লেখক নয় , লেখাই মূলধন

মৈত্রেয়ী বিশ্বাসের পরিক্রমণ

ভিতরকণিকার অন্দরে

অক্টোবরের শেষের দিক। ভোরের দিকে হালকা ঠান্ডা, নীল আকাশ বেশ মনোরম আবহাওয়া। কয়েকদিন পর দীপাবলি, ২০০৫-এর এরকম একদিনে আমাদের যাত্রা। গন্তব্যস্থল ভিতরকণিকা, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, ওড়িশা রাজ্যের কেন্দ্রাপাড়া জেলার অন্তর্গত।

রাতদুপুরে জনা পনেরোর এক দল নামল ওড়িশার ভদ্রক স্টেশনে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল কোচের সহযাত্রীরা। তাদের বকবকানির চোটে সহযাত্রীদের ঘুমের দফারফা। স্টেশন থেকে গাড়ি নিয়ে ঐ মধ্যরাতেই রওনা দিলাম চাঁদবালির উদ্দেশ্যে যা কিনা ভিতরকণিকার প্রবেশদ্বার। আগে থেকেই বুক করা ছিল OTDC-র ডর্মিটরি। চাঁদবালি, একটি ছোটো জনপদ। এত বছর পর সে নিশ্চয় আর তত ছোটোটি নেই। নদী তীরবর্তী অঞ্চল, তাই স্বাভাবিক ভাবেই অনেক মানুষ নদীর উপর নির্ভরশীল।

ছোট্ট করে এক ঘুম দিয়ে সকাল হতেই তৈরী হয়ে লঞ্চে উঠলাম। এটা রিজার্ভড দুদিনের জন্য। প্রয়োজনীয় রসদ, জল মজুদ করে রওনা দিলাম। বৈতরণী নদীর বুক চিরে লঞ্চ চলেছে। সবাই লঞ্চের মাথায় যে যার পছন্দমত পজিশন নিয়ে ক্যামেরা বাগিয়ে প্রস্তুত। সেই প্রথম বন্ধুদের সাথে ভ্রমণ। অভিভাবকদের বিধিনিষেধের গণ্ডি ছাড়িয়ে আমরা সবাই রাজা। সুন্দর বনের মতো এটি ও একটি সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। খাঁড়িবেষ্টিত এই অরণ্যে আছে কুমির, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সাপ, বুনো শূকর, চিতল হরিণ প্রভৃতি। এখানকার দ্বীপগুলির মধ্যে ডাংমল যা কুমির প্রকল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে কুমিরের ডিম ফুটে ছানা বের হবার পর একটু বড়ো করে খাঁড়িগুলিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাই যাত্রাপথে অনেক কুমির দেখেছি, বিভিন্ন আকৃতির। মাঝারি, বিশাল সব সাইজের আছে। কেউ কেউ অলস দুপুরে নদীর পাড়ে রোদ পোহাচ্ছে, জলে ভেসে বেড়াচ্ছে। লঞ্চের ইঞ্জিনের শব্দে সড়সড় করে জলে নেমে পড়ছে আর জলের গুলি টুপ করে ডুব দিয়েছে। আমরা চলেছি দুপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে। গাছগুলো যেন জলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। গরান, গেঁওয়া, হেতাল প্রভৃতি গাছে ঠাসা বনাঞ্চল। মাছরাঙা, পানকৌড়ি সব ব্যস্ত। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর খোলা নামে এক জায়গায় এসে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে পারমিশন বের করে নিতে হলো। কিছুক্ষণ বিরতির পর আবার চলা। মাঝে মাঝেই কুমির দেখা যাচ্ছে আর আমরা হৈ হৈ করে উঠছি। কখনো কখনো পাড়ে হরিণের দল। একসময় মোহনার কাছে উপস্থিত। যে দিকে তাকাই শুধু জল আর জল। তটরেখা থেকে বহুদূরে। বলতে দ্বিধা নেই, বেশ ভয়ই করছিল। প্রথমতঃ সাঁতার জানি না, জানলেও কতদূর কী করা সম্ভব তা একমাত্র ভগবানই জানেন। ইতিমধ্যে লঞ্চ ঢেউ এর আঘাতে দুলতে শুরু করেছে। লঞ্চচালক বললেন খাঁড়িতে ঢুকে গেলে এই রোলিং আর হবে না। শেষপর্যন্ত আমাদের আগ্রহে তিনি খাঁড়ি পথ ধরলেন আর আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বিকেল হয়ে এসেছে। দূরে বঙ্গোপসাগরের মাথায় মেঘ জমেছে। খাঁড়ির দুপাশে সবুজ বনভূমি আর দিগন্তে কালচে নীল মেঘের জমায়েত। এখনও চোখ বন্ধ করলে সে দৃশ্য ভেসে ওঠে। আজ রাত্রিবাস হাবালিখাটি নামে একটি দ্বীপে ওটিডিসির বাড়িতে। এটাকে যে কী বলব বুঝে পাই না। দূরে দেখা যাচ্ছে দ্বীপে নামার সিঁড়ি, খুবই সংকীর্ণ। সিঁড়ির পাশেই একটি বোর্ড। সেখানে লেখা রয়েছে কোন কোন প্রাণীর বাস এই দ্বীপে। সবকিছুর মধ্যে যে নামটি দৃষ্টি আকর্ষণ করল তা হলো কিং কোবরা। এরপর শুরু হল বনপথ ধরে হাঁটা, প্রায় এক কিমি। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন আর হাওয়ার সোঁ সোঁ শব্দ। যত এগোচ্ছি গর্জনের তীব্রতা তত বাড়ছে আর আমাদের উত্তেজনার পারদও চড়ছে। ইতিমধ্যে একজন কেয়ারটেকার ও হাজির। সেই আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। এই ভেবেই রোমাঞ্চ লাগছিল যে সমস্ত দ্বীপটিতে আমরা কয়েকজন মাত্র। ওটাডিসির দুটি বাড়ি পাশাপাশি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের চিহ্ন প্রকট। আলো বলতে সৌরবিদ্যুৎ, টিমটিম করে জ্বলছে। মেয়েরা যে বাড়িটিতে ছিলাম কোনো আলোর ব্যবস্থা ছিল না। সমুদ্রের কাছে পৌঁছেই সেই শেষ বিকেলে আমরা সবাই জলে নেমে পড়লাম। চলল একপ্রস্থ হুটোপুটি। এদিকে রান্নার ঠাকুর রাতের রান্না শুরু করে দিয়েছে। ফ্রেশ হয়ে আবার রাতের অন্ধকারে মোবাইলের আলোয় পথ চলে সমুদ্রের পাড়ে হাজির। দূরে বঙ্গোপসাগরের বুকে তারার মতো কতগুলি আলো ভেসে বেড়াচ্ছে। ঐগুলো মাছ ধরার ট্রলার। চরাচর জুড়ে অন্ধকার ও নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধুমাত্র আমরা আর ঢেউগুলির অবিরাম পাড়ে এসে আছড়ে পড়ার শব্দ। এক অন্যরকম অনুভূতি। রাতের খাবার খেয়ে শোওয়ার তোড়জোড় শুরু করলাম। দুটি খাট পাশাপাশি পাতা। তার উপর শুধুমাত্র তোশক, ব্যস্। মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘরের চারকোণে মশা মারার ধূপ জ্বালিয়ে শুয়ে পড়লাম। এখন স্মৃতি রোমন্থন করতে গেলে ভাবি কিছুটা হঠকারিতাই করেছিলাম। ঐ জঙ্গলের মধ্যে সাপ খোপ, পোকা মাকড়ের সাথে নিশিযাপন।

ম্যানগ্রোভ অরন্য

পরদিন খুব ভোরে উঠেই সমুদ্র পাড়ে জমায়েত। বঙ্গোপসাগরের বুকে সূর্যোদয় যেন জলের মধ্যে থেকে একটি লাল বল হঠাৎ উঠে আসল। দারুণ সে দৃশ্য। পুব আকাশে যেন চলছে হোলি খেলা। কত রঙের রং-মিলান্তি! আর একটা নতুন দিনের সূচনা। আজকের গন্তব্য বাগাগহনা। এই দ্বীপটি হল পরিযায়ী পাখিদের আস্তানা। অক্টোবর মাসের শেষ, হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তারা এসেছে। শীতের সময়টা এখানেই সংসার পাতবে, শীতের শেষে আবার যে যার নিজ দেশে ফিরে যাবে। দ্বীপে নামার পর এক নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। জোয়ারের জল ঢুকে পথ একেবারে কাদায় মাখামাখি। পথ বলতে মাটির তৈরী রাস্তা, শুধু মাত্র আশপাশের জায়গা থেকে সামান্য উঁচু। আমরা সবাই জুতো খুলে লঞ্চে রেখে প্যান্ট গুটিয়ে কাদার মধ্যে নেমে পড়লাম। সাথে সাথেই পা গোড়ালি পর্যন্ত ফস্ করে কাদার মধ্যে ডুবে গেল। এঁটেল মাটি, জোয়ারের জল ঢুকে একেবারে মাখামাখি। পুরো পথটি এরকম। এতগুলো মানুষ চলেছি, যারা পিছনে ছিল তারাই বেশি অসুবিধায় পড়েছে। কারণ মাটি আরও নরম হয়ে গেছিল। এছাড়া গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো ছিল শ্বাসমূলগুলো। সেগুলি ছিল সব “…উন্নত মম শির”। শ্বাসমূলগুলিও নানা ধরণের, কোনটা লম্বা সূঁচালো আবার কতগুলো বেঁটে ,মাথা ভোঁতা। বেকায়দায় সেগুলোর খোঁচা ও ভয়ঙ্কর। সযত্নে সেগুলো এড়িয়ে একে অন্যের হাত ধরাধরি করে অনেকটা পথ চলার পর একটি উঁচু টাওয়ারের সামনে উপস্থিত হলাম। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেই বাক্ রহিত। মনে হলো এক বিশাল সবুজ গালিচা পাতা রয়েছে আর অগণিত পাখির ডানার ঝটপটানি ও কলকাকলিতে জায়গাটা একেবারে জমজমাট চেহারা নিয়েছে। সবুজ গালিচা হলো ঐ দ্বীপের সব গাছগুলির উপরিভাগ। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে ছবি তুলে নেমে এলাম। আবার সেই কাদাপথ মাড়িয়ে তার সাথে জামা কাপড়ে বেশ কিছু কাদা মাখিয়ে লঞ্চে উঠলাম। এবার লঞ্চ ছুটল ডাংমলের দিকে যার কথা প্রথমেই বলেছি। দ্বীপে নামতেই অভ্যর্থনা জানাল এক বিশালদেহী মনিটর লিজার্ড। দুপাশে নারকেল গাছের সারি, মাঝখান দিয়ে রাস্তা দিয়ে চলে গেছে। হরিণের দলের অবাক চাউনি, পুচকে পুচকে কুমির গুলি একে অপরের ঘাড়ে চেপে জড়োসড়ো, এক বিশাল বপুর গৌরী নামের অ্যালবিনো কুমির। সব মিলিয়ে এক দারুণ ব্যাপার।

অ্যালবিনো কুমির

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, আজ রাতে ফেরার ট্রেন। অগত্যা আবার সেই জলযান। অন্ধকারের বুক চিরে চলেছে আমাদের লঞ্চ। অবাক হয়ে ভাবছিলাম এই অন্ধকারের মধ্যেও সারেং মশাই কীভাবে নদীপথ চিনে নেন। এত দ্রুত কীভাবে যে দুদিন কেটে গেল টেরই পেলাম না।

ভিতরকণিকা ভ্রমণের সেরা সময় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস বলে মনে করি। কারণ এই সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে, পরিযায়ী পাখিদের আগমনও এই সময় ঘটে। আর একটি কারণ হল এখানকার গহিরমাথা দ্বীপ। দীর্ঘ সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে শুধুমাত্র ডিম পাড়তে এই দ্বীপে আসে অলিভ রিডলে প্রজাতির কচ্ছপ। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবার পর ছানাদের নিয়ে আবার তারা ফিরে যায়। যদিও আমাদের যাওয়া হয়নি তবে উৎসাহী বন্ধুরা একটু খোঁজ খবর নিয়ে যেতেই পারেন ওড়িশা বনবিভাগের আগাম অনুমতি নিয়ে। আগে থেকেই সব বুক করে নিতে হবে। তবে বাচ্চাদের নিয়ে এখানে যাওয়া উচিত নয় বলে আমি মনে করি।

প্রকৃতি প্রেমিক যারা, এই ভ্রমণ তাদের নিরাশ করবে না। ভবিষ্যৎ জীবনে স্মৃতি রোমন্থনের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠবে।

মৈত্রেয়ী বিশ্বাসের পরিক্রমণ

আমাদের নতুন বই