কেন, সিংহরাজা। দেখো তো কী অসাধারণ কাজ করেছে। উটিতে ড্রাইভার দূর থেকে দেখিয়েছিল, ‘দেখিয়ে আপকা মিঠুন চক্রবর্তী কা হোটেল’, খুব গর্ব হয়েছিল। এটা দেখে তো আমার মাথা নুয়ে আসছে। এর তো মিঠুনের মতো টাকা, প্রতিপত্তি, লোকবল কিছু নেই, শুধু পরিবারের সবাই মিলে হাতে হাতে কাজ করে এটা দাঁড় করিয়েছে, রিয়েলি হ্যাটস অফ টু হিম’
আমার ধাঁ করে রাগ হল। সেটা আমাকে কাঁকড়া বলার জন্যেই শুধু নয়। উটির নাম শুনে। পিয়ালি আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে গিয়েছিল অলোক। ওই সাতদিন আমি রাতে শুয়ে শুয়ে শুধু কাঁদতাম। আর আমাকে ও কোথায় এনেছে! রেসিডেন্সি! এটা একটা টয়লেট!
‘আমি ফিরে যাচ্ছি।’
অলোক আমাকে দু-হাতে টেনে নিল বুকের মধ্যে। ‘অত রাগ করে না সোনা। তুমি তো বলেছিলে এরকম একটা নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা চুমু খাব’ বলেই ও আর অপেক্ষা করল না, আমার ঠোঁটে নিজের সব অপারগতাকে ডুবিয়ে দিল। কতক্ষণ কে জানে। তারপর ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘এই হোম স্টেটা এমনি এমনি ওঠেনি। এর মালিক ড্যানি খুন হয়েছিল।’
‘খুন!’ অমন একটা রোদ ঝলমল সকালেও আমার হাত পা নিথর হয়ে এল। আমার কেন জানি মনে হল গুপ্ত রেসিডেন্সির রমরমিয়ে বেড়ে ওঠা আর এই ড্যানি হোম স্টের মুছে যাওয়া— এ দুটোর মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক আছে।
অলোক আমকে টেনে চড়াইয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘তুমি যা ভাবছ তা নয়। হোম স্টের পাশাপাশি একটা দারুখানাও ছিল। সেখানে জুয়ো খেলা আর সব বিচিত্র কাজকর্ম হত। একটি মেয়েকে ঘিরে দখলদারি থেকে মারপিট, তারপর খুন’
হাঁটতে হাঁটতে ঝরনার ধারে পৌঁছে গেলাম একসময়। গালে গাল ঠেকিয়ে, গহন মুহূর্তের সেলফি উঠল অনেক। পেছনে ঝরনার সাদা ফেনায়িত জল। আমি তবু দেখতে পাচ্ছিলাম সাদা জলের ফেনায় রক্ত লেগে আছে। গুপ্তরা কি সত্যিই নতুন কিছু করার জন্যে এখানে এসেছে? না কোনো অন্ধকার অতীত থেকে পালিয়ে এসেছে?


আসার সময় ড্রাইভার খুব ভুগিয়েছিল। নিউ জল্পাইগুড়ি স্টেশনের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল বাঙালি ড্রাইভার, রাস্তা কিছু চেনে না, মাঝরাস্তায় নামিয়ে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। আমরা এখান থেকে টুমলিং হয়ে সান্দাকফু যাব, পাকা ড্রাইভার চাই। তাই গুপ্ত সাঙ্গে শেরপাকে দিয়েছে। আমি ব্রেকফাস্ট সেরে বাইরে বেরিয়ে দেখলাম গুপ্ত ড্রাইভারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাদের মালপত্র জিপে তুলছে। আমি সিঁড়ি বেয়ে ওপরের রাস্তায় উঠে এলাম। এদিকে গুপ্ত রেসিডেন্সির সামনেটা। একটা দোকান আছে, টুকটাক স্টেশনারি, ম্যাগি, চকোলেট, সিগারেট, চিপস পাওয়া যায়, ট্যুরিস্টরা যাতায়াতের পথে কেনে। দেখলাম দোকানের মধ্যে থেকে কিছু হাতে করে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে ভেতরে নেমে যাচ্ছে মণীষা। নাইটির ওপর ঢোলা ওভারকোট, গুপ্তর বৌ। কাল ওই মহিলা দু-জন আলাপ করতে গেছিল ওর সঙ্গে। আমাকেও বলল যেতে। দেখলাম সুন্দর গোছানো কিচেনে যন্ত্রের মতো কাজ করে যাচ্ছে মা আর মেয়ে। হাল্কা গান চলছে, রবীন্দ্রসংগীত। আমাদের দেখে হেসে বসাল, লাগোয়া ছোট্ট একটা ঘরে। সারা দেওয়াল জুড়ে শুধু কলকাতা। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, হাওড়া ব্রিজ, মা কালী, কাগজের কাটিং, কোনো কাগজে বেরিয়েছে হয়তো এই হোটেলের খবর, বাঙালির লক্ষ্মীলাভ। আর তার মধ্যে একটা বয়স্ক বিশেষত্বহীন মানুষের ছবি, মণীষা বলল, ‘আমার শ্বশুর, বড়ো সরকারি অফিসার ছিলেন, একবার বেড়াতে এসে জায়গাটা ওঁর এত পছন্দ হয়ে যায়, যে উনি এখানে জমি কিনে ফেলেন। সেই জমিটুকু ছিল বলেই আমি আর ভাস্কর এই স্বপ্ন দেখতে পেরেছি।’ মহিলা দুটি পরস্পরের দিকে তাকায়। এখানে আসার একটু আগে ওরা সর্বশেষ সংগৃহীত স্কুপ নিউজটি দিয়েছে। গুপ্তর বাবা নাকি এখানে পোর্টারের কাজ করত!
আমি মণীষার দিকে তাকিয়ে বলি ‘ভালো লাগে এখানে? মিস করেন না কলকাতা? তাছাড়া বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না’
‘পারছে না কেন, আমরাই দিইনি। এটা আমাদের চয়েস। ওরা এখানে থেকে যা শিখছে, স্কুলে এর থেকে বেশি কিছু শিখত না। তাছাড়া আমার ছেলে অলরেডি একজন ইন্টারন্যাশনালি রেকগনাইজড গেম ডেভেলপার। মেয়েও মিউজিক তৈরি করছে’ বলেই হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে মণীষা বলে, ‘আপনারা কোথায় থাকেন কলকাতার? ছেলেমেয়ে এল না?’ আমি ওর চোখে ঝিকিমিকি কৌতুক দেখতে পাই। অলোককে কি আমাদের দু-জনের আধার কার্ডের কপি দিতে হয়েছে? আমি ছটফট করে উঠে পড়ি। ‘অনেক গোছগাছ বাকি। কাল ভোরেই বেরোনো তো’ সবাই উঠে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে। মণীষা আমাদের ডাইনিং হলের আগে পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। চলে যেতে না যেতেই হাসিতে ফেটে পড়ে মহিলা দুটি। ‘একজন গেম ডিজাইনার, একজন মিউজিক কম্পোজার। বাব্বা! সিক্রেট সুপারস্টার সব’। আমি হাসতে পারি না ওদের সঙ্গে।

সব মাল উঠে গেছিল গাড়িতে। আমি শেষবারের মতো তাকিয়ে নিলাম। ড্যানিজ হোম স্টে, ব্রিজ, নদী, গুপ্ত রেসিডেন্সির লাল টালির ছাদ আর লনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সেই ছোটো স্টেজটা। অলোক, গুপ্তর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বলল ‘থ্যাঙ্কস দাদা। দারুণ কাটল এই দু-দিন’ গুপ্ত হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল ভেতরে এলেন ম্যাডাম, আর আমাদের লাইব্রেরিটা দেখলেন না? মণীষা খুব বই পড়ে। ওর জন্যে আমি একটা লাইব্রেরি করে দিয়েছি, কলকাতা থেকে একটু একটু করে বই আনিয়ে আনিয়ে’
‘লাইব্রেরি!’ আমি হাত নাড়তেই নাড়তেই সাঙ্গে শেরপা জিপ ছেড়ে দিল। আমার আর বলা হল না, একদিন দু-রাত্রিতে সব কিছু দেখা যায় না!

Spread the love
By Editor Editor গল্প 1 Comment

1 Comment

  • বেশ ভালোই লাগল।

    শীর্ষা,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *