Categories
গল্প

শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প

রেজিউম

কাল থেকে আবার সব চালু হবে, এই কথাটাই ভাবছে শিলাদিত্য গালে শেভিং ক্রিম লাগাতে লাগাতে। ওদের অফিসের সব শাখাগুলোর সহকর্মীরাই নয় কেবল, পুরো দেশবাসী প্রস্তুত হচ্ছে, কাল থেকে আবার সব চালু। যেন কোনো সিনেমা চলছিল, আর কেউ পজ বাটনটা প্রেস করে দিয়েছিল।
মিহির বলছিল সেদিন, ঠিক যেন ভারত বন্‌ধ, বলুন?

মিহির শিলাদিত্যর ওপরের ফ্ল্যাটে থাকে। ওর হেঁশেলে পেঁয়াজ শেষ হয়ে গেছিল, তাই এসেছিল খোঁজ করতে। যদি থাকে তাহলে আর বেরোতে হয় না সেদিন। হয়তো দু-দিন পরে বেরোবার কথা ভাববে। শিলাদিত্যর সঙ্গে মিহিরদের এমন দেওয়া-নেওয়া চলেই হামেশা। দিয়েছিল পেঁয়াজ, ছিল ওর কাছে। চারটে দিতে চেয়েছিল, মিহির দুটোর বেশি নেয়নি। তবে শিলাদিত্য বন্ধের সঙ্গে মেলাতে পারেনি এই লকডাউনকে। বলেওছিল সে-কথা, বন্‌ধ এমন সর্বাত্মক হয় না মিহির। যে-দল ডাকে, তারা দাবি করে অমন, আর বিরোধীরা বলে— কিস্যুই হয়নি। ও চাপানউতোরের খেলা নয় এই লকডাউন।

চিত্র: সোমনাথ হোড়

শিলাদিত্য দাড়ি কামাচ্ছে অফিস বেরোতে হবে বলেই। না-হলে কে ওসব হ্যাপা করে? ও করেনি, সাতান্ন দিন এভাবেই। সাতান্ন দিন কম নয়! গালে যেন জঞ্জাল জমেছে। ব্লেডটা আগে ইউজ করা, কাটছে না ঠিক। শিলাদিত্য পালটে নিল। নতুন ব্লেডে এতদিনের না-কাটা দাড়ি কামাতে গিয়ে ছড়ে ছড়ে যাচ্ছে। বাপরে! কিছু অভিজ্ঞতা হল বটে। ট্রেন চলছে না। ফেরি চলছে না। বাস, ট্যাক্সি, অটো কিচ্ছু না। সব স্তব্ধ! চুপচাপ। সাউন্ড অফ সাইলেন্স— গানের কল্পনায় নয়, বাস্তবে। জন্মে কেউ কোনোদিন ভেবেছে? শিলাদিত্য ভাবছিল।

সেদিন অবাক বিস্ময়ে ও দেখছিল রাস্তাটা। ওর ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে। শুনশান। সবে লকডাউন শুরু হয়েছে তখন। কেউ নেই। রাস্তার কুকুরগুলো বেদম ঘাবড়ে গেছে। কাক ডাকতে ভুলে গেছে। বেড়াল ধীরেসুস্থে রাস্তা পেরোচ্ছে। গাড়ির চাকার তলায় যাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই তার। বিল্লি কাট দিয়া রে— বলবার কেউ নেই। তখন ক-টা হবে? সকাল সাড়ে এগারোটা আন্দাজ। ওই সময় চ্যাঁ ভ্যাঁ করে পুরো রাস্তা। ঠিক দুক্কুরবেলা ভূতে মারে ঢেলা… শিলাদিত্য ফিরে যাচ্ছিল কৈশোরে। যাতে বাচ্চা বয়সের অপ্রতিরোধ্য কৌতূহলের বশে দুপুরে খাওয়ার পরে ঘরের বাইরে না বেরিয়ে যায়, তাই ওই ভয় মেশানো ছড়ার বীজ সেই জমানায় তাদের মাথায় সেঁধিয়ে দেওয়া হত। ঘুম আসত না কিছুতেই, তবু চোখদুটো টিপে বন্ধ করে, চুপটি করে মায়ের পাশটিতে শুয়ে থাকতে হত। কাঁচা বয়সের মাথা ফুটত সবসময়, কিছু করার জন্য সবসময় যেন ছুটিয়ে মারত।

খুরের আওয়াজে পিছন ফিরে দেখল শিলাদিত্য। কালো চকচকে তেজি একটা ঘোড়া ছুটতে ছুটতে তার কাছে এসে গতি কমাল, আর শিলাদিত্য ওর লাগামটা ধরে এক ঝটকায় ওটার পিঠে উঠে বসল, চল মেঘা। কানদুটো খাড়া আর সোজা হয়ে গেল ঘোড়াটার, যেন চেনা নামে ডাকল কেউ ওকে, নিমেষে ক্ষিপ্রবেগে জনশূন্য মহান সেই উত্তরাপথ ধরে ওরা ছুটল দিগন্ত ছুঁতে। দিগন্ত ক্রমে দূরবর্তী হয়, আর মেঘা শিলাদিত্যকে পিঠে নিয়ে তার গতি বাড়ায়। তার মুখ দিয়ে ফেনা উঠে আসে, তবু সে কর্তব্যে অবিচল। শিলাদিত্য তাকে বলেছে, পাটলিপুত্র পৌঁছোতে হবে।

এদিকে দুপুরের খর রোদ এলিয়ে পড়ছে। শিলাদিত্য চাইছে নিকটবর্তী জনপদে পৌঁছে অতিথিশালায় অথবা হৃদয়বান কোনো মানুষের আতিথ্যে আজ রাতটা কাটিয়ে কাল খুব ভোরে আবার যাত্রা শুরু করবে। যা করার করতে হবে সন্ধ্যে নামার আগেই। এই মহান উত্তরাপথ মূলত আরণ্যক, এবং স্থানে স্থানে বিচ্ছিন্ন লোকালয়। বর্ধিষ্ণু কোনো জনপদে না পৌঁছোতে পারলে সন্ধ্যের পরে এই পথের আরণ্যক অংশ শ্বাপদসংকুল, আর বাকি অংশগুলি চলে যায় ঠগি ও ঠ্যাঙাড়েদের জিম্মায়। শিলাদিত্যর মাথায় একটা ধন্দ জাগে, ঘোড়া ছুটছে অথচ ধুলো উড়ছে না! পিছনে ফিরে সে খেয়াল করে রাস্তাটা অ্যাসফল্টের। মসৃণ ও প্রশস্ত।

কামানো গাল আবার আবার কামানোর ফলে জ্বলছিল। শিলাদিত্য চটপট ধুয়ে ডেটল লাগাল। জ্বলুনি কমল না, র্যা শ বেরিয়ে গেছে লাল লাল। চুলকোচ্ছে। কী করা যায় এখন? মনটাকে ডাইভার্ট করতে ও বিপাশাকে ফোন করল। বিপাশার সঙ্গে শিলাদিত্যর বিয়ে হতেও পারে। মাস্টার্স কমপ্লিট করে এই মাস ছয়েক হল একটা চাকরিতে ঢুকেছে বিপাশা। শিলাদিত্যর প্রশ্ন, কাল বেরোবি তো?

হ্যাঁ। ওফ্‌। বাড়িতে বসে বসে হেজে গেছি একেবারে।
তা ঠিক। তবে অফিসে গিয়েও রোজদিন যে-যার একঘেয়ে কাজই করে যাই আমরা, ভেবে দেখেছিস সেটা? তাতে বোর হই না, অথচ ঘরে থাকতে হলেই…

হুম্‌ম। এর কারণ মুভমেন্ট। আমরা মুভমেন্ট ভালোবাসি। দেখবি, বাসের জন্য ওয়েট করতে বেশি কষ্ট হয়, তুলনায় বাসে উঠে ট্রাফিকে আটকে থাকতে অতটা নয়। ব্যাপারটা ওই, মুভমেন্ট। এই যে, কেউ কিছু পড়ে না আজকাল, সবাই মোবাইলে সিনেমা দেখে, ঢপের ভিডিয়োগুলো দেখে যায়, গেম্‌স খেলে যায়। কেন? মুভমেন্ট। এত জ্ঞান দিচ্ছি বটে, আমিও ওই দলেই পড়ি। শুনেছি, রাস্তামুখো বাড়ির লোকেদের ডিপ্রেশন কম হয়, তারা পরিবারমুখী হয়, কারণ ওই বহমানতা। সারাক্ষণ তারা দেখতে পাচ্ছে মানুষের যাতায়াত। আর পাড়ার ভিতর বা গলিতে থাকা মানুষরা সেই ডিপ্রেশন কাটাতে রাস্তায় আসে, পরিবারের প্রতি তারা কিছুটা উদাসীন হয়।

বাপরে, কত জ্ঞান তোর, কোনো অহংকার নেই অথচ!
লেগ পুলিং? তথাস্তু বৎস। হা হা।
ছাড়। দাড়ি কামিয়েছি। চুলকোচ্ছে।
রাখছিলিস তো। কামাতে গেলি কেন?
বাহ্‌! অফিস তো কাল থেকে।
মাস্ক পরবি না?
হ্যাঁ। কম্পালসরি তো।
তবে আরকী! কে দেখবে বাবা তোর দাড়ি আছে না নেই! গোঁফটা স্যার আশুতোষের মতো, না কার্তিক ঠাকুরের মতো! দাড়িটা কার্ল মার্কসের মতো, নাকি ইন্দরকুমার গুজরালের মতো!
হা হা। ভালো বলেছিস। আচ্ছা… তাহলে সমস্যা তো রে।
হোয়াট প্রবলেম?
লিপ মুভমেন্ট ফলো করতে পারবে না কেউ কারো। ফলে অন্যের কথা শুনতে আর বুঝতে বেশ বেগ পেতে হবে তো!
ও-সব অভ্যেস হয়ে যাবে। হয়তো কানের ক্ষমতাবর্ধক প্রোডাক্টস বেরোবে কিছু। স্যানিটাইজার নিয়ে তো হবেই দেখে নিস। ধনীদের স্যানিটাইজার, গরিবদের স্যানিটাইজার, ইমপোর্টেড স্যানিটাইজার, ব্র্যান্ডেড স্যানিটাইজার, পাতি দিশি স্যানিটাইজার। হোর্ডিঙে বিজ্ঞাপনে স্যানিটাইজার আর ওই কানের ক্ষমতাবর্ধক দেখব শুধুই। কিছু ক্র্যাশকোর্সও চালু হতে পারে বুঝলি, কীভাবে মাস্কে ঢাকা মুখে এফেক্টিভলি অফিসে প্রেজেন্টেশন দিতে হবে, বা জনসভায় বক্তৃতা। ওহ্‌ ঋতা ফোন করে কী বলছিল জানিস?
তোর সেই বুটিকের বন্ধু ঋতাভরী?
আর কে! ও বলছিল, আমার সালোয়ার আর শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং মাস্ক বানিয়ে দেবে। তোর জন্যও দেবে। বলছিল, তোর শার্ট পরা ছবিগুলো লাগবে।
বলিস কী!

ফোনটা রেখে শিলাদিত্য ভাবছিল, হাসলে বিপাশার গজদাঁত আর দু-গালের টোল তাহলে আর দেখা যাবে না যখন-তখন! হায় আল্লা! বেঁচে থেকে আর লাভ কী তবে? বিপাশার বাঁ-গালে অল্প টোল পড়ে একটু বেশি হাসলে। আর ডান গালের টোলটা ওর বাই ডিফল্ট। কথা বলতে গেলেই শুরু হয়ে যায়, হাসলে তো ভরপুর। সে-সব মাস্কে ঢাকা পড়ে যাবে? শিলাদিত্য ভাবল এখুনি ওকে একবার ভিডিয়ো কল করে। তখনই ফোনটা বেজে উঠল, সুরজিত।
ভাই, আমরা তাহলে পোস্ট করোনা যুগে এসে উপস্থিত হলাম।
কী আশ্চর্য, সুরজিতকেই ফোন করবে ভাবছিল শিলাদিত্য, ওরা সমবয়সি কোলিগ। সুরজিত খবরের কাগজ পড়তে ভালোবাসে। সক্কাল সক্কাল একটি বিশেষ কাগজের পাতাগুলোয় চোখ না বোলালে ওর দিনটা নাকি আলুনি কাটে। সুরজিত খবরের কাগজের ভাষায় কথা বলে। এমনকী চিন্তাও করে সেই কাগজের পোস্ট এডিট কলামের কখনো মৃদু ও কখনো সোচ্চারে নির্দেশিত মার্গে। টিভি খুললেও ও সেই খবরের কাগজেরই ইংরাজি নিউজ চ্যানেলে চোখ রাখতে পছন্দ করে। সুরজিত বলছিল, দেখেছ, মহারাষ্ট্রে… দিল্লিতে… নিজামুদ্দিন…
মেঘার পিঠে চেপে শিলাদিত্য পলকে পার হয়ে গেল হস্তিনাপুরের সুউচ্চ বিশাল সিংহতোরণ। আশ্চর্য, ও যেন সকলের চেনা। কেউ বাধা দিল না। প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশের মূল দ্বারের কাছে আসতেই দু-জন রাজকর্মচারী দ্রুত এসে মেঘার লাগাম ধরে নিয়ে ওকে অভিবাদন জানালো। শিলাদিত্য প্রবেশ করল। দাসদাসী পরিবৃত হয়ে চলল রাজা ধৃতরাষ্ট্রের নিজস্ব মহালে। সেখানে হইহই ব্যাপার। সঞ্জয় ধারাবিবরণী দিয়ে যাচ্ছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের। একদম লাইভ অ্যান্ড এক্সক্লুসিভ, গরম গরম। মহাভারতীয় আবহে ‘লাইভ’ আর ‘এক্সক্লুসিভ’ শব্দদুটিতে একটু খটকা লাগলেও শিলাদিত্য সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে ভালো করে শোনার চেষ্টা করল সঞ্জয়ের কথাগুলো। কিন্তু এ-সব হচ্ছেটা কী! যাত্তেরি! কী সব ভুলভাল এবং অতিরঞ্জিত তথ্যাবলী অবলীলায় বলে যাচ্ছেন ভদ্রলোক। ধৃতরাষ্ট্র সে-সব শুনে দৃশ্যতই উদ্‌বিগ্ন, আতঙ্কিত। মহারাজের আতঙ্কিত চেহারা যেন আরও উৎসাহিত করে তুলছে সঞ্জয়কে। সে আরও আরও বলে যাচ্ছে। আর পড়া মুখস্ত করানোর মতো করে একই কথা বলেই যাচ্ছে… যাচ্ছে… যেন মহারাজ 10th স্ট্যান্ডার্ডের পরীক্ষায় বসবেন! ওখানে অতজন মারা গেছে, সেখানে অতজন আক্রান্ত, এতজন রিকভারড, এই এই এলাকা হটস্পট, ওই ওই এলাকা সিল্‌ড, সেই সেই এলাকা কনটেনমেন্ট জোন।
আরে কী হল, তুমি তো কিছুই বলছ না, সুরজিত বলে।
সুরজিতের কথায় সম্বিত ফেরে শিলাদিত্যর, হ্যাঁ, ঠিকই তো বলছ। চলো আজকের মতো বাই। কাল দেখা হচ্ছে। টাইট হাগ।
পোস্ট করোনা জমানায় হাগ আর হ্যান্ডশেক ভুলে যাও ব্রো। পেজ থ্রি-তে মাইরি এবার আর সেলিব্রিটিদের পিডিএ-পিকসগুলো থাকবে না, কী বলো গুরু? আচ্ছা এই পার্টিসার্টিগুলোও কি সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেনে হবে?
দেখো কী হয়, তোমার কাগজ কী করে। তবে ভাই, ইকনমি ঝাড় খাবে ভালোরকম।
সে আর বলতে।

শিলাদিত্যর মনে পড়ছিল ছোটোবেলায় দিদার মুখে শোনা একটি আখ্যানের কথা। সেখানে একটা শাঁকচুন্নি গোছের চরিত্র ছিল— অখলু তাঁতির মা— তার সামনে দিকে গড়গড়ানে/পেছন দিকে পা। ওর দিদা খুব হাতমুখ নেড়ে নাটকীয় করে শোনাত সে-কাহিনি। ওর গা ছমছম করে উঠত সেই বয়সে। শুনতে চাইত না কিছুতেই, সন্ধ্যের পরে তো নয়ই। সেই অখলু তাঁতির মা হাঁটতে পারত না, যেন কোনো চারপেয়ে জন্তুর সামনের দুটো পা জড়িয়ে মড়িয়ে একটা এবড়ো-খেবড়ো মাংসপিণ্ড, আর পেছনের দুটো পায়ের পাতা পেছন দিকে ঘোরানো। সামনে এগোতে হলে তাকে গড়িয়ে গড়িয়ে যেতে হত, কেন-না হাঁটার চেষ্টা করলেই সে পিছন দিকে এগিয়ে যেত পায়ের পাতা উলটো মুখে ছিল বলে। লকডাউনে কি ভারতের অর্থনীতির চেহারাটা সে-রকম হয়ে যাবে নাকি? ও আর ভাবতে পারছে না। মাথাটা টিপটিপ করছে।

বাড়িতে থেকে থেকেই কি ওর মাথায় এইসব ঘোড়ায় চড়া, পাটলিপুত্র, হস্তিনাপুর, সঞ্জয়, ধৃতরাষ্ট্র ঘুরঘুর করতে শুরু করলো নাকি! ওদের অফিস আছে ভারতব্যাপী প্রায় প্রতিটি বড়ো শহরের একদম প্রাইম লোকেশনে, সে-সব জায়গা সবসময় একদম গমগম করে। লকডাউনে সব নিশ্চয়ই জনমানবশূন্য। খবরাখবর নিয়েছে কিছু কিছু শিলাদিত্য সেখানকার কোলিগদের থেকে, সবাই ভালো আছে। পাটনা, দিল্লি, হায়দরাবাদ… সেগুলোই কি অবচেতনে… কিন্তু ঘোড়ায় চড়ে যাওয়া যায় নাকি! কে জানে! বর্গিরা আসতো অবিশ্যি এই বাংলায়, সুদূর সেই পশ্চিম থেকে। তখন আর এরোপ্লেন বা ট্রেন কই!

শিলাদিত্য লকডাউনের মাঝে একবারের জন্যও বাড়ির বাইরে পা রাখবে না ভেবেছিল। পারেনি। দু-দিন যেতে হয়েছিল। আলু, ডিম, চা-পাতা, ওষুধ এইরকম কয়েকটা টুকিটাকি একেবারে ফুরিয়ে গেছিল। আনাজ, মাছ, দুধ এইসব থেকে সরিয়ে নিয়েছিল ও নিজেকে। খবরের কাগজ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, টিভিতে খবর দেখাও। সভ্যতার সঙ্গে একরকম ছিন্নই করে দিয়েছিল সব সম্পর্ক। দিনগুলি কেটেছে এন্তার পড়ে, গান শুনে, সিনেমা দেখে। আর অল্পস্বল্প ফেসবুক। সেখানেও জনে জনে শেয়ার করা ভুলভাল ভয় পাওয়ানো খবরগুলো এড়িয়ে গেছে সযত্নে। তবে হোয়াটসঅ্যাপে আর মেসেঞ্জারে পেয়েছে কিছুমিছু ওইরকম। বন্ধুরা দিয়েছে, সহকর্মীরাও। সবাই খবর দিতে বেশি উদ্‌গ্রীব, নিতে নয়। যুগধর্ম— ভেবে মুচকি হেসেছে সে।
একটু চা বসাল। বেসিনের কাছে এসে আয়নায় গালটা দেখল আরেকবার। চুলকোচ্ছে। একটু অ্যান্টি-র্যা শ ক্রিম মাখবে? সুরজিত ঠিকই বলেছে, পোস্ট করোনা। পোস্ট মডার্ন, পোস্ট ওয়ার, পোস্ট কলোনিয়াল, পোস্ট ট্রুথের পরে এবার পোস্ট করোনা। বয়স্কদের মুখে শুনত তারা বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে, দেশভাগ, মন্বন্তর, অনুপ্রবেশ, এমারজেন্সি দেখেছে। ওইসব বলার সময় শিলাদিত্য দেখেছে তাদের মুখে আলো, সফলতার প্রতিফলিত আলো। সংকটকাল পেরিয়ে আসার বহুবচনীয় গৌরব।

চা-টা ছেঁকে কাপে নিয়ে ও ব্যালকনিতে এল। ফোন করল নাগেশকে, জানিস একটা ফিচার পড়েছিলাম বাংলায়, একজন সাহিত্যিকের লেখা, তিনি লিখেছিলেন, জায়গার অভাব অদূর ভবিষ্যতে এমন আকার নেবে যে মানুষকে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। বসলেই গুঁতোগুঁতি হবে, মারপিট লেগে যাবে। তাহলে কাল থেকে কী হবে বল তো? এত জায়গা কোথায়! সুরজিতের চিন্তা— সেলিব্রিটিদের পার্টিতে কী হবে? আমি ভাবছি, পলিটিক্যাল পার্টিগুলো যে বড়ো বড়ো জমায়েত ডাকে না, এই যেমন ধর কলকাতার ব্রিগেডে, পাটনার গান্ধী ময়দান বা দিল্লির রামলীলা ময়দানে…

বুঝেছি। আমাদের দেশের যেমন তিরুপেরুমপুতুর। তোরা যেটা শ্রীপেরুমপুদুর নামে চিনিস। কিন্তু, কী বলতে চাইছিস তুই?
হ্যাঁ, বলছি, সেইসব জমায়েতগুলো কি এবার থেকে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেনে হবে?
অত বড়ো বড়ো ব্যাপার ভাবলি। আর সিম্পল ট্রেন, বাস এগুলোর কথা মনে পড়ল না মাই ডিয়ার! হা হা, ওয়েল, ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। হবে হয়তো।

নাগেশ এভাবেই হালকা চালে গভীর কথা বলে দেয়। কত উঁচু দায়িত্ব সামলাচ্ছে অফিসের! নাগেশ আর শিলাদিত্য একই বছরে জয়েন করেছিল। নাগেশ বলে চলে, শোন শিলাদিত্য, আমাদের তো ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলবে এখনও। লকডাউন হল কিন্তু ‘ওয়ার্ক ফ্রম ওয়ার্কপ্লেস’ ক্যাটেগরির মানুষদের জন্যই। তারাই ইকনমির রথের চাকাগুলো সমৃদ্ধির দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে চলে। যদি সবাই ওয়ার্ক ফ্রম হোম করলেই চলত দেশটা, তাহলে তো আর লকডাউনের দরকারই হত না, তাই না? একটা গোটা দেশ যেন সেই ছোটোবেলার স্টপ স্টপ খেলার মতো হঠাৎ স্টপ হয়ে গেছিল, কতদিন ধরে! এর মাঝে ইয়ার এন্ড, ট্যাক্স সাবমিশন— সবকিছু মুলতুবি রইল, ভাবা যায়! আমার তো সেই হলিউডি অ্যাপোকালিপ্সো ফিল্মগুলোর মতো লাগছিল। বিশ্বাসই হচ্ছিল না শুরু শুরুতে।

নাগেশ, আমার লেখালিখির বন্ধুরা সব একটা ফ্রেজ খুব বলছে রে, লাভ ইন দ্য টাইম অফ করোনা।
হা হা। ওয়েল, ইবোলা বা সারসের সময় তো বলেনি! আসলে কলেরা আর করোনা শব্দদুটোয় ছন্দমাত্রায় মিল আছে, তাই।

শিলাদিত্য সুমতির সঙ্গে একটু মজা করার কথা ভাবল। সুমতি একটু সিরিয়াস টাইপ। অ্যাডমিনে কাজ করে। সুমতিকে ফোন করল শিলাদিত্য, আচ্ছা, আমাদের ব্রেনে স্টোর্‌ড ফাইলগুলো রিপ্লেস করতে হবে। তাই না?
হোয়াট!

আমরা মাস্কঢাকা মুখগুলো দেখে চট করে চিনতে পারব না তো কাউকে। ব্রেনের স্টোরেজ ফাইলের ছবির সঙ্গে চোখ মেলাতে পারবে না তো! তাহলে?

ইউ নো হোয়াট, গ্র্যাজুয়ালি ইট উইল বি রিপ্লেসড। উই ডোন্ট নিড টু ডু এনিথিং কনশাসলি, শিলা। বাট ডু ইউ বিলিভ দিজ উইল বি ফলোড ভেরি সিরিয়াসলি বাই এভরি ইন্ডিভিডুয়াল? অ্যান্ড ফর রেস্ট অফ দ্য লাইফ? আই ডাউট। তবে এই লকডাউনে আমরা সবাই ঘরের কাজ নিজেরা করেছি। আমাদের সাহস বেড়েছে, সহিষ্ণুতা বেড়েছে, বেড়েছে অন্যকে বোঝার ইচ্ছা। ঘর ঝাঁট-মোছা কাপড় কাচা বাসন মাজার মতো কাজগুলোকে আমরা অনেকেই হীন নজরে দেখতাম, আমরা লেখাপড়া শিখে বড়ো-মেজো ডেজিগনেশনে কাজ করছি, একটা বেশ গেরেম্ভারী ব্যাপার। ও-সব তুচ্ছ কাজ করার জন্য আমরা লোক হায়ার করি— একটা নাক উঁচু ভাব কাজ করত কোথাও। সেটা ধুয়েমুছে গেছে। আমাদের টলারেন্স বেড়েছে। কড়া যাতে না পোড়ে সেভাবে গ্যাসের ফ্লেম কমিয়ে রান্না করেছি আমি। আগে কোনোদিন ভাবিইনি। ওই পোড়া কড়া এতদিন আমাকে মাজতে হয়নি। দেখো শিলা, আমি তোমার আমার কথা বলছি না, আমাদের কারও কথাও বলছি না। একটা সামগ্রিক পরিবর্তনের কথা বলছি। যেটা হয়তো এই লকডাউনের পজিটিভ আউটকাম।
অফ কোর্স। এগ্রিড।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা চমৎকার বদল এসেছে। অ্যান্ড ইউ নো, উই উইল এনজয় আওয়ার কামিং ডেজ উইথ মোর ডিটারমিনেশন অ্যান্ড মোর পারপাজফুলি।

ইয়েস, ফর শিওর। কাল দেখা হচ্ছে।
উফ্‌ফ… মাথা ঝিমঝিম করছে শিলাদিত্যর! আর এক কাপ চা দরকার।

ডিনারের পরে ফোন এল গায়ত্রীর। গায়ত্রীও একটু লেংদি, আর নীতিবাগীশ। এটা করা উচিত নয়, ওটা যে কী করে করে মানুষে… এইসব খালি। আর সবই এসে টাইপ, বোথ কোয়েশ্চেন অ্যান্ড অ্যানসার। তবে কথাগুলো ফেলে দেবার নয়। বলছিল, যে-কোনো ডিজাস্টারের মূল কুশীলব থাকে ধনীরা, উচ্চ শিক্ষিতরা। আর প্রাথমিকভাবে ভিকটিমাইজ্‌ড হয় গরিবেরা, কম শিক্ষিতরা। এই করোনা যেমন। রোগটা এল বিদেশ থেকে উড়ানপথে। আর দিল্লির নিজামুদ্দিন মসজিদ বা মুম্বইয়ের ধারাভি বস্তিতে গিয়ে সেটা আয়ত্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়ল খুব দ্রুত। শুধু করোনা কেন? ভাবুন গ্লোবাল ওয়ার্মিং। একটা অন্যতম কারণ আমাদের ওভার ইউসেজ অফ এয়ার কন্ডিশনার আর প্রাইভেট কারস। এবার ভাবুন— কারা এসি বা নিজের কার ব্যবহার করে? আর হিমালয়ের বরফ গলে গেলে কারা আগে অ্যাফেক্টেড হবে?

ঠিকই তো। এই লকডাউনে দিন-আনি-দিন-খাই মানুষেরা যে কী চরম বিপাকে পড়ল সারা দেশ জুড়ে, ভাবাই যায় না।

এর বেশি কিছু বলার ছিল না শিলাদিত্যর। ফোন রাখার আগে একবার ভাবল বলে, গায়ত্রী, হাসি বিশ্বজোড়া এক ইউনিক ভাষা, জেসচার। হাসি দিয়ে বিশ্বজয় করতে জন্ম নেয় মানবশিশু। তাকেও কি মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হবে জন্মলগ্নেই? মানুষ আরও ক্রূর হয়ে যাবে না তো মানুষের প্রতি, গায়ত্রী? এমন হবে না তো, ইভল্যুশনের ফলে তিনশো কি পাঁচশো বছর পরে মানুষের নাকমুখ থেকে কান একটা পাতলা আস্তরণে ঢাকা হয়ে গেল। আর খাবার অভ্যাস হয়ে গেল হাতির মতো, সরাসরি গলায়? দাঁত, চোয়াল, জিভ ক্রমে হয়ে গেল অ্যাপেনডিক্সের মতো অব্যবহার্য অঙ্গ, বাড়তি, ফালতু!
কিন্তু বলল না, রাত হয়েছে। কথা বেড়ে যেতে পারে।

শোবার আগে ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ লিখল বস্‌কে, কাল দেখা হচ্ছে স্যার। গুড নাইট।

চকিতে কল করল বস, গুড ইভনিং শিলাদিত্য। শুনছি গঙ্গার ওপর যে-পার্মানেন্ট ধোঁয়াশা হয়ে থাকত, সেটা লকডাউনের জেরে গায়েব হয়ে গেছে। আর গঙ্গার ঘোলা জল নাকি তরতরে স্বচ্ছ! তুমি কাল অফিসে আসার সময় দেখো তো একবার সত্যি নাকি।
ওকে বস্‌।
শিলাদিত্য, আমি আরেকটা কথা ভাবছিলাম। ব্ল্যাঙ্ক কল করে যারা প্রেম করার চেষ্টা করত আমাদের জমানায়, যাতে না গলা চিনতে পারে বাড়ির কেউ, তাই রুমালে ফোনের মুখ ঢেকে নিত, তাদের মুখ সেই সময় মাস্কে ঢাকা থাকলে সুবিধেই হত, কী বলো?
রাইট স্যার। এখন তো সবই মোবাইলে…

আরে এখনকার কথা হচ্ছে না। আচ্ছা এখনকার কথাই বলছি, শোনো। আমার এক বন্ধুর শালি সেপারেশনের জন্য তোড়জোড় প্রায় কমপ্লিট করে ফেলেছিল। তারপর লকডাউন। গৃহবন্দি। স্বামী-স্ত্রী দু-জনে দু-জনে ঘরের মধ্যে, কূজনে কূজনে, মাঝে তাদের বাচ্চা। কাঁড়ি ঘরের কাজ। আর জানোই তো, ওয়ার্ক ইজ ওয়ারশিপ। সব এখন জুড়ে গেছে আগের মতো। বন্ধুর সঙ্গে, তার গিন্নি আর মেয়ের সঙ্গে তারা নাকি ভিডিয়ো কল করে মিলেজুলে কথা বলেছে। বন্ধুটি বলছিল, তাদের কথায় নাকি খুব আঠা! আর ফাটা দাগ গায়েব! হাঃ হাঃ হাঃ…

আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে একজন বিয়ে করে নিল স্যার! ভেবেছিল সামনের মাঘে করবে। কিন্তু এখন হাতে এত সময়, কিছু তো করা উচিত, তাই…

বিয়ে! আরে গ্রেট ম্যান! আমার শুভেচ্ছা জানিয়ো। সব দম্পতির একটা কমন অনুযোগ থাকে, স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই যে, বিয়ের পরে পরে কেউ কাউকে যথেষ্ট সময় দেয়নি। তারপর বাচ্চাকাচ্চা হয়ে পুরো ল্যাজেগোবরে হয়ে গেল ক্রমেই। ওদের সেটা বলার থাকবে না। কী বলো? অঢেল সময়, দু-জনেই বাড়িতে, একে-অপরের কাছাকাছি, হাউ রোম্যান্টিক!

ইয়েস স্যার। লাভ ইন দ্য টাইম অফ করোনা।
একটু থেমে, গলাটা একটু সিরিয়াস করে বস্‌ বললেন, শিলাদিত্য, কাল থেকে সব রেজিউম।
রিস্টার্ট স্যার। সব নতুন করে শুরু করতে হবে আবার। আর একটা কথা স্যার, মানুষ মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখবে। সবাই সবাইকে ভাববে সাইলেন্ট ক্যারিয়ার। এভাবে কাজ হবে তো?

শিলাদিত্য, আই উড প্রেফার দ্য ওয়ার্ড ‘রেজিউম’। দীর্ঘ পজের পরে। হয়তো যেখানে থেমেছিল সেখানেই শুরু হবে না, কিন্তু আমাদের টার্গেট থাকবে দ্রুত সেই জায়গাটা রিচ করার। উই শ্যুড সেলিব্রেট দ্য মোমেন্ট ফর অ্যা ফ্রেশ অ্যান্ড বেটার ফিউচার ইন অল দ্য ওয়ে। আর তুমি সন্দেহের কথা বলছিলে, আমি বলব বিশ্বাসের কথা। যে-অটল বিশ্বাস নিয়ে আমরা এতগুলো ব্রাঞ্চ অফিস হেড অফিস সবরকম অ্যাক্টিভিটিজ বন্ধ রেখেও ঠিক সময়ে সহকর্মীদের বেতন এবং ভেন্ডর ও অন্যান্যদের পেমেন্ট সময়মতো করে দিলাম, শুধু আমাদের অফিসই-বা কেন, আরও কত অফিসই, তারপর যে-অটুট বিশ্বাস নিয়ে দেশব্যাপী আমাদের এই প্রায় ১৩৫ কোটি মানুষ লড়ল এই ভাইরাসটার বিরুদ্ধে সব কাজকাম বন্ধ রেখে, যে-গভীর বিশ্বাস নিয়ে দুনিয়াজোড়া মানবজাতি এই হার-না-মানা লড়াইটা লড়ল, সেই অতলান্ত বিশ্বাস তোমার-আমার, বুঝলে শিলাদিত্য, আমাদের সমস্ত সন্দেহকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে যাবে, দেখে নিয়ো।

One reply on “শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *