Categories
পরিক্রমণ

মৈনাক কর্মকারের পরিক্রমণ

রূপকুণ্ড রেড জোন…

Lock down শব্দটার সাথে পরিচিত হলাম মার্চ ২০২০-তে।
তারপর জানলাম রেড জোন, অরেঞ্জ জোন, গ্রিন জোন।
২০১৮ সালে আগস্ট মাসে উত্তরাখণ্ডের রূপকুণ্ড ট্রেক রুট বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এই এখন যেমন লক ডাউন চলছে সেইরকম। রূপকুণ্ড রেড জোন।
ওখানে ট্রেক করতে গেলে যে-দু-টি বুগিয়াল আছে সেখানে এখন রাত্রিবাস করা যাবে না।
আমি সৌভাগ্যবান কারন আমি ৩-১০ জুন ২০১৮ রূপকুণ্ড ট্রেক করি।
আমাদের ১৪ জনের দল।
তবে কেন সরকার এই ট্রেক রুট বন্ধ করল সেটা ওখানে গিয়ে উপলব্ধি করেছি।

আমরা ট্রেক শুরু করি ওয়ান গ্রাম থেকে। লালকুয়ায় ২রা জুন ট্রেন থেকে নেবে ছোটো বাসে ওয়ান গ্রাম পৌঁছোতে সেদিন বেশ রাত হয়ে গেল।
পরদিন ৩রা জুন ২০১৮ সকালে পরিষ্কার নীল আকাশ, সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বেরোতে ৯: ৪৫টা বেজে গেল।

আমরা ইচ্ছে করেই একটু দেরিতে হাঁটা শুরু করলাম। ইন্ডিয়া হাইকিং-এর একটা বড়ো টিম যাবে, ওরা যাবার পর আমাদের পথ চলা শুরু, আমরা একটু নিরিবিলি নিজেদের মতো করে পথ চলতে চাই… দু-চোখ ভরে দেখতে চাই।

চলার পথে নীল গঙ্গা নামে এক সরু নদী, তার উপর ছোট্ট এক ব্রিজ পেরিয়ে, চড়াই উৎরাই আবার চড়াই এভাবেই জঙ্গলের পথে পৌঁছে গেলাম গহেরীয়া পাতাল তখন বিকেল ৩: ২৫।

সেদিন আকাশ ছিল পুরো নীল, ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ, ওখানে পৌঁছে আমরা লাঞ্চ করি।

জঙ্গলের মধ্যেই আমাদের টেন্ট লাগানো হল। চারদিক নিস্তব্ধ, তার মধ্যে নাম না জানা পাখির গান খুব সুন্দর লাগছিল। বড়ো বড়ো গাছ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট উঁচু, ঘন জঙ্গলের ফাঁকে সূর্যের তেরচা আলো এসে জায়গাটা আরও সুন্দর করে তুলল।

আজ ৪ঠা জুন ২০১৮ সকালে খাওয়া দাওয়া সেরে হাঁটা শুরু করতেই চোখে পড়ল একটি দোকান তার পাশেই স্থায়ী ক্যাম্পসাইট সেখানে কিছু টেন্ট লাগানো।
হালকা চড়াই জঙ্গলের পথে আমরা চলেছি আলী বুগিয়াল।

আলী বুগিয়ালে প্রায় এক ঘণ্টা কাটালাম তারপর আবার চলা শুরু।

এবার কিন্তু শুধু আমরা একা নই। আরও বহু মানুষ চলেছে সাথে আমরাও চলেছি। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা ঢিপির মতো জায়গায় প্রচুর মানুষ একসাথে, কেউ বসে কেউ কোলে শুয়ে, কেউ গিটার বাজিয়ে গান ধরেছে, ওখানে পৌঁছে অবাক হলাম। বৈদিনী বুগিয়াল চলে এসেছি কি সুন্দর জায়গাটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।

কিন্তু একটু ভালো করে দেখতেই রাগ হল খুব। এ কোথায় এলাম, চারদিকে শুধু টেন্ট। উপর থেকে ক-টা ছবি তুলে নেবে এলাম বৈদিনী বুগিয়াল। মখমলের মতো ঘাসের উপর আমরাও একটু দূরে টেন্ট লাগলাম।

এখানে এসে আমাদের টিমের সকলেরই কেমন যেন লাগছিল। গতকাল যেখানে ছিলাম কী সুন্দর ফাঁকা জায়গা, আর আজ এ কোথায় এলাম! অসংখ্য টেন্ট শ-য়ে শ-য়ে লোক কেউ বক্সে গান বাজিয়ে নাচানাচি করছে তো কেউ তালি বাজিয়ে চিৎকার যেন মেলা বসেছে, বৈদিনী মেলা, এত লোক একসাথে আমি দেখেছি, সে তো অমরনাথের রাস্তায়।

বহু বছর ধরে ট্রেক করছি আমি, এত ভিড় এত চিৎকার কখনো পাহাড়ে শুনিনি। পাহাড়ে তো মানুষ আসে শান্তির জন্য পাখির ডাক শুনতে কিন্তু পাখি এখানে আসবে কী করে, ফুল ফোটার আগেই তো চলার পথে পা দিয়ে পিষে মেরে ফেলা হচ্ছে।

এইসব দেখে আকাশের মুখ ভার হয়ে গেল। রাত নাবল পাহাড়ে, ভাবলাম এবার বুঝি শান্ত হবে পরিবেশ, কিন্তু না আমার ভাবনার ভুল, DJ-র মতো কিছু একটা বাজানো হচ্ছে তার সাথে উদ্দাম নৃত্য। যাইহোক রাতে খেয়ে ঘুম।

আজ ৫ই জুন ২০১৮ আমরা আজ যাব পাথর নাচুনি। আগের দিনই ঠিক করে নিয়েছিলাম সকাল সকাল হাঁটা শুরু করব, তাহলে হয়তো রাস্তা ফাঁকা পাব।
আমার মতো অনেকেই বোধহয় তাই ভেবেছে। সকাল হতেই ভিড় শুরু, বেশ কিছুটা টানা চড়াই কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায় পিঠে মাল নিয়ে উঠতে হাঁপিয়ে যাচ্ছি, একটু দাঁড়ালেই কেউ একজন বলে উঠছে side please. আমাদের টিমের সবাই যে যার মতো হাঁটছে কেউ কারোর খবর নেবে তার উপায় নেই।
কোথায় একটু বসে জিরিয়ে নেবেন। পাশ থেকে একজন বলবে, “… চালিয়ে চালিয়ে।”
আমি তো একজনকে বলেই বসলাম, “… আমি চলব কেন?”
সে বলল, “… জলদি পৌঁছনা হায়।”

আমি বুঝলাম ওর বোধহয় ভুল হচ্ছে কোথাও। আসলে এদেরও দোষ নয়। এজেন্সির একটাই গাইড ৩০ থেকে ৪০ জনের দলকে নিয়ে চলেছে। খানিকটা ভেড়া তাড়ানোর মতো করে। দল বেঁধে লোক চলেছে মাঝে-মধ্যেই চিৎকার করে বলছে, “… হর হর মহাদেব।”
বুঝলাম এরা নিশ্চই এর আগে অমরনাথ বা কেদারনাথ ট্রেক করে এসেছেন।

অনেকটা হাঁটার পর একটা চওড়া জায়গায় বসলাম, ফ্লাক্সে চা নিয়ে এসেছি সেটা সবাই মিলে খাব। ভাগ করে নিচ্ছি হঠাৎ একজন বললেন, “… নিশ্চই বাঙালি, দাদা একটু চা হবে নাকি…”

স্বাভাবিকভাবেই ভাগ করে খেলাম। আবার পথ চলা শুরু, পাথর নাচুনির একটু আগেই চোখে পড়ল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে একটা সমতল জায়গায় গোটা ৪০ টেন্ট, পরে জানলাম এগুলো কোনো এজেন্সিদের, তাদের স্থায়ী ক্যাম্প সাইট করেছে। কেন স্থায়ী বলছি কারণ হল টেন্টগুলো মে মাস থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত থাকবে, টয়লেট টেন্ট যার নীচটা মেঝে করে কমোড বসানো সঙ্গে জলের ট্যাঙ্ক, বেসিন, প্রতি টেন্টে ম্যাট ও স্লিপিং ব্যাগ রাখা, কাস্টমার আসছে একরাত থেকে চলে যাবে। আপ্যায়নে যেন ত্রুটি না হয়। বিশাল বড়ো পারমানেন্ট স্টোর চারটে হবে বোধহয়।

এইরকম আয়োজন সর্বত্র মানে বৈদিনী বুগিয়াল, পাথর নাচুনি, বগুয়াবাসা।
যাইহোক পাথর নাচুনিতে রাস্তার ধারে টেন্ট লাগানোর জায়গা পেলাম। ছোট্ট জায়গা প্রচুর লোক।
পাথর নাচুনিতে সূর্যাস্ত দেখব, সূর্য ডোবার মুহূর্তে খুব জোরে হাততালি, সাথে চিৎকার, “… ওয়ে………….. য়ে…”
কাক খাবার ফেলে পালিয়ে গেল, সূর্য ডোবার আগেই মেঘ ঢেকে দিল।

পরদিন সকাল আজ ৬ই জুন ২০১৮ সূর্য আর ওঠার সাহসই দেখাল না ওই চিৎকারের ভয়ে। সকাল থেকেই বৃষ্টি, তার মধ্যেই লোক চলেছে। আমরা যে যার টেন্টে।

৯টা নাগাদ বৃষ্টি কমলো আমরা সব গুছিয়ে রওনা হলাম আজ বগুয়াবাসা। কলূ বিনায়ক টপ পর্যন্ত্য টানা চড়াই। যেহেতু দেরিতে পথ চলা শুরু করেছি তাই একটু ফাঁকা।

কিন্তু যখন বিনায়ক টপ পৌঁছোলাম ওখানে তখন সাংঘাতিক ভিড়। মনে হল দুর্গা পূজার সকালে অঞ্জলি দিতে এসেছে।

“… দাদা একটু সাইড দিজিয়ে…”
এই বলে বলে একটা জায়গায় সবাই বসলাম একটা গ্রুপ ছবি তুললাম।
আমাদের টিমের মধ্যেও “ওয়ে…” বলে চিৎকারের রোগ ধরে গেছে। দু-জন মানুষের সাথে আলাপ হল তারা এই প্রথম ট্রেক করতে এসেছে তাদের ৮ জনের দল। একজন বলছে, “… দাদা এত কষ্ট জানলে আসতাম না।”

প্রসঙ্গত বলে রাখি বিনায়ক টপে ৩টে দোকান আছে ওখানে অনেক কিছুই পাওয়া যায়। সব দোকানেই খুব ভিড়। পুজো দিয়ে এগিয়ে চললাম বগুয়াবাসা। ওখানে পৌঁছোনোর আগেই চোখে পড়ল পাথরের উপর অসংখ্য টেন্ট।

আমরা একটু এগিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় আমাদের তাবু লাগলাম। আজ বেশ ভালো লাগছে, দূরে লোক থাকলেও কোনো শব্দ কিন্তু পাচ্ছি না।

কাজেই পাহাড়ের মজাটা আছে… আজ দারুণ সূর্যাস্ত দেখলাম। না, আজ কোনো সিটি নেই হাততালি নেই। অবাক হয়ে আকাশে শুধু রঙের খেলা দেখে গেলাম। তাড়াতাড়ি ডিনার করে শুতে হবে।
সবাইকে বললাম কাল ৪:৩০-তে বেরোব। সকালে চা আর কেক খেয়ে রওনা দেব।
রাত দুটো বাজে পাশের টেন্টে খুটখাট আওয়াজ, আমি চুপ করে শুয়ে আছি ঘড়িতে দেখি ২টো ৫ আমি চোখ বুঝলাম। আড়াইটা বাজতেই আমার টেন্টের সামনে দাড়িয়ে অনুপ চিৎকার করতে শুরু করল।
মৈনাকদা ওঠো ওঠো, সবাই চলে যাচ্ছে। তুমি বাইরে এসে দেখো।
নিরুপায় হয়ে বাইরে বেরিয়ে আমি অবাক করা দৃশ্য দেখলাম।
শ-য়ে শ-য়ে লোক হেডলাইট জ্বেলে রূপকুণ্ডর দিকে চলেছে। মনে হচ্ছে যেন পাহাড়ের গলায় হীরের মালা। অপূর্ব দৃশ্য সেটাই দেখলাম ১০ মিনিট ধরে। তারপর বললাম অনুপকে, “… এখন যাব কেন?”
ও ভারী মজার কথা বলেছিল, “… সবাই চলে যাচ্ছে, চলো চলো।”

আজ ৬ই জুন ২০১৮ এ-সব করতে করতে ৪:২০ বেজে গেল আমরা রওনা হলাম… আমরা সবার শেষে।
পিছনে তাকিয়ে দেখি আমাদের পরে আর কেউ নেই, সবাই আমাদের সামনে। এতে একটা সুবিধা পুরো রাস্তায় লোক সামনে চলার জন্য বুঝতে পারছি কতটা চড়াই উঠতে হবে।

ঘণ্টাখানিক পরে অন্য বিপত্তি, এবার দেখি লোক নাবছে। এই রুটে বগুয়াবাসা থেকে রূপকুণ্ড রাস্তাটাই সব থেকে সরু। তবে ২ জনের চলতে কোনো অসুবিধা হয় না।

যেই নাবছে সেই এক কথা বলে চলেছে, “… Best of Luck থোরাসা বাকি বিশ মিনিট বাকি”
আধঘণ্টা পরের লোকও একই কথা বলছে।

গতকাল কলূ বিনায়ক টপে যে-দু-জনের সাথে কথা হয়েছে তাদের সাথে দেখা।
বলল, “… দাদা ভিড়ের মধ্যে কী দেখলাম ঠিক বলতে পারব না। আকাশ মেঘলা খুব ঠান্ডা”
কথা বলে উনি চললেন নীচে আমরা উপরে উঠছি।

অবশেষে যখন রূপকুণ্ড পৌঁছোলাম ঠিক তার আগে একটা উঁচু জায়গায় কিছু মানুষের কঙ্কাল জড়ো করা দেখলাম কিন্তু তখনকার দিনে মানুষ এত্তো লম্বা হত বা ওদের করোটি এত্তো বড়ো হত কি… মনে প্রশ্ন জাগল?? তাছাড়া ইতিহাস বলছে আরও অনেক কঙ্কাল থাকার কথা…

তবে বাকি সব গেল কোথায়?? সেই উঁচু জায়গা থেকে একটু ঢালু হয়ে নীচের দিকে আমাদের গন্তব্য সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত কুণ্ড, পৌঁছওলাম সকাল ৭:২০ তখন একদম ফাঁকা সবাই নেমে গেছে। আমাদেরকে স্বাক্ষী রেখে আকাশ পরিষ্কার হল সূর্যের আলো আস্তে আস্তে পুরো কুণ্ডতে পড়ল।

আমরা অনেক ভাগ্যবান এত সুন্দর রূপ প্রকৃতি আমাদের দেখাল। প্রায় ২ ঘণ্টা কোথা থেকে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। ওখানে পুজো দিয়ে নেবে আসা।

সত্যি বলছি ওখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল হিমালয়কে নিয়ে যারা ব্যবসা করে হিমালয় তাদের চায় না।
বিভিন্ন এজেন্সির রূপকুণ্ড রুটে স্থায়ী ঘর করে ব্যবসা করছিল। তাই উত্তরাখণ্ড সরকার রূপকুণ্ড বন্ধ করে সঠিক কাজ করেছে। Lock down ওরাই শুরু করেছে ২০১৮-তে। আজ নিশ্চয় ওই রুটে বুগিয়াল পাথর, গাছ, পাখি সবাই ভালো আছে, ফুলে ফুলে ভরে আছে পাহাড়ের ঢাল।

উত্তরাখণ্ড সরকার রূপকুণ্ড লকডাউন করেছিল প্রকৃতি বাঁচানোর জন্য, আর এখন লকডাউন মানুষ বাঁচানোর জন্য, উপলক্ষ্য যাইহোক লাভ হচ্ছে প্রকৃতির সবাই ভালো থাকবেন।
টাটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *