গল্প

আদিদেব মুখোপাধ্যায়

এখন ভস্মের অধ্যায় শেষ হচ্ছে

অনেকক্ষণ হয়ে গেল, আমি একভাবে শুয়ে আছি, নড়তে চড়তে পারছি না। চাইছিও কি নড়তে, হয়তো না। আমার পেটে আবছা ব্যথা ছড়িয়ে যাচ্ছে, কেন করছে ব্যথা?সাতসকালেই খারাপ কিছু খেয়েছি কি আমি? মনে পড়ছে না। ব্যথাটা ছড়িয়ে যাচ্ছে, ফিরে আসছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে ফের। এটা আসলে একটা ঘূর্ণি, একটা প্যাঁচানো রাস্তায় ব্যাপারটা চলে; ছড়িয়ে পড়া, ফিরে আসা, আবার ছড়িয়ে পড়ার পথে এটা শুরু আর শেষ আর ফিরে শুরু হতে থাকে, এটা, মানে এই ব্যথাটার কথা বলছি আরকী। ব্যথা আমাকে শুধু ব্যথার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, ব্যথার কথা মনে করাচ্ছে ঘূর্ণির কথা, ঘূর্ণি আবার ব্যথায় বদলে যাচ্ছে, ব্যথা আমায় আর অন্য কিছুই মনে করাচ্ছে না। রক্তশূন্যতায় শাদা একটা নিথর সিলিং, তার দিকে একভাবে চেয়ে আছি আমি। চোখের পাতাও কি পড়ছে, হয়তো পড়ছে, হয়তো পড়ছে না। কোনো কিছু স্থির করে মনে করতে যে কতদিন পারিনি। রোদের একটা রেখা নাক বরাবর চলে গ্যাছে, তার ভেতরে চকচকে ধুলো ঘুরে ঘুরে উঠছে। কোথায় পৌঁছেছে রেখাটা? আমি বলতে পারি না। আমি ঘাড় তুলতে পারি না, আমি নড়তে পারি না, আমি চড়তে পারি না, আমি চেয়ে থাকতে পারি কেবল। হয়তো রেখাটা কোথাও মিশে গ্যাছে। কিংবা হারিয়ে গ্যাছে। হয়তো সেখানে, যেখান থেকে ফোঁপানিটা উঠে উঠে আসছে। উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে। কোথায়? যেখান থেকে উঠে আসছে, সেখানেই কি? জানি না। কী করেই-বা জানব। দিক সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আচ্ছা, আমি কোথায় আছি? এই বালিশের নরম, এই বিছানার নরম আমায় ছুঁয়ে আছে। আমার ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে আমি তোমাকে কী বলব? যা কিছু নরম তাদের মধ্যে আমি শুয়ে থাকি আর ততটুকুই আমি বুঝি যতটুকু আমায় ছুঁয়ে থাকে? কিন্তু না, আমি এ-সব ভাবব না। আমি এখন মুখ ডুবিয়ে দিয়েছি আলোতে। তাপ শুষে নিচ্ছি। রক্ত কলকল করে উঠছে আমার মধ্যে, কোলাহলে আমি ভরে যাচ্ছি। ঘাসের মধ্যে নিবিড় একটা সাপ অতি ধীরে তার খোলস ছাড়ে আর স্থির হয়ে শুয়ে থাকে আর শুয়ে শুয়ে তোমার কথা ভাবে। তুমি, ওহ্‌ তুমি, সামান্য জিভ কাঁপানোর ক্ষমতাও আমার নেই, ফিশফিশ করা, তাও কি আছে, তোমার গাল অপর দিকে ফেরাতে কি আমায় হাত ব্যবহার করতে হবে? সহসা হাওয়া দিলে অন্ধকার দুলে দুলে ওঠে, ঘনত্ব পাতলা হয়ে আসে, অন্ধকারের প্রথম কণা তার দ্বিতীয় কণার থেকে আলগা হয়, সরে যায়, অপেক্ষাকৃত পাতলা অন্ধকার এসে সেই মাঝখানের জায়গা দখল করে নেয়। তুমি মুখ নীচু করে একভাবে বসে থাকো, নড়ো না, চড়ো না, চেরা চেরা শুকনো জিভ কেঁপে ওঠে। শিরশিরে হাওয়া দেয়, রেখা বেঁকে যায়, বিন্দুরা অবস্থান পালটায়, বক্রতলে বদলে যায় সমতল, বাতাস এসে বক্রিমার শূন্যতাকে ভরাট ও অবলুপ্ত করে। আমি নিঃশ্বাস চেপে রাখি। আড়াল থেকে গোয়েন্দা কিংবা চোরের মতো আমি দেখছি তোমায়। দেওয়ালের প্লাস্টারে নখগুলো বসে যাচ্ছে। বাস্তবতা সময়ের মধ্যে তার ঝুরিগুলো নামিয়ে দিয়েছে, ঝুরিরা ক্রমাগত নিজেদের বিন্যাস পালটাতে থাকে। সামান্য পালটে যাওয়া, ব্যাস, তাতেই স্মৃতি দুমড়ে যায়, আকার মুচড়ে যায়, অস্ফুটে কঁকিয়ে ওঠার শব্দ আসে। এতক্ষণের নৈঃশব্দ্য ভেঙে পড়ে। ইতস্তত পড়ে থাকে মুহূর্ত, মাড়িয়ে এগোলে তারা কাচ ফেটে যাওয়ার শব্দ করে ওঠে। আস্তে আস্তে তোমার চুল ছড়িয়ে পড়ে আর মিশে যেতে থাকে নরম অন্ধকারে। সাপ নড়েচড়ে ওঠে, ঘাসের ওপর তার নিথর খোলসচিহ্ন পড়ে আছে। আমি কাঁপা কাঁপা আঙুল বাড়িয়ে দিই ভাঙা ছবিদের আর অস্পষ্ট শব্দদের গুলিয়ে-যাওয়া দিকে। দপ্ করে লাফিয়ে ওঠে শিখা, অল্প অল্প অন্ধকার পুড়ে ছাই হয়ে ঝরে যেতে থাকে। আমার কামনা এখন জ্বলন্ত মোমবাতি হয়েছে, গলে-যাওয়া তার একটি ফোঁটা আসলে একটি অশ্রুবিন্দু, মোমবাতির গোড়ায় এসে অশ্রু জমে কামনা হতে থাকে। এই বদলে-যাওয়া দেখে অস্পষ্ট হেসে ওঠো তুমি। বা হয়তো ভুল দেখি, তুমি হাসছ না, শুধুই চেয়ে আছ, বা হয়তো হাসছ, বা আমি জানি না ঠিক। আলো-আঁধারিতে কেবলই ভ্রম তৈরি হয়। আমি আলতো করে ছুঁই তোমাকে। পাথরের ঠান্ডা উঠে আসে আঙুলের ডগায়। আবার হাওয়া দেয়, ঘুরে ঘুরে ওঠে, আলোছায়া কাঁপতে কাঁপতে সন্ত্রস্ত দানব হয়ে যায়। আমি দু-হাত দিয়ে চেপে ধরি তোমার মুখ। নখ বসে যায় গালে। এটা কী, মুকুট, হ্যাঁ, মুকুটই তো। একটা কাঁটার মুকুট পরানো তোমার মাথায়, কে পরিয়েছে, কেন পরিয়েছে? আমি বুঝতে পারি না। থিরথির করে চেরা জিভ কেঁপে ওঠে। স্রিক স্রিক শব্দ হয়। টিক টিক করে একটা ঘড়ি কোথা থেকে প্রতিবাদ জানায়। দেখি, তোমার চোখের কোণা দিয়ে রক্ত নেমে আসছে। না-বলা ব্যথায় তোমার চামড়া নীল হয়ে গ্যাছে। আমি রোধ অনুভব করি। গরাদের মতো সে জেগে ওঠে, সর্বস্ব দিয়ে আমাকে নিরস্ত করে। আমি আমার রোগা হাতেদুটো দিয়ে শিক ধরে থাকি। শিকের ওপর বিদ্যুৎ পিছলে যেতে থাকে। ক্রুদ্ধ, ফোঁসফোঁস শব্দ ওঠে। ঘাসের ওপর দুটো নুড়ি রৌদ্রে ঝকঝক করতে থাকে। আমার কামনার জ্বলন্ত শীর্ষ আমি হাতের আড়ালে ধরি। বাতাসের অভাবে সে ছটফট করে। নিভে যায়। লুপ্ত চরাচরে আমি একা, একমাত্র অস্তিত্ব বজায় রাখি। শুধু অস্তিত্ব, যার দৈর্ঘ্য নেই, প্রস্থ নেই, হয়তো উচ্চতাও নেই। হয়তো সে বিন্দুর মতো, কে জানে, আমি বুঝতে পারি না। সে কি স্থির, না কি সে অসীমের দিকে উঠে যাচ্ছে, না কি ঢুকে আসছে এক অতল কুয়োয়? আমি নিশ্চিত হতে পারি না। হয়তো আমি শুধুই একটা বিন্দু, কেবলই বিন্দু, যে-আমি একবিন্দু ব্যথা হয়ে বিন্দু-আমার ভেতরে ঢুকে পড়েছে কখন। অতলতা এক ঘূর্ণি, তার প্রথম বলয় থেকে অনন্ত বলয়ের দিকে ব্যথা নেমে আসে। ব্যথা স্থির হয়। ব্যথা উঠে আসতে থাকে। অসীম, অতল ও স্থিরতার মধ্যেকার যে-রাস্তা তার প্যাঁচগুলো আমার অস্তিত্ব কিংবা ব্যথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে থাকে। এই একঘেয়েমি আমাকে সহ্য করে নিতে হয়। এর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারি না। জিভ নাড়াতে পারি না। ফিশফিশ করতে পারি না। একটা ঘড়িও থাকে না যে, সময় জানব। আমাকে ছুঁয়ে থাকে নরম। সিলিং-এর রক্তশূন্যতায় তোমার মুখ কল্পনা করি। পারি না। একটা আঁচড়ও কাটতে পারি না। এটা আসলে একটা অনন্ত সাদা, অনন্ত শীতলতা, এখানে কোনো প্রশ্ন নেই, উত্তরও নেই, প্রশ্ন উত্তরের মাঝামাঝি কিছু, বিবৃতি, তাও কি আছে? হয়তো নেই। আঃ। নতুন করে কিছুই আর ভাবতে পারি না। ব্যথা শুধুই ব্যথা আর ঘূর্ণি হয়ে জেগে থাকে। শ্বাসপ্রশ্বাস জেগে থাকে শ্বাসপ্রশ্বাস হয়ে। রক্তের কোলাহল কোলাহলের বেশি কিছু বলে না। আমি বরং এক দুই তিন গুনি। মনে মনে। সংখ্যাগুলো সহসা থমকে দাঁড়ায়। সিঁড়ির ধাপে বুটের শব্দ, থমকে যায়। দরজায় আঘাতের শব্দ, এবার, এবার। গেস্টাপোরা এক্ষুণি ঢুকে পড়বে ঘরের ভেতর। একটা দুটো না, প্রতিটি সকালে এই ভয়ে তুমি ঘুমোতে পারতে না। মনস্তাত্বিক লাকঁ তোমার চিকিৎসা করেছিলেন। গেস্টাপোর কাছাকাছি একটা ফরাসি শব্দের মানে হল স্পর্শ। ছোঁয়া, কিন্তু আলতো করে। বেশ, তুমি তাহলে ঘুমিয়ে পড়ো এবার। বালিশের নরম তোমায় ছুঁয়ে থাকবে। ২০০২ সালে গুজরাতের একটি হাসপাতালে মুকেশ ঠাকুর আর বশির আহমেদ পাশাপাশি বেডে শুয়ে ছিল। তাদের রক্ত গড়িয়ে পরস্পর মিশে যাচ্ছিল মেঝেতে। তারা প্রায় একইরকম ছোঁয়া পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ছিল। শুধু শব্দের মানে পালটে দেওয়া। একটা চিহ্ন, তার ঈষৎ বদল। না, এ-সব কথা তোমার উদ্দেশে আমি বলি না। আমি জানি না আর কোনো কথার কোনো মানে আছে কি না। কথারা অতিদ্রুত কথা বাড়িয়ে তোলে। শূন্যতাকে দুমড়ে দেয়। নৈঃশব্দ্যকে ভেঙে ফ্যালে। থাক, বরং মুহূর্তেরা মুহূর্তের মতোই থাক। তাদের কথায় বদলে দিও না। অর্থ খোঁজা এক ভয়াবহ জুয়োখেলা। ঐ আড্ডায় আমি আর কিছুতেই যাব না। এরা কোথা থেকে উঠে আসছে, এইসব কথারা? আমি বলতে পারি না। হয়তো যেখানে আবার এরা মিশে যাবে সেখান থেকেই। আমি জানি না। আমি বিড়বিড় করতে পারি না। আমি নড়তে চড়তে পারি না। ফিশফিশ করতে? তাও না। আমি শুধু তোমার কথা ভাবতে থাকি। হায় তুমি, সর্বত্র তুমি ব্যাপন করে আছ, সুতরাং সবকিছু তুমিই হয়েছ। আবার সবকিছুরই রূপ হয়ে তুমি বসে আছ নরম অন্ধকারের কেন্দ্রে। তোমার গাল কী করে ছোঁব আমি, কী করে বসিয়ে দেব নখ? তোমার চোখের রক্ত কী করে আমি মুছে নেব কাঁপা কাঁপা আঙুলে? দ্যাখ, আমার কামনা কখন বদলে গ্যাছে প্রেমে, আমার প্রেম তার নিষ্কম্প শীর্ষে উদাসীনতা হয়ে জ্বলে আছে। তোমার দিকে এবার একটু ঝুঁকে পড়ি আমি, প্রথমবারের মতো লক্ষ করি এটা একটা হুইলচেয়ার, যার ওপর তুমি বসে। এখানে কি ভূমিকম্প হয়েছিল কোনো? মেঝে ফাটলো কী করে? তোমার হুইলচেয়ার ঢুকে গ্যাছে মেঝেতে। আমি ঝুঁকে বসি আর দু-হাত দিয়ে তুলতে থাকি একটা চাকা। আমার ঘাম হয়, পরিশ্রম হয়। মনে হয় কেউ আমায় লক্ষ করছে আড়াল থেকে, কখন মুণ্ডু লুটিয়ে দেবে ভূঁয়ে। কই, চাকা তো এতটুকু উঠছে না! আমি আকুল হয়ে উঠি, গালি দিতে যাই নজরদারের উদ্দেশে, ডাকতে যাই তার নাম ধরে। থমকে যাই। রোধের গরাদ ওঠে। কিছুই মনে পড়ে না আমার। কার নাম, কাকে ডাকব, কী বলে ডাকব, কিছুই মনে আসে না। দু-মুঠোয় শিকের ধাতবতা, আমি চেয়ে থাকি। ঘাসের মধ্যে সাপ আবার তার মুখ নামিয়ে নেয়। রোদ্দুরে দুটো নুড়ি শুধু চকচক করে। আস্তে আস্তে আবার নরমে মিশে যাই। ধুলোরা এলোমেলো ঘুরে ওঠে। এক বিন্দু ব্যথা হয়ে ঢুকে আসি বিন্দুসত্তার ভেতরে। কী খাবার খেয়েছি মনে আসে না। হয়তো খাওয়াই হয়নি সকাল থেকে। জানি না। বুঝতে পারি না। ব্যথা শুধু ব্যথার কথা মনে পড়িয়ে দেয়। ঘূর্ণি মনে পড়ায় ঘূর্ণির কথা। ব্যথা আর ঘূর্ণি কখন একাকার হয়ে যায়। বাস্তবতা সময়ের মধ্যে তার ঝুরিগুলো নামিয়ে দিয়েছে, তাদের বিন্যাস প্রতি পলে বদলে বদলে যায়। রক্তশূন্য সিলিং তার রক্তশূন্যতায় ছড়িয়ে থাকে। প্রশ্ন ও উত্তরের অতীত তার শীতলতা, তার অবরোধ। তারই মধ্যে চূড়ান্ত বিবৃতি খুঁজি। মেলে না। ও কার ফোঁপানি? বুঝতে পারি না। ভাঙা ছবি আর অস্পষ্ট শব্দেরা একটু একটু করে মুছে যায়। শ্যাওলায় আচ্ছন্ন প্রাচীন কুয়ো দিয়ে আমি অতলতার দিকে ঘুরে ঘুরে নেমে যেতে থাকি।

আদিদেব মুখোপাধ্যায়

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। ভালোবাসা সাহিত্য, সিনেমা আর ছবি। জন্ম ১৯৯৪। প্রকাশিত বই – ‘আমি ফাটিয়ে দেব’ (২০১৭), ‘ট্রায়ো’ (২০১৮), ‘আগামী পর্দায় দ্রষ্টব্য’ (২০১৯), ‘সমবেত আর্তনাদ’ (২০১৯), ‘ইডিপাসের বাচ্চা ইডিপাসকে দাদা বলে ডাকছে’ ( ২০২১ ) সম্পাদিত পত্রিকা— ‘তৃতীয় বিশ্ব’ (২০১৮)।

আমাদের নতুন বই