অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম

ঘাস বিচালি ঘাস

(প্রথম পর্ব)

একটা জ্বর, সকাল থেকে ঘুরেফিরে এসে আদর করে যাচ্ছে করিমন বিবিকে। নিজেকে, নিয়মিত জ্বলে পুড়ে পিছন কালো হয়ে যাওয়া একটা হাঁড়ির মতো লাগছে করিমন বিবির। ভ্রূণের ভঙ্গিমায় গুঁটি পাকিয়ে মাদুরে লেপে আছে সে। পাশ ফিরলে এক্ষুনি তার গালে বালিশের ভাজের দাগ দেখা যাবে। সেই দাগটি অনেকক্ষণ এক নামহীন পানিহীন শুকনো খাতের নদী তৈরি করে রেখেছে করিমন বিবির গালে। করিমন বিবি থেকে থেকে পাশ ফেরে আর শুয়ে শুয়ে বেলা অবধি জ্বরের আদর খায়। তার মাথার ভিতর জ্বরটা গুনগুনিয়ে গেয়ে চলে— ‘ঘাস বিচালি ঘাস, ঘাস বিচালি ঘাস”- কোন কবি কোন অলুক্ষুনে মায়ায় এই লাইন লিখে ফেলেছিল মনে পড়ে না তার। কোথায়, কার মুখে সে এই লাইন শুনেছিল তাও মনে নেই, এমনকী এর আগে বা পরে যা যা সব ছিল তাও ভুলে গিয়েছে সে। জ্বরটা গপ গপ করে করিমন বিবির সমস্তটা গিলে ফেলছে। শুধু তার মনে পড়ছে, একদিন সে চেয়েছিল ফয়জুল রহমান তার দোরে ফিরে আসুক। একদিন সে গাছের নীচে বৃষ্টির আগের অন্ধকার হতে চেয়েছিল। একদিন সে জ্বর হতে চেয়েছিল মনে মনে, ভীষণ ভাবে। জ্বরে কিনা কে জানে, আঁখি ছলছল করে করিমন বিবির। সকাল থেকে একটা ম্যাও বিড়ালীর মতো জ্বর করিমন বিবির কোল আলো করে বসে থাকে।

এরই মধ্যে ছোটো মেয়ে থার্মোমিটার হাতে এল। কিছু না বলেই হাত তুলে তাকে বগল দেখিয়ে দিল করিমন বিবি। বগলের ঘন কালো ঘামভেজা লোমের মধ্যে থার্মোমিটারের মুখ গুঁজে দিয়ে ছোটো মেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল মিনিট খানেক। তারপর প্রাজ্ঞ চোখে আলোর দিকে থার্মোমিটার তুলে ধরে জ্বর মাপল কিছুক্ষণ। শেষে ঘর থেকে চলেও গেল যেভাবে সকলই যায়।
ঘাস বিচালি ঘাস করতে করতে হঠাৎ করে, কেন কে জানে, করিমন বিড়ালীর মন কু ডাকল। এক হাতে তলপেট চেপে ধরতেই বিষয়টা খোলতাই হল তার কাছে। দুম করে ঘেমে গেল করিমন বিবি। গান থেমে গিয়ে কানে বেজে উঠল সুলেইমান রেজার গলা। ‘গতরে পিরিতির ফুল ফুটাইও না য্যান!’, বলে সেই যে সুলেইমান রেজা দুবাই চলে গেল… আর আজ দুই মাস পর তলপেট চেপে ধরে করিমন বিবি আবিষ্কার করল, ‘গতরে পিরিতির ফুল ফুটচে!’ এতক্ষণ ঝিম মেরে থাকা চোখ ডাগর হয়ে উঠল। ড্যাব ড্যাব করে অজানার পানে চাইতেই সুলেইমান রেজার সে-রাতের বুলডোজারের কথা মনে পড়ে গেল করিমন বিবির। শিহরণ ফুরিয়ে যেতেই আবার সে ঝিমিয়ে গেল। না হওয়া মাসিকের হিসেব করতে করতে ঝিম মেরে এল করিমন বিবির গতরে, সাথে ফিরে এল ‘ঘাস বিচালি ঘাস’-এর বাজনা। সে-বাজনার তালে তালে জ্বর বেড়ে চলল, করিমন বিবি তলপেটে থাবা রেখে চক্ষু মুদে ছাড়ল এক দীর্ঘশ্বাস।

 চিত্র: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 চিত্র: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যে-বছর বন্যা হল, উঠোনের পেঁপে গাছ অবধি চলে এল পানি, সে-বছর থেকে রশিদা বেগম চলচ্ছক্তিহীন হয়েছেন। যেহেতু খোদাতালা এক দোর বন্ধ করলে অন্য খিড়কি খুলে দেন, তাই সে-বছর থেকেই কানে বেশি বেশি শুনতে শিখেছেন তিনি। রশিদা বেগম নিজের বিছানায় আট হাত-পাওয়ালা মাকড়শার মতো থেবড়ে বসে থেকে মাঝে মাঝে যেন মানুষের মনের কথাও শুনে ফেলেন। মানুষের মনের কথা শুনে ফেললে রশিদা বেগম বলে ওঠেন, ‘তওবা! তওবা!’ ছোটোমেয়ে জানতে চায়, ‘কী হইচে দাদি?’ রশিদা বেগম জবাব দেন না। বরং চুপচাপ এক টুকরো সুপুরি টুপ করে গালে পুরে মুখ বোজেন। আজ করিমন বিবির দীর্ঘশ্বাস তাঁর কান এড়াল না। বরং করিমন বিবির ওই দীর্ঘশ্বাস উতলা করে তুলল রশিদা বেগমকে। নিজের বিছানা থেকে বাজখাই স্বরে তিনি জানতে চাইলেন ‘কী রে কী অইচে, ঠিক আচচ নি?’
বাইরের ঘর থেকে করিমন ম্যাও অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফ্যাঁস করে উঠল। সেই ফ্যাঁস শুনে রশিদা বেগম চুপ করে গেলেও তাঁর কপাল কুঁচকে রইল। একটু পরে অস্ফুটে ‘ঘাস বিচালি ঘাস’-এর গান আবার শুনতে পেলেন তিনি। না চাইতেও আজকাল সহজে আশ্বস্ত হয়ে পড়েন রশিদা বেগম, সহজে উদ্বিগ্নও হয়ে যান, টের পান— তাঁর মন নরম হয়ে এসেছে। সকাল থেকে ‘ঘাস বিচালি ঘাস/ঘাস বিচালি ঘাস’-এর দোয়া তাকে আশ্বস্ত হতে বলে গেছে তাই তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন। কারণ, এ ছাড়া তাঁর আর কিছু করণীয় নেই। এই সময় ছোটোমেয়ে এসে এক গ্লাস দুধ আর ঔষধ রেখে গেল তাঁর সামনে। গরম দুধ। ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ধোঁয়ার দিকে চেয়ে থাকেন রশিদা বেগম। আজকাল অশরীরী বস্তুসমূহের প্রতি কেমন যেন অতিরিক্ত টান অনুভব করেন। এই যেমন বাইরের উঠোন জোড়া রোদ। ইচ্ছে করে,— উঠোনে চর্বির পাহাড়সমেত আদুর গায়ে রোদ জড়িয়ে-মড়িয়ে বসে থাকবেন। গভীর রাতে জানালা বেয়ে চোরের মতো চাঁদের আলো যখন চুপি চুপি ঘরে ঢুকে রশিদা বেগমের পায়ে এসে পড়ে, সেই অশরীরী স্পর্শে তাঁর ঘুম টুটে যায়। ইচ্ছে হয় জ্যোৎস্নার মধ্যে খোলা ছাদে লুটোপুটি খাবেন। এইসব ইচ্ছের কথা ভেবে শরম হলেও, হেমন্তে কুয়াশার দিন এলে রশিদা বেগম ছোটোমেয়েকে বলেন খিড়কি-দোর সব খুলে দিতে। ঘরের ভেতর ঝমঝমিয়ে শিশির পড়ার খোয়াব দেখেন তিনি। টমির ভুক-ভুক-ভৌ-ঘ্যাঁকর চিৎকার, টিউবলাইট ঘিরে শ্যামাপোকার হন্যে হওয়া, উল্টোদিকের দেওয়াল থেকে ঝুলে থাকা ছবির ভিতরের একরাম আলির চোখ নাক ঠোঁটের ক্রূঢ়তা বিবাহিত জীবনের ওপার হতে হিড়হিড় করে টানে রশিদা বেগমকে।
‘দাদি দুধ খাবানা?’
ছোটোমেয়ের কথায়, রশিদা বেগমের মুখের মধ্যে অলস মোটা কুমিরের মতো স্থবির জিব্বাটা নড়েচড়ে ওঠে, তাহার উপর ঔষধ রেখে, গ্লাসের গরম ধোঁয়াসমেত দুধ গলায় ঢেলে দেন রশিদা বেগম। গলা জ্বালাতে জ্বালাতে দুধ নেমে যায় তাঁর কণ্ঠনালী বেয়ে। নিজের পেটেও সেই উত্তাপের অস্তিত্ব টের পান তিনি। আজকাল যন্ত্রণা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে শিখেছেন রশিদা বেগম।
জাহা আরা দেখল রশিদা বেগমের চোখ মুখ কুঁচকে গেছে। তবু গরম দুধ গিলে চলেছেন তিনি। জাহান আরা একবার ভাবল মানা করবে কি না, কিন্তু তার মন বলে উঠল,— ‘দহন তো প্রত্যেকের একার।’ রশিদা বেগম এ-কথা শুনে ফেলে বেদম ঝিম মেরে গেলেন। বাইরের রোদে টমিটাও ঝিমিয়ে গেছে কখন। ঘরের আসবাব, আলনার পোশাক আসাক, হেঁশেলের হাঁড়ি পাতিল— সমস্তই ঝিমিয়ে আছে। এই অবেলায় কোনো জ্ঞাতি এলে মনে করবে এ-বাড়ির সকলকেই যেন আফিমে খেয়েছে।
দুধ শেষ হতে গ্লাস নিয়ে রান্নাঘরে ফিরে এল জাহান আরা। দরজা-জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে একবার দেখে নিল কেউ তাকে দেখছে কি না। তারপর ধীরে ধীরে সালোয়ারের বুকের প্রথম দুটো হুক খুলে বাঁ-দিকের বুকের পোড়া, গোল দাগটার পানে চেয়ে রইল।
বুকের দাগও ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছে জাহান আরার পানে।
জাহান আরা তাকে জিগালো, ‘ও দাগ, তুমি কেমন আছ?’
বুকের দাগ বোবা। গোল দাগটা হাঁ করে হাবার মতো চেয়েই আছে পৃথিবীর দিকে। তার উপর আদরের আঙুল বোলায় জাহান আরা আর ফিসফিস করে বলে, ‘ও দাগ, তুমি কী দেখো? কাকে দেখো? এত মন দিয়ে?’

একটা কাক এসে বসেছে শ্যাওলা ধরা পাঁচিলে। কী চায় কাক? দুপুরে জ্বর ছেড়ে যেতে করিমন ম্যাও আবার করিমন বিবি হয়ে পড়েছে। এখন তার নজর কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে পাঁচিলের কাকের ওপর। বহুদিন, অকারণ কোনোকিছু আর সহ্য হয় না করিমন বিবির। তার মন আজকাল কাকের বসে থাকার পিছনেও অভিসন্ধি খোঁজে। এ-সব কথা জানলে বড়ো মেয়ের ভ্রূ কুঁচকে যেত, কিছু থান ইট কথা করিমন বিবিকে শুনতে হত। কিন্তু এখন বড়ো মেয়ে অফিসে। বড়ো মেয়ের ভ্রূও অফিসেই। অতএব করিমন বিবি মন দিয়ে কাকের অভিসন্ধি সম্পর্কে ভাবতে পারে। দেখতে পারে, কাকটা লম্বা কালো ঠোঁট নিজের পেটের ভিতর ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছে আর ছোটো ছোটো পালক খুঁটে খুঁটে বের করে আনছে। পালকের ভিড় ঠেলে ঠোঁটের এই অবাধ যাতায়াত দেখতে দেখতে করিমন বিবির মনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। কাকটা কি তবে কিছু ঈশারা করছে?
‘ঘাস বিচালি ঘাস’-এর দোয়া থমকে গেছে কখন, করিমন বিবি জানে না। এক মনে কাক দেখতে দেখতে করিমন বিবির ঘাড় সামনের দিকে হেলে যাচ্ছে। বাইরে থেকে তাকে দেখতে লাগছে অবিকল এক পোড়খাওয়া সাপের মতো। অন্যমনস্ক অথচ নিবিষ্ট সর্প। করিমন সাপ হাঁ করে কাকের পেট খোঁচানো দেখে। দেখতে দেখতে তার মুখ থেকে লকলকে, দ্বিধা, অন্যমনস্ক জিহ্বা বেরিয়ে আসতে থাকে। নিজে থেকেই তার মাথার ভেতরে শুরু হয় নতুন গান,—
‘লকলক শরবন, বক তায় মগ্ন/চুপচাপ চারদিক, সন্ধ্যার লগ্ন।।’

ছোটোমেয়ে এই শেষবেলায় কাজ সেরে বুকের ওপর পড়ার বই রেখে শুয়ে লুবোর কথা ভাবছে। লুবোর পেশীবহুল দেহের সাথে নিষ্পাপ বেমানান চোখদুটোর কথা ভাবতে ভাবতে একসময় পড়ার বই ছোটোমেয়ের বুকের ওপর নিদ্রা যায়। আর পড়ার বইয়ের নীচে ছোটো মেয়ের বাম হাত নাইটির গভীর অন্ধকারের দিকে ধেয়ে চলে। ঠিক তখনই, বাইরে উঠোনের রোদে ধুকতে থাকা টমির ঝিমুনি কেটে যায় ব্যস্ত একটা পায়ের আওয়াজে। মুখ তুলে সে চেয়ে দেখে এ-বাড়ির মেয়েমানুষ করিমন এক ছুটে ফটকের দরজা পার করে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে গেল। টমি অবাক হয়। অবাক হলে কুকুরদের মুখ করুণ হয়ে আসে। করুণ চোখে টমি দেখে, তাকে পাত্তা না দিয়েই আজ করিমন বিবি নিজের খেয়ালে কোথায় যেন চলল,— তা কেউ টমিকে বোঝাতে পারে না। পাত্তা না পাওয়ায় টমি বেকুব ও আশাহত চোখে চেয়ে রইল রাস্তার পানে।

Spread the love

11 Comments

  • এমন গদ্য বারবার পড়তে ইচ্ছে করে।

    শতানীক রায়,
    • ভালোবাসা জেনো

      অলোকপর্ণা,
  • আফেমী ঘোর কেমন হয় তা শুনেছি,কিন্তু তোমার লেখা পড়লে বুঝি ফের নেশা কেনো চায় মন। এই ঘোরটার জন্যই।
    খুব ভালো মিশিয়েছো,
    আবারও রইলাম নতুন ঘোর এর অপেক্ষায়।

    নীলা,
    • ধন্যবাদ ধন্যবাদ

      অলোকপর্ণা,
  • পড়িয়ে নেবে বোধহয় তোমার উপন্যাসটি। অসাধারণ!

    দেবাশিস বিশ্বাস,
    • ধন্যবাদ

      অলোকপর্ণা,
  • আগ্রহ বাড়ল

    শিবসাগর দেবনাথ,
  • দারুণ এগোচ্ছে। নামকরণ সার্থক। আফিমগ্রস্ত হয়ে গিললাম।

    শীর্ষা মণ্ডল,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *