লেখক নয় , লেখাই মূলধন

শুভদীপ ঘোষের গল্প

শীতঘুম

বাপ ঠাকুরদার ঠিকুজি কোষ্ঠী নিয়ে ভারত সরকারের পার্লামেন্টে আনা যে-বিলটা তুমুল বাক্বিতণ্ডার পর অবশেষে পাস হয়ে গেল সেই নিয়ে অনিমেষদের তর্কাতর্কির শেষ ছিল না। গোবলয়ের হিন্দুত্ব, রাডিক্যাল ইসলাম, ভারতবর্ষের পেরিনিয়াল হিন্দু মুসলমান সমস্যা এইসব নিয়ে দুপুরের খাওয়ার টেবিল গরম হয়ে থাকত। একটা ছোটোখাটো গ্রুপ ছিল অনিদের, যাবতীয় প্রলোভন, যুগের মুদ্রাদোষ এইসবের পরেও মাথার কিছু জায়গা খালি থাকত কিংবা বলা যেতে পারে জিনগত ত্রুটির কারণে এইসব অর্বাচীন ব্যাপার নিয়ে সময় নষ্ট করার বদভ্যাস ছিল ওদের। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও ক্রমপাতনশীল অর্থনীতি না কি হিন্দু মুসলমান সমস্যা কোনটা আসল কোনটা বানানো, কোনটা অগ্রাধিকার যোগ্য কোনটা তুচ্ছ, হ্যাঁ বেশ মনে আছে সেই সময় খুব কথা হত এইসব নিয়ে। কিন্তু পরা-বাস্তবতার আভাস সে-সময় বাতাসে একটা কোথাও ছিলই! অনি এসে খাওয়ার টেবিলে সোমকে বলে ‘ব্যাপার মোটেই সুবিধের নয়, অলরেডি ইউরোপ ইনফেক্টেড, ইরান, ইতালি, চীন তো আছেই, এখন শুধু পায়ের নীচের গলিগুলো দিয়ে এখানে ছড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষা, সেটা হলে কিন্তু আমাদের কমপ্লিট মারা যাবে!’ চারপাশে তাকিয়ে হাতের ভঙ্গিতে দেখায় অনি। নকশাল পন্থী যে-দলটা মার্কসবাদী লেনিনবাদী নামে পার্লামেন্টের রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত থেকে যায় সোমের বাবা সেই পার্টির হোল টাইমার ছিল। অফিসে এসেছে থেকে অনি দেখেছে সোমও যে-কোনো ব্যাপারে সেই পার্টির ব্যাখ্যাটাই আগে দিত। কিন্তু বিগত এক-দু-বছরে এর পরিবর্তন ঘটেছে। ব্যক্তিগত কোনো কারণ থাকতে পারে এবং তা হয়তো এমনই যে, তাতে ব্যক্তিগতও হয়ে যেতে পারত, তাই এই পরিবর্তন। এইসব ঠিকই ছিল, ছেচল্লিশের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ও তৎপরবর্তী দাঙ্গা, চরম-নরমপন্থী কংগ্রেস, শক্তির সমতুল্যতা এই পর্যন্তও চলছিল, কিন্তু গৈরিক ভারতবর্ষের একপেশে ধারণা নিয়ে একবার তুমুল বাক্বিতণ্ডার পর থেকে অনিরা সোমেশ্বর ওরফে সোমের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা একটু বুঝেশুঝে করত। ‘আমাদের এখানে তো তেমন প্রভাব পড়বে না বলছে, ওয়েদারের জন্য’— পাশের টেবিল থেকে গলা ভেসে আসে। অনিরা যেখানে খাওয়া দাওয়া করে সেটা ওদের অফিস কমপ্লেক্সের কমনগ্রাউন্ড, ওরা কয়েকদিন ধরেই লক্ষ করেছে অনেকেরই মুখে মাস্ক দেখা যাচ্ছে। অতনুর অফিস পাশেই। অতনুও মাঝে মাঝে খেতে আসে ওদের সঙ্গে, বিকেলে চা খেতে বেরিয়ে প্রতিদিন দেখা হয়। সেদিন চা খেতে বেরিয়েও ওই একই ছবি।

এর হপ্তা তিনেক পর। বিকেলের শেষ সূর্যের আলোয় অনিমেষ অফিস থেকে সময়ের আগে বেড়িয়ে পড়ে। অতনুর কাউনসেলর বলেছিল রিপ্রেশন নির্জ্ঞানে রূপান্তরিত হয়। এমন কোনো ইচ্ছে যা অবদমিত কিন্তু আপনাকে মাঝে মাঝেই পীড়ন করছে। মানুষের সেইসব শারীরিক ও মানসিক অভিজ্ঞতা না কি অতিদ্বেষাত্মক। নন্দনচর্চার কথা শুনে অনিকে ওই ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘সব কিছুর শেষে দেখবেন একজন কবি বসে থাকেন’, ওঁর কথা নয়। অবাধ যোগসাজশ যদিও বলা যাবে না মানে যাকে ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন বলে, তবে অতনু বলেছিল মালটা পাক্কা চালিয়াত। অফিসপাড়ার মোড় থেকে ট্যাক্সি নিতে নিতে অনির মনে পড়ছিল এই কথাগুলো। সকালবেলা ফোন করে অতনু খবর দেয়, ওদের দলের নাটক আছে সন্ধ্যেবেলা দক্ষিণ কলকাতার একটি হলে। গোড়ার দিকে অনি সব ফ্রি পাসেই দেখতে যেত। কিন্তু ইদানীং অতনু দিনক্ষণ বলে দেয়, অনি টিকিট কেটে যায়। ওই দিন একটু দোনোমনা করে মোবাইল থেকে টিকিট কাটার সময় অনি দেখে পেছন দিকের দুটো রো মাঝখান থেকে ফাঁকা পড়ে আছে। অনি মাঝামাঝি দেখে দু-দিক থেকে আট নটা চেয়ার ছেড়ে একটা টিকিট কাটে। রুপা আসতে পারবে না, ওঁর এক পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাবে এরকমই জানিয়েছিল। অনি ট্যাক্সি থেকে নেমে দেখে লোক সব ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে মনে হয়, দু-চারজন যারা বাইরে ঘোরাঘুরি করছে তাদের দেখে রুমাল বের করে মুখে বেঁধে নেয়। হলে অর্ধেকেরও কম লোক, দু-দিকে সিট ফাঁকাই পড়েছিল। নাটক শুরু হওয়ার একটু আগে বাঁ-দিকের শেষ ফাঁকা সিটটায় একজন ভদ্রমহিলা এসে বসেন, মুখ মাস্কে ঢাকা। প্রায়ান্ধকারে বেশ কয়েকবার ওনার সঙ্গে চোখাচোখি হয় অনির। আলো সম্পূর্ণ নিভে যাওয়া ও মঞ্চের পর্দা উত্তোলনের মধ্যে অনি টের পায় ওনার পাশে এসে লোক বসেছে। ব্লাউজের উপরের দুটো হুক খোলা রেণু, যে-দৃশ্যে গলাকাটা ছাগলের মুণ্ডুর মতো ছটফট করতে করতে বিজন ওরফে অতনুকে বলছে, ‘নিক, নিয়ে যাক। আমার আসবাবপত্র সব বিক্রি করে টাকা নিয়ে নিক ওরা!’ অনির মনে হয়েছিল এবার এই ধরনের চরিত্রে অতনুর অভিনয় বন্ধ করাই ভালো। রুবিকে, সাগরিকা হোটেলের ছাদ থেকে আগের একটি নাটকে যে-দৃশ্যে অতনু মিলোনন্মত্ত বানের শব্দ শোনাচ্ছে, সেই একই অভিব্যক্তি আবারও দেখা গেল এই দৃশ্যে। মানুষ কতদূর পর্যন্ত নীতি মেনে চলবে! নৈতিকতা তাকে যতটা অ্যালাউ করবে ততটাই তো! কিন্তু এর কী শ্রেণি নির্বিশেষে কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে! সমস্ত মানসিক সমস্যার একটা মূল জায়গা দেখা যায় ভালোবাসার অভাব। ভালোবাসা নীতি নৈতিকতা মেনে চলে কিন্তু তার রেপ্রেসিভ আউটকাম আছে। এই রেপ্রেসন না থাকলে কিনশিপ তৈরি হত কী! যৌনপ্রেম সভ্যতার কোন পর্যায়ে থাকত তাহলে এতদিনে, কোন পর্যায়েই-বা এখন আছে কেউ কী হলফ করে বলতে পারে! অনি অতনুকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোর এক্স্যাক্ট অসুবিধেটা কী হয়?’ অতনু পরিষ্কার বলতে পারেনি। অনুমানে অনি বুঝেছিল দীর্ঘক্ষণ গুম মেরে থাকাটা সম্ভবত ওর একটা মানিফেসটেশান। বিরতির আলো জ্বলার পর অনি তাকিয়ে দেখে ভদ্রমহিলা একা বসে আছেন। এরপর আর কারো আসা টের পায়নি অনি। সো-এর পর গ্রিনরুমে যায় অনি। ভালোলাগা, খারাপলাগা, এরম এলোমেলো কিছু কথার মাঝখানে অতনু হঠাৎ অনিকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোর বিমলদাকে মনে আছে?’ অনি ভুরু কুঁচকে একটু ভেবে বলে, ‘বিমলদা! মানে, গোর্কির বিমলদা! অবশ্যই মনে আছে, কেন কী ব্যাপার?’ ‘সো-এর আগে ফোন করেছিলেন, ব্যস্ত আছি শুনে ফোন কেটে দিলেন, করে দেখব পরে আবার’। বিমলদার স্মৃতি রোমন্থনের তেমন সুযোগ সেদিন পায়নি অনিরা, আচমকা ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় সবাই তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়ে, ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা ক্রস করে উলটো পাড়ে যাওয়ার সময় সেই মহিলাকে অনি অতনু দু-জনেই দেখতে পায় ব্রিজের মাঝখানে, সিক্তবসনা।

এর সপ্তাহ দু-য়েক পর ‘প্যানডেমিক’ শব্দটা প্রায় খিস্তির পর্যায় পুনরুক্ত হতে থাকে মানুষের মুখে মুখে। অতনু ও সোমের মোবাইল থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন নিউজ ফিড আসতে থাকে অনির মোবাইলে, অনিও সেগুলি ফরওয়ার্ড করতে থাকে ইতিউতি। সংক্রমণের মরটালিটি সংক্রান্ত আলোচনায় অনি লেখে, ‘মরটালিটির প্রশ্নে এইচ আই ভির কথা মনে এল। যে-রোগ শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে আবধ্য ছিল, আমেরিকাতে আশির দশকে তা প্রায় মহামারির চেহারা নেয়। মরটালিটি রেট অল মোস্ট হান্ড্রেড পার্সেন্ট। এলজিবিটি কমিউনিটিকে আইসোলেট করা হয় ও মূল অভিযুক্ত ঠাউরে কাঠগড়ায় তোলা হয় সে-সময়’। উত্তরে অতনু লেখে, ‘এতে ওই কমিউনিটির প্রতি পরবর্তীকালে অদ্ভুতভাবে সলিদারিটি বাড়ে, দে বিকেম দ্য পার্ট অফ দ্য সিস্টেম স্লোলি। প্রশ্নটা হল ‘প্যানডেমিক’-এর নাম করে যেভাবে সরকার মানুষের গতিবিধির উপর নজরদারি শুরু করেছে ইভেন বাই ইউজিং মোবাইল অ্যাপ তাতে ইফ উই আর নট কশাস, ইন দ্য ফিউচার ‘প্যানডেমিক’ চলে যাবে তার নিজের নিয়মে একদিন হয়তো অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে, কিন্তু রাষ্ট্র! স্বৈরতন্ত্র!’ মৌনতা সন্মতির লক্ষণ মানে অনি। এর দু-একদিন বাদে ওদের পুরানো বাড়ির দরজার সামনে বাইকে বসা একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর ওকে জিজ্ঞেস করে ‘১১/সি-টা কোনটা হবে?’ মুখে বাধ্যতামূলক মাস্ক ও হাতে গ্লাভস, অনি হাত দেখিয়ে দূরের একটা বাড়ি দেখিয়ে দেয়, বিষ্ণুদের বাড়ি। লোকটা চলে গেলে, উলটো দিকের ব্যালকনি থেকে রাশভারী গলা শোনা যায়, ’বাইরে থেকে ফিরেছে মনে হচ্ছে?’। দূর থেকে সানাইয়ের শব্দ ভেসে আসছে, বেচারা প্রসন্য নায়েবকে যেন বিশ্বম্ভর জিজ্ঞেস করছেন, ‘বন্দে আলির সানাই না?’ অনি ঘরে ঢুকে যায়।

এই বিষ্ণু এক অর্থে ওর ছোটোবেলার বন্ধু। যা হয় বড়ো হয়ে যাওয়ার পর বন্ধু থাকে কিন্তু বন্ধুত্ব থাকে না। মোটামুটি সচ্ছল পরিবার, অতি শীর্ণকায় চেহারা, পাজামা পরত কোমরে গার্ডার দিয়ে, অনেক বড়ো বয়স পর্যন্ত অন্তর্বাস পরত না অনিরা লক্ষ করেছে। একবার একমাত্র সন্ধ্যার শুকতারাকে সাক্ষী রেখে এই ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায়। প্রায় কয়েক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর জটলার মাঝখানে আচমকা প্রেতের আগমন, বাড়ির পেছন দিকের সেফটি ট্যাঙ্কের উপর এতক্ষণ বসে ছিল! উলটো দিকের বাড়ির স্নেহশীলা অবিবাহিত যে-দিদির বাড়িতে অন্তর্বাসহীন বিষ্ণুর অবাধ যাতায়াত ছিল, তিনি চোখের জল মুছে স্নেহে ওকে বুকে টেনে নেন। বাবা মায়ের মুখে ফ্লুরোসেন্ট জ্বেলে এ-ছেলে শেষ পর্যন্ত বিদেশে যায় চাকরির সুবাদে। সম্ভবত এই ভোরে বাধ্যতামূলক চোদ্দ দিনের কোয়ারেন্টিইন সেন্টারকে এড়িয়ে নিরপরাধী বিষ্ণু পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বাড়ি চলে আসে, তাই এই শিকারির আগমন। প্রশাসন একটিভ তাহলে, পাড়ার লোক খবর দেয় পুলিশ এসে মা ছেলে দু-জনকেই তৈরি হতে বলে গেছে, নাইসেড টেস্টের জন্য যেতে হবে সম্ভবত, বাবা আগেই মারা গেছেন। ‘এদেরকে শিক্ষিত বলে! কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই সোজা বাড়ি চলে এসেছে!’— পাশের বাড়ির গলা। পুলিশ আবার আসে, কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ির আওয়াজ পেয়ে অনি বারান্দায় গিয়ে দেখে একটা হলুদ ট্যাক্সি ওদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিকে চলে যাচ্ছে, ভিতরে নিরাপদ দূরত্বে বিষ্ণু আর ওর মা বসে আছেন, মুখে মাস্ক, অনি হাত দিয়ে নিজের নাক মুখ চেপে রাখে, পুলিশের বাইকটা উলটো দিকের রাস্তার মোড়ে মিলিয়ে যায়। অনির মনে পড়ে বিষ্ণুর ঠাকুমা বেঁচে থাকাকালীন মাছ তো দূরস্থান, বিধবা ছিলেন, পেঁয়াজ রসুনও খেতেন না, এমনকী যে-জায়গায় বসে একবার আমিষ ভোজন হয়েছে জ্ঞানত তিনি সেই স্থানে গিয়ে কখনো বসতেন না। মানুষ রোগ থেকে রুগীকে কি কোনোদিনও আলাদা করতে পেরেছে, পাপ থেকে পাপী যেমন! অনি ঘরে এসে ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে নেয়।

এরই কিছুদিন আগে অনিদের অফিস বন্ধ হয়ে যায়। অতনুদেরও। বাড়ি থেকে কাজ, অতনুদের নয় অবশ্য। এর মধ্যে ফোনে সোমের সঙ্গে অনির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের এবং সোমের রাজনৈতিক তরজা অনির মাথা ধরিয়ে দিয়েছিল। হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, রেমডিসিভির সোম জানিয়েছিল, কিছু উন্নতির কেস দেখা যাওয়াতে, ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে। রেমডিসিভির না কি ভাইরাল শেডিংটাকে কমাতে সক্ষম। অনি জানায় মার্কিনদেশে সংক্রমণ সব থেকে বেশি হওয়ায় সিনিয়র সিটিজেন না হলে হাসপাতালে ভর্তি নিতে চাইছে না, লক্ষণ লঘু হলে তো আরওই নয়। অতনুর এক দিদি জামাইবাবু ওখানকার ডাক্তার, দু-জনেই সংক্রমিত কিন্তু বয়স কম বলে হাসপাতাল ভর্তি নেয়নি। ওনারা বাড়িতেই নিজেরা নিজেদের চিকিৎসা করেন, গোড়ায় ক্লোরোকুইন খেয়ে ওদের বমি শুরু হয়। এখন দু-জনেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন। এই লকডাউনের মধ্যে অতনু একদিন ফোনে জানায় ওদের নাটকের দলগুলির যে-এসোসিয়েসান আছে তার বাইরে অতনুরা একটা ফান্ড তৈরি করেছে টেকনিশিয়ান ও প্রতিদিন অভিনয় করে যারা সংসার চালায় তাদের জন্য। বিমলের কথা ওঠে এই সূত্রে আবার, স্কুলের মাস্টারির বাইরে সখে থিয়েটারে অভিনয় ও ফিল্ম ক্লাব এইসব করে বেড়াতেন। এরকম বিচিত্র মানুষ অনিরা জীবনে খুব বেশি দেখেনি। ভীষণ সমস্যাশঙ্কুল জীবন কিন্তু এমন একটা অনড় ভাব ছিল, আদিরস মিশ্রিত মুখের ভাষা কিঞ্চিৎ প্রগলভতায় ভরা, অদ্ভুত ভঙ্গি কিন্তু কথার মধ্যে পারস্পেকটিভ পাওয়া যেত নানা ধরনের। স্কুলের মাস্টারমশাই হিসেবে একেবারেই ভাবা যেত না। কলকাতায় থাকতেন হেদোর কাছে, পুরানো বাড়ি ছিল নদিয়া জেলায়, রানাঘাটের কাছে। অনিদের সাথে প্রথম দেখা দু-হাজার সালের আশেপাশে। সম্ভবত গোর্কি সদনের মাসিক সিনেমা প্রদর্শনীতে। ডিসিকার বাইসাইকেল থিফ দেখার শেষে। ছবি শেষ হলে, অনিরা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে দীর্ঘকায় মৃণাল সেন কৌতূহলী ও নাছোড় বিমলকে বলছেন, ‘ভাবতে পারেন এ-ছবি চল্লিশের দশকে বানানো, আজও দেখলে মনে হয় এই কালকে বানানো হয়েছে!’ শোনা কথার মধ্যে যখন আকাঙ্ক্ষিত কথা থাকে তখন কথায় কথা বাড়ে। মৃণাল সেন তাঁর সাগরেদ সমেত হাঁটা দিলে বাইরে চা খেতে এসে অনিরা দেখে বিমল মৃণাল সেনের চেনা কেউ নন এবং প্রায় বিনা পরিচয়েই ওদের বলছে, ‘মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত কোথাও শুনেছ অপমানে বাপ ছেলে একসঙ্গে কেঁদে ভাসাচ্ছে! এ শুধু শালা নিম্নবিত্তেরই বারমাস্যা, পৃথিবীর যেখানে যাও! আমার জানতে ইচ্ছে করে এ-ঘটনা ওঁর ছেলের জীবনেও ঘটবে কি না!’ এর মাসখানেক পরে, পরের বছর হবে হয়তো, নাম মনে নেই, ইতালির ছবি, অতনু বলে, ‘পার্সোনাল সিনেমা বলে যদি কিছু থেকে থাকে এ একেবারে তাই, একজন মানুষের অবসেসন, তার পায়ুকাম, পৃথুলা রমণীদের প্রতি আকর্ষণ এ-সব কি কোনো এস্থেটিক্স এনে দিতে পারে? কোন অ্যালকেমির জন্য লোকে এ আবার দেখতে চাইবে!’ অনিমেষ ভাবতে থাকে।

উল্লাসের হাসি-মাখা অরুণ অধর
গোপ-সীমন্তিনী-গণে চুম্বে নিরন্তর।
আলিঙ্গনে আমোদিনী নিতম্বিনী-দল,
তিমির অঙ্গের মণি করে ঝলমল।
বিশাল বক্ষেতে কিবা বিমর্দ্দিত আজি
গোপ-নিতম্বিনী-গণ-উচ্চ-কুচ-রাজি।

আমার তো এই মনে এল, এর জন্য আবার দেখব কী?’ বারোশো শতকে লেখা জয়দেবের গীতগোবিন্দ থেকে আবৃত্তি করে শোনায় বিমল। রসময় দাস নয়, শ্রী শরচ্চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রী নগেন্দ্রনাথ ঘোষ প্রণীত ও প্রকাশিত গীতগোবিন্দের এই বাংলা পদ্যানুবাদটি বিমলের কাছে আছে। আজ যা রেপ্রেসেড হয় ক্ষমতার নৈতিক অনুশাসনে কাল তা আকুপাকু করে নতুন চেহারায় ফিরে আসে, সাবভারসানের চেহারা নিয়ে, ক্ষমতার অলিন্দে অন্তর্ঘাত ঘটানোর অভিপ্রায়। বিমল চুকচুক করে চায়ে চুমুক দেয় আর চোখ পিটপিট করতে থাকে, পয়সা মেটায় প্রতিবারের মতো অনিরা। ‘তোমার বাড়ি যেন কোথায় বলেছিলে?’, অতনু উত্তর দেয়, ‘রানাঘাট’। ‘রানাঘাট টকিজের পাশ দিয়ে যে-রাস্তাটা এঁকবেঁকে চূর্ণীর দিকে চলে গেছে ওই দিকে একসময় নিয়মিত যেতে হয়েছে বুঝলে’। মানুষের কিছু অনিবার্য অসহায়তা থাকে, যা ক্রমউন্মোচিত হতে থাকে প্রকাশের আধার পেলে। জ্যান্ত পুড়ে যাওয়ার আগে প্লেগাক্রান্ত মেয়েটির আতঙ্কিত মুখের দিকে তাকিয়ে পরিচালক জানতে চেয়েছিলেন, ‘ইস ইট দ্য আঙ্গেলস ওর গড ওর স্যাটান ওর জাস্ট এম্পটিনেস, হু উইল টেক কেয়ার অফ দ্যাট চাইলড?’ দ্য সেভেন্থ সীল ছবিতে, এ-দেশের মানুষ এই প্রশ্ন করার অবকাশই পায় না। সেই দিনের ও পরের দিনের বেঁচে থাকা, ব্যাধি, অপমান, কোটি কোটি মানুষের অবমানবের জীবন, তাদের জন্মান্তরের অশান্তি দিতে পারে কেবল, তার চাইতে মরনোত্তর সেটেলমেন্টের সেমিটিক ভাবনা এখন মনে হয় অনেক বেশি ভালো বোঝাপড়া, এই সন্দর্ভ তৈরি করে বিমল অনিদের সঙ্গে সেই দিন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার পরপর শ্লেষ্মা দিয়ে রক্ত আসতে শুরু করে বিমলের, সেই সময়ই এই ডাক্তার সেই ডাক্তার ঘুরে অবশেষে যৌবনের অনিবার্য টানে রানাঘাটে আসা শুরু হয়। চম্পার সঙ্গে প্রেম তার আগে থেকেই ছিল। গোঁড়ায় কিছু না জানালেও একদিন খয়েরি রক্তের ছাপ দেখে ও চাপা কাশির দমক দেখে বিমলকে চুমু খেতে বাধা দেয় পয়োধরা চম্পা। বিমল জোর করে চুমু খায়, উপরন্তু স্তনে মুখ দেয়। এর পরেই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। সম্পর্কে সম্পূর্ণ ছেদ ঘটার আগে চম্পার বাবা চেয়েছিলেন দৈবক্রমে পাওয়া এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে বিমলের গায়ে অসন্মান স্থায়ীভাবে লেপে দিতে। বিমলকে কলার ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় চূর্ণীর শেষ মাথার গলির ডাক্তারের কাছে। এর কয়েকদিনের মধ্যেই বিমলকে ভর্তি করে দেওয়া হয় ধুবুলিয়ার টিবি হাসপাতালে। এই শোকে বিমলের বাবার একটা ম্যাসিভ স্ট্রোক হয়, দু-একদিন বাদেই উনি মারা যান। ‘সেই সময়ের কথা, ষাটের দশকের শুরুর দিক, স্ত্রেপটোমাইসিন দেওয়া শুরু হয়েছে কিন্তু ফুল প্রুফ নয়, আর ভরসা সেই চিরাচরিত রোদ্দুরের আলো আর ট্যাঁকের জোর থাকলে পশ্চিমে গিয়ে মাসের পর মাস ভালো জল হাওয়া খাওয়া আর শরীরে এন্তার রোদ লাগান।’ — অনর্গল বমনক্রিয়ার মতো, অনিদের কথাগুলো বলে যায় বিমল। ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরে বিমল জানতে পারে ফিমেল ওয়ার্ডে চম্পা ভর্তি হয়েছে। দাদা এসে বিমলকে বলে যায় ওর সঙ্গে দেখা করার কোনোরকম চেষ্টা না করতে। দুই বাড়ির মধ্যে অশান্তি প্রায় হুমকি হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিমলকে প্রায় দু-বছর থাকতে হয়েছিল ধুবুলিয়াতে। স্ত্রেপটোমাইসিন কাজে আসে, বিমল পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়, কিন্তু চম্পা, বিমল ছাড়া পাওয়ার বছরখানেক বাদে মারা যায়। সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকদিন পর্যন্ত তীব্র মাথা ঘোরা ও বমি ছিল বিমলের নিত্তসঙ্গী। মা দাদারা বিমলকে আর পড়াশুনো করতে দিতে চায়না, পেয়ারাপাড়া গ্রামে ওদের যে জমিজায়গা ছিল তাই দেখাশুনো করতে বলে। তথাপি দু-বছরের ব্যবধানে বিমল এসে ভর্তি হয় উত্তর কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজি বিভাগে। পিজি বিএড দু-টিই শেষ করে অবশেষে চাকরি নেয় স্কুলে। এরই মধ্যে একদিন পেছন থেকে বিমল ভেবে ভুল করে ওর দাদার উপর কিছু লোক চড়াও হয়, কিঞ্চিৎ হাতাহাতির মধ্যেই ব্যাপারটা তখনকার মতো মিটে যায়, তাই পুনরায় পড়াশুনো করার আকাঙ্ক্ষা ছাড়াও কলকাতায় চলে আসার বা বলা ভালো বাড়ির লোকের পাঠানোর পিছনে আর একটা কারণ ছিল পূর্বের প্রেম ও অশান্তির আবহ থেকে বিমলকে দূরে সরিয়ে রাখা। মেয়ে ও মদের নেশা বিমলের অল্পবিস্তর থেকেই যায়। বিয়ে করে, একটি মেয়েও হয়। সখে থিয়েটারে অভিনয় এর কিছু কাল পরে শুরু হয়, নব্বই-এর দশক থেকে ফিল্ম ক্লাব, থিয়েটার ছেড়ে দিলেও ফিল্ম ক্লাবে যাতায়াত অনেকদিন পর্যন্ত ছিল। গত দশকের মাঝামাঝি বেশ কিছু দিনের অ্যাবসেন্সে একদিন বিমলের এসএমএস পায় অতনু। লেখা ছিল, ‘অতনু— ১৫/০৪/২০০৬, ৭:০০ পিএম— ৯:০০ পিএম, সাডেনলি, অকারড ৩-৪ টিএসএফ ব্লাড উইথ কাফ (৫৪ ইয়ার্স এগো ১৯৬২-৬৪ ইয়ার: কেএসআর–ধুবুলিয়া–ক্রি–সদর–এমসিএইছ), মেডিক্যাল কলেজ ইমারজেনসি ডায়গনোনসিস: হেমপটিসিস (পাস্ট হিস্ট্রি + টুডে— সিমস সেম: আই ই: নরমাল); সোয়ালিং অফ ফিট; বিপি— ১২৫/৭৫; নেক্সট চেকআপ: আফটার ওয়ান উইক;’।

শেষ পাতা

শুভদীপ ঘোষের গল্প

আমাদের নতুন বই