শুভদীপ ঘোষের গল্প
শীতঘুম

তৎক্ষণাৎ ফোন করে বিমলকে পায় না অনিরা। সপ্তাহখানেক বাদে ফোনে পায়। শরীর যদিও একটু দুর্বল তথাপি ভালো আছেন। ডাক্তার অনেকটা এরকম বলেছেন বিমল জানায়, স্ত্রেপটোমাইসিন টিবির জার্মকে ঠিক মেরে ফেলে না, ওটা জার্মগুলোর চারপাশে একটা শেল তৈরি করে, বলের মতো, জার্মগুলো কনশিল্ড থাকে নির্জীব ও নির্বিষ হয়ে ওই বলয়ের ভিতরে, আজীবন। মানুষটি ওইভাবেই পুরোপুরি সুস্থ জীবন কাটিয়ে দিতে পারে উইথ অল নরমাল একটিভিটিস। অনেক সময় অনেকদিন বাদে, ওইরকম একটা দুটো শেল ড্রপলেটের সাথে বাইরে এসে পরে। এর কিছু মাস পরে আবার বিমলের সাথে দেখা হয় ওদের হিচককের বার্ডস দেখতে গিয়ে। পীড়নের উপকরণ হিসেবে তৈরি করা অস্ত্র ছাড়া, মানুষ যে পৃথিবীর যে-কোনো ক্রিচারের কাছেই নিতান্ত অসহায় এবং সবচেয়ে দুর্বল একটি প্রাণী, ফিকশানের মুনশিয়ানার বাইরে গিয়ে অন্ধকারে কালো কালো মাথাগুলির কতজন সেটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলা মুশকিল, কিন্তু বিমলকে সেদিন অনিদের বয়েসের ভারে ওই প্রথমবারের জন্য ন্যুব্জ ও কিঞ্চিৎ দুর্বল বলে মনে হয়েছিল। কখনো কখনো নিবিষ্ট অতীত অন্বেষণের মধ্যে ভবিষ্যতের নিরুচ্চার দাগ থেকে যায় কোথাও যেন! ফিটন গাড়িতে অপু যেরকম তাঁর আশা ও সর্বনাশ দু-টিই দেখতে পেয়েছিল অপর্ণার চোখের কাজলে!

এরপরেও আরও বছর দু-য়েক ওদের দেখা সাক্ষাৎ ছিল। এরই মধ্যে অনি অতনু চাকরিতে ঢোকে, অনির অন্যান্য সময় কমে আসে, অতনু যদিও এবং অনস্বীকার্য যে, খানিকটা বিমলের অনুসরণেই থিয়েটারে সখের অভিনয়ে ঢোকে, কিন্তু বিমলের সঙ্গে যোগাযোগ ক্রমেই শূন্য হতে থাকে। আরও প্রায় তিন চার বছর পরে দু-হাজার তেরো চোদ্দ সাল নাগাদ, অতনু অনিকে জানায় বিমলকে অনেকবারের চেষ্টায় শেষমেশ পাওয়া গেছে। বিয়ের নেমন্তন্ন করতে গিয়ে দীর্ঘ কথোপকথনের ভিতর দিয়ে অতনু জানতে পারে বিমলের শরীর পুনরায় ওই ড্রপলেটের ঘটনাটার পর থেকেই ক্রমশ খারাপ হতে থাকে, বছর চারেক আগে ওর লিউকেমিয়া ধরা পড়ে! ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হসপিটালে ভর্তি হন। দীর্ঘ চিকিৎসা চলে কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। সামুহিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে গোটা পরিবার। যাবতীয় আশা যখন প্রায় শেষ হয়ে আসছে ঠিক সেই সময় ওই নির্দিষ্ট লিউকেমিয়াটির ওষুধ আচমকা বেরোয় জার্মানিতে। হেয়ারপিন লিউকেমিয়া। কলকাতায় খবর আসে কিন্তু ওষুধ আসে না। প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা ধারদেনা করে ওষুধটা আনানো হয় মুম্বাই থেকে। প্রাণদায়ী হয়, কিন্তু ডাক্তাররা জানিয়ে দেন এর একটা পর্যায়ক্রমিক সারভাইবালের ব্যাপার আছে। বিমলকে পাঁচ বছরের মাথায় আবার টেস্ট করে দেখতে হবে যে, ব্যাপারটা উইদিন রেঞ্জ আছে কি না, যদি থাকে তাহলে এর লংজিভিটি বেড়ে দাঁড়াবে দশ বছর, অতঃপর একই প্রক্রিয়া। এইসব কথার মধ্যেই অতনুকে বিমল নির্লিপ্তভাবে জানায় যে, চিকিৎসার খরচের জন্য সে বউ মেয়েকে কিডনি পর্যন্ত বেঁচে দিতে ফোর্স করেছিল, সে-সবের অবশ্য দরকার পরেনি শেষ পর্যন্ত।
জানালায় ধাক্কা লাগার শব্দে অনির ঘুম ভেঙে যায়। অনি একটু উঠে ধাক্কা দিয়ে জানালা খুলে দেখে বাইরে ঝড় হচ্ছে। বাঁ-দিকে তাকিয়ে দেখে রুপা ঘুমে অচেতন, আবার জানালায় শব্দ। রুপা জেগে থাকলে নির্ঘাত এই প্রথম ভোরেও হপ্তা তিনেক আগের ঘটে যাওয়া সাইক্লোন ও তৎ সংক্রান্ত ক্ষয়ক্ষতির স্মৃতি আর একবার রোমন্থন করত। জানালা ভেজিয়ে দিয়ে মোবাইল ফোনটা খুলে দেখে ভোর চারটে। রাত দুটো নাগাদ সোমেশ্বরের দুটো ফিড এসেছিল, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে চরম সঙ্কটে পড়েছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার গুলি, সংক্রমণের চাপ গ্রাম ভারতে ক্রমবর্ধমান, সামলাতে হিমশিম অবস্থা এবং দুই, নৈহাটি অঞ্চলে রাস্তায় যে-ময়ূর দু-টিকে সন্তর্পণে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল ও গান্ধীনগরের রাস্তায় যে-হরিণগুলিকে, বনদপ্তর জানিয়েছে তাদের মধ্যে সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিয়েছে! অনি অবজ্ঞা ভরে ফিডদুটোকে সরিয়ে দেয়, দেশে সংক্রমণের সংখ্যা যবে লাখ সোয়া লাখ ছাড়িয়েছে তবে থেকে এসবের খবর রাখা ও বন্ধ করে দিয়েছে, কানে ঘাড়ে ভালো করে জল দিয়ে গিয়ে আবার শুয়ে পড়ে।

ঘুম ভেঙে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগে, উঠবে উঠবে করছে, সাড়ে সাতটা বাজে, মোবাইল বেজে ওঠে।

‘ঘুম থেকে উঠেছিস!’— অতনু

‘বলো?’

‘কুন্দনন্দিনী, মনে পড়ছে?’— অতনু

‘কে!?’— ঝাঁঝালো গলা

‘আরে খানদানী খানদানী, বিমলদা বলেছিল, হাঃ হাঃ এবার মনে পড়বে। পরশু রাস্তার মাঝখানে আমায় ধরে ফোন নাম্বার দিল, নতুন নাম্বার, বলল বিমলদার খুব দরকার। আমার কৌতূহলি চোখ দেখে শরীর নাচিয়ে বলল ‘যোগাযোগ আছে, আরে এই গতরটাকে এড়ানো অত সহজ না কি!’, আমার বিশ্বাসযোগ্য লাগেনি অবশ্য কোনো কথাই’— অতনু

‘সাতসকালে এ-সব শোনানোর জন্য ফোন করেছিস বলে তো মনে হয় না, যোগাযোগ হয়েছিল কি?’

‘আমায় করতে হয়নি, নিজেই ফোন করেছিলেন গতকাল রাতে, অল্প কথা তো কোনোকালেই বলতে পারেন না, যেতে বলছেন তোকে আমাকে শিগগিরি, বললেন, ‘রক্তের কথা রক্তের সম্পর্কের বাইরে তো তোমাদেরই বলেছি, কিন্তু এটা আর কেউ জানে না গলা একটু জড়ানো মনে হল যদিও’— অতনু

‘কথাটা কি বলবি তো?’

‘সলিডারিটি ট্রায়ালের ব্যাপারটা জানিস তো? হু যেটা করে বিভিন্ন সময়ে। এই সংক্রমণের মধ্যে অক্সফোর্ড, ইতালি, ইসরায়েল কোথাওই ভ্যাকসিন ট্রায়াল অবশ্য তেমন ফলপ্রদ হয়নি। ভারতেও না কি শুরু হয়েছে কিছুদিন হল। বললেন কীভাবে হয় জানি কি না, বলে নিজেই বলতে শুরু করলেন!’— অতনু

‘হ্যাঁ জানি পদ্ধতিটা, দু-তিনটে গ্রুপে ভাগ করা হয় নন-ইনফেকটেড পারসনদের, একটা গ্রুপকে ভ্যাক্সিনাইজড করা হয় আরেকটা গ্রুপকে করা হয় না, অ্যান্ড দে আর অ্যালাউড টু বি এক্সপসড উইথ দ্য ইনফেকটেড পিপল, কিছুদিন পরে দুটো গ্রুপ থেকেই দেখা হয় কতজন ইনফেকটেড হল, তার উপর মানে সেই ডেটার উপর সাম্পলিং আর ইনফারেন্স করা হয় কতটা এফেকটিভ সেটা বোঝার জন্য, মাইক্রোবায়োলজিস্টদের কাজ, ডাক্তারদের খুব তেমন ধারণা থাকে না। অঙ্কে আমাদের পিজি পর্যন্ত পড়তে হয়েছিল স্ট্যাটিস্টিকসটা। কিন্তুউ!’

আকাশে বিদ্যুতের বলিরেখা আর তার শব্দের মধ্যে যে ক্ষণের উৎকণ্ঠা থাকে সেইরকম যেন, ‘উনি ওই ট্রাইয়ালে যেতে চান, বললেন, ‘আমার তো আর কিছু নেই’, শরীরের যা হাল, তাই নিজে আসার আগে উনি চান যাতে আমরা গিয়ে সরজমিনে ওনার হাল হকিকত একবার দেখে আসি’— অতনু

ক্ষণিকের নৈঃশব্দ্য, ‘কী অদ্ভুত! তুই কী বললি?’

‘না বলিনি’, তবে উনি বললেন, ‘আহত স্যার ফিলিপ সিডনি, জুটফেন নামক যুদ্ধে, জলের পাত্র তুলে দিচ্ছেন এক সৈনিকের হাতে, সম্ভবত রন এম্বেলটনের ইলাসট্রেশান ছিল, একটা এক্সেবিসানে এ-ছবি দেখে আমরা অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম, তোমাদের মনে আছে? আজ কেন জানি না অনেকটা সেরকম অনুভূতি হচ্ছে কথাটা জানিয়ে।’’— অতনু

অনি চিরকাল দেখেছে জীবনের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে ওর ভাবনাগুলো কীরকম যেন হয়ে যায়! অপঘাতে মৃত্যুর খবর শুনেছে কিন্তু নিজে কখনো অপঘাতে মৃত মানুষ দেখেনি, বাজ পড়ে মৃত্যুর খবর শুনেছে কিন্তু বাজ পড়া মৃতদেহ কখনো দেখেনি, এমনকী বাজে পোড়া গাছ পর্যন্ত নয়, এইসব মনে আসতে থাকে।

এর সপ্তাহখানেক বাদে দোনোমনা করে একবার যাওয়া স্থির করে ওরা, কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠে না। যা এতদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা গিয়েছিল, কোটিকোটি অসহায় পরিযায়ী মানুষের ক্রমান্বয় পদধ্বনিতে সেই গ্রাম ভারত এবং বাংলার গ্রাম লাল তালিকাভুক্ত হয়ে পড়ে অবশেষে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে।

প্রথম পাতা