লেখক নয় , লেখাই মূলধন

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (তৃতীয় পর্ব)

একতলা হাতি আর ইঁদুরের

আজ খুশির ঈদ। মদিনার ঘরে ঘরে আনন্দ! আজ রশিদা বেগমের শোকের দিন। আজ রশিদা বেগমের বড়ো ছেলে, বড়ো মেয়ে ছোটো মেয়ের বাপ,— ফয়জুল রহমানের অন্তর্ধান দিবস। যেন সহস্র বছর পূর্বে আজকের একফালি চাঁদের এই বিশেষ দিনটিতে খালি পায়ে সাইকেলে চড়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ফয়জুল রহমান। চটি-জুতো পড়ে ছিল দুয়ারে। মানিব্যাগ, পকেটচিরুনি, হাতঘড়ি, রুমাল দেরাজে ঠায় বসে ছিল একে-অপরের পানে চেয়ে। সকাল হতে করিমন বিবির কান্নায় ঘুম ভেঙেছিল পাড়া পড়শির। বড়ো মেয়ে, ছোটো মেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে এসে দেখতে পেয়েছিল চিরকুট হাতে দাঁড়িয়ে, তেল ফুরিয়ে আসা হ্যারিকেনের শিখার মতো দপদপ করে কাঁপতে থাকা করিমন বিবিকে। বড়ো মেয়ে এগিয়ে এসে নিভে যাওয়া করিমন হ্যারিকেনের হাত থেকে চিরকুটটা টেনে নিয়ে দেখেছিল, ওতে লেখা,—
‘চললাম। আমার খোঁজ কোরো না।’
পড়া মাত্র সহস্র বছর পূর্বের সেই সকালে দাঁড়িয়ে বড়ো মেয়ে বুঝে গিয়েছিল, চিরকুটে ‘আমি’ বলতে কাকে বোঝানো হচ্ছে। কার এমন মন উচাটন হতে পারে রোশন আরা সেই বয়সেও জানত।
পরে সে বহুবার ভেবেছে, আব্বু কেন ‘খোঁজ কোরো না’ লিখেছে! যদি আব্বু লিখত, ‘আমায় খুঁজো না’, তাহলে অর্থ অন্যরকম হত। তাহলে বোঝান যেত যে, আব্বু ধারেকাছেই কোথাও যেন অভিমান করে লুকিয়ে রয়েছে। একটু খুঁজলেই, একটু ডাকলেই বেরিয়ে এসে বলবে, ‘এই তো আমি!’
‘খোঁজ করা’-র মধ্যে এই প্রকার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। অভিমান নেই। অর্থাৎ আব্বু নেই। ‘করা’ শব্দটা কীভাবে সমস্ত আবেগ মুছে দিয়ে গোটা বিষয়টাকে মেহনতি করে দিয়েছে,— বড়ো মেয়ে ভাবে। মানুষ কীভাবে গায়েব হয়ে যায়, মানুষ কীভাবে নেই হয়ে যায়, তা ফয়জুল রহমানকে দেখে জেনেছে রোশন আরারা।
ঈদের দিনে রোশন আরা সকাল সকাল যে-কোনো একটা বই হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে পুকুর পাড়ে এসে বসে। পায়ের কাছে মশা মারার কয়েল ধ্যান করে। ধোঁয়া ওড়ায়। গন্ধ বিলোয়। কিন্তু মশা মারে না। রোশন আরার মনে পড়ে একদিন আব্বুর হাত ধরে মেলায় যাওয়া হয়েছিল, অনেক বায়নার পর রঙিন হাওয়াই মিঠাই খাওয়া হয়েছিল। একদিন আব্বুর কোলে বসে ভাত খেয়েছিল কোনো এক রোশন আরা,— যাকে সে আর চিনতে পারে না। একদিন আব্বু তাকে ইস্কুলে দিয়ে এসেছিল। একদিন। একদিন। একদিন।— এই সব একদিনের জন্য বেঁচে থাকা পতঙ্গ টুকরোদের মনে করার দিন আজ। আজ খুশির ঈদ। রোশন আরা চুপ করে পুকুরের পানিতে তাকিয়ে থাকে। বুদ্বুদ দেখে। গোল গোল ঢেউ দেখে। রোদ পড়ে চকচক করতে থাকা মাকড়শার আঁশ দেখে, পানিতে ভেসে থাকা ডাব দেখে। আর মশা মারে। হাত পা ফুলে যায়। চামড়া গোল হয়ে ফুলে ওঠে। তার উপর নখ দিয়ে যোগ চিহ্ন, বিয়োগ চিহ্ন এঁকে দেয় রোশন আরা। জীবন থেকে আব্বু বিয়োগ হয়ে যায়, মশার কয়েল যোগ হয়, পুকুর পাড় যোগ হয়, ঊরুতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরানের গহীন ভিতর’। রোশন আরা পুকুর পাড়ে বসে তীব্র চিক্কুর দিয়ে ওঠে। অথচ বাইরে থেকে কোনো শব্দ শোনা যায় না। ঘরের ভিতরে তসবি জপতে থাকা রশিদা বেগম সেই চিৎকারের অভিঘাতে একটু টলে যান বটে। তীব্র চিৎকারের মধ্যে মশার কামড়ে হাত পা চুলকায় রোশন আরার। হাত পা চুলকাতে চুলকাতে চিৎকার করে চলে সে। নখের আঁচড়ে তার হাত পা ডোরাকাটা হয়ে যায়। চামড়া জ্বালা করে। তবু চিৎকার থামে না। রোশন আরার ভিতরে চিৎকার প্রলম্বিত হয়। পানির উপর চুপ করে বসে থাকে ফড়িং। কোনোদিন ডুবে যায় না।

‘নামাজ কালাম করে না যে নারী তার উপর আল্লার গজব বর্ষে!’, বাজখাই স্বরে নিজস্ব নিদান দেন রশিদা বেগম। কার প্রতি দেন তা তিনিই জানেন। জীবন যখন শুকায়ে যায়, তখন রশিদা বেগমের মনে দ্বিধা আসে। জীবনের দিকে তাকিয়ে রশিদা বেগম ভয় পান। সন্দেহের দৃষ্টিতে নিজের যাপিত জীবনকে তাঁর আগাগোড়া মিথ্যে বলে মনে হয়। জিব্বা তিতা তিতা লাগে। গলা শুকিয়ে কারবালা হয়ে যায়। বিছানার পাশের টেবিলে রাখা ব্যক্তিগত পানির জগ, ওজনের ভুলে ঝট করে তাকে তুলে বুঝতে পারেন তা ফাঁকা। কোনো কিছুতে খেই পান না রশিদা বেগম। বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘পানি দে রে হারামজাদী!’
হারামজাদী পানি নিয়ে আসে কিছুক্ষণ পর। এসে দেখে ঘোলাটে চোখে রশিদা বেগম একরাম আলির ছবির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছেন। গ্লাস রেখে ফিরে যায় ছোটো মেয়ে। গ্লাস নিজের মতো পড়ে থাকে। পানি খাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে রশিদা বেগম বিহ্বল হয়ে একরাম আলির ছবির দিকে চেয়ে থাকেন। ছবি থেকে একরাম আলি গম্ভীর মুখ করে বাইরের পৃথিবীতে তাকিয়ে। খুশির দিন গড়িয়ে চলে।
নামাজ কালাম না করা মেয়ে পুকুর পাড়ে বসে মশা মেরে যায়। যেন মশা মারতেই সে পুকুরের কাছে এসেছে, যেন মশক বধ করার জন্য তার পয়দা হওয়া। মশা মারতে মারতে তাকে মশা মারার নেশায় পেয়ে বসে। অজস্র মশার শব তার পায়ের চারপাশে শূন্য হতে ঝরে ঝরে পড়ে। মৃত মশার গন্ধ পেয়ে সেখানে জড়ো হয় কালো পিঁপড়ের দল। কিছুক্ষণ পর দেখা যায় মৃত বা অর্ধমৃত মশার দেহ কাঁধে পিঁপড়ের মিছিল সোল্লাসে কাছেপিঠের মাটির গর্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে। পিঁপড়েদের আহার যুগিয়ে চলার নেশা পেয়ে বসে রোশন আরাকে। গোধূলির আঁধারে মশা মারার চটাস চটাস আওয়াজ আসে পুকুর পাড় থেকে।

ছবি: চম্পা রায়

পেটে হাত রাখা মুদ্রাদোষ হয়ে দাঁড়িয়েছে করিমন বিবির। তার ফুলে ওঠা পাঁচমাসি পেট, পেটের জায়গায় আছে না নেই দেখে নিতে সে সময়ে সময়ে তলপেটে হাত রাখে। আজকাল থেকে থেকে করিমন বিবির মেজাজ বড়ো মেয়ে ছোটে মেয়ের বাপের মতো হারিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি অঙ্গ জ্বলছে তার টমিকে দেখলে। টমি হারাম। টমি তা জানে না। করিমন বিবিকে দেখামাত্রই ল্যালল্যাল করে চারপায়ে ছুটে আসে সে। পেট হওয়ার আগে টমির প্রতি প্রশ্রয় আসতো। পেট হওয়ার পর সমস্ত প্রশ্রয় পেটের দিকে ধেয়ে চলে। টমিকে দেখা মাত্র আজকাল করিমন কামান স্ফীতকায় পেট নিয়ে হাতের কাছে যা পায় তা ছুঁড়ে মারে। টমি বিভ্রান্ত হয়। আহত হয়। তারপর প্রাণ বাঁচাতে বাড়ি ছাড়ে সাময়িক কালের জন্য। আবার পরের বেলায় টমিকে দাওয়ায় বসে ঝিমোতে দেখা যায়।
শুধু টমি নয়। বড়ো মেয়ে ছোটো মেয়েকে দেখেও তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে করিমন বিবি। তাদের হারিয়ে যাওয়া বাপের নাম নোংরা করতে শুরু করে। বড়ো মেয়ের ওড়নাবিহীন অফিস যাতায়াত, ছোটো মেয়ের চায়ে চিনি কম দেওয়া, প্রশ্নের উত্তরে বড়ো মেয়ের সাড়া না দেওয়া, কাপড় ভিজিয়ে রেখে জানালা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখে ছোটো মেয়ের হেসে হেসে ওঠা, বেতন পেয়েও বড়ো মেয়ের বাড়িতে যথেষ্ট টাকা না দিতে চাওয়া, ছোটো মেয়ের অঙ্ক খাতার শেষ পাতায় হৃদয় এঁকে তার মাঝে লুবোর নাম দিখে রাখা, পাহাড়প্রমাণ পেটসমেত করিমন বিবিকে বাড়তে দেখেও বড়ো মেয়ের কুশল জিজ্ঞেস না করা, রশিদা বেগমের সারাদিনের কূলকিনারাহীন মনোলগ,— করিমন বিবির দেহে আগুন লাগিয়ে দেয়। আর আঁচ গিয়ে পড়ে টমির উপর। সুলেইমান রেজাকে আজকাল ফোনে ধরা যাচ্ছে না বুঝে করিমন বিবি অস্থির ডাঁশ মাছির ন্যায় এ-ঘর ও-ঘর ঘুরঘুর করে বিশালাকার পেটসমেত। তারপর হাঁপিয়ে গেলে বাইরের ঘরের খাটের চাদরে এসে জিরোয়। আরবার বড় মেয়ে ছোট মেয়ের বাপের বাপ বাপান্ত করে।
আজকেও মাথায় ওড়না না দিয়ে বেরনোর সময় রোশন আরা করিমন বিবির রোশানলে পুড়ে যায় কিছুটা। তারপর ফটক পার হতে হতে দেখে পোস্টম্যান কামাল চাচা আসছেন।

হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যান এসে একটা খাম ধরিয়ে দেয় করিমন বিবির হাতে,— রোশন আরার প্রতি ডানা খাবলানো যার বন্ধ হয়নি তখনও। খাম খুলতে একটা সাদা কাগজ বেরিয়ে আসে। সে-কাগজের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন খোপে অনেক কিছু লেখা। এক জায়গায় এসে করিমন মাছির চোখ আটকে যায়। ডানা নেতিয়ে পড়ে। শুধু অস্ফুটে সে বলে ওঠে, ‘আল্লাহ!…’
রোশন আরা দেখে,— তলপেটে হাত রেখে, তেল ফুরিয়ে আসা হ্যারিকেনের শিখার মতো পুনর্বার কাঁপছে করিমন বিবি। ছুটে এসে নিভন্ত করিমন হ্যারিকেনের হাত থেকে সাদা কাগজটা ছিনিয়ে নেয় রোশন আরা। দেখে সেটি একটি টেলিগ্রাম। প্রেরক: সুলেইমান রেজা। প্রাপক: করিমন বিবি। কাগজের ঠিক মাঝখানে এক জায়গায় এসে রোশন আরার চোখ স্থির হয়ে যায়। নীল পেনের কালিতে সেখানে স্পষ্ট করে লেখা,—
তালাক। তালাক। তালাক।

প্রথম পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম

দ্বিতীয় পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (দ্বিতীয় পর্ব)

ক্রমশ…

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (তৃতীয় পর্ব)

আমাদের নতুন বই