Categories
আত্মপ্রকাশ সংখ্যা গল্প

শুভংকর গুহর গল্প

লেনিন

কিছুটা এগিয়ে গেলে, বাঁ দিকে সামান্য বাঁক নিলে, হাটখোলার মোড়। স্থায়ী দোকানপাট। ঝিমানো। কখনও কখনও লোকজন আর টুকটুকি অটো আর ক্লান্ত বিষণ্ণ রাতজাগা গরুযান। আরও একটু এগিয়ে গেলে পাকা রাস্তা। হাইরোড। বাস স্ট্যান্ড। শত প্রাচীন একটি নিম গাছ। নিম গাছের নীচে কুড়িয়ে নেওয়া পাথরের থান, সিন্দুরের বৈভব ছড়ানো, তেলচিটে। পাশে মাটির পুতুলের দোকান। বাসযাত্রীরা বাসে ওঠা ও নামার আগে মাটির পুতুলের দোকানের দিকে একবার তাকাবে, কেউ কেউ পুতুলের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াবে। পরের পর কাঠের পাটাতনের ওপরে সারি সারি মাটির পুতুল। কত ধরনের পুতুল।
লাঙল কাঁধে চাষি। একতারা, ভগভগি হাতে নিয়ে গান গাইছে বাউল। মাঝি নৌকা বাইছে, জেলে মাছ ধরছে, ফচকে অভিনেতা ঠোঁটে সিগারেট চেপে ভঙ্গি দিচ্ছে, আইসক্রিমওয়ালা ও তার গাড়ি, ঝাড়ুদার। হুঁকো টানছে বুড়ো। ফেরিওয়ালা। সাপুড়িয়া সাপ খেলা দেখাচ্ছে। ফুটবল খেলোয়াড়। ফল-ফুল-পাখি। রাধাকৃষ্ণ। কালীয়দমন। চৈতন্যদেব। ক্ষুদিরাম। রবিঠাকুর। আদিবাসী রমণী। সাইকেলচারি। সৈনিক। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রুশ বিপ্লবের নায়ক লেনিন, একটু আড়ালে। দেশের বামপন্থা এখন ডানপন্থী। আরও কত পুতুল। সব চরিত্রের পুতুল মিলেমিশে একাকার।
বাস থেকে নেমেই অনেক যাত্রী পুতুলওয়ালার কাছে এদিক সেই দিকের ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে পুতুলের মোহে পড়ে যায়। অনেকেই যারা প্রথমবার আসে তারা পুতুল কিনে নিয়ে যায়। এখনও মানুষের পুতুলের প্রতি মোহ ও আগ্রহ কী গভীর। দোকানটির সামনে কিছুক্ষণ না দাঁড়ালে বিশ্বাস হতে চায় না। আজকাল স্মার্ট ফোন মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। পুতুলওয়ালাকে অনেকেই লোভ দেখিয়েছে। ভারি সুন্দর প্লাস্টিকের ও রবারের পুতুলের কথা বলে, দ্বিগুণ লাভের কথাও বলেছে, কিন্তু জগন্নাথ মাটি থেকে সরেনি। মানুষ যদি মনের মতন না হয়, আর পুতুল যদি মাটির না হয় তাহলে মানুষের সঙ্গে কীসের সখ্য ও দোকানদারি।
একদিন দুপুরে, ঝোলা কাঁধে অতি সাধারণ, জামা প্যান্ট পড়ে একজন যুবক বাস থেকে নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পুতলের দোকানটিকে খুঁটিয়ে দেখছিল। থুতনির নীচে ফ্রেঞ্চকাট। কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা থেকে কয়েকটি গ্রন্থের প্রচ্ছদ উঁকি দিচ্ছে। পুতুলগুলি মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে, পুতুলের দোকানদারকে প্রশ্ন করল—
আপনার দোকান?
আজ্ঞে হ্যাঁ। কেন?
মানে আপনারই দোকান তো? আপনিই মালিক?
আপনি কি আমার দোকান নতুন দেখছেন? আমার দোকান বহু বছরের পুরানো।
এখন নিশ্চিত হলাম আপনি নূতন গ্রামের।
নূতন নয়। বলুন নতুন। নতুন গ্রামের। কোথায় যাবেন আপনি?
প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে যাব।
গ্রামে তিনজন প্রধান শিক্ষক আছেন।
যুবকটি তার ঝোলার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে কি যেন দেখল বার কয়েক। ঢোক গিলে তারপরে দম নিল। পুতুল বিক্রেতার প্রতি তাকাল এমন যেন, নাম? সে তো অনেক নামই মনে আসছে। কোনজনের নাম বলি বলুন তো?
পুতুল বিক্রেতা প্রশ্নের উত্তরকে সহজ করে তোলার জন্য, বলল— নতুন গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় এক নং ও দুই নং শাখা আছে। দুটি শাখার দুইজন প্রধান শিক্ষক। আর আছেন কর্মরত তিনি নতুন গ্রাম রাধাচরণ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আর অন্যজন অবসরপ্রাপ্ত। অবসরপ্রাপ্ত যিনি তাঁকে ধরলে মোট চারজন প্রধান শিক্ষক। তিনজন বর্তমান এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত, বেঁচে থেকেও অতীত হলেও শিক্ষক শিক্ষকই থাকেন। তাঁর জাত বদল হয় না।
যুবকটি বলল— গোটা দুনিয়াতে শিক্ষকের অতীত বর্তমান হয় না। অবসর গ্রহণ করলেও তিনি শিক্ষকই থেকে যান। শিক্ষকজীবনের হাফ টাইম নেই।
আপনি কার কাছে যাবেন? তবে বিষ্ণুকান্তি লাহিড়ীর ঠিকানাই অনেকে জানতে চান। তিনিই অবসরপ্রাপ্ত। আপনি কি তাঁর কাছেই যাবেন?
যুবকটি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। উৎসাহিত হয়ে বলল— আপনি ঠিকই বলেছেন। ওনার কাছেই যাব।
তিনি খুবই জনপ্রিয়। অবসর গ্রহণ করলে কী হবে?
আপনি নূতনকে সংশোধন করে, যখন নতুন বললেন, আমি তখনই বুঝতে পেরেছি, আপনি সঠিক সন্ধান দিতে পারবেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
সেই কবে থেকেই নতুন গ্রাম। আর কোনোদিন পুরাতন হল না। আসলে এই নতুন নামে কয়েক শত গ্রাম আছে। যা কোনোদিন পুরাতন হয় না। কাজেই জন্মের পর থেকেই আমরা নতুন গ্রামের গ্রামবাসী। আমার পিতৃদেব এই নতুন গ্রামের পুতুল বিক্রেতা ছিলেন। বংশানুক্রমে আমরা পুতুল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। আমার পিতৃদেব তিনি স্বর্গলাভ করেছেন। এখন আমিই দোকান সামলাই। কত গ্রামবাসীর কত পেশার পরিবর্তন হয়ে গেল, কিন্তু আমরা সেই মাটির পুতুল নিয়েই পড়ে রইলাম।
যুবকটি বলল— আমার পিতৃদেবও এই সড়ক ধরেই চম্পকনগরের হাই স্কুলে পড়াতে যেতেন। আপনাদের পুতুলের দোকান থেকেই তিনি অনেক পুতুল কিনেছিলেন। তার মধ্যে ননী হাতে গোপাল যেমন আছে। বাউল, শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ। লেনিন। সাপুড়িয়া। আরও নানারকম। অনেকরকম। অনেক পুতুল ভেঙে গেছে। তার মধ্যে লেনিন আমার বইয়ের তাকে এখনও আছেন। সেখানে মায়ের গানের ডায়েরিও আছে। মা গান গাইতেন। মায়ের ডায়েরিতে অনেক গান লেখা আছে। একটি গানের দলের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে বিচরণ করতেন। গান গাইতেন। এখনও খুব বৃষ্টি পড়লে মাঠে যেমন জল জমে থাকে, সেই জলের ছায়াতে আজও মায়ের চলমান ছায়া দেখি। মা আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুলে ভেদী অনশন… গাইতেন। মা উদাত্ত কণ্ঠে গান গাইতেন। ভেদী অনশন মৃত্যু তুষার তুফান… মায়ের ঠিক পিছনে বিশ্বম্ভরকাকু হারমনিয়মের রিড ধরে আরও উচ্ছ্বাসে যোগ করতেন… প্রতি নগর হতে গ্রামাঞ্চল… কী সব দিন ছিল হিল্লোরি হিল্লোরি, আহা কী সব গান বাঁধা হতো। মায়ের সেই গানের ডায়েরির পাশে লেনিন এখনও আছেন। কয়েকজন আমার বাড়িতে আসেন, তারা আমার বইয়ের তাকে লেনিনকে আড়চোখে দেখেন। আমি বুঝতে পারি। এই মাটির পুতুল লেনিন রাজনৈতিক বিভেদের শিকার। আবার কয়েকজন যারা আসেন, তারা বিনম্র কণ্ঠে বলেন, অনেকদিন ধরে লেনিন তোমার বাড়িতে? আমিও ওনাদের বলি—
অনেকদিন নয়, বহু বছর ধরে।
পুতুলের দোকানদার হাসল। কী বলবে তাই ভাবছিল। অনেক কথাই মনে আসছে। কোনটা ছেড়ে কোন কথা বলবে তাই ভাবছিল। বহু বছরের পুরানো দোকান। কত কিছু দেখেছে সে। একসময় খড়খালির মাঠে কত বড়ো বড়ো জনসভা হতো। সভার শেষে কাতারে কাতারে মানুষ আসতো বাস স্ট্যান্ডে। এই নিমগাছের নীচে। তখন কী চাহিদা ছিল লেনিনের মাটির পুতুলের। লেনিন দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। হাত তুলে নিশানা করছেন শত্রু শিবির। আর কিছু হাফ বাস্ক পুতুল। থুতনির নীচে জেদি দৃপ্ত ফ্রেঞ্চ কাট। একের পর এক দল আসতো আর পছন্দ করে লেনিন নিয়ে যেত। মাঠ দিগন্ত রাস্তা ঘাট লাল হয়ে থাকত পতাকায়। লাউড স্পিকারে গান বাজত… কারা মোর ঘর ভেঙেছে স্মরণ আছে… চেতনায় হানছে আঘাত… দিনকালের বদল হয়েছে। এখন লেনিনের পুতুল বিক্রি হয় কম। চাহিদা থাকলেও মানুষ ঘরে রাখতে ভয় পায়। প্রকাশ্যে না রেখে আড়ালে রাখে কেউ কেউ। দোকানদার নিজের মেজাজের বদল আনার জন্য, টানা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল—
এইদিকে আসুন। এইখানে দাঁড়ান। ওই যে বাবলা গাছটি দেখছেন পাশ দিয়ে তাকান। ঠিক মাঠের ওপর দিয়ে দেখুন। একটি হলুদ রঙের বাড়ি দেখতে পাচ্ছেন? ওই হলুদ রঙের বাড়িটির পাশে মজে যাওয়া ইট রঙের বাড়ি আছে। একেবারে ধারে তিন আনি ফালি খাল। খালের ধারে গাছ-গাছালির পরিবেশ। সেখানে বাগান, বাগানের শেষে বিদ্যালয়। ওই বিদ্যালয়ের বিস্তৃত প্রাঙ্গণের দক্ষিণ পূর্ব কোণে অবসরপ্রাপ্ত হেড স্যার বিষ্ণুকান্তি লাহিড়ীর বাড়ি।
আপনি দেখছি মুখস্থ রেখে বলে গেলেন,
অভ্যাস হয়ে গেছে। ভালো মানুষের ঠিকানা অভ্যাসে রাখতে হয়।
আপনি যেভাবে বললেন, মনে হচ্ছে হলুদ বাড়িটির কাছে গেলেই চিনতে কোনোরকম অসুবিধা হবে না।
হ্যাঁ। তা হবে না। ঠিক বলেছেন আপনি। হেড স্যারের কাছে কাজ আছে বুঝি? ভালো মানুষের আসন সবখানেই পাতা থাকে। কত মানুষ আসেন ওনার সঙ্গে দেখা করতে। অনেক দূর থেকে। আমার দোকানের পুতুল যেমন বহু দূরের গ্রামে ছড়ানো, তেমনি হেড স্যারের খ্যাতি। বড়ো ভালো মানুষ তিনি। এই প্রথম এলেন, না আগেই পরিচয় আছে?
আছে আবার নেইও বলতে পারেন।
সেটি কেমন?
সব পরিচয়ের একটি সূত্র চাই। আমার সঙ্গে না হলেও আমার পিতৃদেবের সঙ্গে ওনার গভীর সখ্য ছিল। ওনার কিছু গ্রন্থ বাবার কাছে গচ্ছিত ছিল। বাবাকে উনি পড়তে দিয়েছিলেন। সেই গ্রন্থগুলি আমার ঝোলাতে আছে। ফেরত দিতে এসেছি।
আমি সামান্য পুতুলের কারিগর। পুতুলের দোকানদার। তবে মাটির পুতুল গড়তে গড়তে এটি বুঝেছি, কাজের মধ্য দিয়েই হোক বা যোগাযোগের মাধ্যমে, সব পরিচয়ের মধ্যেই আপনজন বা বিশেষজন থাকেন, হয়তো কোনো উপকরণ, সম্পর্ক বা মনের টান, কর্ম বা স্মৃতি অথবা নির্দিষ্ট প্রয়োজন।
ঠিক আপনার সঙ্গে যেমন মাটির পুতুলের।
পুতুল গড়ে দোকানে নিয়ে আসি বিক্রির জন্য। কেনা বেচাই হল মানব সভ্যতার এক বাস্তব নিয়তি। তা যদি মাটির পুতুল হয়, বা মাস্টারমশাইদের শিক্ষা প্রদান, শত শত কিছু— আমি কিছু তোমাকে দেব বিনিময়ে আমাকে কিছু দাও… এই তো, বাকিটুকু আমাদের আদর্শবোধ এবং চলমান জীবন।
আপনার কথন যে আমাকে বিবশ করে দিচ্ছে।
কোনো কথা না বলে, মুখে কোনো শব্দ না করে পুতুল গড়ি, গড়তে গড়তে অনেক কথা বলি।
পুতুলের দোকানদার এবার কিছুক্ষণ থেমে দুপুরের চুপুর থেকে ফিরতি বাসটির দিকে তাকিয়ে দেখল কেউ দোকানের দিকে আসছে কি না? চম্পক নগরের প্রথম ফেরতা বাসটি চলে গেছে। কয়েকজন মাত্র যাত্রী চুপুরের বাসটি থেকে নামল। সকাল থেকে টানা ব্যস্ততার মাঝে ঝিমানো দুপুর, হঠাৎ সমস্বরের শব্দ, জোরালো। কেন জানি হুমকি ও কম্পনের শব্দ। একটি স্বৈরাচারি আস্ফালনের সঙ্গে এগিয়ে আসা সন্ত্রাস। দোকানদার ভীত হয়ে—
শুনতে পাচ্ছেন, সমস্বরের হুমকি?
শাসকদলের।
সময়ের ঘাত প্রতিঘাতে একটি নিয়তি বা পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা। আমার দোকানে লেনিনের পুতুল খুব সামলে বিক্কির করি। কয়েকবার এমনই মিছিল থেকেই হুমকি দিয়ে গেছে। আমি পরোয়া করিনি। শুধু একবার বলে ছিলাম, অনেকেই বাড়িতে ভালোবেসে নিয়ে যায়, তাই রাখি।
স্বৈরাচারি আস্ফালন পুতুলের দোকানের দিকেই এগিয়ে আসছে। ক্রমশ হুমকির সঙ্গে জোরালো অকথ্য আর সময়ের ঘাত প্রতিঘাতের প্রতি আঘাত। মাঝের কাঠের তাকে রাখা লেনিনের পুতুলটিকে লাঙল কাঁধে চাষি মাটির পুতুলের আড়ালে সরিয়ে দিয়ে বলল—
ভাববেন না আমি ভীত। এর আগে কয়েকবার হুমকি দিয়ে গেছে। দোকানে ঢুকে চোখের সামনে ভেঙে ফেললে খুবই দুঃখ পাব। সেই জন্যই। লেনিনের পুতুলের সঙ্গে আমার এবং আমার বাবার ইতিহাস জড়িয়ে আছে। শত শাসানি ও হুমকি সত্ত্বেও আমরা বহু বহু বছর ধরে লেনিনের পুতুল বিক্রি করে যাচ্ছি।
আপনার আয়োজনের কথা বলুন?
বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। হেড স্যারের বাড়িতে যাবেন না?
আপনার সঙ্গে কথা বলতে বেশ লাগছে। ভাবলাম আপনার আয়োজনের কথা জেনে নিই।
খুবই সাধারণ। পুতুল গড়া আর বিক্কির করাই হল আমার নিয়তি। তিন আনি খালের অনেক সংস্কার হয়েছে। তাই খালের পার থেকে মাটি তুলতে গেলে অনেক বিধি নিষেধ এসেছে। মাটি এমনি এমনি তোলা যায় না। অনুমতি নিতে হয়। আগে পিতৃদেবের আমলে এইসব নিয়ম ছিল না। মাটি তুলে ঘরে আনতে হয়। তারপরে মাটির চরিত্রকে নম্র করতে হয়। যাতে আঙ্গুলের বাজনার সঙ্গে সঙ্গে পুতুল আদল পায়। অধিকাংশ পুতুলের ছাঁচ আছে। আবার কিছু পুতুলের নতুন আদল কল্পনা করতে হয়। বয়সে প্রবীণ যারা তারা দেবদেবীর মূর্তি বেশি পছন্দ করেন। আর বয়সে যারা একেবারেই কাঁচা তারা ফল-পাখি-মাছ-ফুল-বেড়াল এই সব বেশি পছন্দ করে। পুতুলের রঙের কল্পনা বাস্তবের সঙ্গে মিল রেখে করতে হয়। দোকানে আনার আগে পুতুলকে ভালো করে পালিশ করে নিতে হয়। দিনকালের বদল হয়েছে। মানুষ বড়ো বেশি চকচকে পচন্দ করে।
আপনি নিজেই কারিগর আবার নিজেই দোকানদার।
আপনার কথার অর্থ ঠিক বুঝতে পারলাম না।
আপনি নিজেই যখন কারিগর?
সেটিই আমার অভিশাপ।
কেন? অভিশাপ কেন বললেন?
আমি পুতুল তৈরি ও বিক্রি ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানি না। কত গ্রামবাসী, কত মানুষ কতরকম কাজ করে জীবিকা অর্জন করছে। আমি সে একই থেকে গেলাম। পিতৃদেবের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। পুতুলের দোকান আমাদের স্থিরতা দিয়েছে। কিন্তু উপায় অর্জনের স্থায়িত্ব্ব দেয়নি। ওই দেখুন বেলা পড়ে আসছে। মা মনসা, তারা মা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সবাই ধান মাঠের আল ভেঙ্গে আস্তানায় ফিরে যাচ্ছে। মধ্য বেলার আলো নরম হয়ে এল। ভিক্ষে করে মা জননী ফিরে যাচ্ছে। জয় বাবা তারকনাথের সেবা লাগে। শ্রাবণ আসছে। মেঘের মধ্যে ভারি রং বসেছে। দেখে মনে হচ্ছে শেষ আষাঢ়ে মেঘ ও ভূমির ভালো আয় হয়েছে। আমার কী হল? সকাল থেকে বসে আছি, একটাও পুতুল বিক্রি হল না। এমনই এক এক দিন যায় আমার। অথচ দেখুন দোকানের সাইন বোর্ডের ওপর থেকে রোদ সরে গিয়ে হাটতলার মোড়ে সরে গেল।
যুবকটি তাকিয়ে দেখল সাইন বোর্ডে লেখা আছে “মাটির পুতুল”। নিচে লেখা হাটখোলা হাই রোড, নতুন গ্রাম। একেবারে নিচে লেখা আছে— প্রযত্নে জগন্নাথ পাল।
সেকি? একটিও পুতুল নয়?
আগের মানুষ কি আর আছে? পুতুল কেনার সঙ্গে মানুষের মনের আবেগ থাকে। আপনি বলছিলেন না বিষ্ণুকান্তি হেডস্যারের বাড়িতে যাবেন? আর কখন যাবেন?
যুবকের নিজের গ্রামের বাড়িতে পোস্টম্যান জানালা দিয়ে পোস্টকার্ড ফেলে গেল। পোস্ট কার্ডের ওপরে ঠিকানায় লেখা আছে অবলোকন গোস্বামী।
হাইরোডের ওপরে যান বাহনের হর্ন, দূরগামী বাসের চলে যাওয়ার দৃশ্য যেন শুকনো বাঁশ পাতার চুপ পতন। শোনা যাচ্ছে আবার সমস্বরের ধ্বনি। ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে হুমকি। ধানমাঠে দুই কৃষক বালক পরস্পর কাদা ছুঁড়ছে। আর খিল খিল সশব্দে হাসছে। লাঙ্গল নিয়ে ফিরে যাচ্ছে মাঠ কর্মী। আকাশের এক কোণে কালো মেঘ। গর্জন করছে। বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছে। নতুন সংকেত আবার… পুতুলওয়ালা কিসের যেন ইঙ্গিত পেল। দোকানের অন্দরে ঢুকে তিন চারটি লেনিনের নানান ভঙ্গির পুতুলগুলিকে একেবারে সামনে রাখল। দোকানের সামনে বাস্তব ছায়া। তিন-চারজন। বাসের অপেক্ষায় আর না থেকে পায়ে পায়ে দোকানের সামনে। একজন ক্রেতা বলল—
ভালো করে প্যাক করে দেবেন। চুপুরের পথ। অনেক দূর।
দোকানদার জগন্নাথ পাল বলল— কোনো চিন্তা নেই, আমি খড় দিয়ে প্যাক করে দিয়েছি।
অবলোকন গোস্বামী দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করল— লেনিন…লেনিন…লেনিন…

5 replies on “শুভংকর গুহর গল্প”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *