দেবজ্যোতি রায়ের গল্প

এইসব গ্রামীণ ঠেক

উপেন খুড়ো চায়ের দোকানের প্রভাতি আসরে, ঠিক চায়ের দোকানও নয়, আসলে গ্রামের একমাত্র মিষ্টির দোকান, আগে লোকে বাড়িতে অতিথি এলে, তবে চায়ের ব্যবস্থাও আছে, অনেকেই পুরি-তরকারি, মাঝে কিছুদিন বন্ধ ছিল, এখন ছাড় যেহেতু, অন্তত হাফবেলা, ফলে সকালের এই সময়টুকু, সেই কবে থেকে অভ্যাস, সবকিছু তুড়ি মেরে উড়িয়ে, অনেকেই বাড়ি থেকে এক-দুই-তিন-চার, বাজারও তো বসে, বাজারে এসেও একটু, বাকি দিন তো, আগে সময় কাটত, রক্ত ঝরত না, এখন সময় কাটে না, কিছু একটা ঝরে, ভিতরে, গোপনে, তাই অনেকেই, নইলে দুপুরের ভাত হজম হয় না, তুমি যতই নিষেধের গণ্ডি আঁকো হে সরকার, বিপদ ভুলে মানুষ ডিঙোবেই, গণ্ডি ডিঙানো কি আজকের, রামায়ণেও দেখো, সীতা, মানুষ ভুলেও যায় যে ঠিক কীভাবে চলতে তাকে, এখন, কিংবা মনের গভীরে, মনের অনেক গভীরে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করাটাও মানুষের এক স্বভাবগত, তাছাড়া ধরো, তুমি খুব বুঝিয়ে বললে, বেশিরভাগটাই মাথার ওপর দিয়ে, মৃত্যু-মিছিল কানে শোনা, টিভিতেও, কাগজের পাতায়, তবু প্রত্যক্ষতা নেই তো, ঘরের দুয়ারে নয় তো, এরকমই ভাবে মানুষ, অন্যদের হবে, আমার বা আমাদের, না, তাই গ্রামের একমাত্র মিষ্টির দোকানে, যেখানে চা, এবং পুরি-তরকারিও, শুধুই চা, কিংবা সঙ্গে, যেমন এখন চলছে, প্রতিদিনই সকালের কিছুটা সময়, বাজার করতে এসে বা বাজারে না ঢুকেও, আর উপেন খুড়ো এই প্রভাতী আসরে, খ্যাসখ্যাস খ্যাসখ্যাস, বেজায় মুদিত চোখ, দন্তপাঁতি সামান্য বিকাশে, অতি ছোট্ট হাঁ-এর মধ্যে, যেন কী একটা হাসির কথাও হচ্ছিল, কিংবা এক অপার্থিব আনন্দের মধ্যে ভাসমান হয়তো-বা, তবে ধনা, বছর ২৪-এর ওই চায়েরই দোকানে বা মিষ্টির, এক অতীব ফক্কড়, লোকেদের চা দেয়, পুরি-তরকারিও, সকালে, সকলকেই হাসালো বলে যে,— খুড়ো, এখন যদি মরো, ধরো পজিটিভই তোমার লালায়, রিপোর্ট কিন্তু লিখবে ‘বিচি চুলকে মৃত্যু’, আর খুড়ো— হারামজাদা, বাপের বয়সীর সঙ্গেও…, হাতটা যথাস্থান থেকে গুটিয়ে নিলেন।

ধনার পুরো নাম ধনেশ্বর। কেউ ডাকে ধনা, কেউ-বা আরও আদরে, ধন। আবার কেউ কেউ ধন ধনা ধন— এতটাও টানে। তবে ধনের ঈশ্বর বলে কেউ পূজ্যগড় করে কিনা, বিশেষত, ধনা ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়েছে এবং বাড়িতে একা বিধবা মা, ধনা এখনও বিয়ে করেনি। তবে আমাদের আলোচ্য অবশ্যই ধনা নয়, বিশেষ এই গম্ভীর সময়ে।

গম্ভীর সময় বললাম। এর অর্থ কি এই যে আমরা হাসব না? হাসব না আমরা? কবিতা লিখব না? গান? পাঠ হবে না কবিতা কোথাও? গাওয়া হবে না গান? কেউ কেউ বলছেন, এদের মধ্যে কেউ কেউ কবিরাও আছেন, এই সময়টা নাকি কবিতার নয়! গানের নয়! ছবি আঁকার নয়! মানুষ মরছে। আর তুমি কবিতা মারাচ্ছ? গান মারাচ্ছ? আঁকা মারাচ্ছ? মানুষ হয়ে তুমি শুধু মানুষের পাশে দাঁড়াও। এ-মতভাবে বলা যেন কবিতা, গান বা ছবি এ-সব মানুষের পাশে দাঁড়াবার নয়, দাঁড়ায়নি-বা না কখনো!

এ-মতোদের এতদ্বিষয়ে একটাই বলবার। আতঙ্কের মধ্যে দাঁড়িয়েও, যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়েও, মানুষ কবিতা লেখে, গান গায়, ছবি আঁকে, প্রেম করে। হাজারো চেষ্টাতেও হ্যাটস্‌ অব মানুষের সৃজনক্ষমতা, যে, মানুষকে আজো যন্ত্র বানানো যায়নি। ফতোয়া দিয়েও এমনকী! মৃত্যুর সঙ্গে এটাই চলমান ডিসকোর্স জীবনের। কখনো মৃত্যু জেতে কখনো জীবন। কিংবা এরকমই যে, কেউ-ই হারাতে পারে না কাউকে।

উপেন খুড়ো চুলকাবেই। ধনা ফক্কুড়ি মারবেই। আসরের বাকি যে-সকলজন তারা হেসে উঠবেই। এও তো জীবনের গতির মধ্যেই পড়ে। আর এই গতির মধ্যে দাঁড়িয়েও সামন্ত বলে ওঠে,— বুঝলাইননি খুড়ো, আইজ টমাটো খেতে গোরু ছাইড়া দিছি।
— কও কী! খুইলা কও। ধনা দুইটা চা দে। একটা সামন্তকে দিবি। একটা আমাকে।
— খুইলা কওনের কী আছে খুড়ো। আপনি তো জানেনই। ফসলের দাম নাই। চাষায় মরব। সামন্তর চোখে জল। স্তব্ধ সকলেই।
— হাজারে হাজারে কারখানা, সংখ্যাটা লক্ষ লক্ষ হবে, বন্ধ হয়া যাইতেছে। বেবাকটিরই কোমর ভাইঙ্গা দ। বিশেষ কইরা ছোটো ও মাঝারি। বড়ো গুলানেরও কর্মীছাটাই, তৎসহ বেতন কমাইবার চাতুরি, বহু লোক মরবে সামন্ত। পৃথিবীর তিন-চতুর্থ কর্মীলোক বেকার হলে, চাষা তো জন্মায় মৃত্যুর ঠিকানা নিয়া, যা শুনতেছি।
— আমাগো দ্যাশের কী হইব ভাবো তবে! রাস্তায় কি তাইলে মানুষ মইরা পইড়াই থাকব?
— শুনুন, পাশ থেকে বিশ্বাস, মানুষ জিতবেই।
— সেই বিশ্বাস আছে বইলাই তো খুড়ো নিশ্চিন্তি চুলকায়, ফুট কাটে ধনা।

‘ধন উড়াইয়া দে ওরে ধন উড়াইয়া দে’, বিল্টুর মোবাইলে রিংটোন। বিল্টু ফিসফিস।
— যদ্দিন বাঁচব, তদ্দিনই চুলকাব। তোর বাপের কী রে হারামজাদা! কবিতা গাইবে না মানুষ? আঁকবে না গান? উপেন খুড়ো হাত ফের যথাস্থানে ঠেলে দিয়ে উঠে পড়লেন কাল ফের দেখা হবে বলে।

Spread the love
By Editor Editor গল্প 2 Comments

2 Comments

  • সপাট চাবুক

    Shanu Chowdhury,
  • চাবুকই বটে।

    শীর্ষা,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *