অরূপ চক্রবর্তীর ধারাবাহিক: জলসাঘর

প্রথম পর্ব

বরসে বাদরিয়া সাবন কী

‌‌”বরসে মুসলধার চহুঁ ঔর
‌কারি ঘটা ঘন গরজে মেহা
‌সিওরি পবন বহে জোর জোর
‌দামিনী দমকে জিয়া ঘবরাবে
‌ম‍্যাঁয় হু অকেলী ছতিয়াঁ ধড়কে
‌যাবো সতাবো ন মেরে চিতচোর”

‌বর্ষা মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে আসে পুঞ্জ পুঞ্জ কালো মেঘের দল, যেন কোনো বিরহকাতর অভিমানিনী তার এল চুলের রাশি সারা আকাশে ছড়িয়ে দিয়েছে। বর্ষার মেঘের বাহার ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করে থাকে। কখনো ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, কখনো নীলাভ কৃষ্ণ আবার কভু ধূসর । পূবালী বাতাস তার অভিমান, বিদ্যুৎ চমক তার ক্রোধ, বৃষ্টি যেন চোখের জল যা কখনো অতি বিলম্বিত লয়ে ঝিরঝির, কখনো মধ্যলয়ে রিমঝিম আবার কখনো অতি দ্রুত লয়ে মুষলধারায় ঝরে পড়ে। এরই সাথে কখনো পাখোয়াজে মত্ত তালে (১) বেজে ওঠে বজ্র ঘোষণা যার সাথে তাল মিল রেখে সৃষ্টি হয়েছে শাস্ত্রীয় সংগীতে ‘কড়ক বিজলী’ তানের (২)। সব মিলে বর্ষা ঋতু যেন খুব রোম্যান্টিক একটা অধ্যায় এবং সৃজনশীল মানুষের কাছে সৃষ্টির প্রেরণা।

আমাদের দেশের কবি, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্রকার ও সংগীতস্রষ্টাদের কাছে বর্ষা অতি প্রিয়। কত কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ছায়াছবিতে খণ্ড মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছে এই বর্ষাকে কেন্দ্র করে।

‌সংগীতস্রষ্টাদের কাছে বর্ষার অপর পরিচয় হল মল্লার (বা মলহার) অর্থাৎ মল হরণকারী যা বারিধারার সাথে সাথে ধরণীর ও মানুষের মন সজীব করে দেয়। মল্লারের ভিন্ন ভিন্ন রূপ আমাদের মনের নানান ভাব প্রকাশ করে থাকে। কতই না তার প্রকারভেদ!

‌মেঘ মল্লার, মিঞা কী মল্লার, দেশ মল্লার, রামদাসী মল্লার, সুরদাসী মল্লার, ধুঁরিয়া মল্লার, মীরাবাঈ কী মল্লার, চরজু কী মল্লার, নট মল্লার, মেঘ রঞ্জনী ইত্যাদি। আন্দোলিত কোমল গান্ধারের সাথে শুদ্ধ ও কোমল দুই নিষাদ, কখনো আন্দোলিত কোমল গান্ধার ও কোমল নিষাদ। কখনো-বা গান্ধার বর্জিত করে শুধুই আন্দোলিত কোমল নিষাদের আর্তি, সাথে ‘মা রে পা’ স্বরসংগতি মল্লারের রূপ ব্যক্ত করে। যে-বন্দেজ (বন্ধা হুয়া চীজ) বা বন্দীশ-টি গাওয়া হয় তাতে থাকে বর্ষার রূপ বর্ণনা। খেয়াল, ধ্রুপদ, ধামার— এই তিনধারার গান যে-কোনো রাগ-রাগিনীতেই গাওয়া হয়ে থাকে তবে মল্লারাশ্রিত রাগের বন্দীশে বর্ষার রূপ পাওয়া যায়। ঝুলা, কাজরি ইত্যাদি গান উপশাস্ত্রীয় সংগীত হিসাবে গণ্য করা হলেও মূলত এই গানগুলি উত্তর প্রদেশের লোকসংগীতের একটা ধারা যার মধ্যে বর্ষার রূপ বিধৃত রয়েছে। কখনো কেবলমাত্র বর্ষার রূপ বর্ণনা, কখনো বৃষ্টিধারায় স্নাত হয়ে বিদ্যুৎ ঝলকে পথের দিশা খুঁজে সবার অলক্ষ্যে দয়িতের কাছে মিলানাভিলাষী দয়িতার প্রেম অভিসার, রাধাকৃষ্ণের ঝুলনলীলা ইত্যাদি আমাদের কাব্যে ও সংগীতে বহুবার বিভিন্নভাবে উল্লিখিত আছে।

এই প্রসঙ্গে বিভিন্ন ধারার কিছু গানের প্রথম পঙক্তি নীচে উল্লেখ করলাম:

‌ধ্রুপদ:
‌১. আইয়ে ঘটা উমর ঘুমর
‌২. আয়িরী বরখা রুত চহুঁ ঔর
‌৩. জলধর আবত জল ভরে কারে কারে

‌ধমার (ধামার):
‌১. খেলন আয়ে হোরী বরখা
‌২. বরসত ঘনশ‍্যাম মৌর পঞ্ছী

‌খেয়াল:
‌১. গাজে রাজে ঘন গরজত অতি বরসত
‌২. কারে কারে বাদর আয়ে বরসন কো গগন ছায়ে
‌৩. কারি বদরিয়া ঘির ঘির আওয়ে
‌৪. বিজুরী চমকে বরসে মেহরবা আঈ বদরিয়া
‌৫. বোলরে পপৈহরা অব ঘন

‌কাজরি:
‌১. হরি বিন কারি বাদরিয়া ছায়ি
‌২. ভিজি জাউঁ ম্যাঁয় পিয়া
‌৩. বরসন লাগি বাদরিয়া
‌৪. লাগে বাদরিয়া মে সো গয়ি

‌ঝুলা:
‌১. ঝুলা ধীরে সে ঝুলাও
‌২. আজ দো ঝুলা ঝুলে
‌৩. দেখো সাঁওরি যে সঙ্গ গোরি ঝুলালে হিন্দোলা

‌রবীন্দ্র গান:
‌১. আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে
‌২. এসো নীপবনে ছায়াবীথি তলে
‌৩. আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার পরানসখা
‌৪. শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা নিশীথ যামিনী রে
‌৫. ঝর ঝর বরিষে বারিধারা
‌৬. গহন ঘন ছাইল গগন ঘনাইয়া
‌৭. হৃদয় আমার নাচিরে আজিকে ময়ূরের মতো
‌৮. বাদলমেঘে মাদল বাজে
‌৯. কদম্বেরি কানন ঘেরি আয়াঢ়মেঘের ছায়া খেলে
‌১০. শ্রাবণের গগনের গায় বিদ্যুৎ চমকিয়া যায়

‌নজরুলগীতি:
‌১. বরষা ঋতু এলো এল বিজয়ীর সাজে
‌২. স্নিগ্ধ শ্যামবেণী বর্ণা এসো মালবিকা
‌৩. মেঘের ডমরু ঘন বাজে
‌৪. রিমঝিম রিমঝিম ঘন দেয়া বরষে
‌৫. ছড়ায়ে বৃষ্টির বেলফুল দুলায়ে মেঘলা চাঁচর চুল
‌৬. এল শ্যামল কিশোর তমাল ডালে বাঁধ ঝুলনা
‌৭. কাজরী গাহিয়া এসো গোপললনা
‌৮. গগনে কৃষ্ণমেঘ দোলে কিশোর কৃষ্ণ দোলে বৃন্দাবনে

অতুল প্রসাদী:
‌১. বঁধূ এমন বাদলে তুমি কোথা
‌২. শ্রাবণ ঝুলাতে বাদলবাতে

‌দ্বিজেন্দ্রগীতি:
‌১. বরষা আইল ওই ঘনঘোর মেঘে

‌বাংলা বেসিক আধুনিক গান ও ছায়াছবির গানেও বর্ষা ধরা দিয়েছে বিভিন্ন গীতিকারের রচনায় এবং সেই রচনা পরিপুষ্ট হয়েছে সুরকারের ভাবনার জাদুস্পর্শে।

‌তার কয়েকটির উল্লেখ করা হল:
‌১. এমনি বরষা ছিল সেদিন (প্রণব রায়/কমল দাশগুপ্ত)
‌২. এই রিমঝিম ঝিম বরষা (সুধীন দাশগুপ্ত)
‌৩. রিমঝিম ঝিম বৃষ্টি (পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়/রতু
‌মুখোপাধ্যায়)
‌৪. ও বরষা রে সবাই তোকে বরণ করে এই আষাঢ়ে (জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়)
‌৫. বৃষ্টি এলো বৃষ্টি ও বৃষ্টি (সরিৎ সেনশর্মা/শ‍্যামল মিত্র)
‌৬. থৈ থৈ শাওন এল ওই (যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত/সুধীন দাশগুপ্ত)
‌৭. নাচ ময়ূরী নাচ রে (সুধীন দাশগুপ্ত)
‌৮. ওগো বরষা তুমি ঝরোনা গো ওমন জোরে (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার/নচিকেতা ঘোষ)
‌৯. টাপুর টুপুর সারা দুপুর নূপুর বাজায় (সুনীলবরণ/সুধীন দাশগুপ্ত)
‌১০. মেঘলা মেয়ে মেঘেরই সাজ পড়েছে (সুধীন দাশগুপ্ত)

ছায়াছবির গান:
‌১. এই মেঘলা দিনে একলা (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার/হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)
‌২. বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি এ কোন অপরূপ (বীরেশ্বর সরকার)
‌৩. এই বৃষ্টিতে কে ভিজবে সে এসো না (পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়/সুধীন দাশগুপ্ত)
‌৪. এই বৃষ্টিতে ভিজে মাটি (বীরেশ্বর সরকার)
‌৫. রিমিঝিমি রিমিঝিমি শ্রাবণের সুর (পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়/রবীন চট্টোপাধ্যায়)

এখানে উল্লিখিত গানের বাইরেও আরও শত শত গান রচিত হয়েছে বর্ষার এই মেদুর পরিবেশকে কেন্দ্র করে। সেই চর্যাপদের সময় থেকে শুরু হয়ে তানসেন, জয়দেব, চন্ডীদাস ইত্যাদি পদকর্তাদের সৃষ্টির পথ বেয়ে শতাব্দী পার হয়ে বর্তমান প্রজন্মেও বর্ষাকেন্দ্রিক সংগীতের ধারা বহমান। হয়তো তার প্রয়োগ সময়ের সাথে অনেকটাই আধুনিক হয়েছে।

এখন আমরা মল্লারের তেমনই আবেশ জড়িত সময় অতিবাহিত করছি ও তার সুর, রস ও ভাবে ঋদ্ধ হচ্ছি।

‌সমগ্র বিশ্বের আর কোনো সংগীতধারা এত গভীরভাবে মৌসুমী সুরের রসাস্বাদন করেছে কী? এর উত্তর আমার জানা নেই।

—————

‌১
মত্ত তাল: এটি ১৮ মাত্রার একটা তাল। এই তালের ৯টা বিভাগ এবং প্রতি বিভাগে ২টি করে মাত্রা আছে।

এই তালের মূল ঠেকা নীচে উল্লেখ করা হল:

‌ধা s । ঘি ড় । ন ক । ঘি ড় । ন ক ।
‌তি ট । ক ত । গ দ । গ ন ।


কড়ক বিজলি তান: এটি একটি অতি জটিল তান যার জন্য বিশেষভাবে কণ্ঠসাধনার প্রয়োজন হয়। অতি তারসপ্তক থেকে কর্কশ কণ্ঠধ্বনির সাহায্যে প্রচণ্ড গতিতে মধ্যসপ্তকের ষড়জে নেমে আসা এই তান শুনতে বজ্রপাতের সমতুল্য লাগে।

অরূপ চক্রবর্তীর ধারাবাহিক: জলসাঘর

আমাদের নতুন বই