অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (চতুর্থ পর্ব)

কাজল ভোমরা রে

করিমন বিবির মরাকান্না দু-ঘণ্টার বিবর্তনের পর একঘেয়ে নাকিসুরে ঘ্যানঘ্যানে কান্নায় পরিণত হয়েছে। প্রথম দিকের স্পষ্ট প্রলাপ এখন বিকৃত হয়ে গোঙানি। খেই হারানো কান্না দলা পাকিয়ে আছে বাইরের ঘরটায়। করিমন বিবির নাক, চোখ, গাল ফুলে গিয়ে গোল আর লাল হয়ে চকচক করছে। পেট ফোলা করিমন বিবিকে এখন তুলোভরা স্ফীত ভাল্লুকের মতো দেখাচ্ছে। পার্থক্য শুধু,— ওই গালে পিন ফুটালে চামড়া ফুঁড়ে ভক করে তুলোর পরিবর্তে তার সমস্ত শোক বেরিয়ে পড়বে। কে জানে কখন, করিমন বিবির সেইসব শোক সুলেইমান রেজাকে রেহাই দিয়ে ফয়জুল রহমানে এসে জড়ো হয়েছে। করিমন বিবি কখন থেকে যেন ফয়জুল রহমানের শোকে কাঁদছে। মনে হচ্ছে যেন আজ সকালে কোনো টেলিগ্রাম আসেনি। যেন সুলেইমান রেজা বলে কেউ নেই। যেন সে করিমন বিবির পেট করে দেয়নি। এমন লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে করিমন বিবি ফয়জুল রহমানের বিরহে হাপুস কাঁদছে কখন থেকে কেউ জানে না। একসময় করিমন বিবি ফয়জুল রহমানের মুখ মনে করতে গিয়ে দেখে, ওই মুখ তার আর মনে নেই। অনেক চেষ্টা করে সে মনে করার, অনেক আদব কায়দা করে, তাও বুকের ভিতর ফয়জুল রহমানের আছাড়ি-পিছাড়ি করে দেওয়া স্পর্শটা মনে পড়ে যায় অথচ তার মুখ মনে পড়ে না। কাঁদতে কাঁদতে অবাক করিমন ভাবে, মানুষের সর্বস্ব নাশ হয়ে যায়, হেলায় পড়ে থাকে স্পর্শের কঙ্কাল আর শোকের করোটি। এই ভুলে যাওয়ার শোকে করিমন বিবি আবার নতুন করে মরাকান্না জুড়ে দেয়।

চিত্র: পল ক্লি

মেঝেতে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা রোশন আরার কুঞ্চিত ভ্রূ বলে, ‘আপনে থামবেন!’

করিমন বিবি থামে। এতক্ষণ কেঁদে কেঁদে সর্দিতে তার নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাঁ করে নিঃশ্বাস নিতে হয় তাকে। মনে পড়ে যায় ফোলা পেটের কথা। হাত পুনরায় তলপেটে নেমে আসে। সুলেইমান রেজা নড়তেচে প্যাটের মদ্দি। কান্নার ক্লেশে দু-চোখে ঘুম নেমে আসে করিমন বিবির।

রশিদা বেগম সকাল থেকে ফিসফিস করে পরামর্শ করে চলেছেন নিজের সাথে। তাঁর প্রথম দ্বিধা হল, গর্ভবতী মাইয়াবেডিরে তালাক দেওয়া কোরআন হাদিসে জায়েজ কি না। একরাম আলি ছবির ভিতর থেকে বার্তা পাঠান, হগলই জায়েজ।

এরপর রশিদা বেগম ভাবতে থাকেন টেলিগ্রামে দেওয়া তালাক কবুল হবে কিনা। আবার পেট হইলে ইদ্দত সম্পর্কে কী হুকুম আছে তাও তাঁর জানা নেই। অকুল পাথারে থম মেরে বসে থাকেন রশিদা বেগম। তারপর একসময় তাঁর বিশালাকার হাত তুলে এনে ঠোঁটে লেগে থাকা সুপুরির রস মোছেন আর শুনতে পান ঘুমের ভেতর থেকে করিমন বিবি ত্রাহি চিৎকার করছে, অথচ বাইরে কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। রশিদা বেগম সজাগ হয়ে ওঠেন, তারপর বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে বলেন, ‘তগো আম্মুরে বোবাজ্বিনে ধরছে, উঠা! অরে উঠা!’ তারপর বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা…’

করিমন বিবি কচ্ছপের খোলের মতো উঁচু পেট-সহ রোশন আরার হাত ধরে ধড়মড় করে উঠে বসে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘হায় আল্লা!’ এতক্ষণ তাকে বোবাজ্বিন জাপটে ধরে রেখেছিল। মনে হচ্ছিল পা থেকে তাকে জিভ দিয়ে চাটতে চাটতে বোবাজ্বিন উপরে উঠে আসছে। ভিজে গিয়ে ভয়ে কাঠ করিমন গাছ বিছানায় কাত হয়ে পড়েছিল। এখন উঠে বসার পর বড়োমেয়ের হাত ছাড়তে ইচ্ছে করছে না তার। বোবাজ্বিনের পরশে ভেজাভেজা করিমন গাছ খেয়াল করল বড়োমেয়ের হাত কেমন শক্ত হয়ে গেছে। কেমন রুক্ষ্ম! তারপর তার খেয়াল হল, বহু বছর পূর্বে, বড়োমেয়ের শৈশবে সে শেষবারের মতো তার হাত ধরেছিল। লজ্জায় হাত ছেড়ে দিল করিমন লতা। বড়োমেয়ে চুপ করে তাকিয়ে আছে এখন তার দিকে। হঠাৎ মুখ তুলতে করিমন বিবি বোঝে বড়োমেয়ের আরেক হাত তার মাথার উপর রাখা। চুপ করে করিমন বিবির মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে রোশন আরা। করিমন বিবির মনে হল এখনই যেন তাকে আসল বোবাজ্বিনে ধরেছে। আগেরটা কেবল মহড়া ছিল। বিশ্বচরাচর নিশ্চুপ।

‘আপনেরা এহানেই আছেন, ভালো হইছে, কথা আছিল’, রোশন আরা চমকে গিয়ে করিমন বিবির মাথার উপর থেকে হাত সরিয়ে নেয়, দেখে জাহান আরা এসে দাঁড়িয়েছে দোরে।

‘কী কইবি ক’, বিষণ্ণ স্বরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে রোশন আরা।
একমনে নিজের নখ খুঁটতে খুঁটতে ছোট মেয়ে বলে, ‘আজ আমি বিয়া করুম।’
হাবার মতো মুখ হাঁ হয়ে গেল করিমন বিবির।
রোশন আরা জিজ্ঞেস করল, ‘মানে! কে বিয়া করব তোরে?!’
ছোটোমেয়ে জবাব দেয়, ‘লুবোয়,’
রোশন আরা জিজ্ঞেস করল, ‘লুবো কেডা?’
করিমন বিবি বলল, ‘লুবো?! এ কেমন নাম!’
‘খন্দকার হোসেন লুবো। আমার কেলাসে পড়ে।’
‘পড়ে! কাম কাজ কিছু করে না?’
‘ওর বাপের ব্যবসা আছে, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট’
করিমন বিবি খাবি খায়, বলে, ‘কী… কী… এরপোর্ট?’

রোশন আরা জবাব দেয়, ‘আমদানি রফতানির ব্যবসা।’ তারপর জাহান আরার প্রতি প্রশ্ন ছোঁড়ে সে, ‘এ-সব কবে থেকে? আমাগো কিছু জানাস নাই কেন! আর এমন কইলেই বিয়া হয় নাকি,’

নখ খুঁটতে খুঁটতে জাহান আরা দৃঢ় স্বরে বলে, ‘কেন হইব না… অগো এত পসার, তিন খান বাড়ি কলকাতায়, দ্যাশে জমি, বছরে একবার বিদেশ ভ্রমণ করেন…

রোশন আরা ধমকে ওঠে, ‘পয়সাই সবকিছু নাকি!’
করিমন বিবি রিনরিনে গলায় তাকে থামিয়ে বলে, ‘আহ, বলতে দে অরে,’
জাহান আরা দুলতে দুলতে বলে, ‘আমারে ভালোবাসে সে, আদর যত্নে রাখব’
‘এইটুকু মাইয়া তুই প্রেম ভালোবাসার কী বুঝস!’ রোশন আরা ফুঁসে ওঠে।

‘আপনে যেন কত বোঝেন, আপনারে তো কেউ ভালোবাইসা আঘাতও করতে পারে না, ব্যাডালোগের থিকা এমন দূরে দূরে থাকেন। এই দ্যাহেন, ভালোবাসা কারে কয়,’ বলে ছোটোমেয়ে চুরিদারের প্রথম দুটো বোতাম খুলে সপাট দাঁড়ায়। করিমন বিবির চোখ গোল গোল হয়ে যায়, সে দেখে ছোটোমেয়ের বুকে সিগারেটের ছ্যাকা লেগে গোল হয়ে পুড়ে যাওয়া একটা দাগ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

রোশন আরা অবাক হয়— হতবাক হয়। তার স্খলিত ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বাতাস চলাচল করে।
ভিতরের ঘর থেকে রশিদা বেগম সমস্তটা শুনে গর্জে ওঠেন, ‘বেয়াদব মাইয়া!’

করিমন ফেউ বিস্ময় গিলে রিনরিনে স্বরে বলে, ‘আজাইরা তর্ক কইরা লাভ আছে কুনো? পোলাডারে ডাক, দেহাই যাক না কী ব্যাপার, কেমন পরিবার, তারপর না হয়…’

রোশন আরার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, শান্ত স্বরে, ‘আমার মত নাই’, বলে সে নিজের ঘরে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দেয়।

রশিদা বেগম ঝিমোচ্ছেন। আধেক ঘুমে তাঁর মাথার ভিতর তিনি ফয়জুল রহমানকে দেখছেন, সাদা কুর্তা পাঞ্জাবি পরে হাসিমুখে তাকে ঘিরে গোল করে সাইকেল চালাচ্ছে। ফয়জুল রহমানের সাইকেলের হাতল থেকে একটা বড়ো রুই মাছ ঝুলছে। রশিদা বেগমের লোভ হচ্ছে প্রিয়তম রুইমাছের প্রতি। ঝিমন্ত অবস্থায় রশিদা বেগমের মুখ হাঁ হয়ে যেতে থাকে রুই মাছের লোভে। রুই মাছ এখন রশিদা বেগমের সামনের কড়ায়। মরিচ, লবণে জারিত হচ্ছে। রশিদা বেগম ঘুমের মধ্যে বিরাট একটা খুন্তি নিয়ে রুই মাছের সাথে লড়াই করছেন। কড়ার ভিতর দাঁত বের করে শুয়ে রুইমাছের মাথা রশিদা বেগমকে শুধায়, ‘আর কদ্দিন খালাম্মা, আর কদ্দিন?’

রশিদা বেগম বসে বসে ঝিমোচ্ছেন। তাঁর আত্মাও ঝিমোচ্ছে। আট বছর হল।

হঠাৎ ভুটভুট আওয়াজ আর সাথে টমির চিৎকারে তাঁর চোখ খুলে গেল। টের পেলেন তাঁর খোলা মুখ থেকে দু-ফোঁটা লোভ রুইমাছের তরে ঝরে পড়েছে তাঁরই ডানহাতের উপর। টের পেলেন বাড়ির দোরে একটা মোটর বাইক এসে দাঁড়িয়েছে।… কেডা আইল?…

শুনতে পেলেন করিমন বিবি কাকে যেন আদর করে বাসায় ডেকে আনছে।
‘ও করিমন কে আইলো?’ হাঁক পাড়েন রশিদা বেগম।

একটু পরে তাঁর ঘরের পর্দা সরে গিয়ে এক তরুণের মাথা দেখা যায়, নিষ্পাপ চোখে সেই তরুণ মস্তকটি বলে, ‘আসসালাম আলেইকুম দাদি, আমি লুবো, আমি জাহানারারে বিয়া করনের লাইগা আইসি,’

‘বিয়া!’ হতবাক হয়ে যান রশিদা বেগম।

‘হ দাদি, কাজিও আইসেন আমার লগে,’ তরুণ পর্দার আড়াল থেকে প্রকাশ্যে আসে। রশিদা বেগম দেখেন নিষ্পাপ মুখের সাথে তুমুল বেমানান এক কর্কশ পেশীবহুল দেহ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। মনে মনে তিনি বলে ওঠেন, ‘… হারামজাদি!’

যুদ্ধে হেরে যাওয়ার মতো অবসাদ নেমেছে রোশন আরাকে ঘিরে। কী সমারোহ সে-অবসাদের! ঘাড়ে কাঁধে জাকিয়ে বসেছে হীনতা। এমনিতেও কেউ ছিল না কোথাও, তবু নতুন করে নিজেকে একা মনে হচ্ছে রোশন আরার। মাঝরাতে ঘরের দরজা খুলে সে বাইরে আসে আর সাথে সাথে চমকে যায়। মধ্যরাত্রে অন্ধকার নিঝুম ঘরে ঘরে করিমন ভূত বেঢপ পেট নিয়ে বিছানার পরে চুপ করে বসে আছে। কাছে আসতে সে শুনতে পায় খোনা গলায় করিমন বিবি বলছে, ‘চঁইলা গেঁল,’

‘কে চইলা গেল?’
‘হঁগলডায়।’ এটুকু বলে করিমন প্রেতিনী মুখে কুলুপ আঁটল।

প্রথম পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম

দ্বিতীয় পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (দ্বিতীয় পর্ব)

তৃতীয় পর্ব:

অলোকপর্ণার ধারাবাহিক উপন্যাস: আফিম (তৃতীয় পর্ব)

ক্রমশ…

Spread the love

4 Comments

  • এবারের পর্বের শেষের অংশটি সত্যি সুন্দর। জাদুবস্তবতা এমনই তো হয়! আহা!

    শতানীক রায়,
    • অলোকপর্ণা,
  • চমৎকার লাগছে।

    শীর্ষা মণ্ডল,
    • ধন্যবাদ ধন্যবাদ

      অলোকপর্ণা,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *