শান্তনু ভট্টাচার্যর গল্প

হেমন্তের জোছনাবেলা

তিনি: এ-ক-শো বছর! এই একশো বছরে পৃথিবীতে কী কী হতে পারত বলে আপনার মনে হয়, যেগুলো হয়নি?

আপনি: এই গ্রহের সব মানুষ ক্রমশ দীর্ঘ হতে-হতে শেষে দৈত্যাকৃতি হয়ে উঠতে পারত, অথবা সবাই ধীরে ধীরে খর্বাকৃতি হতে-হতে শেষ অবধি হয়ে পড়তে পারত একেবারে পোকাতুল্য।… কোনো এক কারণে মনের আনন্দে সব মানুষ এমন হেসে উঠতে পারত, যে-হাসি একশো বছরেও থামত না, কিংবা কোনো নিদারুণ দুঃখে প্রত্যেকটা মানুষ এমন কেঁদে ফেলতে পারত, যে-কান্না থামত না একশো বছরেও! তারপর…

তিনি: তারপর?

আপনি: দেখুন, যে-শব্দটা আমি একেবারেই পছন্দ করি না, সেই ‘তারপর’ শব্দটাই আবার এসে গেল। ‘এসে গেল’ বলাটা ভুল; এসে যাচ্ছে, এসে যায়! সত্যি বলতে কী, শব্দটাকে আমি এখনও ভীষণ ঘৃণা করি।

বাতাস বইছে। সিক্ত বাতাস। বাতাসে মিশে আছে কুয়াশা। এমন বাতাস নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যায়। হয়তো অনেক বছর আগে এখানে একটা নদী ছিল। গলায় গান নিয়ে সে-নদীর বুকে নৌকো বেয়ে যেত মাঝিমাল্লারা। কুয়াশা জড়ানো ভিজে বাতাস বয়ে যেত নদীর ওপর দিয়ে। সেই নদীটা এখন নেই। কিন্তু সেই নদী-বাতাস রয়ে গেছে এখনও!

তুমি: ঠিক কোন সময়ে আপনি চেয়ারের গুরুত্ব বুঝেছিলেন, আজ তা মনে আছে?

আপনি: সালটা মনে নেই। ওটা গুরুত্বপূর্ণও নয়। তবে তারিখটা মনে আছে— ৩৩শে ফেব্রুয়ারি।

তুমি: ফেব্রুয়ারি মাসের ৩৩ তারিখ!

আপনি: বোকার মতো অবাক হয়ো না। অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় এটা নয়। ফেব্রুয়ারি মাসটা নিয়ে কখনো ভেবেছ! সবচেয়ে ছোটো এই মাসটা, অথচ কী সুন্দর! সেই সুন্দর মাসটাকে অহেতুক ছোটো করে রাখা হয়েছে। মানুষের তো এটা বিরাট ভুল! আমি সেই ভুলটা সংশোধন করেছি, পরের পাঁচটা মাস থেকে একটা করে দিন টেনে এনে। তোমাকেও বলছি, ভুলটা সংশোধন করার চেষ্টা করো।

তুমি: এই ভুল-সংশোধনের সিদ্ধান্তটা কি ওই কালো চেয়ারে বসে নিয়েছিলেন?

আপনি: আজ আর তা মনে পরে না, জানো— চার দেওয়ালের মধ্যে বসে, নাকি খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে নিয়ে ফেলেছিলাম ওই মূল্যবান সিদ্ধান্তটা। তবে, আশ্চর্যজনকভাবে এটা মনে আছে, যখন সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম, তখন আমার গায়ে একটা চাদর জড়ানো ছিল। যদিও সে-দিন শহরে খু-ব শীত ছিল কি না, আজ আর তা মনে নেই। এখনও স্পষ্ট মনে আছে, গায়ের সেই চাদরটা ছিল লাল রঙের। মৃত্যুর সময় লেনোর মুখ থেকে যে-লাল রঙের রক্ত বেরিয়ে এসেছিল, সেই লাল!… লেনোর মৃত্যুতে আমার মনে এখন আর কোনো শোক নেই, তবে আক্ষেপ আছে— আমার আক্ষেপ ওর শরীর থেকে বেরিয়ে আসা ওই রক্তটুকু নিয়ে। ওই কয়েক ফোঁটা রক্ত না-বেরিয়ে এলে আমি ওর শরীরটা ওষুধ মাখিয়ে রেখে দিতাম একটা কাচের বাক্সে। সবাই এসে দেখত। একটা ইতিহাস নির্মাণ হত!

তুমি: ইতিহাস ছাড়া মানুষ আর ঠিক কী কী নির্মাণ করতে পারে?

আপনি: মানুষ আদপে কোনো কিছুই নির্মাণ করতে পারে না‌। অনেক কিছু নির্মাণের চেষ্টা করে এবং অনিবার্যভাবে ব্যর্থ হয়। তার চরম ব্যর্থতা ইতিহাস নির্মাণে, কারণ ওই কাজে মানুষের চেষ্টা সবচেয়ে বেশি।… শুধু দুটো সত্য সে ঠিকঠাক নির্মাণ করে— প্রথমত, একটা দিন ও দ্বিতীয়ত, একটা রাত। অনেক পরিশ্রমের বিনিময়ে মানুষ এই নির্মাণ-কৌশল আয়ত্ত করেছে। অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে মানুষ তো বুঝে ফেলেছে, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দিন-রাত্রি নির্মাণের এই কৌশল আয়ত্ত না করে তার আর কোনো উপায় নেই!

তুমি: দিন ও রাত!… আচ্ছা, দিন-রাতের সর্বোত্তম সংজ্ঞাটা কি আপনি খুঁজে পেয়েছেন, কিংবা চেষ্টা করেছেন নিজে নির্মাণ করতে?

আপনি: না। খুঁজেও পাইনি, নির্মাণের চেষ্টাও করিনি। ব্রজ বসু মানা করেছিলেন। বলেছিলেন, দিন-রাতের সংজ্ঞা নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন এক কাজ। এতে জীবন দগ্ধ হবার সম্ভাবনা আছে— এ-কথা শোনার পর আমি আর এগোইনি।

তুমি: ব্রজ বসু! আপনি যাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সময় বদলের সংকল্প করেছিলেন?

আপনি: হঁ— তবে সময় বদলের নয়, সময়কে ছোঁয়ায়। এবং তা সংকল্প নয়, তা ছিল প্রকল্প!

তুমি: প্রকল্প?

আপনি: প্রকল্প। প্রজেক্ট। মানুষ খুঁজে, তার দাম মেপে, দামের মূল্যে স্থান নির্ধারণ করে, সময়কে ছুঁয়ে দেখার অতি বৈজ্ঞানিক এক প্রকল্প।

বাতাস বইছে। উষ্ণ বাতাস। বাতাসে লেগে আছে তাপ। এমন বাতাস মরুভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যায়। বহু যুগ আগে হয়তো এখানে ছিল এক মরুভূমি! বেদুইনদের ক্ষিপ্র পদক্ষেপে বালি উড়ত এখানে। তাপ লেগে থাকা উষ্ণ বাতাস বয়ে যেত মরুতলের ওপর দিয়ে। এখন সেই মরুভূমি নেই। কিন্তু এখনও রয়ে গেছে সেই মরু-বাতাস!

: আমরা এখন ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি বলো তো?

: আমরা তো দাঁড়িয়ে নেই।

: তাহলে কি আমরা হাঁটছি?

: জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় পর্ব— হাঁটা। হাঁটা মানেই তো কোনো এক গন্তব্য! এখন প্রশ্ন, কোথায় সেই গহিন গন্তব্য-বলয়?

: আমরা কি গন্তব্য হারিয়ে ফেলেছি?

: আমাদের কি এমন কোনো গন্তব্য ছিল, যা হারিয়ে গেছে?

: হয়তো ছিল এক ধ্রুব-গন্তব্য! ছিল এক দিক, এক দিশা!

: কিংবা ছিল শুধুই এক মেঘচিহ্ন!

: চিহ্ন! চিহ্নটাই রয়ে যায়।

: শেষ অবধি চিহ্নটাও থাকে না। চিহ্নটা মুছে গিয়ে রয়ে যায় একটা ক্ষত।

: ক্ষতটা মোছে না!

: ঠিক। ক্ষতটা মোছে না সময়ের বুক থেকে, মানুষের মন থেকেও না।

: এই ক্ষত ধারণ করে রাখার জন্য আমরা কি আমাদের মনটাকে অনেক আগেই মজবুত ধাতবে নির্মাণ করে নিয়েছিলাম?

: তুমি খুব সুন্দর করে ‘নির্মাণ’ শব্দটা উচ্চারণ করলে। শব্দটাকে আমরা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারছি না, তাই-না!

: আমরা কি আমাদের সেই মনটাকে আজ আর ছুঁয়ে দেখতে চাই না?

: কী পদ্ধতিতে আমরা আমাদের জীবন, আমাদের সময়, আমাদের চারপাশ, এবং আমাদের সেই মনটাকে নির্মাণ করেছিলাম, তা তোমার মনে পড়ে?

: মনে পড়া— মানে স্মৃতি!… তা যদি বলো, তাহলে বলতে হয়, হ্যাঁ, কিছু স্মৃতি সংগ্রহে আছে বটে; বহু কষ্টে, চেষ্টায় আগলে রেখেছি। বলতে পারো, লুঠ হবার ভয়ে ভরে রেখেছি গুপ্ত সিন্দুকে।

: খুব দামি একটা কথা বললে— এটা আমিও অনুভব করছি যে, একটু একটু করে আমার স্মৃতি লুঠ হয়ে যাচ্ছে। আমি প্রতিহত করতে পারছি না লুঠেরাদের। বুঝতে পারছি, ক্রমশ গরিব হয়ে যাচ্ছি আমি।… একটা গুপ্ত সিন্দুক আমাকেও সংগ্রহ করতে হবে, এখনও রয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে আগলে রাখতে।

: লুঠেরাদের চিনতে পারছ তুমি?

: হ্যাঁ, সবাইকে চিনি আমি। আমার প্রত্যেকটা সাফল্যকে যারা সবচেয়ে আগে কুর্ণিশ জানায়, আমার প্রত্যেকটা দুঃখের ওপর যারা মাখিয়ে দেয় সান্ত্বনার প্রলেপ, যারা উৎসাহের উষ্ণতা দেয় আমার প্রত্যেকটা ব্যর্থতার গায়ে, আমার প্রত্যেকটা ভুলকে যারা স্বীকৃতি জানায় ভবিষ্যতের আগাম পন্থা বলে, আমার প্রত্যেকটা বিপন্নতাকে যারা মুছে দেয় সাহস যুগিয়ে, তারাই একটু একটু করে লুঠে নিচ্ছে আমার মহার্ঘ স্মৃতিগুলো।

: সেই চিহ্নটা আবার ফিরে আসছে— যাকে ‘গন্তব্য’, কিংবা ‘দিক’, বা ‘দিশা’, যা-ই বলো! মানুষ যত সেদিকে এগোয়, ততই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় তার প্রতিপক্ষরা। অধিকাংশ সময়েই সাফল্যের নেশায় ও দৌড়ানোর ক্লান্তিতে সে চিনতে পারে না, তারা কে কাছের, কে দূরের‌।

: আসলে কিছু মানুষ, কিংবা হয়তো সব মানুষই, তার গন্তব্যটা নির্ধারণ করতে পারে না— দিক খুঁজে পায় না চলার পথে— দিশা হারিয়ে ফেলে হাঁটতে-হাঁটতে। বুঝতেই পারে না, একটা মেঘচিহ্নকে খোঁজার চেষ্টায় তার জন্য বরাদ্দ সময়টাকে সে ক্রমশ ক্ষয় করে ফেলছে তার নিজের হাতে। গন্তব্য, দিক, দিশা বলে সম্ভবত কিছু হয় না! এটা নিছকই এক অলীক মাইলস্টোন, যার পরেও অনন্ত হাঁটাপথ।

বাতাস থেমে গেছে। ভুল বলা হল— থামেনি, অন্য ধারায় বইছে। অচেনা ধারায় বয়ে চলা এ-বাতাস এক অদৃশ্য বর্ণ বহন করে— এই জাফরানি-বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছি আমি। ত্বকের ওপর এমন এক অনুভূতি হচ্ছে, যা আগে কখনো হয়নি বলেই মনে হয়।

এখন আমি যদি জিজ্ঞাসা করি, কীসের গন্ধ বলো তো?

তুমি হয়তো বলবে, বারুদের।

সম্ভবত আমি তখন হতাশ হব; বলব, ইস, দেখেছ, এই চেনা গন্ধটাও আমি বুঝতে পারিনি!

বুঝতে না-পারার ব্যর্থতা থেকে বোধহয় আমি তখন চুপ হয়ে যাব। আমার নীরবতা নিশ্চুপ করে দেবে তোমাকেও। থেমে যাবে আমাদের যাবতীয় বিশুদ্ধ আলাপন।… ভুল বলা হল, থামা নয়— অসমাপ্ত রইবে। ‘থামা’ শব্দটা ভালো নয়, ‘অসমাপ্ত’ কথাটার মধ্যে একটা সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, যার রং সোনালি। সোনালি সম্ভাবনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে আরও তিনটি শব্দ— ক্ষমতা, আধিপত্য, এবং প্রেম।

বড়ো রহস্যময় এই শেষ শব্দটি! এটা নাকি প্রাণীদেহের এক বিশেষ অনুভূতি, যা মস্তিষ্কের গোপন অন্ধকারে ছড়িয়ে থাকা সূক্ষ্ম কোষের ভেতর অবিরত বয়ে চলা লাল রক্তে মিশিয়ে দেয় সাদা কুয়াশা। মনোবিকারের তা নাকি এক চূড়ান্ত পর্ব!

প্রেমকে বরং বাদ দেওয়া যাক। এই মহাপৃথিবীতে কত যুদ্ধ হয়ে গেছে প্রেমকে কেন্দ্র করে, আর যুদ্ধ মানেই তো বারুদ!… বারুদের গন্ধ বাতাস বইতে পারে না— আমরা, স্বপ্নবাহী নীল মানুষেরা ‘ক্ষমতা’ আর ‘আধিপত্য’ শব্দ দুটোকে বহন করতে-করতে এটা তো খানিকটা বুঝেছি— কী বলো?

প্রথম পাতা

Spread the love
By Editor Editor গল্প 3 Comments

3 Comments

  • ভাল গল্পটি।।। ডায়‌লগে গল্প লেখা খুব‌ই কঠিন।। ।।।।।।।।।।।।

    তীর্থঙ্কর নন্দী,
  • দুর্দান্ত. সময়ের অবয়বহীনতাকে কী আশ্চর্য নিস্পৃহ ভঙ্গিতে ধারণ করেছে লেখাটি !

    শতদল মিত্র,
  • ভালোবাসা গল্পকার! শুধুই ভালোবাসা।

    Mrinmoy Das,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *