পার্থজিৎ চন্দের ধারাবাহিক গদ্য: সোনালি, হরিণ-শস্য

দ্বিতীয় পর্ব

শ্রয়েডিংগারের বিড়াল অথবা লালনের গান

যুগপৎ একটি মূর্ত জিনিসকে বিমূর্ত করে ও একটি বিমূর্ত জিনিসকে মূর্ত করে, দু-টিকে একবিন্দুতে মিশিয়ে দেবার পর বহুক্ষণ দিগন্ত অথবা অস্তসূর্যের দিকে এক মহাসাগরের অন্ধকার তলদেশের শান্তি ও নিঃস্তব্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকার সময়ে যে-পাখিটির উড়ে যাওয়া তাই আসলে অচিন পাখি।

আমার বিশ্বাস, সন্ধ্যার ঠিক আগে এক পবিত্রতম বিষণ্ণ মুহূর্তে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা ও মননের অধিকারী মানুষটির মধ্যে অচিন পাখি নামক ধারণার জন্ম হয়েছিল। প্রথমে তাঁকে ‘বাস্তবের’ এক পাখির ওড়াকে বিমূর্ত পাখির কাছাকাছি নিয়ে যেতে হয়েছিল। তারপর তাকেই আবার ‘প্রাণ’ নামক এক বিমূর্ত ধারণাকে মূর্ত করে পাখি-ধারণার সংলগ্ন করে তুলতে হয়েছিল। এর ফলে জন্ম নেওয়া পাখিই অচিন পাখি। আলোর বর্গগতির সঙ্গে শক্তির নিহিত সম্পর্কের আবিষ্কার পৃথিবীর মেধা ও মননের চূড়ান্ত স্ফূরণের অমোঘ উদাহরণ। যে নাম না-জানা মানবসন্তান সর্বপ্রথম অচিন পাখির ধারণা করেছিলেন তিনি আইনস্টাইনের কাঁধে হাত রেখে এক সন্ধ্যায় অনেক দূর হেঁটে যেতে পারেন।

জন্মান্তরে আমার কোনো বিশ্বাস নেই, কিন্তু বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে সে-মানুষটিই অনেক জন্ম পেরিয়ে আমাদের বাংলায় জন্ম নেওয়া লালন শাহ ছাড়া আর কেউ নন। আর কোনো কারণ ব্যতীত, শুধুমাত্র লালনের গান শোনার পুণ্যে একজন্ম সার্থক।

খাঁচার ভিতর এক পাখি বারবার আসে, চলে যায়। সে-পাখি অচিন বলেই তার পায়ে মনোবেড়ি পরিয়ে দিতে পারছেন না লালন। এরপর লালন দেহতত্ত্বের গূঢ় ও জটিল জগতে প্রবেশ করবেন। সুতীব্র এক ইশারা ছড়িয়ে রাখবেন গানটির প্রতিটি শব্দে। এক ফকিরের গানের ‘সহজিয়া’ ভুবনে হাজার হাজার বছরের দূরত্ব পেরিয়ে উড়ে এসে বসছে একটুকরো বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌:
“দ্বে বাব ব্রহ্মেণ্যে ব্রাহ্মণ্যে রূপে মূর্তং চৈব্যমূর্তং চ মর্ত্যং চামুতং চ স্থিতং চ যচ্চ সচ্চ ত্যচ্চ”

— ব্রহ্মের দুইটি রূপ— মূর্ত ও অমূর্ত, মর্ত্য ও অমৃত, স্থিতিশীল ও গতিশীল, সৎ (সত্তাশীল) ও ত্যৎ (অব্যক্ত)।

প্রাচ্যের যে-নিজস্ব অর্জন তার চূড়ান্ত প্রকাশ লালনের গান। আজকাল লালনের গান অন্য একটি কারণে আমাকে চুম্বকের মতো টেনে রাখে। মনে হয়, আসলে বাস্তবতা বলে কিছু হয় না। এক বাস্তবতা আরেকটি বাস্তবতার ছায়া মাত্র, অথবা এক ‘অবাস্তব’ অন্য একটি বাস্তবের… এমনকী হতে পারে অন্য ‘অবাস্তবের’ নিরিখে নির্মিত হওয়া এক জগৎ। পৃথিবীর সার্থকতম শিল্প আসলে কী… কী ভূমিকা পালন করে সে-শিল্প, আমাদের অজানা। আমার বিশ্বাস, শিল্প আসলে আর কিছুই করে না, একটি বাস্তবতার মধ্যে আরেকটি বা আরও কয়েকটি বাস্তবতার সন্ধান দেয়। সেটি অবাস্তবের মধ্যে বাস্তবের সন্ধান বা বাস্তবের মধ্যে অবাস্তবের সন্ধানও হতে পারে, একইভাবে। ভ্যান গগের ছবি রবীন্দ্রনাথের গান বিঠোফেনের সিম্ফনি— আসলে এই।

রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন, ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব/আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো, গান দিয়ে দ্বার খোলাব’, আমাদের সামনে কংক্রিট হয়ে ওঠে এক বাস্তবতার মধ্যে আরেকটি অ্যবস্ট্রাক্ট অথচ চূড়ান্ত ‘বাস্তব’ জগৎ। শিল্পই পারে গান দিয়ে দ্বার খোলাতে, এমনকী এই দরজা-জানালা খোলা কোনো রূপকও নয় এক্ষেত্রে। আমরা যেমন প্রাত্যহিকের ‘অভ্যাসে’ দরজা-জানালা খুলি, গান দিয়েও ঠিক সেভাবেই দরজা-জানালা খুলে ফেলে যায়। যেমন ঠিক এ-জায়গায় এসে লালনের আরেকটি গানের দিকে চলে যেতে ইচ্ছা করে, ‘আমি একদিনো না দেখিলাম তারেঃ/আমার বাড়ির কাছে আরশি নগর এক পড়শী বসত করেঃ।’

এই না-দেখার মধ্য দিয়ে পড়শীকে দেখা, এমনকী তার রূপ নির্ভুলভাবে অনুধাবন করা, ‘বলব কি সেই পড়শীর কথা তার হস্তপদ স্কন্ধ মাথা নাই রে ও সে ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর আবার ক্ষণেক ভাসে নীরেঃ’ আরেক রকম দেখা। গূঢ় ইঙ্গিতের চিহ্ন রয়েছে, কিন্তু আমার কাছে এ-দেখা ইঙ্গিতমাত্র নয়। এও আরেক রকমের বাস্তব।

এই বাস্তবতার কাছে শ্রয়েডিংগারের বিড়াল ঘুরে বেড়ায়। সে-বিড়াল মৃত অথবা জীবিত… এই প্যারাডক্স ক্ষীণ হয়ে আসে। কোথাও কোনো প্যারাডক্স নেই, সব প্যারাডক্সের মূলে রয়েছে বিভ্রম ও বাস্তবতা নিয়ে আমাদের ভয়াবহ ধারণা। In Search of Schrodinger’s Cat নামে John Gribbin-এর একটি বেস্টসেলার আছে। সেখানে তিনি পদার্থবিদ্যার কঠিনতম বেশ কিছু বিষয়কে আমার মতো আনাড়ি মানুষের জন্য ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন সহজভাবে। শক্তির সঙ্গে ভর ও আলোর গতিবেগের যে-অমোঘ সম্পর্ক, ই ইক্যুয়ালস টু এম সি-স্কোয়ার, সেখানে আলোর বেগকে আমরা ধণাত্মক হিসাবেই ধরে নিই। Gribbin আরেক বিখ্যাত পদার্থবিদ পল ডিরাকের কথা লিখছেন, ‘When energy levels are calculated in the relativistic version of quantum mechanics, there are two sets, one is positive, corresponding to E = mc^2 and the other all negative to, corresponding to E =- mc^2.’

এরপর একটি ঘাতক বাক্যের সামনে বহুক্ষণ চুপ করে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। একটা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে থাকে, ‘What we call ‘empty space’ is actually a sea of negative energy electrons!’

এই শূন্য ও ঋণাত্মক শক্তির ইলেক্ট্রনে পূর্ণ সমুদ্র থেকে গা ঝাড়া দিয়ে একটি বক্সের মধ্যে প্রবেশ করে শ্রয়েডিংগারের বিখ্যাত বিড়াল। বাক্সের ভিতর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জাদু-জগৎ ও বিড়ালটির দু-টি ‘বাস্তব’ সংস্করণ— একটি জীবিত ও একটি মৃত। দু-টি wave functions-ই একইরকম ‘বাস্তব’। বিখ্যাত কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন এই ‘দেখা’র মূলে রয়ে যাওয়া পদ্ধতিটিকে তছনছ করে দেয়, ‘Copenhagen interpretation looks at these possibilities from a different perspective, and says, in effect, that both wave functions are equally unreal, and that only one of them crystallizes as reality when we look inside the box.’

গা ছমছম করে ওঠে সেই একাধারে মৃত ও জীবিত বিড়ালটির থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে… জীবিত ও মৃত— দু-টি অবস্থাই unreal. শুধু আমাদের মধ্যে কেউ সেই বিখ্যাত বাক্সটির মধ্যে যখন তাকিয়ে দেখব তখন, সেই মুহূর্তে, একটি অবস্থা ক্রমশ স্ফটিকস্বচ্ছ হয়ে উঠবে।

অচিন পাখিটি ছিল এবং নেই… পড়শী চেনা এবং অচেনা… না-দেখেও তাকে দেখা এবং এই সূত্র ধরে বলা যায়, দেখেও তাকে না-দেখা ও না-চেনা… সব ক-টি অবস্থাই একইসঙ্গে বাস্তব ও অবাস্তব। মানে, বাস্তব ও অবাস্তবের মধ্যে শুয়ে থাকা কালো অজগর অথবা অনড় অ্যনাকোন্ডাটি হারিয়ে যাচ্ছে, মুছে যাচ্ছে।

আমাদের লালন শাহ আমাদের গ্রামবাংলার পথে পথে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে চলা… হাজার হাজার বাউল ও সহজিয়া সাধকেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে-গূঢ় ও রহস্যময় জগতের মধ্যে প্রবেশ করে লীন হয়ে যেতে চাইছেন, যে-গূঢ় জগতের ইশারা তারা লুকিয়ে রেখেছেন তাঁদের গানে তাঁদের পদের মধ্যে সে-সবই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আদি-সংস্করণ, এভাবে ভাবার কোনো কারণ দেখি না। দুটো দুই ধরনের সন্ধান। একজন লালন তাঁর প্রতিটি দেহকোষ দিয়ে জগতকে পান করেন, প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে জগতের রহস্যকে শুষে নেন। একজন পল ডিরাক একজন আইনস্টাইন প্রখর মেধা মনন ও যুক্তির কাছে দিনের পর দিন হাঁটুমুড়ে বসে থাকেন। একদিন হাজারো বাঁক পেরিয়ে দু-টি পথের মধ্যে প্রায়-দেখাও হয়ে যায়।

কুষ্টিয়ার ছোটো গ্রামে সন্ধ্যা নেমে আসছে, লালন তাঁর উদাত্ত কন্ঠে গান শোনাচ্ছেন এক ঝাঁকড়া-চুল মানুষকে, তাদের মাথার উপর অসংখ্য তারা ছায়াপথ ব্ল্যাকহোল কোয়াসার… আইনস্টাইন আলতো করে হাত রাখলেন লালনের কাঁধে।

‘অবাস্তব’ শোনাচ্ছে? আমরা কি পড়িনি ও জানি না যে, ‘There is a live cat, and there is a dead cat; but they are located in different worlds. It is not that the radioactive atom inside the box either did or didn’t decay, but it did both. Faced with a decision, the whole world— the universe— split into two versions of itself, identical in all respects except that in one version the atom decayed and the cat died, while in the other the atom did not decay and the cat lived…’

এক খণ্ডের মৃত বিড়ালটি হয়তো আরেক খণ্ডে এই মাত্র তার ঘুম থেকে উঠে লাফ দিল অন্ধকারে।

প্রথম পর্ব

Spread the love

1 Comment

  • ভীষণ মনোজ্ঞ লেখা।

    শতানীক রায়,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *