লেখক নয় , লেখাই মূলধন

পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রমণ

সান্দাকফুর পথে কয়েকদিন 

তিব্বতি রঙিন পতাকার ছায়া পড়েছে তার কালো জলে। উত্তর দিকে আবছা সান্দাকফু, পশ্চিমের আকাশ ফের সেই আবিষ্ট করে ফেলা লাল। হাওয়ার দাপট বাড়ে। আমাদের মনখারাপ, কেন গুষ্টিশুদ্ধু দেখলাম না আমরা।

টিপু বলে, চলো দিদি কয়েকটা সেল্ফি হয়ে যাক।

পান্ডিম লজ।

এই যে পাহাড়ে হাঁটা, এই যে ট্রেকার্স হাটকে এক-দু-দিনের ঘরবাড়ি বানিয়ে নেওয়া, রান্নাঘরে বসে আড্ডা, চা ডিমভাজার আবদার, কখনো দুধ দিয়ে কফি বানিয়ে দেবার অনুরোধ… এইসব দু-দিনের আলাপ হাসি কথায় কী পাওয়া যায়? হয়তো কিছুই না। বাঙালির অভ্যেস, যখন সে ভাষা হারায় তখন মনে পড়ে অবধারিত রবীন্দ্রনাথ। ছড়ার ছবির কবি আমায় উত্তর দেন “পথিক যে জন পথে পথেই পায় সে পৃথিবীকে
মুক্ত সে চৌদিকে
চলার ক্ষুধায় চলতে সে চায় দিনের পরে দিনে
অচেনাকেই চিনে”…

এতক্ষণ ছিল চলার ক্ষুধা। কালাপোখরির পান্ডিম লজে এসেই পেটের খিদে চাগাড় দিল। চা বিস্কিট পেয়ে শান্তি। এখানে রান্নাঘর আর থাকার ঘর দুটো বাড়ি মুখোমুখি। যেতে আসতে ঠোকাঠুকি লাগছে। আরেকটা গ্রুপের সঙ্গে। তাদের বেশিরভাগ অবাঙালি আর কয়েকজন ফরেনার। এক বাটি কালার্ড র‍্যাকেট পাপড় ভাজা নিয়ে একটি অল্পবয়সী মেয়ে বসে ছিল। এ-সব এখানে পাওয়া যায় জানতাম না। আমাদের যা দিচ্ছেন তাই খাচ্ছি।

বাবুদা এসে আমাদের গম্ভীরভাবে বোঝাচ্ছিলেন ফরেনাররা কত ডিসিপ্লিন্ড জানো! টি টাইম ছ-টা তো ছ-টা।এসে টেবলে বসে আছে। আবার চিনি মিশিয়েছে বলে রিজেক্ট করল। ডিনার টাইম ৭টা বলে উঠে গেল। সে বিলক্ষণ বুঝলাম। আমাদের রান্নাঘরে চায়ের জমায়েত বন্ধ করে দিতে হল ওদের টেবল গোছানোর জন্যে। আর ওদের খাওয়ার পর আমাদের জন্যে খাবার বানাতে একটু দেরি হল বলে আমরা পকোড়া ভেজে আনতে বললাম। প্রথমে দু- প্লেট, তারপর ইন্টু কতগুলো প্লেট হল সে লিডার দাদাই জানেন। আহা ঘরখানা বেশ আর চকচকে ডাবল লেপ। মরিচ দেওয়া চা আর পকোড়া নিয়ে জোর গপ্পে মেতেছি, ওমনি ওয়ার্ন করে গেল, পাশের ওঁরা ঘুমোবেন!! early to bed and early to rise… আমরা সেই মতো ভদ্র তখুনি। এই লজে খাবার পরিবেশনে বুফে সিস্টেম। ভাত, রুটি, ডাল, সবজি, সয়া বড়ার কারি, ডিমভাজা, পাপড়। যারা পিতলের থালা পেলাম তাদের বেশ রাজকীয় ভাব এল।

কালাপোখরি পিছনে সরে যাচ্ছে ক্রমশ। বারবার পিছন ফিরে দেখি আর অবাক হই কী সুন্দর পাহাড়ের ঢেউ পেরিয়ে পেরিয়ে আসছি আমরা। বয়স হাল্কা হয়ে যেন প্রজাপতি হয়ে যাচ্ছে। অনেক দূরে সামনে সান্দাকফুর আভাস। আজকের দিনটা ইদানীংকালের বহুল প্রচলিত Valentine’s Day, আমরা আমাদের সেই ভীষণ ‘প্রিয়’-র দিকে চলেছি সবাই। এই দলে সবাই হিমালয় পাগল। কেউ পাকা পাহাড়ু কেউ আমার মতো আনাড়ি প্রেমিক। সবাই মিলে হাঁটছি মহানন্দে।

বিকেভঞ্জনের শুরুতেই রাস্তায় বরফ! কনকনে হাওয়া। আর মেঘ। এত কালো যে, পথ হারিয়ে যায় বুঝি! একে-অন্যকে চোখে চোখে রাখি, হারিয়ে গেলে নাম ধরে ডাকি। উঁচুতে আরও উঁচুতে উঠতে উঠতে দেখি নীচে ঝকঝকে রোদ্দুর। ক্যামেরা বাগিয়ে তাক করতেই ম্যাজিকের মতও দৃশ্যবদল।

পাহাড় আমাদের নিয়ে লুকোচুরি খেলে এইরকম। পাইনের বন এগিয়ে আসে আমাদের অভ্যর্থনা করে। হলুদ রাস্তা কালো ঘন বন আমাদের ঘোর লাগিয়ে দেয়। সেইসঙ্গে একটা আশ্চর্য আওয়াজ আমাদের ঘিরে ধরে, যেন সমুদ্র গর্জন। হাওয়ায় হাওয়ায় পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তোলে। কে জানত হাওয়ায় এমনি ঢেউ ওঠে! কালচে নীল জঙ্গল দেখে মনে হয় কেন কবি শক্তি লিখছিলেন স্বর্গের রং ঠিক এমনই।

একটা উঁচু পাহাড়। তার মাথায় ছোট্ট একটা সাদা বাক্স মতো রয়েছে যেন। ওইটাই সান্দাকফু টপ। ওইখানে উঠব। শুনে দমটা গলা অবধি এসে থেমে গেল। এক ঢোঁক জল খেয়ে লাঠি ঠুকে এগোই। কমবয়সী ছেলেগুলোর হাতে লাঠিসোঁটা নেই। বেশ হাঁটে সব ক-টা। মেঘ ঠেলে ঠেলে হাঁটা এখন আমাদেরও দিব্বি অভ্যেস হয়ে এসেছে। পাথর পাথর পথে মাঝে মাঝে লাল দিয়ে তির চিহ্ন আঁকা। ওই দেখে চলো। সামনেটা মেঘে ঢাকা তো কী!

ক্রমশ সব মেঘ পড়ে রইল নীচে। আমরা বুঝতে পারছি আর বেশি দূর নেই।

শুকিয়ে যাওয়া গলা হলেই-বা কী, গাইতে গাইতে হাঁটছি
“আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি
দেখা যায় তোমাদের বাড়ি…”

মাঝখানে ইন্ডিগো ব্লু দু-পাশে ধপধপে সাদা মেঘ উড়ছে, সেই নীলের বুকে আঁকা পিরামিড পিরামিড মাথাওয়ালা একটা বাড়ি নজরে এল অনেক উঁচুতে প্রথম। হৈ হৈ করে উঠলাম। বিভোর হয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হলাম!! এসে গেছি তবে!

একটা উঁচু পাহাড় সামনে। পাথুরে পথটা আমাদের উঠিয়ে আনল একটা সাইনবোর্ডের কাছে তাতে লেখা:
Singalila National Park
Leave nothing but footprints
and take nothing but…

বাকিটা আবছা। কী হতে পারে ভাবতে ভাবতে এগোই। তার পাশে watch tower. তার বাঁ-দিকে বেসিন মতো জায়গায় বেশ অনেক ঘরবাড়ি, মানে ট্রেকার্স হাট, হোটেল এইসব। প্রচণ্ড মেঘলা আর হু হু হাওয়ায় কেঁপে-কুপে আমরা সবুজ চালওয়ালা বাড়িটার মধ্যে গুটগুট করে ঢুকে পড়লাম। হাওয়া আর ঠান্ডা একনিমেষে গায়েব। সামনেই সবচেয়ে উঁচু স্পট। কিন্তু আবহাওয়া বিশেষ সুবিধের নয়।

বাইরের আকাশ আষাঢ়ে মেঘলা। মন খুব দোটানায়। দেখতে কী পাব কিছু!?

রান্নাঘর থেকে খবর এল জলদি খেয়ে নিন। ডাইনিং-এ গিয়ে বসি। কাচের জানলা সব ঘরে। তাই খুব ভালো লাগছিল। ১১০০০ ফিটেরও কিছু বেশি ওপরে এসে এই কনকনে শীতে টেবল সাজিয়ে দিচ্ছেন গরম ভাত, ডাল, সবজি, পাপড়, শশা, পেঁয়াজ, টমেটো, আর নবরত্ন আচারে। সঙ্গে হাল্কা গরম জল। স্বর্গীয় অনুভূতি। মনে মনে কুর্নিস জানাই সেই হোস্ট আর হোস্টেসকে। যাঁরা এরপর আমাদের জন্যে সাজিয়ে রেখেছেন, পর্দা টানা কাচের জানলায় ভরা ঘর, নরম খাট আর লেপ।

গিয়ে বসি আর অজান্তে অপেক্ষা করি এক স্বর্গীয় মুহূর্তের।

“কী দেখেছ, কী দেখেছ, বলো
চুপ চুপ! দু-চোখ জুড়োল”

আজকের এই ১৪ই ফেব্রুয়ারির বিকেল আর ১৫-র ভোর থেকে সারাদিন এর কথা বলতে বললেই চুপ করে যেতে হয়। কিছুতেই বলে বোঝানো যাবে না যে, বিকেলের শেষে কীরকম করে হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে তুষারকণারা ঝরে ঝরে পড়ছিল, রূপকথার গল্পের মতো সারাটা এলাকা ধপধপে সাদায় সাদা হয়ে যাচ্ছিল, সেই তুষারমালার দেশের পথঘাট পাইনের বন চুপচাপ শান্ত হয়ে কোনো রাজকন্যার প্রতীক্ষা করেছিল সারারাত। সারা সন্ধ্যে তুষার ঝরা শেষ হলে দু-একটা তারা আলো জ্বেলে বেরিয়ে এসে কাকে পথ দেখিয়েছিল…

সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখি ছেলেরা হৈ হৈ করে গুঁড়ো বরফ কণা মেখে নিচ্ছিল সারা গায়ে, জানলার কাচ ঝাপসা করে বরফ কণারা নীচের কাঠে জমা হচ্ছিল খই ফোটার মতো। কেউ কেউ ছবি তুলে নিচ্ছিল, আমার হঠাৎ মনে পড়েছিল একটা গান
“কাশ্মীরেও নয়, শিলং-এও নয়
আন্দামান কি, রাঁচিতেও নয়
আরও যে সুন্দর…
রয়েছে কাছে এইখানে এই প্রাণে এই মনে আরো নির্ভর।”

কাঠের ঘরে ফাঁক দিয়ে বরফ এসে জমছিল মেঝেয় জানলায়।

আমরা বিভিন্ন জানলায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, আর ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিলাম প্রায়। ঘরে কাংড়ি রাখা বারণ গত দু-বছর ধরে সিংগালীলা ন্যাশনাল পার্কে, অতঃপর চায়ের অর্ডার হল। ব্র‍্যান্ডির নিদান দিলেন কেউ। টয়লেটের পিচ্ছিল মেঝেয় যাতে কেউ অসাবধানে পড়ে না যায় সে-ব্যাপারে কেউ এসে সজাগ করে গেলেন। রান্নাঘর থেকে ডাক এল সাড়ে সাতটায় ডিনার সেরে ফেলার জন্য। সবাই মিলে ঠিক হল খিচুড়ি। সবজি দিয়ে খিচুড়ি আর স্যালাডের পাশাপাশি রান্নাঘর থেকে পাপড় ভাজার ঝুড়ি কোচড়ে বেরিয়ে এল ছোট্ট খুকি, তার কান মাথা কিচ্ছু ঢাকা নেই।

কালো আকাশে ফুটে ওঠা তারা অলিখিত ঘোষণা করে দিল আগামীকাল আকাশ পরিষ্কার থাকার সম্ভাবনা।

ঘুমোতে গেলাম নামেই, প্রবল ঠান্ডায় হাড় কাঁপুনিতে এপাশ ওপাশ করেই রাত। একটা ফেদার কোট খুব দরকার ছিল।

ভোরের আলো ফোটার আগেই ম্যাজিকের মতো সবাই নিজে নিজে উঠে পড়ে আর কেউ কারোর সঙ্গে একটিও কথা না বলে নিশি পাওয়ার মতোই কোনোমতে টুপিটা ঠিক করে পরে নিয়েই বেরিয়ে যেতে থাকে। একটা একটা করে ছায়া সেই আধো-অন্ধকারে দরজা দিয়ে বেরিয়ে মিশে যায় রাত কাটা আলো আঁধারিতে। কে কোন জন বুঝতে না পেরে আমি একজনের পিছু নি। সঙ্গে শুধু সেলফোন। ক্যামেরা নিতে ভুল হয়ে যায়। চলতে চলতে সে-মানুষ হারিয়ে যায়, একলা আবছায়াতে ফটফুটে বরফে পা রেখে খুব মনকেমন করতে থাকে, কারণ বুঝি না। জোর পা চালাই উঁচু জায়গাটার পথ ধরে। পিছু ধরি একদল টগবগে তরুণ দলের। ওরা কি ক্ষিপ্রতায় প্রচণ্ড খাড়াই বেয়ে উঠে যাচ্ছে। বুঝতে পেরে যাই ওদের বয়সটার জন্যে আমার মনকেমন করছে। এত বেশি সতর্ক হয়ে পড়লাম কবে! কেউ একজন আমার হাত ধরে নেয়, কয়েক পা উঠেও পড়ি, ওরা প্রায় দৌড়ে উঠছে, অন্যজন বলে আন্টি আপনি খালি হাতে পারবেন না। ঠিক বলে। আমি থামি। আমার জনেরা সব কই। নেমে আসি। ফাঁকা একটা জায়গা খুজে দাঁড়াই। উত্তর দিকে আবছায়ায় বুদ্ধদেব স্পষ্ট শয়ান। সম্মোহিত হই। ডান হাতে শুরু হয়ে গেছে রঙের খেলা, ক্রিমসান, স্কারলেট, ভারমিলিয়ন, এম্বার, বার্ণ্ট এম্বার, অরেঞ্জের স্তর কাটিয়ে প্রথম আলো পড়ল কাঞ্চনজঙ্ঘায়। মোহ, মগ্নতা আচ্ছন্নভাব কাটিয়ে দৌড় দিলাম পিছনের নির্মীয়মাণ হোটেলের দিকে। ছাদে আবছা কিছু মানুষ নজর হয়, কোত্থেকে চলে আসে শুভ। শক্ত করে হাত ধরে নিয়ে বকে, খুব পিছল, বরফ গলবে, আমার সঙ্গে আসুন দিদি। দু-জনে দৌড়ে প্রায় পাঁচ তলায়। একেবারে কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখোমুখি। হিমেল হাওয়ার দাপট সামলে বড়ো বড়ো চোখে দেখি উত্তর-পশ্চিমে মাকালু লোৎসে এভারেস্ট স্পষ্ট হয়ে উঠল ক্রমশ।

সারাটা দিন মহান হিমালয় এভাবে জড়িয়ে থাকবে পাকে পাকে তা বোঝা যাবে না যদি না গুরদুমের রাস্তায় পা রাখতাম। বাঁকের পর বাঁক, কে যেন বলল বিরাশিটা! সে তো অগুন্তি পাকদণ্ডী, কিন্তু ফিরে ফিরে সামনে ভেসে উঠছেন রুপোলি মুকুটে সাজানো কাঞ্চনজঙ্ঘা, এভারেস্ট মাকালু, লোৎসে।

শেষ পাতা

পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রমণ

আমাদের নতুন বই