Categories
গল্প

শান্তনু ভট্টাচার্যর গল্প

হেমন্তের জোছনাবেলা

বাতাস বইছে। জোলো বাতাস। বাতাসে মিশে আছে শীত। এমন বাতাস সমুদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। হয়তো বহু যুগ আগে এখানে কোনো সমুদ্র ছিল! সেই সমুদ্রের বুকে নিয়ত জেগে থাকত প্রবল ঢেউ, আর তার ওপর দিয়ে ছুটে বেড়াত ভিজে নোনা বাতাস! সেই সমুদ্র এখন নেই। কিন্তু সেই সমুদ্র-বাতাস রয়ে গেছে এখনও!

তুমি: আঃ, প্রাণ জুড়িয়ে যায়…

সে: জীবনে সে-দিনই প্রথম, আমি অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিলাম। অনেক রাত, প্রায় মধ্যরাত। আমার পথ চেয়ে বসে থাকতে-থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিল মা। আমার ডাক শুনে ঘুম লেগে থাকা চোখে খুলে দিয়েছিল দরজা…

তুমি: অত রাত হয়েছিল কেন?

সে: সে-দিন তো সারা শহর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এক বিখ্যাত নেত্রীকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল তাঁর বাগানে। তুমি ভুলে গেছ!

তুমি: পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ…

সে: খুব কাছ থেকে… বোধ হয় তিনটে বুলেট… একেবারে বুকে। ওই তিনটে ছিদ্রকে তিনটে সরলরেখায় জুড়ে দিলে একটা সমবাহু ত্রিভুজ আঁকা হয়ে যায়।

তুমি: সমবাহু ত্রিভুজ!

সে: সমবাহু ত্রিভুজ। যে-ত্রিভুজের তিনটে বাহু সমান।

তুমি: অঙ্কে তো তুমি পাকা ছিলে।… তা তুমি কোথায় গিয়েছিলে ওই দিন?

সে: সে-দিন আমার একটা চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। সবার আগে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম আমি, কিন্তু আমাকে ডাকা হল সবার শেষে। সাদা কাচের টেবিলের ওপারে তিনজন বসেছিল। তিনজনই খুব রোগা, আমার মতো। অত বড়ো চাকরির মানুষেরা কী করে অত রোগা হয় কে-জানে!… ওরা প্রথমে আমার নাম জিজ্ঞাসা করেছিল, তারপর একে একে আরও অনেকগুলো প্রশ্ন— আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে আমি সব ক-টারই উত্তর দিয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম, ওগুলো সবই ভুল। শেষে তারা জিজ্ঞাসা করেছিল, আমাকে ওই অফিসে চাকরি দিলে আমি ঠিক সময়ে আসতে পারব কিনা? এই প্রশ্নে আমি কিন্তু ভুল উত্তর দিইনি। বলেছিলাম, আমি তো অনেক দূর থেকে আসব, সুতরাং আমার আসতে কিছুটা দেরি হতেই পারে। যেহেতু আপনাদের অফিস আর আমার বাড়ির মাঝে অনেকটা দূরত্ব, কাজেই আমাকে একটু তাড়াতাড়িই ছেড়ে দিতে হবে!

তুমি: তারা এরপর আর কোনো খবর পাঠিয়েছিল তোমাকে?

সে: পাঠায়নি, তবে মনে হয় পাঠাবে। এই তো সবে পঁয়ত্রিশ বছর হল ইন্টারভিউ দিয়ে এলাম।

তুমি: আশ্চর্য!

সে: ঠিক বলেছ, আশ্চর্য! আশ্চর্য এক মানুষ ছিলেন তিনি। তা না হলে অত সুন্দর কারো চুল হয়? ঘন কালোর একপ্রান্তে জমাট বাঁধা এক ফালি সাদা, যেন মাঝ সমুদ্র থেকে খুব সাবধানে একটু সাদা ফেনা তুলে এনে রেখে দেওয়া হয়েছে চুলের আগায়! তেমনই ছিল তাঁর বিচক্ষণতা। মেঘের ভিতর ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় তাঁর এক সন্তানের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি নাকি আগে লকারের চাবিটা খুঁজেছিলেন!… সত্যি, চাবি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বস্তু জীবনে!

তুমি: জীবনের গুরুত্ব তুমি তাহলে বুঝে ফেলেছ?

সে: কী বলছ, বুঝব না! জীবনের গুরুত্ব না বুঝলে তো আমি সে-রাতে বাড়িই ফিরতাম না!

তুমি: কোথায় যেতে?

সে: হাঁটতাম। সারারাত হাঁটতাম। শুধু তো আমি একা নই, আরও কত মানুষ সে-দিন রাস্তায় হেঁটেছিল‌। আলো, আধো আলো, অন্ধকার রাস্তায় কত পা ধুলো উড়িয়েছিল সে-দিন! সে যেন এক ক্রীড়া-উৎসব! ভয় আর দুঃখের মাঝে চলন-গমন প্রতিযোগিতা! হাঁটতে-হাঁটতে হয়তো সে-দিন কোনো গুহার গভীরে গিয়ে থামতাম আমি।

বাতাস বইছে। ভিজে বাতাস। বাতাসে হিম মিশে রয়েছে। এমন বাতাস পাহাড়ের গায়ে বয়ে যায়। হয়তো অনেক বছর আগে এখানে কোনো পাহাড় ছিল। সেই পাহাড় ঘিরে বারোমাস ছড়িয়ে থাকত কুয়াশাকণা, কুয়াশা মেখে দৌড়ে যেত হিমেল বাতাস। সেই পাহাড় এখন নেই। কিন্তু সেই পাহাড়ি বাতাস রয়ে গেছে এখনও!

তিনি: আচ্ছা, জীবনে চাবির গুরুত্ব তুমি কি আর কাউকে বুঝিয়েছ?

সে: বোঝাব। চাবির গুরুত্ব উপলব্ধি করার মতো উপযুক্ত মানুষের সন্ধান পেলে দৌড়ে যাব তার কাছে। এত বড়ো একটা শিক্ষা, কোনো একজনের হাতে তার সামান্য অংশ তুলে না দিয়ে গেলে মহাপাপ হবে আমার।

তিনি: সেই শিক্ষার আলো-বাতাসেই কি এগিয়ে গেছে তোমার জীবন?

সে: সে-শিক্ষা থেকেই তো সে-দিন অনেক রাস্তা হেঁটে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীরে মাকে বলেছিলাম, আর আমরা এ-বাড়িতে থাকব না মা, অন্য কোনো বাড়িতে চলে যাব।… ঘুমের আবেশে সে-দিন অবশ্য মা আমার কথায় গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু তার ক-দিন পরেই, এক বিকেলে বাড়ি ফিরে মাকে বললাম, মা, কাল সকালেই আমরা কিন্তু বাড়ি বদল করব। জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নাও।… মা হয়তো অবাক হয়েছিল, কিন্তু কোনো পালটা প্রশ্ন করেনি‌। শুধু বলেছিল, আচ্ছা।

তিনি: নতুন বাড়িতে গেলে?

সে: পরের দিন খুব সকালে। দিনযাপনের যা-কিছু সম্পত্তি, সব একটা ঠেলা গাড়িতে চাপিয়ে, মাকে নিয়ে আমি নতুন বাড়িতে চলে গেলাম। পলেস্তারাহীন একটা ঘর— প্রথম দিন ঘরটা দেখেই আমার খুব ভালো লেগেছিল। মনে হয়েছিল, এ-রকম একটা লাল ঘরে বসবাস না করলে জীবনে কিছু একটা হারাব।

তিনি: দেওয়ালের রং-ই তাহলে তোমার বাড়ি বদলের একমাত্র কারণ?

সে: পুরোনো বাড়িটায় সুখের অভাব ছিল না, কিন্তু নতুন বাড়িটাতে ছিল এক মহত্ব। ওই যে বললাম, চাবি! নতুন বাড়িতে চাবির প্রয়োজন হত না। একদিন ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে ব্রজবাবু বলেছিলেন, যে-ঘরের দরজায় চাবির প্রয়োজন পড়ে, সে-ঘরে বাস করে জীবনে উন্নতি করা যায় না।… আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল সংগ্রামী-সাথী ব্রজ বসুর কথাটা।

তিনি: সংগ্রামী-সাথী!

সে: বাংলা বর্ণমালার প্রথম ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে শুরু, তারপর আরও তিনটি বর্ণ— মোট চার অক্ষরের একটি শব্দ, যার অর্থ ‘সংগ্রামী-সাথী’।… জীবনযাপনের রসদ বলতে সংগ্রামী-সাথী ব্রজ বসুর ছিল দুটো খদ্দরের পাঞ্জাবি, তিনটে সুতির পায়জামা, তিনটে আন্ডারওয়ার, দুটো গামছা, একটা চিরুনি, একটা ছোটো আয়না, বেশ কিছু বই, তিনটে কলম, অল্প কিছু বাসনপত্র, একটা স্টোভ, আর একটা রেডিয়ো। পৈতৃক সম্পত্তি হিসাবে ভাগে পাওয়া তাঁর দুটো ঘরের একটা তিনি আমাকে ভাড়ায় থাকতে দেবেন বলেছিলেন। দিয়েও ছিলেন, মাসিক পনেরো টাকার বিনিময়ে। সহজ গাণিতিক হিসাবে দিন প্রতি আট আনা। ব্রজ বসু ঘরে চাবি লাগাতেন না। আমাকেও বলেছিলেন, সম্ভব হলে চাবি না-লাগাতে। আমি সে-কথা মাকে জানিয়েছিলাম।

তিনি: ব্রজ বসুর কাছ থেকেই কি তুমি জীবনবোধ, সময়বোধ, সমাজবোধের গভীর-জটিল সব তত্ত্বসূত্র শিখলে?

সে: আমি রেডিয়ো চালাতে শিখলাম। তিনি রেডিয়োতে দেশ-বিদেশের খবর শুনতেন; তিনি যখন থাকতেন না, তখন সেই রেডিয়োর নব ঘুরিয়ে আমি গান শুনতাম। কত গান! তার একটা এখনও মনে আছে— আমরা করব জয় একদিন…

তিনি: শেষ পর্যন্ত জয় করলে?

সে: করতাম। নিশ্চয়ই করতাম। কিন্তু হঠাৎ ওঠা ঝড়ে চারপাশ ঢেকে গেল ধুলোয়। থমকে গেলাম আমরা।

তিনি: জয় আসবে কোনোদিন?

সে: আসবে, আসতেই হবে, একদিন অবশ্যই আসবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত জয়। আমার চোখের সামনে এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই পলেস্তারাহীন লালচে দেওয়াল চারটে, যেখানে ইটের খাঁজে খাঁজে জমাট বেঁধে থাকত লাল অন্ধকার। আমি এখনও সেই লাল অন্ধকার লেগে থাকা রেখাগুলো খুঁজি। রেখার সঙ্গে রেখা জুড়েই তো তৈরি হয় ত্রিভুজ-চতুর্ভুজ!

বাতাস বইছে। শুষ্ক বাতাস। বাতাসে ফুলের সুবাস। এমন বাতাস জঙ্গলের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। হয়তো অনেককাল আগে এখানে ছিল এক গহন অরণ্য। সেই ভয়ংকর অরণ্যে হিংস্র শ্বাপদরা কঠিন লড়াইতে লিপ্ত থাকত সর্বদা। প্রাচীন গাছগুলোর ওপর দিয়ে ছুটে বেড়াত সুগন্ধ মাখা বাতাস। সেই জঙ্গল এখন নেই। কিন্তু সেই জংলি বাতাস রয়ে গেছে এখনও!

তিনি: তা আপনার সেই সাদা বিড়ালটার কী খবর? যাকে আপনি খুব মিষ্টি করে ‘মাহো’ বলে ডাকতেন! যে খুব মাছ পছন্দ করত।

আপনি: সে তো কবেই মরে গেছে। এতদিন কোনো বিড়াল বাঁচে নাকি! তারপর অবশ্য আমি একটা লাল বিড়াল পুষেছিলাম…

তিনি: লাল বিড়াল!

আপনি: ঠিক লাল নয়, লাল বিড়াল তো হয় না! লালের কাছাকাছি। তার ওই পলেস্তারাহীন ঘরের দেওয়ালের মতো রং ছিল বিড়ালটার। সেটা আবার খুব দুধ খেতো। আমি ওর নাম রেখেছিলাম ‘লেনো’, আমার মনে হয়েছিল, লেনো কোনো সাধারণ বিড়াল নয়। সেই লেনো-ও মরে গেল একদিন। বিষাক্ত কিছু হয়তো ও খেয়ে ফেলেছিল! মরে যাবার সময় ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল একটু লাল রক্ত। তবে আমার ধারণা, বিষক্রিয়ায় না পড়লে ও হয়তো অ-নে-ক দিন বাঁচত। ক্যালেন্ডার থেকে একটা সুন্দর তারিখ বেছে নিয়ে আমি লেনোর ২৫ বা ৫০ তম জন্মদিন পালন করতাম…

তিনি: এখন তাহলে আপনার সঙ্গে কোনো বিড়াল নেই!

আপনি: না। এখন আমি মাছ পুষি। দুটো ছোটো অ্যাকুরিয়াম রেখেছি বাড়িতে।

তিনি: বড়ো একটাতেই তো রাখা যেত সব মাছ! দৃষ্টিনন্দন হত।

আপনি: বিপদের হত।… শ্রেণি সংঘাত এড়াতেই একটাতে শান্ত, ভাবুক মাছগুলোকে রেখেছি; যারা দিবানিশি একে-অন্যের রূপে মোহিত হয়ে থাকে। অন্যটাকে রেখেছি অশান্ত, লড়াকু মাছগুলোকে; যারা নিশিদিন নিজেরা মেতে থাকে দ্বন্দ্বে। তবে দু-পক্ষেরই দেহের গড়ন, বর্ণ বিচিত্র! এর মধ্যে দুটো মাছ, দুটো অ্যাকুরিয়ামের, যাদের রূপ-লাবণ্য তো তুলনাহীন! আমি একই নামে ডাকি ওদের দু-জনকে— মার্কাস। আমার কাচ-বাক্সের পরিবেশ সাগরতু্ল্যে সাজিয়েছি আমি— ওরকম পাথর, ওরকম শ্যাওলা, ওরকম নীল অন্ধকার! দুটোরই।

তিনি: ভারি মজার বিষয় তো— ভিন্ন চরিত্র, অভিন্ন পরিবেশ!

আপনি: হ্যাঁ। শান্ত আর ক্ষিপ্ত, দুই শ্রেণিকেই আমি সম-পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

তিনি: আপনার মহত্ত্ব।

আপনি: আমার চেতনা।

তিনি: লড়াকু আর অ-লড়াকুর নিখুঁত শ্রেণি বিভাজন আপনি তাহলে শেষ পর্যন্ত করেই ফেললেন!

আপনি: ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে।

তিনি: আপনার বাড়িতে কালো কাঠের সেই বড়ো চেয়ারটা কি এখনও আছে, যেটাতে উনি অবসরে বসতেন?

আপনি: হ্যাঁ, আছে। সেই মহান মানুষটার স্মৃতি ধরে রাখতে ওই চেয়ারটাই এখন আমার একমাত্র সম্বল। আর তো কিছুই নেই।

তিনি: কিছুই নেই!

আপনি: না।… প্রত্যাশাও ছিল না আর কোনো স্থূল বস্তুর। আমি চেয়েছিলাম, আমরা সবাই চেয়েছিলাম মানুষটা শতায়ু হন। কিন্তু উনি তো একশো সংখ্যাটা ছুঁতে পারলেন না, একশো থেকে দু-বছর দূরেই থেমে গেল তাঁর হাঁটা। এই দীর্ঘ সময় তিনি পৃথিবীতে রইলেন, জীবনের এক অখণ্ড সময় আমি তাঁর শরীর ও মন ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকেছি, কিন্তু ওই কালো চেয়ারটা ছাড়া আমি আর কিছুই চেয়ে আনিনি তাঁর কাছ থেকে। আমার সেই সাদা বিড়ালটা, মাহো, সে পরম আরামে ওই চেয়ারের ওপর শুয়ে থাকত। পরে লেনো, আমার প্রিয় লাল বিড়াল, সেও অতি আয়েশে শরীর মেলে রাখত কালো চেয়ারটার ওপর।…

শেষ পাতা