Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ গল্প

সেলিম মণ্ডলের গল্প

হাতটি

আকাশে একটিও তারা নেই। গুমোট। বৃষ্টি হওয়ার প্রয়োজন ছিল। আকাশের কি ভালো লাগে এত ভারী মেঘ বয়ে বেড়াতে? আকাশভারী মেঘের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। মনে হয়— অন্ধকার আকাশটা এখুনি ঘরের ভিতর ঢুকে আমাকে চেপে মারবে। কতদিন কিছু লেখা হয় না! পড়াতেও মনোযোগ বসে না। কতদিন নতুন উপন্যাস পড়িনি! বিছানায় নেরুদার প্রশ্নপুঁথি, মণীন্দ্র গুপ্তের গদ্যসংগ্রহের প্রথম খণ্ড, উৎপলের কবিতা সংগ্রহের দ্বিতীয় খণ্ড ছড়িয়ে… কোনোটি দু-পাতা পড়ব তার ইচ্ছেও হচ্ছে না। বালিশের পাশে একটা ডায়েরি ও লাল কালো দু-খানা কলম পড়ে। ডায়েরিতে লিখি না। কাটাকুটি করি। নিজেকে যখন ভীষণ একা লাগে ওই ডায়েরির পাতায় অজস্র বক্ররেখা টানি। তারপর মুখগুলো মিলিয়ে দিই। আজ কিছুই ইচ্ছে করছে না। ল্যাপটপটা অনেকক্ষণ আগে বন্ধ করে রেখেছি। স্পিকারটাও অফ। খেয়েছিও অনেকটা দেরিতে। রাতে খাওয়ার সময় একমাত্র টিভির ঘরে ঢুকি। খেতে খেতে খবরের চ্যানেলগুলো স্ক্রল করি। চ্যানেলগুলো বড্ড বোরিং। এই বিপর্যয়ে মানুষজনের কী অবস্থা তা যত না খবর করে তার থেকে বেশি খবর করে এ-সরকার কী করছে, ও-সরকার কী করছে! কোন সেলেব্রটি পেগন্যান্ট! গঙ্গায় তিমি ভাসছে!

আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, মাথায় কী সব উদ্ভট প্রশ্ন ঘুরছে—

তারাদের কি অভিমান হয়?

ধারে কেনা যায় কি তারার ছটফটানি?

তারাদের বিয়েতে কি চাঁদের নিমন্ত্রণ থাকে?

হঠাৎ, মনে হল পিছন থেকে কেউ একজন ঘাড়ে হাত রাখল। আমি একটুও চমকে গেলাম না। পিছন ফিরেও তাকালাম না। আমি আগের মতোই আছি। ছোটোবেলা থেকেই ঘাড় ধরতে পছন্দ করি। কেউ ঘাড়ে হাত রাখলেও ভালো লাগে। প্রেমিকার সঙ্গে যখন বেরোতাম, হাত না ধরে ঘাড় ধরতাম।

আজ আমার ভিতর কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। লাইট অফ। চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। অন্ধকার আকাশে কিছুই দেখা যায় না। না-দেখাটাও অনেক সময় আনন্দের। আমরা যত না দেখব, পৃথিবী বোধহয় ততই রহস্যময় সুন্দর।

হাতটি আস্তে আস্তে আরও চাপ দিয়ে স্পর্শ করছে। আমার মন্দ লাগছে না। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। এত রাতে আমার ঘরে কেউ আসবে না। আসলেও এভাবে আচমকা এসে ঘাড়ে হাত দেবে না। কিন্তু এ-নিয়ে আমার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতাই নেই। একইরকমভাবে আকাশ দেখছি তো দেখছিই। ঘড়ির ব্যাটারি বহুদিন শেষ হয়ে গেছে। লকডাউনের মধ্যে কেনাও হয়নি। সত্যি বলতে আজকাল ঘড়ি দেখার প্রয়োজনই হয় না। সারাক্ষণ হাতের কাছে মোবাইল থাকে। কিন্তু এখন মোবাইল কোথায় আছে জানি না। অন্ধকারে খুঁজে পাওয়াও যাবে না। মা, ঘুমোতে যাওয়ার আগে বারবার বলে গেছে, বেশি রাত করবি না। এখন ক-টা বাজে আমার আইডিয়া নেই। রাতে খেয়েছি তাও ঘণ্টা ৩-৪ হবে। সেই সূত্রে অন্তত ২টো বা ৩টে বাজে। ঘুম আসছে না। এবার ঘুমোতে যাওয়া দরকার। আমি অনুভব করলাম ঘাড় থেকে হাতটি সরে গেছে। আকাশেও যেন মেঘের ভিতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একটি তারা। হতেও পারে দূরের কোনো জোনাকি। আমি মাঝে মধ্যেই তারার সঙ্গে জোনাকি গুলিয়ে ফেলি।

ঢক ঢক করে কয়েক গ্লাস জল খেয়ে, মোবাইলটাও খুঁজতে লাগলাম। পেলাম না। বোধহয় টিভির ঘরে রেখে এসেছি। খাটের একপাশেই কোনোরকমে বইয়ের ওপর বই চাপিয়ে মশারি টাঙিয়ে নিলাম। এই বিরক্তিকর কাজ আমাকে একটি কারণে করতে হয়। যাতে মায়ের বকা না খেতে হয়।

সঠিক ক-টা বাজে, এখনও জানি না। অন্যান্য দিন শোবার সময় মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে কখন ঘুমিয়ে পড়ি টের পাই না। মশারির মধ্যে চুপচাপ আছি। ঘুম আসছে না। আমার ঘরটাই মনে হচ্ছে আকাশ। একটাও তারা নেই। গুমোট। খালি ফ্যানের হাওয়ায় অল্প অল্প মশারির নড়াচড়া টের পাচ্ছি। একটা সময় আমার ঘুম নিয়ে অহংকার ছিল। বিছানায় পড়লেই ঘুমিয়ে যেতাম। আজকাল কী হয়েছে, শুলেও ঘুম আসে না। ঘুম আসে, আবার ভেঙে যায়। এখন আমি ঘরের মধ্যেই আকাশ দেখছি। কখন তারারা আসবে অপেক্ষা করছি।

এর মধ্যে একটা কালো বিড়াল এসে জানালার ধারে কুৎসিতভাবে ডাকছে। জানালার একটা পাল্লা খোলা। তা দিয়ে কিছুটা দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বলতে— তার উজ্জ্বল দু-টি চোখ। এত তীব্র আলো মনে হচ্ছে এই তো দু-টি তারা জ্বলছে আকাশে। কিন্তু ওই ডাকটা আরও পাগল করে তুলছে। কিছুক্ষণ পর বিড়ালটা নিজেই চলে গেল।

চোখটা আস্তে আস্তে একটু ভার লাগছে। চুপচাপ আছি। আকাশটা আরও ঝাপসা হয়ে আসছে। পাশ ফিরে কোনোরকম চোখটা বুজলাম। আবার যেন পিঠে কারো হাত স্পর্শ করল। কিছুই বললাম না। এবার সে নিজে থেকেই বলল, তারাদের দেখা পাবে না। আমার মাথায় হাত বোলাতে লাগল। এই কণ্ঠস্বর আমার চেনা। এই কণ্ঠস্বর আমি ভীষণ পছন্দ করি। কিন্তু আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

— কথা বলো।

— আজ তুমি চলে যাও। চলে যাও প্লিজ।

— তুমি তারাদের দেখা পাবে না। দেখো, আকাশ থেকে ওই অন্ধকারে ঝরে পড়ছে রক্ত। টের পাও, ওই রক্ত কাদের? শুনতে পাও কি কোনো আর্তনাদ।

হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। ফ্যান চলছে। ঘরের দরজা বন্ধ, পাশের ঘর অবধি শব্দ হয়তো পৌঁছায়নি। তবে কোনোরকমে নিজে সামলে বললাম, আজ তুমি চলে যাও, প্লিজ। আমি নিজেকে সামলাতে পারব না। পাশের ঘরে কিছুক্ষণ আগেই বাবার কাশির আওয়াজ পেয়েছি। জেগে যেতে পারে। ও নাছোড়। কিছুতেই যাবে না। মাথায় হাত বোলাতে থাকে আর বলে আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি তুমি ঘুমাও। মাথায় হাত বোলাতে থাকে, মাঝে মাঝে কপালে চুমু খায়। এই আদর আমার সহ্য হচ্ছে না। সব কিছু অসহ্য লাগছে। আমার কী হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি পাগল হয়ে উঠছি। রাতের পর রাত ঘুম নেই। কিছু সহ্য হচ্ছে না। গভীর রাতে স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করছে না। অন্ধকার গুমোট আকাশে তারা খুঁজছি!

যেভাবে হোক একে তাড়াতে হবে। না হলে আমি আরও পাগল হয়ে যাব। চিৎকার করে উঠব। কয়েকবার ঘুরে লাথি মারলাম। তার কিছুই যেন হল না। একইভাবে আমার পাশে শুয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছে। আজ রাতে আমার সঙ্গে থাকবে। গল্প করতে চায়। বিরক্ত হচ্ছি বলে চুপচাপ গায়ের গন্ধ নেবে। মাথায় হাত বোলাবে। কিন্তু সে যাবে না…

হঠাৎ, একটা শব্দ কানে এল। গেট খোলার শব্দ। একটু স্বস্তি পেলাম। মা বোধহয় বাথরুমে যাওয়ার জন্য উঠেছে। আমার ঘরে আলো জ্বললে মা এসে দেখে যায়। আজ অন্ধকার। আসার প্রশ্নই নেই। মা-কে কি ডাকব? এত বিরক্ত লাগছে কেন? মা এসে কি একে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে? আমি কি সত্যিই চাই, একে দূর দূর করতে? আজ তো প্রথম নয়, তাহলে কেন বারবার সে আসে?

কিছুক্ষণ পর আবার দু-বার আওয়াজ পেলাম। একবার বাইরের গেট লাগানোর, আরেকবার আরেকবার শোবার ঘরের সিটকানি মারার।

— তুই কি যাবি বাল?

— আমি তোমার কি ক্ষতি করছি? ঘুম পাড়িয়েই তো দিচ্ছি।

— দ্যাখ, বাল; তোর এই আদর আমি চাই না।

— তাহলে জানালার ধারে গিয়ে কেন, কেন আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলে?

— তা তোর কী?

— তুমি, তারার দ্যাখা চাও। অথচ, তারা তোমার কাছে এলে তাকে দূর ছাই করো।

— আমি তোর মতো তারা চাই না। নীল আকাশে জ্বলজ্বল করা তারা দেখতে চাই।

— যে-আকাশে তুমিই মেঘ ঘনিয়ে আনলে সেই আকাশেই তারা দেখবে? আর যে-রাতে অন্ধকার তারাদের গিলে নেয়, সেই রাতকে, না তারাকে; তুমি বিশ্বাস করো না?

তুই তোকারি পর্যায়ের তর্ক-বিতর্ক শুরু হল। আমি পাশ ফিরে একইরকমভাবেই শুয়ে আছি। ও মাথায় যতই হাত বুলিয়ে দিক, কিছুতেই ঘুম ধরে না।

ডান হাতে প্রচণ্ড ব্যথা। শরীরটা আগের চেয়ে অনেকটা হালকা লাগছে। ঘরটা আগের মতো অতটা অন্ধকার নয়। জানালার একটা পাল্লা দিয়ে অল্প অল্প আলো ঢুকছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকাল হবে। জানালার ফাঁক দিয়েই দেখা যাচ্ছে— পাঁচিলে ঝিমোচ্ছে একটা পাখি। ও কি আমায় সারারাত পাহারা দিচ্ছিল? পাশেই নারকেল গাছ। প্রতিদিন কত পাখি ওর পাতায় বসে খেলা করে। পেচ্ছাপের বেগ পেয়েছে কিন্তু বালিশ ছেড়ে ওঠার শক্তি নেই। তিনরাত টানা ঘুম নেই। হাতের ওপর মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি গতকাল। ঘুম এতই গভীর ছিল কিছুই টের পাইনি। মাথার পাশেই পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইপত্র। মা এসে কোনোরকমে লাইট অফ করে মশারি টাঙিয়ে দিয়ে গেছে। তবে আমার ডায়েরির একটি ছেঁড়া পাতা বুকের ওপর লেপটে ছিল। স্পষ্ট ছিল তার দাগ। মনে হচ্ছিল— সদ্য ইস্ত্রি করা সাদা পাঞ্জাবী…

11 replies on “সেলিম মণ্ডলের গল্প”

জীবন যাপন পুংখাণুপুংখ। তার ভেতর অন্য বিশ্ব। খুব ভাল

গল্পের বিষাদ নিহিত চলন, শব্দ ও তার নিজস্ব প্রতিধ্বনি, অন্তর্লীন নৈঃশব্দের বাঙ্ময়তা সব মিলিয়ে বড় মনোগ্রাহী একটি কাজ।

বেশ ভালো লাগল গল্পটা। এরকম আরো লেখা আসুক।

তোমার গল্পও আসলে কবিতাই। কবিতার মতো সুন্দর!

এক অসহায় মানুষের জীবনে অদৃশ‍্য এক হাত হয়ে উঠছে গল্পটি র চরিত্র।।গল্প যতই এগোয় আমরা নতুনত্বের স্বাদ পাই।।।।।।।।।।।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *