লেখক নয় , লেখাই মূলধন

রিপন হালদারের গল্প

দ্য বয় উইথ দ্য বাই-সাইকেল

যত এগোচ্ছে গল্পটা ততই যেন গোলক ধাঁধায় আটকে পড়ছে। ট্যুইস্টের পর ট্যুইস্ট গল্পটাকে ওঠালো বাস্তব থেকে অনেক উপরে, যেখানে গোরুর চার পা হাতের আবেষ্টনী হয়ে ধীরে ধীরে উঠে যায় গাছে।

সিনেমার নাম ‘দ্য বয় উইথ দ্য বাই-সাইকেল’। বেশ লাগল নামটা। একটা পনেরো-ষোলো বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পোস্টার দেখছে। পোস্টারে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ওরই বয়সী একটা ছেলে ছোটো একটা ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ মেঘলা। ছেলেটির বিষণ্ণ দুই চোখ ঐ দিকে। শুক্রবার নুন শো দেখার জন্য ছেলেটি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

শহরের সিনেমা হল্ ওদের এলাকা থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পথ। পঞ্চাশ টাকার একটা নতুন চারকোনা নোট সকাল থেকেই আস্তানা গেড়েছে ছেলেটির ছোট্ট কালো মানিব্যাগে। দেখে নিল যথাস্থানে আছে কিনা।

কিন্তু টাকাটা অন্যখাতে ব্যয় করার কথা ছিল। আজ ওর মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে। নেট ক্যাফে থেকে জানার কথা ছিল। ও তো জানেই রেজাল্ট কেমন হবে। তারপর বাড়িতে কী হবে, তাও জানে। বাবা-মায়ের যুগ্ম আক্রমণ। ফুল ভলিউমে চিৎকার। গালে থাপ্পর আর থাপ্পরের ভাই চড়, পিঠে গায়ে… বাবার মনে হবে যত নষ্টের গোড়া ঐ সাইকেলটা। তারপর সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে ওটা ভাঙতে যাওয়া, ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া রাস্তায়… বছর দুই ধরে গল্প এক জায়গাতেই পাক খাচ্ছে।

তারপর দেহের শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকা সরু পিচ রাস্তার উপর দিয়ে ঢিমে তালে এগোতে থাকে সাইকেলটি। চারপাশের সমস্তটা ভীষণ ফাঁকা। এক পাশে মাঠ, এদিক ওদিক কিছু বাড়ি। রাস্তার পাশে ছড়িয়ে থাকা আবছা মানুষজন। ছেলেটির মন সিনেমার ভাবনায় মশগুল। কিছুক্ষণ পর বাঁদিক থেকে আসা লম্বা উঁচু একটা দেওয়াল রাস্তাটিকে প্রায় ঘিরে ধরেছিল। তারপর আবার মাঠ। কাছে দূরে ছেঁড়া ছেঁড়া বাড়িঘর। কিছুক্ষণ চলার পর রাস্তার ডান দিকে এসে পড়ে দীর্ঘ রেল লাইন। রোদে চকচক করছে। তাও ফাঁকা, ডাউনে যতদূর চোখ যায়… হঠাৎ দেখা যায় শব্দ করে এগিয়ে আসছে লম্বা একটা ধাতব ট্রেন। যতক্ষণ না সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ছেলেটি তাকিয়ে থাকল।

শহরে যাওয়ার এই দৃশ্যপথ ওর নিজেরই আবিষ্কার। ভদ্রলোকেরা খুব একটা এই পথ দিয়ে শহরে আসে না। কিন্তু ওর খুব প্রিয় এই প্রায় নির্জন রাস্তাটি। বাড়ির মায়া কাটানো একটা দূরত্ব-ব্যঞ্জক হাহাকার যেন ছড়িয়ে আছে এই কালো পিচ জুড়ে। আছে অসামাজিক মানুষজন অথবা মাতালদের হাতে পড়ার ভয়। কিন্তু সেই ভয় ওকে দমাতে পারে না। এই ভয়টুকু বরং ওকে সান্ত্বনা যোগায়। একটা অজানা গন্তব্যের নিষিদ্ধ ইশারা ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। হিংস্র কোনো জন্তু যেন পুষে রাখা আছে হৃদয়ে।
প্রায় মিনিট চল্লিশ পর এসে যায় সিনেমা হল। ছেলেটি ঢুকে পড়ে।

এই পর্যন্ত দেখার পর ইন্টারভ্যাল হল। কেমন যেন অসহায় বোধ করে ছেলেটি। গল্পের খেই হারিয়ে ফেলেছে। বেরিয়ে এল হল থেকে। গ্যারেজে রাখা সাইকেলটি ছাড়িয়ে নিল। তারপর প্যাডেল চাপতে শুরু করে কিশোর দুটি পা।

উত্তর-পশ্চিম আকাশে তখন কালো মেঘ। এখনই অন্ধকার মনে হচ্ছে চারদিক। ততক্ষণে শহরের সরু ঘিঞ্জি পথ পার হয়ে ছেলেটি ছোট্ট একটা ব্রিজের উপর এসে পড়েছে। আকাশের দিকে চোখ পড়তেই কী ভেবে যেন দাঁড়িয়ে পড়ল। পাশ দিয়ে দ্রুত বেগে চলাচল করছে মানুষজন। কী হবে এখন! বাড়ি ফিরবে কী করে! সঙ্গে ছাতাও নেই। সাইকেলের উপর বসে থাকে ছেলেটি। ভাবতে থাকে। ডান পা প্যাডেলে। বাঁ পা রাস্তায়। ভাবছে ও স্থির হয়ে। ভাবতে ভাবতে, ভাবতে ভাবতে ও স্থির চিত্র হয়ে যায়। পোস্টার হয়ে যায় ধীরে ধীরে…

এইসময় সামনের দিকে অনেক মানুষ আর সাইকেল, রিক্সা, বাইক, মোটর ভ্যানের ভিড়। তা ভেঙে বিশেষ একটি সাইকেল সামনের দিকে এগিয়ে আসে। তার সওয়ার বছর পনেরোর একটি ছেলে। রং চটা বাস্কেট আর কেরিয়ারের শিক ভাঙা সাইকেলটা নিয়ে সে বিশাল দেওয়াল জোড়া এই পোস্টারের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। অবাক। শোয়ের টাইম দেখে। নুন শো দেখাই তো যায়!

তারপর একটা পঞ্চাশ টাকার নতুন নোট টিকিট কাউণ্টারের অন্ধকার গর্ত আলোকিত করতে করতে সামনের দিকে এগোয়।

বাকি সিনেমাটা এভাবেই এগিয়ে চলে…

রিপন হালদারের গল্প

আমাদের নতুন বই