পার্থজিৎ চন্দের ধারাবাহিক গদ্য: সোনালি, হরিণ-শস্য

তৃতীয় পর্ব

চক্রব্যূহ অর্থশাস্ত্র ও তিমি-শিকারীর দল

“…এত যদি ব্যুহ চক্র তীর তীরন্দাজ, তবে কেন
শরীর দিয়েছ শুধু, বর্মখানি ভুলে গেছ দিতে?”

তিমি-শিকারের তিনটি বোট চলে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে, খুব ধীরে তারা চলে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে। হয়তো স্বপ্নের মধ্যেই হবে, আজকাল ভোররাতে এমন একটা দৃশ্য দেখি। এক বাস্তব-স্বপ্নের মধ্যে জেগে থাকে অন্ধকার তিমি-শিকারের বন্দর। ভোরের আলো বহুদিন দেখি না, এমনকী সেই স্বপ্নেও ভোরের আলো নেই। যেন কেউ গ্যালন গ্যালন আলকাতরা ঢেলে দিয়ে গেছে সমুদ্রের জলে। তারকামণ্ডল থেকে ধাতব ছুঁচের মতো আলোর রশ্মি জল ফুঁড়ে… জাহাজঘাটার কাঠের পাটাতন ফুঁড়ে ঢুকে যায় সমুদ্রের তলদেশে। সমস্ত তিমি-শিকারীর চোখে ভারী কালো কাচের চশমা। তাদের পরনে কালো প্যারাসুট-কাপড়ের জ্যাকেট; অন্ধকার ও বৃষ্টি একসঙ্গে পোশাক বেয়ে নেমে মিশে যায় সমুদ্রের জলে।

তিমি-শিকারের তিনটি বোট চলে যাচ্ছে সমুদ্রের গভীরে।

পীতবর্ণের ঈষৎ খর্বকায় সে-সব তিমি-শিকারীর চামড়া ঢাকা কালো পোশাকে; কিন্তু আমি তাদের পেটের পুরুষ্টু পেশী বলিষ্ঠ কাঁধ দেখতে পাই। দেখতে পাই তাদের ঠোঁটের ওঠাপড়া। জলস্তম্ভের গর্জন ছাপিয়ে তারা চিৎকার করে— ‘হোয়াটস দ্য ফাক… হোয়াটস দ্য ফাক, আর ইউ ডুয়িং…’

ফোয়ারার মতো জল ছিটিয়ে মা-তিমি ঘুরছে তার বাচ্চাটিকে পেটের নীচে নিয়ে। মা-তিমির ছায়া মা-তিমির থেকেও বেশি বিশ্বাসযোগ্য বাচ্চা-তিমির কাছে। জলস্তরের নীচে মেঘের মতো সরে সরে যাচ্ছে সে-ছায়া।
নিশ্চয় আরও কয়েকটি তিমি কাছাকাছি থাকে, কয়েক নটিক্যাল মাইলের মধ্যে ঘোরাফেরা করে তারা। কিন্তু আমার স্বপ্নে ভেসে থাকা তিনটি তিমি-শিকারের বোট একটি তিমিকে প্রথমে সিঙল-আউট করে নেয়। আমার স্বপ্নও জেনে গেছে শিকারের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই সিঙল-আউট করে নেবার পদ্ধতি।

তিমি-শিকারের বোটগুলির পাটাতন থেকে একে একে হারপুন তুলে নেয় শিকারীরা। এরপর গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে একটি চক্রব্যূহ নির্মাণ ও হত্যা। হত্যার আগে একটি নিখুঁত বৃত্তের মধ্যে শিকারকে বন্দী করে ফেলা মানুষের আদিম ও মৌলিক আবিষ্কার।

যে-ব্যূহ যত নিখুঁতভাবে চক্রাকার সেখানে হনন সব থেকে বেশি সফল ও সার্থক।

তিমি শিকারের তিনটি কালো বোটের দিকে তাকিয়ে তাদের পাটাতনে পড়ে থাকা হারপুনের দিকে তাকিয়ে দেখা যায় সেখান থেকে তৈরি হওয়া একটা রাস্তা চলে গেছে মহাহত্যাশালার ভিতর। জগৎজোড়া এক মহাহত্যাশালা, চারদিকে তিরন্দাজ… বীরের দল। গূঢ়পুরুষের ছায়া পড়ে আছে দূর দিগন্ত পর্যন্ত। সভ্যতার ইতিহাস যতটা জীবনের ততটাই হননের। মাছ খেয়ে মুখের রক্ত মুছে ফেলে বিড়াল, তার থেকেও সুচারুভাবে হনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবার পথ খুঁজেছে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে। সমস্ত হত্যার আগে ক্ষমতা-কাঠামো নিজের যুক্তিকে সাজিয়ে নির্মাণ করতে শুরু করে হননের নীল নকশা।

মানুষ তার মেধার ঠিক কতটা ব্যয় করেছে হনন সম্পন্ন করবার জন্য? সমস্ত শিল্পের মতো মানুষ তার হনন-শিল্পকেও ক্রমাগত তীব্র ও তীক্ষ্ণ করে গেছে।

যে-ভেড়াটিকে মুণ্ডিতমস্তক লামা তাড়িয়ে তাড়িয়ে পাহাড়চূড়ায় নিয়ে যায়, যে-লামা তার গলায় ভারী পাথরের খণ্ড বেঁধে দেয় ও সব শেষে যে-লামা সেই পাথরখণ্ডটিকে গড়িয়ে দেয় খাদের দিকে— তিনজন লামার মধ্যে কেউই ভেড়াটিকে হত্যা করেনি। তাদের কেউই ভেড়াটির ঘাতক ছিল না। স্বপ্নের মধ্যে এই স্যিলুয়েট-টি দেখার পর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিম স্রোত নেমে যায়। তা হলে কি ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হয়ে ওঠাই হত্যার পথকে আরও সুগম করে তোলে? ঠিক যেভাবে তিনজন মুণ্ডিতমস্তক লামা একে একে, পৃথক পৃথকভাবে ভেড়াটির কাছে বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছিল। জগৎজোড়া মহাহত্যাশালায় এই ‘বিশ্বস্ত’ হয়ে ওঠার খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়ে গেছে। শত্রুর হাতের তাস চিনে নেবার জন্য গূঢ়পুরুষের ভূমিকা অসীম।

বোবা কালা অন্ধ গায়ক নর্তক বাদক থেকে শুরু করে নরসুন্দরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে গূঢ়পুরুষ… গুপ্তচরের দল। কারা কারা ক্ষমতার পক্ষে আর কারাই-বা বিপক্ষে তাদের চিনে নেওয়া দরকার, দরকার তাদের চিনে নেওয়া যারা ক্ষমতার পক্ষে ‘থ্রেট’ হয়ে উঠতে পারে। যারা ক্ষমতার পক্ষে নেই তাদের জন্য তৈরি করতে হবে এক কাল্পনিক ঘৃণার আবহাওয়া, সে-হাওয়ায় ‘মব লিঞ্চিং’-নামক এক হত্যা নিজে পায়ে হেঁটে এসে তার প্রাপ্য উশুল করে নেবে।

ক্ষমতার আরেকটি প্রিয় আধার মিথ-এর নির্মান। গূঢ়পুরুষের ভূমিকা সেখানেও কম নয়, একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি (মিথ নির্মাণ বিষয়ক) একবার দেখে নেওয়া যাক, ‘আর (রাজার সঙ্গে) দেবতাসংযোগ বোঝাতে গুপ্তচরের সংকেত মতো (তিনি) দেবতার আবির্ভাবের কথা বলবেন, জলমধ্য থেকে গুপ্তচরেরা নাগ ও বরুণদেবের বেশে উঠে তাঁকে আশির্বাদ করবে, গোপনে পুকুরে কোনো চিহ্নযুক্ত মুদ্রা রেখে তা উঠিয়ে দেখাবেন, কৌশলে জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবেন ও ভাসবেন।… দৈবজ্ঞ কথক জ্যোতিষী নানাশ্রেণির গুপ্তচরেরা রাজার এইসব গুণাবলী দেশে ও বিদেশে প্রচার করবে। এই গুপ্তচরেরাই আবার শত্রুসৈন্যদের নানা দৈবদুর্দশার কথা ফলিয়ে প্রচার করবে।’

অপরের মুখ বারবার ম্লান করে দেবার মতো অমোঘ শক্তির অধিকারী হতে চাওয়া মানুষ তাই সব বিদ্যার পরেও তীব্রভাবে আস্থা রাখে মায়াবিদ্যার উপর। তার আকাঙ্ক্ষিত সবকিছু যেন যার করতলে আসে, মায়াবিদ্যা ছাড়া আর কে দেবে এই অভয়! দু-একটি মায়াবিদ্যা-আধারিত খেলার দিকে তাকিয়ে দেখার সময়ে গলা শুকিয়ে আসে, ভয় ও আতঙ্কে, ‘পুষ্যানক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণাচতুর্দশীতে কামমত্ত কুকুরের লিঙ্গে কৃষ্ণবর্ণ লোহার আংটি লাগিয়ে দেবে। সেই আংটি আপনা থেকে খসে পড়লে তা নিয়ে যে কোন গাছের ফল চাইলেই তা হাতে চলে আসবে।… মৃতলোকের মালা, সুরার বীজ, বেজির লোম, বৃশ্চিক, অলি ও সাপের চামড়া একত্রে কারো বাড়িতে পুঁতে দিলে ঐ লোক পুরুষত্বহীন হয়ে থাকবে। তবে ঐ দ্রব্য তুলে ফেললে সেই সমস্যা দূরীভূত হবে।’ পুষ্যানক্ষত্রের নীচে এক কামমত্ত কুকুরের অবরুদ্ধ কামের পথ ধরে করতলে আমলকি এসে ধরা দেবে। এই বিভৎসতা ছাড়া সমস্ত অর্জন মিথ্যা হয়ে যায় মানুষের।

তিমি-শিকারের তিনটি বোট চলে যায় গভীর সমুদ্রের দিকে। কালো বোট, তাদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি মহাহত্যাশালায় বসবাস করতে করতে মানুষ বুড়ো হয়ে গেছে। তার কপালে গভীর হয়েছে বলিরেখা। কিন্তু অপরের মুখ ম্লান করে দেবার আনন্দে এখনও তার মুখ সব থেকে বেশি উজ্বল হয়ে ওঠে। প্রতিটি হত্যাকে শিল্পের স্তরে উন্নীত করবার জন্য সে-চেষ্টার কোনো খামতি রাখেনি। আহার নিদ্রা মৈথুনের থেকেও বেশি আনন্দদায়ক গুপ্তহত্যা ও অপরের মুখ ম্লান করে দেবার সাধ, এক চক্রব্যূহে প্রবেশ করিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অসহায় প্রতিপক্ষকে হত্যা করার মধ্যে যে-আনন্দ তা সম্ভবত আমাদের জিনের মধ্যে কোথাও লুকিয়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা এভাবেই হত্যা করেছি বাইসন ও ম্যামথকে।

ভোর হবার কিছুটা আগে সমুদ্রের দিকে ভেসে যাওয়া বোটের পাটাতনে কখনো কখনো ভেসে ওঠে পুরানো… হারানো বন্ধুর মুখের আদল। যে-আমি সচেতন, বাস্তব এক স্বপ্নের মধ্যে এ-দৃশ্য দেখছি সে-‘আমির’ সঙ্গে অবলীলায় স্থান অদলবদল হতে পারে হারপুন হাতে ওই মানুষগুলির। এই সিস্টেমের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমিও কোথাও রচনা করে চলেছি সেই চক্রব্যূহ, হয়তো। হয়তো হারপুন হাতে তিমি-শিকারীর মতো আমিও শিকারী, আমিও গেঁথে দিতে চাই বর্শা আমূল। কিন্তু এ-সব পেরিয়ে আরেকটি ‘আমি’ও তো স্বপ্নে জেগে থাকে। সে তো চেয়ে থাকে অবোধ বন্ধুতার দিকে, ভাবে যে-হাত বারবার তার পিঠে ছুরি গেঁথে দিয়ে গেছে, যে-হাত তার বুকের দিকে বারবার ছুড়ে দিয়েছে বর্শা সে-হাত কোনো বন্ধুর। সে-হাতের কোনো হননকৌশল জানা নেই; সে-হাত শুধু ফলার ধারটুকু পরীক্ষা করতে চেয়েছে আরেকটি মানুষের বুকে-পিঠে।

স্বপ্নে জেগে থাকা এক ‘অবোধ’ তিমি-শিকারের উদ্দেশে গভীর সমুদ্রের দিকে ভেসে যাওয়া তিনটি বোটের দিকে তাকিয়ে থাকে।

এই মহাহত্যাশালায় সেই তো প্রকৃত অভিমন্যু, চক্রব্যূহের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুধু বর্ম না-পাবার হাহাকারটুকুই যার একান্ত সম্পদ ও অর্জন।

ঋণ: কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র/অনুবাদ: সুকুমার সিকদার

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

পার্থজিৎ চন্দের ধারাবাহিক গদ্য: সোনালি, হরিণ-শস্য

আমাদের নতুন বই