পিয়ালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রমণ

সান্দাকফুর পথে কয়েকদিন

আমি মনে মনে এভারেস্টকে ডাকি মাউন্ট রাধানাথ বলে। আর ছেলেমেয়েদের ক্লাস নিতে গেলেও সেই মহান বাঙালির গল্প বলি। রাধানাথ শিকদার।

যাইহোক, সান্দাকফু টপ-এ একরকম অলৌকিক প্রাপ্তির পর আমাদের ছবি তোলার আদিখ্যেতা শুরু হল। সামনে আমি পিছনে রেঞ্জ। সামনে দল, ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝকঝকে রেঞ্জ। ব্রাশ করতে করতে এভারেস্ট, ম্যাগি খেতে খেতে এভারেস্ট, জল ভরতে ভরতে, ব্যাগ গুছোতে গুছোতে, ক্রিম মাখতে মাখতে, কোকা ৩০ গালে ফেলতে ফেলতে, লাঠিটা কোথায় ফেললাম খুঁজতে খুঁজতে মনে প্রাণে জড়িয়ে নিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা আর সাগরমাতাকে।

এবার নামব।

পাইনের বন। মাঝখান দিয়ে পথ। টুকুস টুকুস করে নামছি। নামছি আর দেখছি। যত না নামি দাঁড়াই বেশি। কথা বলি, গান গাই, ছবি তুলি। তুলে তুলে কুল পাই না। সবটুকুই পকেট ভরে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়। এই চমৎকার রোদ বরফে পড়ে আছে, আর বরফেরা পড়ে আছে হলুদ ঘাসে, জমে আছে পাইনের পাতার ফাঁকে, পুরোনো পুড়ে যাওয়া গাছের কোটোরে, ডাঁই করে ফেলে রাখা সরু মুখ কাচের বোতলগুলোর ওপর কিংবা দূরের সবুজ টিনওয়ালা ট্রেকার্স হাটের চালে, এই সবকিছুই বড্ড ভালো লাগায়। ভালোবেসে আমরা এর ওর মুখে তাকাই। হাসি। দাঁড়াও দাঁড়াও বলে ছবি তুলে নি, যাতে ব্যস্ত শহরে ফিরে গিয়ে অনায়াসে তাকে বলতে পারি এখন আরও অনেকদিন তোমায় সহ্য করে চলার রসদ নিয়ে ফিরেছি।

পথ নেমে যায়, আমরাও নামি, পথ বাঁক নেয়, আমরাও নি, পথ লাফায়, আমরাও কেউ পাশ হয়ে, কেউ কাত হয়ে, কেউ বসে, কেউ তাল মিলিয়ে লাফিয়ে নামি। নামতে গিয়ে পড়ি ধুপ করে, পা কখনো ভুস করে এগিয়ে যায় আমার আগেই, কখনো এগোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াতেই পাশ থেকে কারো শক্ত ভরসা দেওয়া হাত এগিয়ে এসে পলকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অনেকটা পথ। Nothing comes from nothing/nothing ever would somewhere in my youth, or childhood/I must have done something good’.

গুরদুমের রাস্তায় সম্মোহন আছে। সবুজের। সবুজ মানে নীলচে, কালচে, বাদামি, খোড়ো, ধূসর, কচি, লালচে সবরকম সবুজ। পাইন শেষ হল তো বাঁশ। আর পাখিরালয় যেন। সারা রাস্তা পাখির ডাক। একটা খোলা চত্বর এল। সেটা পেরোতেই এক মানুষ চলার মতো পথ পেতে দিল রিম্বিক পাহাড়। সবজে কালো জাফরি কাটা চলনপথ ধরে আমরা এবার সবাই আগুপিছু হাঁটি। কখনো একা বা দু-তিনজন। একটু হাঁপিয়ে নি মাঝে মাঝে। কুহেলি দি কখন এগিয়ে গিয়েছে দেখাই যাচ্ছে না। টিপু আজ পাখিকে কিছুতেই থামতে দেবে না ঠিক করেছে বোধহয়, প্রায় ঘোড়দৌড় করিয়ে ছাড়ছে। আর পাখিও ওঠার দিনের অসুবিধেটা নামায় পুষিয়ে নিচ্ছে। পাশ কাটিয়ে এরাও ভ্যানিস। রূপাবৌদি ভুল করে একখানা উলিকট গায়ে দিয়ে এসে গরমে কষ্ট পাচ্ছেন। আর রাস্তার পাশের বরফ তুলে মাখতে মাখতে চলেছেন। মোমদির পা একবার ফস্কেছে বলে নিজেই স্পিড কমিয়ে সাবধানে চলছে। মিস্টু ঘন জঙ্গলের পাশে গরগর আওয়াজ পেয়ে দলের মধ্যে হাঁটছে। নাহলে পায়ে চাকা লাগিয়ে চলছিল।

আমি আর কুঁড়ি নামছি। ওকে পেয়ে আমার বয়েস ওর বয়সে নেমে এসছে এখন আমি আর নামছি না। স্লিপ খাচ্ছি ইচ্ছে করে। ঢাল দেখলেই হাল্কা করে বসে ভাসিয়ে দিচ্ছি গা। লিডার দাদা ইচ্ছেমতো কখনো এগিয়ে কখনো পিছিয়ে দলের তদারকি করছেন। আর চলছে গান। দাদার পছন্দের গান ইউথ কয়্যার, সলীল চৌধুরী, আই পি টি এ…

আমার বেশ একলা হাঁটা পছন্দ। একসময় বেশ এগিয়ে নেমে গেছি। চারপাশে শুধু সবুজ জঙ্গল। কে না জানে এই ঘন বনে লেপার্ড ক্যাট থাকে। সে-কথা একটু আগেই আমাদের পোর্টার শুনিয়েছে গম্ভীরভাবে। আর সহেলিদি তো একখানা থাবার ছবিও তুলেছে।

এ উতরাই আমাদের চিরকাল মনে থাকবে। সারাদিন ধরে নামছি। ঘুরে ঘুরে নেমেই চলছি। না কমে জঙ্গল, না কমে বাঁক। আর পা ফেলা!? সে কী ধাপ রে বাবা! জল যেতে পারে এমন পথে যদি বিভিন্ন আকারের মানুষকে যেতে বলা হয়। বসে নামলে আটকে যাব এমন সরু, আর দাঁড়িয়ে নামলে ভু…স।

জঙ্গল একটু ফাঁকা হয়ে একবার একটা উৎরাই-এ এসে আমরা জামা কাপড় হাল্কা করে স্যাকে ঢোকাই। এই জায়গাটায় অনেক পোড়া গাছের গুঁড়ি পথের ধারে ভাস্কর্যের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। শোনা যায় ১৯২৫-এর দাবানলের চিহ্ন এগুলো।

গুরদুম হয়ে তিম্বুরে

এতক্ষণ ছিল শুধু পাখির ডাক, পাতা ঝরার শব্দ, আর পায়ে চলার আওয়াজ। বিকেল গড়িয়ে আসে প্রায়, গুরদুমের ছোট্ট ছোট্ট বাড়িগুলো দেখা যায়। বাড়ি মানে মানুষ, মানে তেষ্টা, জল, আশ্রয়। কিন্তু যতই নামছি পাকে পাকে ততই কি বাড়িগুলোও নামছে না কী! হাল্কা হয়ে আসছে রিম্বিক ফরেস্ট বিট-এর ঘন বন, ঝরঝর করে শব্দ প্রথম শোনা গেল, তখনও শ্রীখোলা কত নীচে। বাড়িঘর দেখার পর ক্লান্তি বাড়ছে। আর চলতে পারছি না। জলের আওয়াজ কানে নিয়ে নামতে নামতে প্রায় সন্ধ্যে।

পাগুলো ভারী হয়ে আসে। পথ পৌঁছে দেয় গুরদুমের প্রথম হোটেলে। সেখানে একটু জিরিয়ে আবার নামা।

এবার সন্ধ্যের অন্ধকারে জঙ্গলের পথ বেয়ে টর্চের আলোয় জলের শব্দভেদী পথ হাঁটা। মাথার ওপরে আকাশে তাকালে বিস্ময়! এখন অমাবস্যা, তাই অজস্র হীরের কুচি নানান ঘনত্বে জ্বলছে, ঝলসাচ্ছে, অন্তরাত্মা আলোয় ভরে দিচ্ছে। মিল্কি ওয়ে স্পস্ট। আমরা কিছু দেখতে পাচ্ছি না, আর দেখতেও চাইছি না। মনে হয় এই অনন্ত পথ চলা আমার সারাজীবনের সঞ্চয়। কখন তারই মধ্যে এগিয়ে এসে করণ মাথায় হেড টর্চ পরিয়ে দেয়, আগের পৌঁছোন দলের ছেলেরা পাঠিয়ে দিয়েছে পিছনের মানুষদের সুবিধের জন্যে। ঝরনার জলের আওয়াজ বাড়তে বাড়তে একসময় ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের মস্তিষ্ককে ঘিরে ফেলে। আমরা ব্রিজের কাছে নেমে এসেছি। পার হয়ে মটরশুঁটির ক্ষেত, টোমাটো, বাঁধাকপির ক্ষেতের পাশে সরু পথ ধরে এসে পৌঁছোই তিম্বুরে। আজ রাতের আস্তানা।

তারা ভরা আকাশের নীচে দাঁড়াই। শরীরের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় হীরেয় মোড়া মায়াবী অমানিশার আকাশ।

টুকরো প্রসঙ্গ কিছু

তারা: একজন আদ্যন্ত শহুরে মানুষকে যদি এক অমানিশার শীতল রাতে এক আকাশ তারা দিয়ে দেওয়া হয়! সে কী করে।

হেড টর্চটা বন্ধ করে অন্ধকার জঙ্গুলে পাকদণ্ডীর খাদ ঘেঁষে চুপ করে দাঁড়ায় একটু। এখানে তাকে কেউ চেঁচিয়ে সাবধান করার নেই। কারণ, যারা হাঁটছে তারা আগে পিছে, অন্ধকারে নিজেদের সামাল দিতে ক্লান্ত।

মাথা তুলে আকাশ দেখে চোখ ভরে। আর বাড়ি ফিরে শিশিরকুমার দাস-এর তারায় তারায় বইটা আবার বের করে পড়ার কথা ভাবে।

একজন মানুষকে খুব মনে হয়, মিহির সেনগুপ্ত। মাস্টারমশাই, যাঁকে অনেক বড়ো হয়ে জেনেছে। জিনি আজন্ম একটার পর একটা স্কুল আর ছাত্র তৈরি করে গেছেন। পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে, ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে তাদের দৃঢ় আর মজবুত মেরুদণ্ড বানিয়েছেন, পুরুলিয়ায় নিয়ে গিয়ে তারা চিনিয়েছেন। ফিরে গিয়ে তাঁকে বলতে হবে এই তারা দেখা।

একটা করে গান মনে আসে কিন্তু গাই না। কারণ, এ-সময় সে-স্তব্ধতাকেই আপ্রাণ শুষে নিতে চাইছে।
“তোমারই নাম সকল তারার মাঝে।” কে এই তুমি!

“আজি যত তারা তব আকাশে”… ‘তব’ মানে কার আকাশ!

“তারায় তারায় দীপ্ত শিখার অগ্নি জ্বলে…” কী অদ্ভুত কথা, কোন পাহাড়ে বসে কবি এমন করে ভেবেছিলেন।
“I wandered off by myself,
In the mystical moist night— air, and from time to time,
looked up in perfect silence at the stars”

শ্রীখোলা আমাদের মোহমুগ্ধ করে রাখে সারারাত তার জলতরঙ্গ শুনিয়ে। মনে হয় তার টানেই তারারা নেমেছে এত কাছে। এখানে দুটো পাহাড় বন্ধু হয়েছে। জুড়বে জুড়বে করেও অল্প স্পেশ রেখে পাশাপাশি আছে। এক নদী জল যাওয়ার জায়গা রেখে দেয়। কী ভালো হিসেব। তাই ওরা আকাশকে এত নিবিড় করে পায় রোজ।

প্রথম পাতা

Spread the love

4 Comments

  • পড়তে পড়তে আমিও তোমার সাথে হাঁটছিলাম, এতো সুন্দর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছ যা সত্যিই খুব হৃদয় গ্রাহী| এই হচ্ছে পাহাড় যার প্রতিটি বাঁকে রহস্য লুকিয়ে আছে, এদিকে তাকালে মনে হয়, এই বুঝি ওদিকটা মিস করে গেলাম|

    Sumi Dattagupta,
  • আমার যাওয়া হয়নি। পড়তে পড়তে তাই যেন মানস ভ্রমণ হয়ে গেলো। কখন যে নিজেই সহযাত্রী হয়ে গেছিলাম বুঝতে পারিনি। লেখা শেষ হবার বেশ কিছুক্ষণ পরে যেন ঘোর কাটলো।

    Arup Chakraborty,
  • স্বপ্নের জায়গা… যাওয়া হয়নি। ছবি, গান, কবিতা যুড়েছো মিনাকারী কাজের মতো। লেখাটা একটা মিনাকারী রত্নখচিত মুকুট হয়েছে উঠেছে…. দেখতে পাচ্ছি সাগরমাতার হাতছানি

    Tanusree banerjee,
  • খুব প্রাণবন্ত ও আনন্দ দায়ক। বহুবার যাওয়া সত্বেও নতুনত্ব পেলাম লেখার গুনে ।

    বিদ্যুৎ,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *