Categories
উৎসব সংখ্যা ২০১৯ গল্প

সরোজ দরবারের

বারিদের বন্ধুরা

চিত্র: রেনে মাগরিত

হিসেব মেলে না। মেলে না বলা ভুল, হিসেব রাখাই হয়নি। যে-সব হিসেব মিলে যায় তারা অঙ্কপাড়ার লক্ষ্মী ছেলে। বাঁ-পাশ, ডান-পাশ হুবহু এক। সবুজ কালির টিকচিহ্ন। কিন্তু যে-সব হিসেব রাখা হয় না, একটা সময় দেখা যায়, সেই হিসেব রাখাই জরুরি ছিল। এদের অঙ্ক হয় না। এদের মেলানো যায় না। কিন্তু মেলানো দরকারি ছিল।
কিছু হিসেব বড়ো হেঁয়ালির মতো। লেগে থাকে স্মৃতির গায়ে। চামড়ায়। রোদ্দুরে। জোছনায়। কিছু হিসেব একান্তে গোপনাঙ্গ স্পর্শের মতো।
তাদের মেলানো যায় না। যদিও মিললে বড়ো ভালো হতো।
হিসেব তাই এখন মিশে যাচ্ছে অতীতে। গুঁড়ো গুঁড়ো হিসেব। ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নের মতো। বিচ্ছিন্ন। তবু মোটামুটি একরকম জোড়া লাগালে একটা আদল পাওয়া যায়। আলগা অবয়ব ফুটে ওঠে।
কার অবয়ব! হিসেবের! না, হিসেবের কোনো অবয়ব হয় না। জীবনের হয়। জীবনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের হয়। যেমন, বারিদের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে শেখরের মুখটা।
শেখরের খবরটা এল। একটু আগে। আকস্মিক! ভাবাই যায় না!
শনিবার বিকেল আলিস্যিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল বারিদ। আচমকা এ খবর পেয়ে উঠে বসল। শেখরের সঙ্গে কতদিন দেখা হয়নি কে জানে! হিসেব রাখা হয় না এ’সবের। এরকম ঘটনা ঘটলে তখন মন হিসেব মেলাতে চায়। কিন্তু হিসেব মেলে না।
শেখরই কি কোনোকিছুর হিসেব রাখত! রাখত না। এই বাজারে বারিদের দেখা সে একমাত্র ছেলে যে চাইত, সারা জীবন শুধু পার্টি করবে।
কিন্তু পার্টির কি সেই দিন আর আছে? শেখর ফোঁস করে বলতো, পার্টির থেকে সে কিছু চায় না।
সে ভালো কথা। তবু, পার্টির কি আর সেইদিন আছে?
এবার শেখর আসল প্রশ্নটা বুঝত। না, পার্টি আর আগের মতো নেই। আগের পার্টি নেই। এ’কথা মুখ ফুটে বলা যায় না। পার্টিতে থাকতে হয় বলেই বলা যায় না।
তবু আত্মসমীক্ষা ছাড়তে পারে না মানুষ। ইস্তাহারে, বক্তৃতায় লাইনগুলো ওলটপালট করা যায়। কিন্তু তাতে কী! ঘরে নয় আয়না না-ই রাখলে! ঝিলের জলে কি মুখ দেখা যায় না! নিজেকে না দেখে, অবজ্ঞা করে কতক্ষণ তুমি নিজের মতো হয়ে থাকতে পারো! সম্ভব নয়।
ঝিলের ধারে বারিদের পাশে বসে বিষণ্ণ হত শেখর। একটু ঝুঁকে মুখ দেখত। তারপর সিগারেট ধরাত। গাঁজার রোল করলে বারিদ বুঝত, আজ ভিতরে ভিতরে বেশি ব্যাজার হয়ে আছে ছেলেটা।
সেই শেখর। সেই পার্টি করা শেখর। সেই প্রাণবন্ত শেখর। ঝিলের জলে মুখ দেখা শেখর।
চলে গেল। বিশ্বাস হয় না।
এই মুহূর্তটাকে সহ্য করতে পারছিল না বারিদ। তার মনে হচ্ছিল, এক্ষুনি কারো সঙ্গে কথা বলা দরকার। কার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় এই শোক?
যদিও শোকের ভাগ হয় না, তবু সারথীর কথাই মনে পড়ল বারিদের। সারথীর আসল নাম অবশ্য প্রাঞ্জল। ছেলেটা এমন বাইকপাগল যে বন্ধুরা সারথী বলেই ডাকত। মানে, কেউ কোথাও যেতে চাইলেই হাঁক পড়ত প্রাঞ্জলের। সেও হাসিমুখে পৌঁছে দিত। বাপ বড়োলোক ছিল। তেলের খরচ চাইত না বন্ধুদের থেকে। এটাই নাকি সাচ্চা ট্রিকল ডাউন থিওরি! অল্পবয়সের বাতেলাবাজি, যা হয় আরকী! তো এই করে করেই ক্রমে প্রাঞ্জলের নাম হয়ে গেল সারথী।
শেখরের ঘটনাটা যে মাসখানেক আগের, জানত না বারিদ। হতভাগা সারথীও কি জানত না! জেনে একবার ফোন অবধি করল না! এই ঘোরতর কমিউনিকেশনের যুগে এতদিন অন্ধকারে ছিল বারিদ। ভাবা যায়!
তার থেকেও বড়ো কথা, এই যে গত এক মাস, অন্তত বারিদের কাছে তো শেখর ছিল। বারিদের অস্তিত্বে, চেতনায় জলজ্যান্ত ছিল শেখর। অথচ একটু আগে থেকে একেবারে নেই হয়ে গেছে। অদ্ভুত! যেন একটা ফ্রেন্ডলিস্টে দীর্ঘদিন ছিল। কোনো অ্যাক্টিভিটি ছিল না। তাই থাকা আর না-থাকা সমান। আজ হঠাৎ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে হাওয়া।
গা-টা কেমন শিরশিরিয়ে ওঠে বারিদের। সে খুঁজেপেতে সারথীর নম্বরটা বের করে ডায়াল করে। পাবে যে তাই-ই ভাবেনি।
—হ্যালো…
ও-পারে মহিলা কণ্ঠস্বর শুনে একটু থমকায় বারিদ। মনে মনে সারথীকে গাল দেয়। বিয়ে করেছে জানায়নি অবধি। এখন আবার ন্যাকামি করে বউকে দিয়ে ফোন ধরাচ্ছে!
রাগ গোপন করে মার্জিত স্বরে বারিদ সারথীর খোঁজ করে। বলে, ওকে বলুন, বারিদ ফোন করেছে। শেখরের ব্যাপারে কথা আছে।

আত্মসমীক্ষা ছাড়তে পারে না মানুষ। ইস্তাহারে, বক্তৃতায় লাইনগুলো ওলটপালট করা যায়। কিন্তু তাতে কী! ঘরে নয় আয়না না-ই রাখলে! ঝিলের জলে কি মুখ দেখা যায় না! নিজেকে না দেখে, অবজ্ঞা করে কতক্ষণ তুমি নিজের মতো হয়ে থাকতে পারো!

ও-প্রান্ত থেকে আর কোনো উত্তর আসে না। নির্ঘাৎ সারথীর বউ ফোনে হাতচাপা দিয়ে চোখের ইশারায় বলছে, নাও এবার তো রিসিভ করো। আর হতচ্ছাড়াটা গা এলিয়ে দাঁত ক্যালাচ্ছে।
একটু পরে আবার ওপাশ সচল হয়। সেই মহিলাকণ্ঠ জানায়, প্রাঞ্জলের সঙ্গে আপনার কতদিন দেখা হয়নি?
হিসেব নেই। হিসেব মেলে না। আমতা আমতা করে বারিদ। তারপর বলে, হ্যাঁ, তা প্রায় বছরখানেক তো বটেই। নাকি আরও বেশি! ঠিক মনে নেই। কেন বলুন তো?
মহিলা জানায়, প্রায় সাত মাস হতে চলল।…
বারিদ চোখ বন্ধ করে। প্রার্থনা করে, আর নয়। আর যেন কোনো খারাপ খবর না হয়…
…মহিলা বলে যায়, সুইসাইড করেছে প্রাঞ্জল।
বিয়েটা হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। ফোনটা তবু এখনও নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন মহিলা।
আরও কিছু বলল সে। আর বারিদ কিছুই শুনতে পেল না। মহিলা, দু’বার হ্যালো হ্যালো করল। বলল, বারিদবাবু প্রাঞ্জলের কাছে আপনার কথা দু’একবার শুনেছিলাম।
বারিদ আলগোছে ফোন কেটে দিল। এ কীরকম করে বেঁচে ছিল সে! শেখর নেই, সারথী নেই! নেই মানে নেই-ই।
হিসেব মেলে না। কিছু হিসেব স্মৃতিতে মেশে। চামড়ায় লেগে থাকে। চামড়ায়…
হাতের দিকে তাকায় বারিদ। এখনও অস্পষ্ট একটা সাদা দাগ আছে।
সে কতদিন আগের কথা নাই-বা হিসেব করে দেখা গেল। একদিন ফেরার রাস্তায় বেদম হই-হল্লা করে ভাড়াবাড়ির দরজা খুলেই দেখা গেল, ঠিক সারথীর জানলায়, তারের জালে একটা ব্রা আটকে আছে।
সারথী কেন যে ভাড়াবাড়িতে তাদের সঙ্গে থাকত তার কোনো হিসেব নেই। বাড়িতে কীসব বাওয়াল ছিল। একদিন বাইক নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে এসেছিল। আর ফেরেনি। ওদের সঙ্গেই থাকত। অথচ বাড়ি থেকে টাকা পাঠালে নিত। শেখর বলত, শালা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুরো।
যাই হোক, তখন সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হল সেই ব্রা। উলটোদিকে মেয়েদের মেস ছিল। সামনের বারান্দায় দড়িতে মেলা থাকত, বারিদরা আড়চোখে বহুবার দেখেছে। তা নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে রসিকতাও করেছে। যদিও ওগুলো ওড়ার কথা নয়, তবু সেখান থেকেই যে-কোনোভাবে উড়ে এসেছে, তা নিশ্চিত। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, মেয়েরা যদি ফেরত নিতে না আসে, তাহলে সারথীর কি ফিরিয়ে দিয়ে আসা উচিত নয়? যেহেতু সেটা সারথীর বিছানার পাশের জানলাতেই ল্যান্ড করেছে, তাই এটা তার নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। মত বারিদদের। শেখর বলল, ও কিন্তু ওর মালকিনের খিদমত খাটতে খাটতে রিভল্ট করেছে। নইলে উড়ে আসত না। ও মুক্তি চাইছে। এখন শেল্টার নিতে আসা কাউকে কি শাসকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত? আবার তো তাহলে তাকে সেই ভারবাহীতে পরিণত হতে হবে! শেখরের কথা শুনে হাসে বারিদ। বলে, তোর সব কিছুতে খালি পার্টি। শেখর বলে, আর পার্টিই শিখিয়েছে সবকিছু উৎপাদন আর শ্রেণির প্রশ্নে বিচার করে বুঝতে। সেই হিসেবে ব্রা হল আদ্যন্তে প্রলেতারিয়েত।
সারথী অবশ্য ওসব কথার ধার ধারল না। চট করে বলে ফেলল, কিন্তু কার কী করে বুঝব?
আর যায় কোথায়? এরপর যা যা হয় বা হয়ে থাকে সে-সব কোথাও লেখাজোকা থাকে না। কিন্তু সে-সব হয়েই থাকে। এবং আরও পরে একটা সমবেত চেষ্টায় ওরা সারথীকে সেই ব্রা পরানোর চেষ্টা করেছিল। তারজালের ওপরে একটু ফাঁক ছিল। সেখান থেকে লম্বা হাত বাড়িয়েছিল বারিদই। আর অমনি ছড়ে গিয়ে… কী জ্বালা। ইঞ্জেকশন নেওয়া উচিত… ধুত্তুরি নিকুচি করেছি… শালা আগে দেখি আন্ডারওয়ার আর ব্রা পরে তোকে কেমন লাগে… তোর আবার মেল ব্রেস্ট সিনড্রোম…
উফফ, কী সব দিন গেছে!
চামড়ায় লেগে থাকে কিছু স্মৃতি। স্মৃতিতে মিশে থাকে কিছু হিসেব। হিসেব মেলে না। ভুল হল, মেলানো হয় না।
সেই ব্রা নিতে অবিশ্যি কেউ আসেনি। কিন্তু ওই পাশের মেসের ইন্দুবালার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল তাদের। সে আরও কিছু পরের কথা। ইন্দুবালাও আসল নাম নয়। নাম ছিল, সেঁজুতি। হাবভাবে কেমন পুরোনো দিনের নায়িকা ছিল। তাই এই নামটা চালু হয়ে গিয়েছিল। এর বেশি আর কোনো সার্থকতা নেই।
তা পুরোনো নায়িকার আবার সিগরেটের নেশা ছিল। একদিন অনেক রাতে গুলতানি চলছে। হঠাৎ, দরজায় নক। যার হাতে যা ছিল তাই নিয়ে উঠে দাঁড়াল বারিদরা। তারপর খুব সন্তর্পণে, সিনেমায় যেমন দেখায়, তেমন করে দরজা খোলা হল। আর সব ক্লাইম্যাক্সে জল ঢেলে একটা মেয়ে বলল, একটা সিগরেট হবে? আমার কাছে একদম শেষ। কিন্তু এখন একটা না খেলে আর চলছে না।
বোঝো কাণ্ড!
ইন্দুবালার সঙ্গে ওদের খুব বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তারপর যা হয়! চাকরি-বাকরির ব্যস্ততা। আজ এখন ইন্দুবালার কথাই একমাত্র মনে পড়ল বারিদের। ফোন নম্বর তো নেই। ফেসবুক ভরসা। তড়িঘড়ি সেঁজুতি নাম দিয়ে সার্চ করতে বসল সে। পদবি জানে না। যতগুলো সেঁজুতিকে পাওয়া গেল, প্রত্যেকের প্রোফাইল খুলে খুলে দেখতে লাগল। সময় পেরিয়ে গিয়েছে অনেকটাই। ইন্দুবালার চেহারাও নিশ্চয়ই অনেকটা বদলে গেছে। পৃথুলা, মেদবতী! সেদিন কিন্তু ওরা স্থির বিশ্বাস করেছিল যে, ব্রা-টা ইন্দুবালারই ছিল। সেটাই নিতে এসে লজ্জায় পড়ে সিগারেটে নেমে এসেছিল। এসবই সম্ভাবনার তত্ত্ব। না-ও হতে পারে। তবু এ-সব আলোচনা অনেকটা সময় ভরিয়ে রাখত বারিদদের।
প্রোফাইলগুলো বেশ ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে একটাতে এসে থমকাল বারিদ। এইরকম চোখ করে তাকানো! এ ইন্দুবালা ছাড়া আর কে হতে পারে? আরও কয়েকটা ছবি পরপর দেখে সে নিশ্চিত হল। তারপর ফোন নং চেয়ে মেসেজ করল। নিজেরটাও দিল। মেসেজ পৌঁছাল। দেখলে নিশ্চিত ফোন করবে। ব্যাক করতে গিয়ে মনে হল, কী করে এখন ইন্দুবালা?
প্রোফাইলটায় ঢুকল সে। আর তার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল মাটিতে।
শেষ পোস্টটা ইন্দুবালার স্বামীর করা। বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গিয়েছে ইন্দুবালা।
জানত না বারিদ। জানত-ইনা। জানার চেষ্টা করেনি। শেখর জানত? সারথী? জানত কি না কী করে বুঝবে? কারো থেকে জানার উপায় নেই কোনো।
কিন্তু এই মুহূর্তে সে এক আশ্চর্য বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে সে এক বান্ধবহীন শূন্যতায় ভাসছে। তার বন্ধুরা সবাই তাঁর ভাবনায় আছে। আগের মতো করেই আছে। কিন্তু নেই। সত্যি নেই।
তার ভয় হল। ভয় হল এই ভেবে যে, এখন যদি সে সুরঞ্জনের বাড়ি যায়, তবে হয়তো দেখা যাবে, আজ দুপুরেই সে অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। কিংবা মৃন্ময়, সায়ন্তনী, সৌরভ, পলাশ— যাকেই ফোন করুক না কেন, নিশ্চিতই শুনবে, তারা হয় আত্মহত্যা করেছে কিছুদিন আগে, নয় হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মারা গেছে, নয় দাঙ্গার মুখে পড়েছিল, নয়…।
কে মারছে তাদের? কে এই সিরিয়াল কিলার?
বারিদ উদ্‌ভ্রান্তের মতো তাকায়। একবার তার মনে হয়, তার সব বন্ধুকে সে নিজেই খুন করেছে। এ-সবের জন্য সেই-ই দায়ী।
মৃতের কোনো দায় থাকে না। যে দায় বহন করে, তাকে বেঁচে থাকতে হয়। যেমন নির্বান্ধব বেঁচে আছে বারিদ। বারিদবরণ গঙ্গোপাধ্যায়।


টানা তিনদিন। অফিস যায়নি বারিদ। শেভ করেনি। যেন সে অশৌচ পালন করছে।
এটা কখনও হতে পারে! একটা ভরা যুবক ছেলের সমস্ত বন্ধু মারা গেছে। অথচ সে জানতে অবধি পারেনি। এতদিন সবাই তার কাছে অস্তিত্বময় ছিল। তার অস্তিত্বও ওদের নিয়েই ছিল। আচমকা সব ওলটপালট হয়ে গেলে হিসেব মেলে না।
অথচ কঠিন বাস্তব তো এটাই।
অফিস থেকে মেল করেছিল, এইচআর যেমন করে, রিপ্লাই করেনি বারিদ। অফিস গ্রুপে খোঁজ চলেছে। দেখেও এড়িয়ে গিয়েছে। চাকরির পক্ষে এটা ভালো জিনিস নয়। কিন্তু বারিদের মনে হচ্ছে, তার সঙ্গে যা হয়েছে বা হচ্ছে, জীবনের পক্ষেই কি তা ভালো জিনিস!
থেকে থেকে সে খালি শাওয়ারের তলায় দাঁড়ায়। জলে শরীরের ভাপ নেমে যায়। একটু শান্তি পায়। তারপর তার মনে হয়, আসলে তার শরীরটা আছে তো! এই যে সে, সে তো শেখর, সারথী, ইন্দুবালা বা সুরঞ্জন, সৌরভদের বাদ দিয়ে নয়। কিন্তু তারা যদি না থাকে, তাহলে তার থেকে যাওয়াটা কতটা ঠিকঠাক!
নিজের শরীরকে সন্দেহ করতে শুরু করে বারিদ। সর্বাঙ্গে আঙুল ছুঁইয়ে টিপে টিপে দ্যাখে। দ্যাখে, কোশে কোশে সাড় পড়ছে। হাত নিয়ে যায় পুরুষাঙ্গে। স্পর্শ টের পায়।
তার মানে সে আছে। পুরোটাই আছে। অথচ অনেকটা না-থাকার যেন কথা ছিল। তাতেই শান্তি পেত সে। কেন যে এমন হয়!
হিসেব মেলে না। কিছুতেই। কিছু হিসেব মিশে থাকে রোদ্দুরে, জোছনায়, চামড়ায়। কিছু হিসেব নিজের গোপানঙ্গে নিজেরই স্পর্শের মতো।
আবার শাওয়ার চালিয়ে দেয় বারিদ।
কী করে এমন একটা নির্বান্ধব পৃথিবী সে তৈরি করে ফেলল। অথচ এই কমিউনিকেশনের যুগ। এই ভরা যোগাযোগের মরশুম!
নাকি এটাই ঠিক নয়। বারিদকে ভাবানো হয়েছে যে, এই যোগাযোগের মরশুমে কেউ কারো থেকে আলাদা নেই আর। কিন্তু আসলে সকলেই আলাদা হয়ে গেছে। কমিউনিকেশনের মানেটা কি তবে বদলে দেওয়া হয়েছে! অধিভাষায় যেমন শব্দের অর্থ বদলে যায়!
নিজের চারপাশটাকেই এবার সন্দেহ করতে শুরু করে বারিদ। কুকুরের মতো সে বাতাস শোঁকে। গন্ধ পায়। চক্রান্তের। ষড়যন্ত্রের। এই বন্ধুহীন পৃথিবী তার হাত দিয়েই তৈরি হোক, এ’মত চক্রব্যূহে কেউ যেন তাকে টেনে এনেছিল।
উলঙ্গ বারিদ এ’দেওয়াল থেকে ও’দেওয়াল হাঁটে। হেঁটে বেড়ায়। খুঁজে ফেরে সেই কালপ্রিটকে। সেই সিরিয়াল কিলারকে।
তার মনে পড়ে, একদিন সে বিজ্ঞাপনে শুনেছিল, কার্ডে কেনাবেচা করাকে বলা হচ্ছে প্রাইসলেস! আসলে তো কথাটার মানে দুর্মূল্য ছিল। অর্থাৎ, কিনা যা অতি মূল্যবান। তাহলে কি অতি মূল্যবান বলে আর কিছু নেই। নাকি যা-কিছু অতি মূল্যবান তার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলা হল, কার্ডে কেনাবেচাই এখন প্রাইসলেস। যাতে একমাত্র কার্ডটাকেই মূল্যবান মনে হয়।
অর্থ বদলে যায়। বদলে দেওয়া হয়।
এসব কি জানত না বারিদ? জানত। কতক শেখরের থেকে শুনেছে। কতক ঠেকে শিখেছে। জেনেছে যে, ভাষাকে কী করে উলটো করে ব্যবহার করতে হয়। ধরা যাক, স্বাধীনতা। তার তো অগাধ অর্থ। কিন্তু শপিংমল যখন কাউকে কেনাকাটার স্বাধীনতা দেয়, সে আসলে কী দেয়? দেয়, তার ইচ্ছেমতো সাজিয়ে রাখা কয়েকটা প্রোডাক্টে আটকে থাকার পরাধীনতা। অথচ এমনভাবে বলে যে এমনি দোকানে একটা জিনিসে আবদ্ধ থাকবেন আপনি, শপিংমলে নয়, তাতে উলটোটাই মনে হয়।
সবই তো জানত বারিদ। কিছু শুনে, কিছু জীবনের অভিজ্ঞতায়। জানত না কি, অর্থ বদলে কেমন ব্যবসা হয়! দেখেনি কি ধর্মকে কোন জায়গায় নেমে আসতে হয়েছে!
জেনেবুঝেও সে কিছু করেনি। গা ভাসিয়েছে। যেভাবে ভেলায় ভেসে যায় লখিন্দর। এ যে কার অভিশাপ, কে জানে!
বন্ধুদের জন্য এবার ভারী মন খারাপ করে বারিদের। সে বসে পড়ে মেঝেতে। কাঁদতে থাকে। সে ভেবেছিল, তার অনেক বন্ধু আছে। কে যেন, অনেক আইডেন্টিটিকে ক্লাব করে একটা জায়গায় এনে বলেছিল, এরা তোমার ফ্রেন্ড। এই তোমার ফ্রেন্ডলিস্ট। তুমি থাকো। এদের সঙ্গে থাকো। এদের মতো করে থাকো। আর সেরকমই থাকতে থাকতে তার বন্ধুরা সব মরে গেল। সবকটা বন্ধুদের মেরে ফেলল বারিদ নিজে।
বারিদ আবিষ্কার করে কিংবা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, আর কেউ নয় সে নিজেই সেই আশ্চর্য সিরিয়াল কিলার।
এবার যেন নিজেকে হত্যা করার ঝোঁক চেপে বসে তার মাথায়।
আত্মহত্যা নয়। নিজেকে হত্যা। দুটো হরেদরে একই ব্যাপার। কিন্তু তবু এক নয়। অর্থ বদলাতে চায় বারিদ। নিজেকে শেষ করে দেওয়া নয়। নিজেকে খতম করে দেওয়া।
কিন্তু তা কী করে সম্ভব হবে? ভেবে পায় না সে। অসম্ভব বিষণ্ণ লাগে তার। বারিদ কি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে! প্রশ্ন করে বারিদ নিজেকে। যথারীতি উত্তর আসে না।
অবসন্ন হয়ে সে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। একটা সিগারেট ধরায়। ধোঁয়ায় তার চোখ জ্বালা করতেই মনে পড়ে, গত তিনরাত ঘুমোয়নি সে। তাহলে কি শেষতম হত্যাটি করার আগে সে একটু ঘুমিয়ে নেবে? ভাবতে ভাবতেই সে শুনতে পায়, ফোন বাজছে।
অফিস হবে। নয়তো আর কে! তার তো কেউ বন্ধু নেই।
ইচ্ছে করছিল না। তবু বারিদ উঠে এসে বিছানায় তার ফোনটা হাতড়ায়। চাদরে বালিশের ফাঁকে সেটি ঢুকেছিল। জট ছাড়িয়ে হাতে তুলে নিতেই বারিদ দেখল, শেখর কলিং…
কী করে সম্ভব! শেখর কি তবে আছে! এবার সে মনে করার চেষ্টা করে, শেখর যে নেই, এ খবরটা তাকে কে দিয়েছিল? কোন বন্ধু?
কিছুতেই মনে করতে পারছে না বারিদ। ফোন হাতে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। একসময় ফোন বাজা থেমে গেল।
ঘুরিয়ে ফোন করতে যাবে, আবার ফোনটা বেজে উঠল।
এবার, সারথী কলিং…
আবার ফোন ধরল না বারিদ।

বারিদ আবিষ্কার করে কিংবা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, আর কেউ নয় সে নিজেই সেই আশ্চর্য সিরিয়াল কিলার।
এবার যেন নিজেকে হত্যা করার ঝোঁক চেপে বসে তার মাথায়।

সে বেশ বুঝতে পারছে, এবার ইন্দুবালার ফোন আসবে। তারপর সুরঞ্জন, কি সৌরভ কি পলাশ…
এ কী অসম্ভব খেলা তার চারিদিকে হচ্ছে!
ফের ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায় বারিদ। তবে এটা চেনা। খুনশুটির। বন্ধুদের মধ্যে যেমন হয় আরকী!
বন্ধ ঘরে একলা বসে বারিদ নিজেকে প্রশ্ন করে, আমি কি মরে গেছি? কেউ বলে দেবে প্লিজ।


চারদিনের মাথায় বারিদকে যখন উদ্ধার করা হল, তখনও সে অচেতন। দরজা ভাঙতে হয়েছিল। পুলিশ এসেছিল। অ্যাপার্টমেন্টের অন্যান্যরা আর অফিসের লোকেরাই ব্যাপারটা নজর করেছিল।
এসে দেখা গেল, সম্পূর্ণ উলঙ্গ বারিদ অচেতন হয়ে পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক আনানো হল। ভালো ব্যাপার যে, একটা ছেলেকে সুইসাইড থেকে বাঁচানো গেছে শেষমেশ। আটার ডিপ্রেশন। ডাক্তার বললেন।
একটু পরে ক্রমে জ্ঞান ফিরছিল বারিদের। খানিকটা ধাতস্থ হওয়ার পর, সে জড়িয়ে জড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কারা?
অনেকগুলো মাথা একযোগে বলল, তোমার বন্ধু বারিদ। আমরা সবাই। চিনতে পারছ না!
বন্ধু!
শব্দটা কোন অর্থে বলছে এরা! বারিদ বুঝতে পারল না। সে দেখল, তার চোখের সামনে অনেকগুলো আইডেন্টিটিকে কে যেন ক্লাব করে বসিয়ে দিয়েছে।
খুব ক্লান্তি বোধ হল তার। একবার সবার দিকে তাকাল সে।
তার চোখে অদ্ভুত নীল আলো। যেন অন্ধকার ঘরে, একটা কমপিউটার শাট ডাউন হচ্ছে।
তারপর চোখ বন্ধ করল বারিদ। তার ঠোঁটটা বারকয় নড়ল। যেন কিছু বলতে চেয়েও বলে ফেলার আগেই ঘুমিয়ে পড়ল সে।
যেন সে জানত ঘুমন্তের পৃথিবী মৃতের পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি। যেন শেখর তাকে জানিয়েই গিয়েছিল, বন্ধুদের খাতিরেই কখনও-সখনও এসকেপ রুট ধরতে হয়। তাতে কোনো দোষ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *