পার্থজিৎ চন্দের ধারাবাহিক গদ্য: সোনালি, হরিণ-শস্য

ষষ্ঠ পর্ব

মাৎসুয়ামা ক্যাসেল দালির ঘড়ি ও পতঙ্গের বিরহ-সন্তাপ

“ভুলো না, আলোকবর্ষ, সময়ের ছদ্মবেশে, দূরত্বের মাপ
ভুলো না, আলোকবর্ষ, সময়ের ছদ্মবেশে, অনন্তের মাপ
ভুলো না, আলোকবর্ষ, সময়ের ছদ্মবেশে, পতঙ্গের বিরহ-সন্তাপ”
(আলোকবর্ষ/রণজিৎ দাশ)

মাৎসুয়ামা ক্যাসেল থেকে কবি রণজিৎ দাশের এই অসামান্য কবিতাটির দূরত্ব কতটা? সেদিন এক বৃষ্টির দুপুরে কয়েকটি ছবির সামনে অনেকক্ষণ বসে মনে হচ্ছিল রণজিতের এই কবিতাটির থেকে কাওয়াসি হাসুই-এর ‘চেরি ব্লসম অ্যন্ড মুন অ্যট মাৎসুয়ামা ক্যাসেল’-এর দূরত্ব খুব বেশি নয়। বরং বলা যেতে পারে রণজিতের এই কবিতাটি ও হাসুই-এর ছবিটির মধ্যে কোনো সরলরৈখিক সম্পর্ক না-থাকলেও দু-টি শিল্পই একে-অপরকে ছুঁয়ে আছে কোথাও।

লাইটি-ইয়ার আমাদের অক্ষম হাতে পড়ে সেই কবে থেকেই ‘আলোকবর্ষ’ হয়ে গেছে। বর্ষের ছোঁয়া থাকবার ফলে আলোকবর্ষ আমাদের সাবকনসাসে সবসময়ই সময়কে চিহ্নিত করে। রণজিৎ এই জায়গাটিতে প্রথমেই ধাক্কা দিলেন, জানিয়ে দিলেন আলোকবর্ষ আসলে সময়ের ছদ্মবেশে দূরত্বেরই মাপ। ঠিক তার পরের লাইনে এসে কবিতাটির মধ্যে আরেকটি উল্লম্ফন ঘটল, রণজিৎ জানিয়ে দিলেন আলোকবর্ষ আসলে সময়ের ছদ্মবেশে অনন্তের মাপও বটে। সময়কে রণজিৎ মুক্তি দিয়ে অনন্তের দিকে ধাবিত করালেন। কিন্তু কবিতাটির প্রকৃত আবেদন লুকিয়ে রয়েছে তৃতীয় তথা শেষ লাইনে। আলোকবর্ষের মধ্যেও যে লুকিয়ে থাকতে পারে পতঙ্গের বিরহ-সন্তাপ, ঠিক যেমন শক্তির মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে আলোর বর্গগতি ইত্যাদি সেটিকে একমুহূর্তে উন্মোচিত করে দিলেন রণজিৎ। আপাদমস্তক কেঁপে উঠে আমরাও আবিষ্কার করি, অনন্তের সাপেক্ষে আমরা আসলে কীটপতঙ্গই। এক টেম্পোর‌্যালিটি ছুঁয়ে অনন্তের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া আমাদের আর কোনো ভূমিকাই নেই।

কিন্তু সেই দুপুরে কাওয়াসি হাসুই-এর ছবিটি দেখতে দেখতে রণজিতের কবিতাটির কথা মনে পড়ল কেন?

হাসুই-এর ছবিটিতে দেখতে পাওয়া যায়, মাৎসুয়ামা ক্যাসেলের মাথার উপর গোল পূর্ণ চাঁদ, চাঁদ তার স্তন থেকে দুধের মতো জ্যোৎস্না ঢেলে দিচ্ছে ক্যাসেলের ঠান্ডা কালো পাথরের বুকে। ক্যাসেলের গেট উন্মুক্ত, গেটের ঠিক বাইরে ফুলে ফুলে ভরে ওঠা এক চেরি গাছ। ক্যানভাস জুড়ে যেন ছড়িয়ে রয়েছে গর্ভবতী নারীর আনন্দ। এক মহাজাগতিক আলোকসম্পাতের নীচে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু-জন মানুষ— এক নারী ও এক পুরুষ। দুর্গের গেট থেকে বেরিয়ে রাস্তাটি সামান্য বেঁকে গেছে বামদিকে। তোরনের ডানদিকে বেশ কিছুটা স্পেস ছেড়ে রেখেছেন হাসুই। বামদিকে ঘন হয়ে আছে দু-জন মানুষ, গেট থেকে বেরিয়ে এই এক অপার্থিব দৃশ্যের সামনে থমকে রয়েছেন তাঁরা।

এর পরেই শুরু হয় আসল খেলা, ছবিটি বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলের থেকেও বেশি রহস্য-চুম্বকে আমাদের টেনে নিয়ে যায় অনেকগুলি সম্ভাবনার দিকে।

এই যুগল কি স্থাণুবৎ তাকিয়ে রয়েছেন এক অপার রহস্যের দিকে? দুর্গের বাইরে এসে তাঁদের এই জ্যোৎস্নাভেজা চেরির নীচে দাঁড়িয়ে থাকা কি দাম্পত্য ও যৌনতার পৌনঃপুনিকতা থেকে সাময়িক এক মুক্তি? জীবন কি বারবার, প্রাত্যহিকতার রোলার-কোস্টারে প্রতি মুহূর্তে পিষে যেতে যেতে এভাবেই এসে দাঁড়ায় সৌন্দর্যের কাছে?

নাকি এটি আরও গূঢ় কোনো ইশারা! তাহলে কি সৌন্দর্য ও প্রকৃতি এভাবেই অপেক্ষা করে আমাদের জন্য? প্রকৃতি ও মানুষের বাইল্যাটার‌্যাল সম্পর্ক বলে সত্যিই কি কিছু নেই? যা আমরা উভমুখী বলে ভাবতে অভ্যস্ত তা আসলে একমুখী এক সম্পর্ক… এই জ্যোৎস্নারাতে চেরিগাছের নীচে দাঁড়িয়ে সে-সত্য উপলব্ধি করা যায় মাত্র।

কিন্তু একজন আধুনিক মানুষের মনন ও মেধার মধু এবং পারদ তো তাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াবেই। এই ইন্টারপ্রিটেশনের মধ্যে সে নিজেকে বন্দী রাখবে না, সে খুঁজতে চাইবে আরও কিছু মাত্রা। এই পথ ধরেই চমকে উঠে আবিষ্কার করা যায়, এই দুই নারী ও পুরুষ ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথ হতেও পারেন। হয়তো হাসুই-এর কাজটি এ-পথ ধরে গড়ে ওঠেনি, হয়তো এই ছবি কোনো ট্র্যাজিক ইন্টারপ্রিটেশন দাবিও করে না। কিন্তু আমার কাছে এক বৃষ্টির দুপুরে হাসুই-এর প্রতিটি স্ট্রোক ক্যানভাস-জুড়ে ফুটে থাকা আলো-আবছায়ার খেলা এক impending tragedy-র দ্যোতক হয়ে উঠতে চায়। দুর্গের ভিতর থেকে জীবনের হাজার বর্শাফলা পেরিয়ে এক রাত্রে দুই নারী-পুরুষ এসে দাঁড়িয়েছেন জ্যোৎস্নার নীচে। এই ‘অবিমিশ্র’ সুন্দরের মধ্যেও যেন তাঁদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে এক অন্ধকারের অভিশাপ, তাঁদের আবার ফিরে যেতে হবে দুর্গের মধ্যে। সমস্ত ছবিটি বারবার আমার কাছে হয়ে উঠতে চাইছে temporality ও eternity-র মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মুহূর্ত। নীৎশের কথা স্মরণ করে বলা যায়, সিসিফাস ট্র্যাজিক— কারণ, সিসিফাস তার যন্ত্রণা সম্পর্কে ‘কনসাস’ ছিলেন। হাসুই-এর ছবিটিতে দু-জন নারী-পুরুষকে আধুনিক সিসিফাস বলে মনে হয়।

যে-দু-জোড়া চোখ এই দৃশ্য দেখে থমকে পড়েছে… বেরিয়ে এসেছে দুর্গের বাইরে… সে-দু-জোড়া চোখ আমার মতে temporality সম্পর্কে অতি-সচেতন। এবং এখান থেকেই ট্র্যাজেডির শুরুয়াত।

হাসুই-এর ছবি দেখতে দেখেতে আরেকটি ছবির সামনে বসে ছিলাম দীর্ঘক্ষণ, ‘দ্য পন্ড অ্যট বেন্টেন শ্রাইন’— ১৯২৯ সালে এ-ছবিটি নির্মাণ করেন হাসুই।

এক বিশাল দিঘিতে পদ্ম ফুটে রয়েছে, সবুজের পবিত্র সন্ত্রাসে দিঘির জল দৃশ্যমান নয়। দিঘির বুক চিরে চলে গেছে একটি ব্রিজ। দিঘির পাড়ের সবুজের জন্য পৃথক শেড। আর কিছু নেই, শুধু এক শান্ত দৃশ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক কিশোর ও কিশোরী।

ছবিটিতে এক আশ্চর্য খেলা আছে, খুব ভালো করে মন দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, কিশোরীটির পোশাকের রং ক্রমশ মিশে যাচ্ছে দিঘির বুক চেপে থাকা পদ্মপাতার রঙের সঙ্গে। এবং কিশোরের পোশাকের রং আরেকটু গাঢ়, সেটিকে অনুসরণ করছে দিঘির পাড়ে গাছপালার সবুজ সন্ত্রাস। যে-আলোর নীচে ওরা দু-জন এসে দাঁড়িয়েছে সে-আলো যেন থমকে দিয়েছে মহাজাগতিক ঘূর্ণন।

সমস্ত প্রকৃতি যেন কান পেতে অপেক্ষা করছে দু-জনের মাঝে ঝরে পড়া নিঃশ্বাসটুকু শুষে নেবার জন্য।

ছবিটা দেখতে দেখতে হঠাৎ শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমস্রোত নেমে যায়। শিল্পের ভিতর কি লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের স্মৃতি?

আজকাল বেশ কিছু অদ্ভুত চিন্তার হাতে আমি ক্রীড়নক হয়ে পড়েছি। যেমন হাসুই-এর এই ভুবনবিখ্যাত ছবিটির নির্মাণ দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে, ১৯২৯ সালে। এই দুই কিশোর-কিশোরী কি ডেস্টিনড? এই দৃশ্যও কি ডেস্টিনড হিরোসিমার মাশরুম ক্লাউডের নীচে দুমড়ে-মুচড়ে যাবার জন্য?

বেন্টেন শ্রাইনের দিঘির উপর দিয়ে চলে যাওয়া ব্রিজটি যেন ধীরে ধীরে এক অন্ধকার টানেলে রূপান্তরিত, হাসুই ষোলো-বছর আগে নির্মাণ করছেন একটি ছবি। যে-ছবির সমস্ত শান্ত আর সবুজের উপর ষোলো-বছর পর ঝরে পড়বে অ্যাটোমিক ক্লাউড।

বাটারফ্লাই-এফেক্ট ঘটিয়ে দেওয়া ‘সেই’ মথটিই কি সালভাদোর দালির গলিত ঘড়ির মধ্যে পড়ে থাকা মৃত মাছি ও ঘড়ির বাইরে পড়ে থাকা নিথর প্রজাপতি? দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ঘড়ির মধ্যে দুমড়ে যাওয়া দু-টি কাঁটার ছায়া পড়ে। সময়কে সূচিত করা সংখ্যাগুলি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। দোমড়ানো ডায়ালের পরিধির কাছে পড়ে থাকা মাছিটি নিশ্চয় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মেল্টিং-ওয়াচের থেকে বের হতে চেয়েছিল… পারেনি। কৃষ্ণগহ্বরের কাছে এসে কি এভাবেই বেঁচে যায় আলো? সময়-ধারণার পরিসমাপ্তির শেষে ওই মাছির পরিণতিই হয়তো আমাদের নিয়তি।

ঘড়ির বাস্তবতার বাইরে নিথর পড়ে থাকা প্রজাপতিটির কোনো ব্যাখ্যা পাইনি, হয়তো পাওয়া সম্ভবও নয়। সে কি এই মহা-ক্যাওসের থেকে কিছুটা দূরে থাকা এক অস্তিত্ব, যার ভূমিকা শুধু এক দর্শকের?

কিন্তু সব শেষে সেও তো মৃত।

আলোকবর্ষের ছদ্মবেশে পতঙ্গ বিরহ-সন্তাপ সম্ভবত এই। একটি বৃষ্টির দুপুর সালভাদোর দালির দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ঘড়ি উপহার দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল সেটি।

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

চতুর্থ পর্ব

পঞ্চম পর্ব

Spread the love

2 Comments

  • অসম্ভব মনন সমৃদ্ধ লেখা। লেখাটি, বিজ্ঞানভাবনা এবং সাহিত্য- শিল্পের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন করে।

    Arindam Ray,
  • একই মুগ্ধতা নিয়ে পড়লাম.

    শতদল মিত্র,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *