হিন্দোল ভট্টাচার্যর গল্প

ভয়

‘তুমি কি নিজেকে ভয় পাচ্ছ?’

প্রশ্নটা শুনে, একটু মনে মনে অস্বস্তিতেই পড়ে গেল পার্থ। আসলে, রুমেলার এই এক সমস্যা। যখন তখন এমন সব প্রশ্ন করে বসে, যেগুলি সে খুব ভেবেচিন্তে করছে বলে মনে হয় না, অথচ, হয়তো ভেবেচিন্তেই করে রুমেলা। কারণ, রুমেলাকে খুব একটা বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই। রুমেলা যে-সব বোঝে, তার প্রমাণ রাখতে একটা বাক্যাংশই যথেষ্ট। কিন্তু ও বেশিক্ষণ এক বাক্য নিয়ে পড়ে থাকে না। যেমন, জামাকাপড় গোছাতে গোছাতে রুমেলা প্রসঙ্গই পালটে ফেলে বলল, ‘দেওয়ালের গায়ে কেমন মানুষের মুখ ফুটে ওঠে, তাই না?’

পার্থ বলল, হুঁ। কিন্তু তার মনে রুমেলার কথাটি গুনগুন করছে। যেন এক চেপে রাখা আশ্চর্য দমকা বাতাস আবার হুহু করে উঠছে বুকের ভিতর।

‘তুমি কি নিজেকে ভয় পাচ্ছ’?

এই সত্যি কথাটা রুমেলার সামনে স্বীকার করার ক্ষমতা পার্থর নেই। বিকেলের আলোটা ক্রমশ মায়াবী হয়ে উঠেছে। এই সময়টা এমন হয়। আবাসনের পশ্চিম দিক এখনও খোলা। তাই অনেকটা আকাশ দেখা যায়। জীবনানন্দের পাখিদের দেখাও যায়। রুমেলা অবশ্য একদিন ভুল ভাঙিয়ে বলেছিল, ওরা বিকেলের ঘরে পেখা পাখি, জীবনানন্দ দেখেছিলেন।

পার্থ যে রুমেলাকে ভয় পায়, তার কারণ যে, রুমেলা পার্থর স্ত্রী তা নয়। বরং, তাদের দু-জনের মধ্যে একটা আশ্চর্য সম্পর্ক। আর সে-সম্পর্কের কথা রুমেলা জানে না। পার্থও জানত না। কিন্তু একদিন রাতে সব হিসেব পালটে গেল।

পার্থ যে কয়েকদিন ধরেই একটু ভয়ে ভয়ে আছে, এ-বিষয়ে সন্দেহ ছিল না তার নিজেরও। কিন্তু ঠিক কাকে ভয় পাচ্ছে, এ-বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ ছিল না। হতে পারে, তার কাগজের অফিসের সম্পূর্ণ পরিবেশ, আবার হতে পারে সেই চিফ রিপোর্টার। আবার এও হতে পারে, মাথার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো ঘনিয়ে আসা চাকরি চলে যাওয়ার ভয়।

অফিস থেকে বেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউইয়ে চা খেতে বেরিয়েছিল পার্থ। ক্রসিং-এর জায়গাটায় গাড়ি সিগন্যাল পেলেই খুব জোরে চলতে শুরু করে দেয়। সেদিনও শুরু করে দিয়েছিল। চা-টা সবে এক সিপ দিয়েছে, আর শুনতে পেল একটা গাড়ির ব্রেক কষা আর একটা কুকুরের চিৎকার।

এমন একটা জায়গায় চায়ের দোকানটা, যেখান থেকে রক্তাক্ত সেই কুকুরটার দেহ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। একটা কুকুরই তো মারা গেল, বিশেষ কিছুই নয়। একটা সাধারণ রাস্তার নেড়ি কুত্তা। অল্প পাঁচ থেকে সাত মিনিটের জন্য থেমেছিল ট্র্যাফিক। কিন্তু তার বেশি কিছুতেই নয়। সাধারণ একটা রাস্তার নেড়িকুত্তার জন্য বেশিক্ষণ থেমে থাকা যায় না। কিন্তু পার্থর বুকের ভিতরে ভয়টা যেন আরও বেড়ে গেল। চায়ের ভাঁড়টা হাতে ধরে রাখতে পারছিল না পার্থ। গরম চা চলকে গেল। আঙুলের উপরে গরম চা-টা পড়তেই আর ভাঁড়টা হাতে ধরে রাখা সম্ভব ছিল না পার্থর পক্ষে।

পায়ের তলার মাটি সরে যেতে সাধারণত কেউই দেখেনি। কিন্তু পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়া একটা চেনা বাক্য হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে। পার্থ এটুকু বুঝেছিল সেদিন, পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে ক্রমশ। অথচ, কোনো কারণ ছিল না এই অহেতুক ভয়ের। কেউ তাকে শাসানি দেয়নি, কোনো টার্মিনাল লেটার আসেনি, বাড়ি ভাড়া দিতে হয় না, পরিবারের কারোর সামনে অপারেশন নেই, হাসপাতালে ভর্তি নয় কেউ, পরকীয়া ঘটেনি জীবনে, রুমেলাও বলেনি ডিভোর্সের কথা, যদিও তার এ-কথা বলে ওঠার অনেকগুলো যুক্তি থাকাটা খুব স্বাভাবিক। এ-সব কিছুই হয়নি।

কিন্তু পার্থর পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। বুকের ভিতরে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত ছটফটে অস্থির ভাব। এক শূন্যতা মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকে অধিকার করে নিয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত জানলাকে তার মনে হচ্ছে যে-কোনো সময়ে ভেঙে পড়ে যেতে পারে। যেন জল উঠে এসেছে বিপদসীমায় আর একটা গোটা শহর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে ঘাটে। কিন্তু এত সব রুমেলাকে বোঝানো সম্ভব নয়। রুমেলা আশাবাদের মতো করে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে উড়ে উড়ে বেড়ায়। কাজ না থাকলেও কোনো-না-কোনো কাজের মধ্যে ডুবে যায়। অথবা অকারণ তর্কের বিষয় খুঁজে বের করে। তা, সে মাছের বাজারদর হোক বা পরিবেশ দূষণ। রুমেলার এই চরম পজিটিভ এনার্জিও মাঝেমধ্যে সহ্য হয় না পার্থর। এক-একদিন ঘুমন্ত রুমেলার মুখের দিকে তাকিয়ে ভয় লাগে। মনে হয়, এই কি সেই রুমেলা, নাকি বহু আগে সে পরিবর্তিত হয়ে গেছে?

এই কথা পরদিন রুমেলাকে জিজ্ঞেস করতেই রুমেলা বলেছিল, “আমরা কি কেউ কখনোই একইরকম থাকি? তুমিও কি আছ? আজকের তুমি কি কালকের তুমিই থাকবে? এক ঘণ্টা পরেও কি তুমি এক ঘণ্টা আগের মতো থাকবে?”

“আমি তার কথা বলিনি রুমেলা। আমি তোমাকে কি হারিয়ে ফেলছি?”

“এ তো একটা প্রেমের গল্প হয়ে গেল। দাম্পত্যে আস্তে আস্তে নেমে আসা শীত। মাল্যবান আর কারুবাসনা থেকে একটু বেরোলে হয় না? ইলিয়াসেও তো ঢুকতে পার একটু!”

“তোমার কি মনে হয় আমাদের জীবনটা একটা ফিকশন?”

“আবার একটাতে আটকে আছ পার্থ। একটা নয়, অনেকগুলো ফিকশন। যেমন, কোনো নদীই আসলে অনন্তকাল ধরে একা নয়, অনেক। নদী মরে যাচ্ছে, আবার জন্ম নিচ্ছে। আবার সে-নদী প্রবাহিতও হচ্ছে। অনেক, অনেক, অনেক।”

“আমাদের চরিত্রগুলো তো আলাদা”।

“আমাদের জন্ম মৃত্যু বেঁচে থাকা ভালোবাসা যৌনতা সবকিছুই আলাদা। অনুভূতিই আলাদা। ফলে ফিকশনও আলাদা।”

“একটা কোনো গল্প নয়?”

“মনে হয় না”

কিন্তু এই এতকিছুর সঙ্গে পার্থর ভয় পাওয়ার কোনো সম্পর্কই তৈরি হত না, যদি না, পার্থ বুঝতে পারত গোটা মানবসভ্যতাই রয়েছে আর কয়েক মাসের জন্য। বেশ কিছুকাল ধরেই সে বুঝতে পারছিল সমস্ত জন্তু জানোয়ার তার দিকে ঘৃণা আর তিক্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আবার কারো কারো চোখে রয়েছে এক অতিরিক্ত বিদ্রূপ। যেমন, যে কাকটা রোজ সকালে আসে বিস্কুট খেতে, সে আসার পর, পার্থ বিস্কুট দিল। কিন্তু কাকটা বিস্কুট মুখে তুলল না। বরং মুখ তুলে রাগত স্বরে কয়েকবার কা কা করে ডেকে চলে গেল। এমনকী কুকুরগুলিও এড়িয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হল। অফিস যাওয়ার পথে সমস্ত কাক বা শালিখ বা কুকুর বা বিড়াল তার দিকে তির্যকভাবে তাকাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল পার্থর। সে সেদিন এর কারণ বুঝতে পারছিল না। আর ঠিক তার পরেই কুকুরটার অমন দুর্ঘটনা। কুকুরটা মরে পড়েছিল, কিন্তু তার তির্যক দৃষ্টি ছিল তারই দিকে। রাস্তায় থেঁতলে যাওয়া কুকুরটার সেই মৃত অথচ অর্থবহ চোখের দৃষ্টি পার্থ সম্ভবত যতদিন বেঁচে থাকবে, মনে থাকবে। যদিও ভুলতে পারলেই ভালো লাগবে তার।

রুমেলা এত সব কিছুই জানে না। শুধু এইটুকু বুঝতে পারে পার্থর মধ্যে একধরনের পরিবর্তন হয়েছে। কেমন যেন ফ্য্যাকাশে হয়ে গেছে পার্থ। এমনকী, পার্থর ভিতরে আর সেই স্পৃহা নেই, যে-স্পৃহা, তাকে একসময়ে বেশ উজ্জ্বল ছাত্র করে তুলেছিল। শুধু উজ্জ্বল ছাত্রই না, যে-কোনো বিষয়ে পথে নামতে যে একবিন্দু ভাবত না, কলেজস্ট্রিটের প্রায় প্রতিটি লিফলেটে যার অদৃশ্য কলম থেকে ঝরে পড়তে যুক্তি আর ভাবনার অনুচ্ছেদ, সেই পার্থ এখন কলমের দিকে ঘেঁষতে পারছে না। টেবিলের সামনে বসে কেমন যেন শব্দহীন একটা অস্তিত্ব হয়ে গেছে। সমস্ত আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে। এর আগে, রাতে, ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় কখনো ঘরের আলো জ্বালত না পার্থ। কিন্তু গত এক মাস ধরে ঘরের আলো জ্বেলে তারপর বাইরের আলো জ্বালছে পার্থ। পার্থ ঘুম থেকে উঠলে গোটা ফ্ল্যাটের আলো জ্বলে ওঠে। কাকে ভয় পাচ্ছে পার্থ? কেন ভয় পাচ্ছে?

“জানো, রুমেলা, পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্তত এই মানবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। এই ধ্বংসের পিছনে আছি আমরাই। আমার বারবার মনে হয় এই পৃথিবীটা আমাদের উপরে প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু কীভাবে তা জানি না। হয়তো পাখিরা আক্রমণ করবে। একদিন দেখব মাটি ফেটে সব সাপেরা শহরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথবা কুকুরেরা আর মানুষকে ভালোবাসছে না। সমস্ত জন্তুজানোয়ার-পাখিরা ব্যারিকেড করে দিয়েছে। ঘিরে ধরে আমাদের আক্রমণ করছে। ওরা কত সহজেই আত্মহত্যা স্কোয়াড গড়ে তুলতে পারে জানো না। কারণ ওরা মরতে ভয় পায় না। জাটিঙ্গা পাখিদের দেখনি? নিদেনপক্ষে পিঁপড়ের যখন পাখা গজায়, তখন?”

রুমেলাকে জড়িয়ে ধরে এক ছুটির গোধূলিতে বলেছিল পার্থ। রুমেলা বুঝতে পারছিল অবস্থা বেশ ভয়ংকর। পরিচিত ডাক্তার পরিতোষদাকে ফোন করাও হল। কিন্তু পার্থ গেল না।

“তুমি গেলে না কেন ডাক্তারের কাছে? বুঝতে পারছ না তোমার একধরনের অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজর্ডার তৈরি হয়ে গেছে?”

“ওহ্‌ রুমেলা, আমরা বড়ো বেশি অসুখ সম্পর্কে জেনে গেছি। কিন্তু আমরা নিজেরাই অসুখ নয় তো?”

পার্থ, এই ভাবে এবং এইভাবে ক্রমশ নিশ্চিত হয়ে পড়েছিল যে সে নিছক এক হত্যাকারী ছাড়া আর কিছু নয়। আর এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবে। কারণ, তার মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির আর মানুষের প্রতি কোনো দয়ামায়া অবশিষ্ট নেই। থাকতে পারে না। এই কথা রুমেলাকে বারবার বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পার্থ বলাই ছেড়ে দিয়েছিল। কারণ, রুমেলা স্থির করে নিয়েছিল এইসব কথায় আর সে পাত্তাই দেবে না। কথাগুলো যত সত্যই হোক না কেন, তা যদি ক্রমশ তার মনের ভিতরে গেঁড়ে বসে যায়, তাহলে তার পক্ষে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা মুশকিল।

ফলে, রুমেলা আর পাত্তা দিত না পার্থর এই সব কথাবার্তায়। পার্থও ক্রমশ একা হয়ে পড়তে শুরু করে নিজের ভিতরে ভিতরে। তার পক্ষে আর কারো সঙ্গে এইসব বিষয়ে আলোচনা করাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ক্রমশ এবং ক্রমশ তার মনে হয় একটি আরশোলা মায় একটি পিঁপড়েও তাকে ঘৃণা করছে। শুধু তাকে নয়, গোটা মানবসমাজকেই ঘৃণা করছে। কিন্তু এক আশ্চর্য লজিক অনুসরণ করে তাকেই বেছে নিয়েছে ঘৃণা প্রকাশের জন্য।

— এইসব তুমি কী লিখেছ পার্থ? সম্পাদক করুণ এবং কিছুটা রাগী চোখে তাকিয়েছিলেন পার্থর দিকে।

সম্পাদক শ্রী তরুণ সামন্ত। তাদের কাগজের সাহিত্যবিভাগের একজন নামজাদা লোক। নিজে ভালো গদ্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার। মানে, একধরনের ফিল গুড ব্যাপার তাঁর লেখার মধ্যে কাজ করায়, তাঁর লেখা বেশ পপুলার। পার্থ যে-দু-চারটে গল্প লিখতে পেরেছে, তার কারণ তরুণবাবুর সাহচর্য। তিনি পার্থকে যথেচ্ছ প্রশ্রয় দিয়েছেন। অবশ্য এও শুনিয়ে বা বুঝিয়ে দিতে ছাড়েননি, যে এইসব পরীক্ষামূলক লেখালেখিরও একটা সীমা আছে। গল্প থেকে বেরোতেই পারো তুমি, কিন্তু কাহিনি থেকে বেরিয়ে গেলে চলবে না। ফের তোমাকে ঘুরে আসতে হবে গল্পের ভিতরেই। কারণ, পাঠক শেষ পর্যন্ত একটা নিটোল গল্প চায়।

শেষ পাতা

Spread the love