পাপড়ি রহমানের গল্প

জলময়ূরীর সংসার

মাদারজানি গ্রামের সকলে কালেভদ্রে কদমফুল চোখে দেখে! এ-তল্লাটেই কোনো কদমের গাছটাছ বিলকুল নাই। অথচ ঝুলমুলির কিনা খামাখাই কদমফুলের কথা স্মরণে আসে! তার সইয়েরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর ঝুলমুলির আঙুলে চোখ ধরা মেয়েটির কপালে তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আলতো টোকা মেরে যায়! ঝুলমুলি তাকে ছেড়ে দিলে সে চোখ কচলে তাকায়। কিন্তু কে তার কপালে টোকা দিয়ে গেছে সে তা কিছুতেই বলতে পারে না। এমনকী অনুমানও করতে পারে না।

ঝুলমুলি ফের অন্য একজন সইয়ের চোখ দুই হাতে আড়াল করে ডাক দেয়—

‘আয়রে আমার কদমফুল’

একই ফুলের নাম ধরে বারংবার ডাকাতে ‘ফুলটোক্কা’ খেলা ভণ্ডুল হয়ে যায়।

ঝুলমুলির সইয়েরা বিরক্ত হয়। কিন্তু তা তারা প্রকাশ করতে চায় না। ফলে খেলা কেন ভুণ্ডুল হল তা ঝুলমুলিও ধরতে পারে না। সইয়েরা ঘরে ফেরার কালে আড়নয়নে ঝুলমুলির বিনুনির আগার পদ্মফুলের দুলুনি দেখে। বিকেলের মরা আলোতে ফুলটা ততক্ষণে নেতিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঝুলমুলির গায়ের কুচকুচে কালো রংকে ওই ফুলটাই যেন গোলাপি আভাযুক্ত করে তুলেছে! মাদারজানির সকলেই দেখে, ছলিমুদ্দির কুচকুচে কালো মেয়েটা হঠাৎ করে গোলাপি রঙে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে!

বাঘিয়ার বিলে হঠাৎ করে এতসব ভজঘট শুরু হয় যে, ছলিমুদ্দির তৃতীয় মেয়েটির কথা মাদারজানির লোকেরা প্রায় বিস্মৃত হয়ে যায়। এমনকী তার বিনুনির আগায় দেখা নেতানো পদ্মফুলের কথাও তাদের আর স্মরণ হয় না! বা হঠাৎ করে কেন তার কুচকুচে কালো মুখে গোলাপি আভা ফুটে উঠেছিল, সে-কথাও তাদের আর মনে থাকে না! অবশ্য ঝুলমুলির কথা বিস্মৃত না হয়ে তাদের উপায়ও থাকে না। কারণ, ততদিনে বাঘিয়ার বিলের পদ্মবনে নতুন কিছু পক্ষীর আগমন ঘটেছে। পানকৌড়ি, কানিবক আর ধলাবকের মাঝে ওইসব পক্ষীরা মাথা নেড়ে নেড়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের মাথায় ময়ূরের মতো ঝুঁটি আর লেজের দিকে ছড়ানো পুচ্ছও তখন নেচে ওঠে! এই পাখিগুলার গায়ে্র বরণ কোকিলের মতো কালো। কিন্তু কণ্ঠ বেসুরো! তারা পদ্মফুলের পাপড়ি খেয়ে বেঁচে থাকে। পদ্মপাতা জোড়া দিয়ে সংসার পাতে। পদ্মের বড়োসড়ো পাতার উপর তিড়িংবিড়িং করে নেচে বেড়ায়। আর জোড়া বেঁধে মিলন হলে নারী পাখিটার ডিম দিতে লাগে চব্বিশ দিন। এই চব্বিশ দিনই থাকে তার সংসারের আয়ু। ডিম পাড়া সারা হলে সংসার ফেলে অন্য পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে যায়। তখন নারীটির পরিত্যক্ত পুরুষসঙ্গীটি আর কী করে? নিয়ম করে সে-ই ডিমে তা দেয়। তা দিয়ে দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। মাদারজানির লোকেরা এমন আজব-গজব কায়-কারবার দেখে একেবারে তবদা মেরে যায়! ইতোপূর্বে এমন করে বিল জুড়ে পদ্মফুল ফুটতে তারা দেখে নাই। এমনকী ডিম না-ফুটিয়ে অন্য পুরুষের প্রতি আসক্ত পক্ষীও তারা দেখে নাই!

ঝুলমুলির চোখে বিস্ময়ের পাহাড় জমতে থাকে।

মেয়ের আনমনা ভাব লক্ষ করে আম্বিয়া খাতুন কী ভাবে সেই জানে? সে নিজ থেকেই মেয়েকে বলে— এইগুলা হইল জলময়ূরী। পানির মইদ্যে সংসার পাতে। পানিতই সংসার ভাঙে। ফের পানিতেই পয়দা দেয়। পানির ফুল খাইয়াই এরা বাঁইচা থাহে।

ঝুলমুলির চক্ষে তখন বিস্ময় গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। বাঘিয়ার বিলের রহস্য দেখতে দেখতে সে এতটাই বেভুলো হয় যে, নিজের তলপেটটা কখন ঢিবি হয়ে ওঠে সে খেয়াল করে না। ঢিবি হতে হতে ফুলে ওঠে। এতটাই ফুলে ওঠে যে, ঝুলমুলি সেই পেটের আড়ালে পড়ে যাওয়া নিজের দুইখানা পা-ও দেখতে পায় না।

আম্বিয়া খাতুন একদিন মেয়ের ওই বেঢপ পেট দেখে চমকে ওঠে!

ঝুলমুলির ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে কী ভাবে সেই জানে?

ঝুলমুলির কালো শরীরে মারের দাগ স্পষ্ট বুঝা না গেলেও কালসিটে চিহ্ন দেখে মাদারজানির লোকেরা জড়ো হয়ে যায়। ঝুলমুলিকে এমন মারধর কে করল তা জানতে তারা ছলিমুদ্দির উঠানে ভিড় জমায়। এত লোকজনের জমায়েত দেখে ঝুলমুলির মনে হয়— আইচ্ছা বিলের বাড়ন্ত পানির বেবাক কি আমাগোরে উডানে ঢুইক্যা পড়ল? নইলে এমুন কইরা ঢেউয়ের শব্দ হুনা যাইতাছে ক্যান?

ঝুলমুলি যাকে ঢেউয়ের শব্দ মনে করে তা আদতে আম্বিয়া বেগমের কান্না। মুখের ভেতর আঁচল গুঁজে দিয়ে সে চাপা কণ্ঠে কেঁদে চলে আর বলে—

হায় হায় গো! আমাগোরে এত বড়ো সব্বোনাশ কে করল গো?

অকস্মাৎ মাদারজানির লোকেদের ঝুলমুলির বিনুনির কথা মনে পড়ে। লম্বা বিনুনির আগায় ঝুলন্ত পদ্মফুলের কথা মনে পড়ে। এবং সেই সাথে তারা এটাও স্মরণ করতে পারে যে, একদা ছলিমুদ্দির কন্যা ঝুলমুলির মুখমণ্ডলে গোলাপি আভা দেখা দিয়েছিল। যার ফলে ছলিমুদ্দির কালোকিষ্টি মেয়েটা অপূর্ব লাবণ্যে ঝলমল করে উঠেছিল।


মাদারজানি গ্রামের লোকেরা যা হোক একটা কিছু বিহিতের চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয় না। ইস্কান্দারও অবশ্য প্রথম প্রথম কিছুই স্বীকার করতেই চাইল না। সেও নানান কিছুর দোহাই দিতে থাকে। যেমন—

দেইহুন তহন এমুন মাছ উজাইয়া আইল, ঝাঁকে ঝাঁক মাছ। এত মাছ! আমি তো কস্মিনকালেও এত মাছ দেহি নাই। এমুন মাছের আমদানি দেইখ্যা আমার মাথাত কিছু গণ্ডগোল পাহাইয়া থাকতে পারে। আমার কাছে তহন ওই কালি ঝুলমুলিরেই কিনা এক্করে পরি মনত অইছিল! দেইহুন মাইনষের হগল কামেই মাইনষের আত থাহে নাহি? এই যে বাঘিয়ার বিল পদ্মফুলে সয়লাব অইয়া গেল এইডাও তো আঁতকা ঘটনা মানে কুনু গায়েবী ব্যাপারেও অইতে পারে! তাই আমিও হয়তো মাছেগুলার কারবারে বা পদ্মফুলের ঘোরে পইড়া এই কামডা কইরা ফেলাইতে পারি।

মাদারজানির লোকেরা তখন একসাথে কথা বলে উঠে। এত লোক কথা বললে কিছুই বুঝার উপায় থাকে না, শুধু গমগম শব্দ শোনা যায়। আর ইস্কান্দার পলকে বুঝে যায় ঘটনা গুরতর! অবশ্য এমনও হতে পারে যে, সে হয়তো ঝুলমুলির ম্লান-মলিন-ক্লান্ত চেহারা দেখে নিজের সংযুক্তি স্বীকার করে নেয়। হয়তো ঝুলমুলির গর্ভস্থ শিশুটির জন্য তার মন দয়ার্দ্র হয়ে ওঠে। বা ঝুলমুলির নিঃশব্দ অশ্রুপাত তাকে বিচলিত করে তোলে! ইস্কান্দার নিজের সন্তানের জন্য এক অনির্বচনীয় অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে ঘটনার ইতি ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সালিসি ক্রমশ নিষ্পত্তির দিকে এগোতে থাকলে জমির চেয়ারম্যান একেবারে বেঁকে বসে। ওই চালচুলাহীন ছলিমুদ্দির মেয়ে কোনোদিন তার ছেলের বউ হতে পারে না। সে ইস্কান্দারকে তেড়েফুঁড়ে মারতে গেলে গ্রামবাসী বাধা দেয়।

আরে করতাছুইন কী? ভাই না ভালা, হোনেন এইবার মাতাডা ঠান্ডা কইরা ভাইব্যা দেহুন। এহন এই মাইয়াডার গতিক কী অইব? মাইয়াডার তো জলে কুম্ভির আর ডাঙ্গায় বাঘ খাড়াইয়া রইছে। মাইয়াডা অহন যাইব কই?

লোকজনের এইসব উপযাচক কথাবার্তায় উপশম কিছু হয় না, উলটা চেয়ারম্যানের মেজাজ টঙ হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু জনরোষের ভয়ে তেমন গলা চড়ে না তার।

বাপের তোপের মুখে দাঁড়িয়ে ইস্কান্দার রা করতে পারে না। যেহেতু সেও এখনও বেকার, বিষয়টা সহসা সে একাকী সামলাতে পারবে তেমনও তার মনে হয় না। প্রায় বোবা হয়ে থাকা ইস্কান্দারকে জমির চেয়ারম্যান প্রায় হিড়িহিড়িয়ে টেনে নিয়ে যায়। কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ সে দেয় না! ইস্কান্দারও ঠিক সদ্যোজাত বাছুরের মতো বাপের পিছু পিছু হেঁটে চলে যায়। ইস্কান্দার জানে, জমির মিয়া এই বিষয় কিছুতেই মেনে নেবে না! ছলিমুদ্দির হাড়হাভাতে ঘরের ওই কালোকোলো মেয়েকে সে পুত্রবধূ রূপে কিছুতেই গ্রহণ করবে না।

জমির চেয়ারম্যান সত্য সত্যই তার রোখ থেকে এক পা-ও নড়ে না। মাদারজানির লোকেরা বিষম সংকটে পতিত হয়। এক্ষণে তারা কী করবে? ছলিমুদ্দির পাশে গ্রামের দুই/একজন দাড়িয়ে যায়। মেম্বার লস্করের পুত্র তাজুল লস্করও দাঁড়িয়ে যায়। সে-ই দুই/একজন সাংবাদিকের সাথে কথা বলে ঝুলমুলিকে মামলা ঠুকতে বলে। মামলা করার সংবাদ শুনে জমির চেয়ারম্যান রাতের অন্ধকারে ছলিমুদ্দির বাড়িতে আসে। যা হোক কিছু একটা যদি দফা রফা করা যায়— কোর্টকাছারি বড়ো হুজ্জতের ব্যাপার।

আম্বিয়া খাতুন আঁচলে মুখ ঢেকে বিনবিনিয়ে কাঁদে। এত বড়ো সব্বোনাশ কি টেকা দিয়াফয়সালা করন যায় নাহি? চেয়ারম্যান সাহেব কী কয় এইগুলা? মাইয়াডা এম্নেই কালা। এত বড়ো কলংকের পরে তারে আর বিয়া করব কেডায়?

রাগে-দুঃখে অপমানে আম্বিয়া খাতুন ঝুলমুলির পিঠে গাম্মুরগুম্মুর করে দুই ঘা বসিয়ে দেয়।

মরারশুকির কপালে কি আজরাইলও জুটে না? যা মর গিয়া। গলায় দড়ি দিয়া মর গিয়া। আমারই দুষ। আমিই তোরে আস্কারা দিয়া মাতায় উডাইছি।

ঝুলমুলি বুঝতে পারে না মা কেন তাকে মরতে বলছে? সে মারা গেলে গর্ভের বাচ্চাটার কী হবে? তাহলে তো সেও মারা যাবে।

বাংলা সিনেমায় কতবার সে দেখেছে নায়ক এসে ঠিকই নায়িকাকে উদ্ধার করে। ইস্কান্দার ঠিকই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। কিন্তু ঝুলমুলির এই আশা দিবাস্বপনের মতোই মিলিয়ে যায়। ইস্কান্দার আসে না। বদলে দুই লাখ টাকায় কিছু একটা রফা হয়। রফাটা কী হয় তা ঝুলমুলি জানতে পারে না।

আম্বিয়া খাতুনের ফোঁপানিও ক্রমে স্তিমিত হয়ে আসে। আঁচল চেপে কান্নার বদলে তার মুখে পানের রস টসটস করে।


চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পাওয়া সেই দুই লাখ টাকায় তরমুজের ফলন বাড়ে। তবে এই ফলন ছলিমুদ্দির জমিতে নয়। আম্বিয়া খাতুনের বোনের ছেলে শফিকুল্লাহ সুদের বিনিময়ে ওই টাকাটা নিয়ে তরমুজের ক্ষেতিতে লাগিয়েছে। ঝুলমুলির ইজ্জতের দামে তরমুজের কালচে রূপ পরিমিত মাটি-সারে খোলতাই হয়। সবুজ সবুজ পত্র-শাখা ফনফনিয়ে বাড়ে। শফিকুল্লাহ সেদিকে তাকিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলে!

এইবার ফলন ভালো অইলে খালুজানরে সুদের কিছু টেকা বেশি দিয়া আইমু। বাচ্চাডার খায়-খইরচা আছে। মাইয়াডাও ঘাড়ের উপর চাইপ্যা আছে।

ঝুলমুলির কোলে কুসুমকলি খলখলিয়ে হাসে। কুসুমকলির উচ্ছ্বল হাসির মাঝেই মাদারজানিতে ফের বাদলার কাল এসে পড়ে। আসমান ফুটো করে অবিরাম জল ঝরে পড়ে। আর বাঘিয়ার বিলে জল থইথই করে। কচুরিপানার বেগুনি রঙের ঘোর পাশ কাটিয়ে এন্তার পদ্মফুলও ফোটে। মাদারজানির জোয়ান ছেলে-ছোকরারা ফের জাল-পলো-বঁড়শি নিয়ে বিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেম্বারের তাগড়া ছেলে তাজুল লস্কর কই-শিঙ্গির ঝাঁক তুলে খালুই ভরে ফেলে। কই-শিঙ্গির সাথে সে কিছু ভুতকিয়া মাছ জালে তোলে। ওই ভুতকিয়া মাছ মারার কোন ফাঁকে জলে ডুব দিয়ে সে একটা পদ্মফুলও তুলে আনে। সেদিন ঝুলমুলির লম্বা বিনুনির আগায় ফের গোলাপি রঙের আভা দেখা দেয়।

মাদারজানির লোকেরা চমকে ওঠে! তাদের পলকে মনে পড়ে যায় ঝুলমুলির কন্যা কুসুমকলি জন্মানোর পূর্বে তারা এ-মতো দৃশ্য দেখেছিল!

বাঘিয়ার বিলের জলস্তম্ভ দেখে ঝুলমুলি ফের উদাস হয়। ঢেউয়ের পর ঢেউ দেখে সে আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকে। এবার তার বিনুনির আগায় ঘন ঘন পদ্মফুলের শোভা দেখা যায়। এর কয়েকদিন বাদেই চেয়ারম্যান বাড়িতে আচনক শিশুর কান্না শোনা যায়। শিশুর কান্না শুনে মাদারজানির লোকেরা উন্মুখ হয়ে ওই বাড়ির দিকে ধাবিত হয়।

একদিন মেম্বারের ছেলে তাজুল লস্করকে মাদারজানির কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এদিকে ছলিমুদ্দির কন্যা ঝুলমুলিকেও কোথাও কেউ দেখে না।

বাঘিয়ার বিলে আগের মতোই ঢেউয়ের পর ঢেউ ওঠে। ঢেউয়েরা যখন ভেঙে পড়ে তখন পদ্মফুলের ছেঁড়াখোঁড়া পাপড়ি ভাসতে দেখা যায়। আর পদ্মের বিশাল বিশাল সবুজ পাতার উপর জলময়ূরীরা আনন্দিত চিত্তে নেচে বেড়ায়…

প্রথম পাতা

পাপড়ি রহমানের গল্প

আমাদের নতুন বই