তৃষ্ণা বসাকের গল্প

বার্তা

চিত্র: রেনে মাগরিত

অনন্তর নিতান্ত চিন্তাপরায়ণ ও দগ্ধহৃদয় হয়ে সে এক মহাবনে প্রবেশ করল। সে-স্থানে মনুষ্যের শব্দ নেই, কেবল রু-রু, বরাহ ও পক্ষীগণ বিচরণ করছে। ইতস্তত ভ্রমণ করতে করতে অকস্মাৎ কেতক, করবী, পিপ্পল প্রভৃতি পাদপশ্রেণিতে সুসংবৃত এক সরোবর তার সম্মুখে দৃশ্যমান হল। সে বিস্মিত হয়ে দেখল সেই সরোবর পার্শ্বে চারজন ইন্দ্রপ্রতিম পুরুষ যুগান্তকালীন লোকপালের ন্যায় নিশ্চেষ্ট হয়ে নিপাতিত হয়েছেন। আর তাঁদের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে এক মহাবাহু পুরুষ বিলাপ করছেন। যথোচিত বিলাপ ও অশ্রুমোচনের পর সেই পুরুষটি সরোবরে নামতে উদ্যত হলে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। মহাকায় এক যক্ষ ঘনঘটার মতো গর্জন করে তাঁকে বাধা দিলেন। সে অনুমান করল এবার প্রশ্নোত্তর পর্ব আরম্ভ হবে। সে দৌড়ে এসে পুরুষটির পৃষ্ঠে মৃদু আঘাত করে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। শোকে নিমজ্জিত হলেও পুরুষটি তাঁর ক্ষিপ্রতা হারাননি। বিদ্যুতের মতো অসি কোষমুক্ত করে তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন এবং অতি ক্ষুদ্র একটি জীবকে সম্মুখে দণ্ডায়মান দেখে গভীর বিস্ময় ও ঈষৎ হতাশার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভদ্রে, তুমি কে? কোথা থেকে আসছ? কোথায় যাবে? একাকিনী এই শ্বাপদসংকুল অরণ্যে তুমি কী করছ?’
“মহাশয়, আমি আপাতত ভবানী ভবন থেকে আসছি, যাব কুসুমপুর জি আর পি থানায়। আমার মোবাইল চুরি গেছে। পথিমধ্যে ক্লান্ত ও পিপাসার্ত হয়ে আমি এখানে এসে পড়েছি এই সরোবরে জল পানের আশায়। সে কথা থাক। প্রশ্ন লক করে ফেলার আগে আপনি ওকে জিজ্ঞাসা করে নিন, কোনো লাইফলাইন আছে কিনা, আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
যুধিষ্ঠিরের মাথায় কিছু ঢুকল না বলা বাহুল্য। কিঞ্চিৎ বিমূঢ় দৃষ্টিতে বালিকাটিকে অবলোকন করে তিনি বললেন, ‘অনুমান করছি তোমার অতি মূল্যবান কোনো বস্তু তস্করে অপহরণ করেছে। যদিও এখন আমি রাজ্যহীন, বনবাসী, তথাপি কী সেই বস্তু, কী করেই বা অপহৃত হল, তা শ্রবণ করতে ইচ্ছা করি। সম্ভব হলে আমি বা আমার ভ্রাতারা…’
অসহিষ্ণু কণ্ঠে যক্ষ বললেন, ‘ওহে কৌন্তেয়, সামান্য মন্থন দণ্ডই তোমরা মৃগের কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারলে না, তো এই বালিকার মোবাইল! তবে তোমার শ্রবণ ইচ্ছার প্রশংসা করতেই হবে। যুধিষ্ঠির না হয়ে তোমার নাম হওয়া উচিত ছিল শ্রবণকুমার। যাই হোক, তোমার জ্ঞানপিপাসা চরিতার্থ করার জন্য বলছি, শ্রবণ করো। বস্তুটির নাম মোবাইল। বিশ্লেষণ করলে mou bil. এর অর্থ চলমান সঞ্চরণশীল, গতিশীল, ভ্রাম্যমান, জঙ্গম, পরিবর্তনশীল। এই জগতে যে-কোনো সতত সঞ্চরণশীল বস্তুর যা গতি, যন্ত্রিকাটিরও তাই গতি হয়েছে। কিন্তু তাতে তোমার কী প্রয়োজন? ভ্রাতাগণকে যদি জীবিত দেখতে চাও, তবে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। বলো, কে আদিত্যকে উন্নত করে, কে তার চতুর্দিকে থাকে? কে তাকে অস্তমিত করে, তিনি কোথায় প্রতিষ্ঠিত আছেন?’

যুধিষ্ঠির কিছু বলার আগেই সে বলল, ‘ইস্যু তাঁকে উন্নত করে, আমলা তাঁর চতুর্দিকে থাকে, ইস্যুই তাঁকে অস্তমিত করে, তিনি ভোটবাক্সে প্রতিষ্ঠিত আছেন’
অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যক্ষ বললেন, ‘যুধিষ্ঠির দেখছি একইরকম অপদার্থ থেকে গেলে! তুমি বলার আগে এই অজ্ঞাতকুলশীল যুবতী বলে দিল! কী দুঃসাহস! ওহে অকালপক্ব বালিকা, দেখি তোমার জ্ঞানের পরিধি, বলো তো কে নিদ্রিত হলেও চক্ষু মুদিত করে না?’
সে কমন প্রশ্ন পড়ে যাবার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘একটু আগে ডায়েরি করতে কুসুমপুর জি আর পি থানায় গিয়েই জেনেছি। পুলিশ, পুলিশ! পুলিশ নিদ্রিত হলেও চক্ষু মুদ্রিত করে না, তাই তো বলা হল আমাকে। আর তাই আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমতে পারি।’
ক্রোধে যক্ষ সূর্যাস্মির মতো প্রতীয়মান হলেন। যুধিষ্ঠির করজোড়ে বললেন, ‘ভদ্রে, তুমি তোমার যন্ত্রিকার সন্ধানে যাও। ভীম অর্জুন, আমার দুই স্তম্ভ, দেখছ ভূমিশয্যা নিয়েছে। আমি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে অক্ষম। তুমি যাও। আমাকে আমার ধর্মচ্যুত কোরো না।’
অনন্তর সেই সরোবর পার্শ্ব ত্যাগ করে সে আরও গহন অরণ্যে প্রবেশ করল। সেই স্থান অত্যন্ত হিংস্র শ্বাপদে পরিপূর্ণ। সেখানে একটি অপরিস্কৃত কুঠুরিতে এক সুখচর পুরুষ অতি প্রসন্ন মুখে দাঁত খোঁচাচ্ছিলেন। অকস্মাৎ সামনে একটি ডবকা যুবতী দেখে তাঁর দাঁত খোঁচানো বন্ধ হল।
“ও আপনি? বললাম না ঠিক বয়ানে লিখে আনতে হবে? অ! একেবারে লিখে এনেছেন? তৈরি জিনিস, বেশ, বেশ। কিন্তু এসব কী লিখেছেন অ্যাঁ? স্টোলেন? ছি! ছি! মনে রাখবেন, যাহা কখনও চুরি যায় না, তাহাই মোবাইল।”
“কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখলাম একটা হাত, আমার ব্যাগ থেকে মোবাইল আর পার্স বার করে নিল। খুব ভিড় ছিল ট্রেনটায়। আমি নড়তে চড়তে পারছিলাম না”
“অমনি দেখলেন? গপ্পো লেখেন নাকি? দেখলেন তো খপ করে ধরলেই পারতেন! যত ফালতু কথা। লিখুন I found missing”
সে লেখে, ‘I found missing from my bag’
“আহহা ব্যাগ কেন? ব্যাগ থেকে অমনি একটা জিনিস হাওয়া হয়ে গেল! আইনকানুন নেই নাকি? লিখুন from my possession”
সে তাই লেখে বিনাবাক্যে।
“কিন্তু কেন?”
“কেন মানে?”
“কেন হঠাৎ পজেশন থেকে মিসিং হয়ে গেল, লিখতে হবে না?”
হঠাৎই অফিসারের মুখটা তালসমুন্নত যক্ষের মতো মনে হল। চিন্তাকুল কণ্ঠে সে বলল, ‘তাই তো, হঠাৎ কেন উধাও হল? লিখুন ডিউ টু হেভি রাশ।’
কোনো একটা ইমেজিং টেকনোলজি কাজ করে ভেতর ভেতর। ভিড় থেকে একটা নির্দিষ্ট মুখ বিশ্লিষ্ট করার চেষ্টা চলে, বারবার মুছে যায়। বাচ্চা কোলে ভিখারিনীটা কি? নাকি বারবার গায়ে এসে পড়া বয়স্ক মহিলাটি?
খুঁটিয়ে পড়েন অফিসার।
‘আরে, শুধু নাম লিখলে চলবে? ওয়াইফ অব অমুক লিখতে হবে না? স্বামীর নাম কে লিখবে শুনি?’
‘কেন? স্বামীর নাম কেন? মোবাইলটা তো আমার’
‘আর আপনি? আপনি কার? কথা না বাড়িয়ে স্বামীর নাম লিখুন’
“লেখেন ঘাড় গুঁজে যা বলা হয় লিখতে। অফিসার চোখ নাচিয়ে বলেন, ‘কী করেন কর্তা? বাড়িসুদ্ধ চাকরি করেন তো? দুপুরে ফাঁকা বাড়ি? শ্বশুর শাশুড়ি সঙ্গে থাকে? নাকি আপনিটি কপনিটি? বাচ্চা কার কাছে থাকে, অ্যাঁ?”
“বাচ্চা!”
“এই যে লিখেছেন বাচ্চার আই ডি কার্ডও ছিল পার্সে, যে পেয়েছে, সে মনে করুন যদি হঠাৎ ওটা দেখিয়ে স্কুল থেকে আপনার বাচ্চাকে বার করে নিয়ে যায়?”

যুধিষ্ঠির করজোড়ে বললেন, ‘ভদ্রে, তুমি তোমার যন্ত্রিকার সন্ধানে যাও। ভীম অর্জুন, আমার দুই স্তম্ভ, দেখছ ভূমিশয্যা নিয়েছে। আমি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে অক্ষম। তুমি যাও। আমাকে আমার ধর্মচ্যুত কোরো না।’

‘না!’— চিৎকার করতে গিয়ে চুপ করে যায় হঠাৎ। মুখে ঝুলিয়ে রাখে হাসি। তার হারানো সিম থেকে রাষ্ট্রপতি ভবন উড়িয়ে দেবার হুমকির সম্ভাবনাতেও একইরকম অবিচল থাকে।
‘তাহলে আই কার্ডটা ফালতু?’ অফিসারের গলায় হতাশা।
‘গলারটা কি সোনার?’ হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় কনস্টেবলটি। খুব শীত করে তার। টলমল পায়ে বাইরে এসে দাঁড়ায়। পেছন থেকে অফিসার বলেন, ‘শুনুন, আই এম আর নম্বরটাই তো দেননি। ১৫ ডিজিটের নম্বরটা, ওইটাই আসল’
সে শুনতে পায় না। বাইরে তখন সন্ধে নামছে। পৃথিবীর সমস্ত কাক এসে জড়ো হয়েছে এক নম্বর প্লাটফর্মে। পেছনের ডোবায় একটা পুঁটলি উজাড় করে চলে গেল কেউ। সাদা ম্যাগটের মতো অপরিণত ভ্রূণেরা চলে গেল জলের তলায়। ওইখানে, ওইখানে, হয়তো নিক্ষিপ্ত ভ্রূণের মধ্যে শুয়ে আছে তার সিম। হয়তো তার কানকো গজাবে একদিন, মাছ হয়ে চলে যাবে প্রলয়পয়োধি জলে। নাকি সে এখন নির্দেশ পাঠাচ্ছে, ইছামতীর তীর থেকে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস, খালপাড়ের বস্তি থেকে তাজের অন্দরে পৌঁছে যাচ্ছে মারণ সঙ্কেত, বিপ বিপ বিপ…

অনন্তর যক্ষ বললেন, ‘আশ্চর্য কী? বার্তাই বা কী?’
সে উত্তর দিল, ‘প্রতিদিন হাজার হাজার মোবাইল চুরি হয়, তবুও লোকে পাবার আশায় এফ. আই. আর. করে— এর চেয়ে আশ্চর্যের আর কী আছে?’
‘মোবাইল কখনো চুরি যায় না, হারিয়ে যায় মাত্র, আর হারানো মোবাইলের চেয়ে বিপজ্জনক আর কিছু হয় না— এটাই বার্তা!’
তার কথা শেষ হবার আগেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। চার পাণ্ডব ধড়মড় করে উঠে বসলেন। আবার সমবেতভাবে ভোগ করবার যোগ্য একটি বস্তু সামনে দেখে তাঁদের সাতিশয় পুলক হল। এই বিশাল মহীতলে কত শত মহাত্মারা সে-ইতিহাস বলে গেছেন, এখনও বলছেন এবং ভবিষ্যতেও বলবেন। এই প্রক্ষিপ্ত আখ্যানটির সঙ্গে সেই অতি পবিত্র ইতিহাসের কোনো সম্বন্ধ নেই।

Spread the love

8 Comments

  • চমৎকার

    Rupankar,
  • অসাধারণ।

    সৌমেন বসাক,
  • দুর্ধর্ষ

    shyamali acharjya,
  • এইরূপ চিত্রকল্প অবধারিতভাবে কেবলমাত্র তোমারই মস্তিষ্কপ্রসূত হওয়া সম্ভব। তোমার লেখনীদন্ডটি অজর অক্ষয় হউক।

    জয়তী অধিকারী,
  • বেশ। আমার দুবার হারিয়েছে। বেশ কানেক্ট করা গেল।

    ঈশিতা ভাদুড়ী,
  • খুব ভালো লাগলো।ক্যাসিকস আর অতি আধুনিকতার এমন মিশেল আর তার সাথে তোমার রসবোধ—লেখাটাকে ভীষণ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

    RIKPARNA Bhattacharya,
  • ভালো লাগলো।

    Koustav Koundu,
  • ভালো লাগলো।

    Koustav Kundu,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *