Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

অলক রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চর্য সমন্বয় মাইহার ব্যান্ড

ভারতীয় সংগীতের প্রতিটি অলিগলি আলাউদ্দিনের শ্রুতিতে উজ্জ্বল তো ছিলই। তার সঙ্গে তিনি মিশিয়ে ছিলেন বাংলার লোকায়ত মেজাজকে। বাংলার মাঠ ঘাট এমনকী ফুটপাথেও তো তাঁর কেটেছে বহু বিনিদ্র রাত। এছাড়াও ছিল প্রত্যক্ষভাবে ব্যান্ডে বাজানোর অভিজ্ঞতা। দেশি ও বিদেশি যন্ত্রে। হাবু দত্তর থিয়েটারে বিভিন্ন দেশি যন্ত্রের বাজানোর অভ্যাস, ফোর্ট উলিয়ামের এক সাহেবের কাছে বেহালায় নিখুঁত পশ্চিমী হার্মনির শিক্ষা, উজির খাঁর থিয়েটার দলে পার্শ্বসংগীত সংযোজনার দায়িত্ব— এ-সবই চলছিল শাস্ত্রীয় গানবাজনা অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গেই। সে-অভিজ্ঞতা মাইহার ব্যান্ডে আশীর্বাদ হয়ে গেল। সারাজীবন ঘুরেছেনও প্রচুর। দেশের বাইরে অনেক জায়গায়। ভলগা নদীর পাড়ে বসে বেঁধেছিলেন ‘ভলগা ধুন’। সুরের সেই নিরীক্ষা অসামান্য। পাশাপাশি ‘কাফি ধুন’ (ওয়েস্টার্ন)— শুনতে কিছুটা সোনার পাথরবাটি মনে হলেও জ্যাজ-এর রিদম আর কাফির আরোহণ-অবরোহণের কাটাকাটি সুরানুলেপন— এতেই চমৎকার বৃন্দাবাদন। আসলে পাশ্চাত্য হার্মনিকে অত্মস্থ করতে আলাউদ্দিনের সময় লাগেনি বেশি। ‘দেশ’ রাগটিকে দুইভাবে ভাবলেন আলাউদ্দিন। প্রথমে ছয় মাত্রার সাধারণ দাদরায় কোমল বা শান্ত ছবি। এবং সেই অনুযায়ী সম্মিলিত বৃন্দবাদনে খানিক নমিত স্বরানুশীলন। তারপরে তার চেহারা অন্য। একই সরগমে ঝোড়ো ‘দেশ’। এ-হেন অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই আনকোরা। নিরীহ সব দেশি যন্ত্রে আমাদের অভ্যস্ত শ্রবণ একক যন্ত্রসংগীত শুনতেই শিখেছে কেবল। ব্যান্ড বা অর্কেস্ট্রা বলতে সাধারণভাবে এখন বোঝায় বিপুল গ্র্যাঞ্জারকে। রিলায়েন্স কাপ বা সাফ গেমসে কত যন্ত্রীর সহযোগিতায়, সর্বাধুনিক স্টুডিওতে কত লক্ষ টাকার বিনিময়ে কী মহৎ সৃষ্টি সম্ভব হল, সে নিয়ে কাগজে স্কুপ রিপোর্টিং-এর ছড়াছড়ি। তাদের পাশে মাইহার ব্যান্ডের জায়গা না হওয়ারই কথা।

একদিক থেকে তা বোধহয় ভালোই হল। বাংলার কীর্তনের অমন বিশ্বাসযোগ্য সমবেত রূপ এমন সান্তুর, অনুভূতিকে উসকে দেওয়া প্রসন্নতায় শোনাতে পারতেন কি তাহলে মাইহার ব্যান্ডের সদস্যরা? অ-প্রচারেই ওঁদের গৌরব। ‘সখি বহে গেল বেলা’-র আকর সংগীত বাংলা পুরাতনীর ‘উঠিতে যুবতী বসিতে যুবতী’। তাকে বন্দিশ করেই এই কম্পোজিশন। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত যে-নলতরঙ্গ বিপুল বিক্রমে ঝড়ের গতিতে দেখিয়েছে তার সাধ্যের নমুনা, এই মধ্যলয়ের দাদরা কম্পোজিশনে তার ভূমিকা তখন কেবলমাত্র মন্দিরায়। আশ্চর্য মমতায় কতিপয় মধ্যপ্রদেশীয় যুবক কীর্তনের মূল মেজাজের উজ্জ্বল উদ্ধারে নেমে পড়েছে যেন। চেলোর গাম্ভীর্যের পাশাপাশি সেতার, সরোদ আর বেহালার ক্ষীণ সুর (ইচ্ছে করেই আঙুলে তার চেপে ধরে স্বরকে অর্ধস্ফুট করছিলেন ওরা), প্রায় থেমে আসা তবলার শীতল সৌন্দর্য সুরস্রষ্টার ভাবনা আর শিল্পীদের অধ্যাবসায়ের জ্যান্ত প্রমাণ হচ্ছিল যেন। আর শুনেছি ‘মালকোষ’, ‘মালহূয়া কেদার’, ‘সিংহ’, ‘ইমন’, ‘হেমবেহাগ’। শুধু মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠানেই নয়, গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন বা কালীঘাট কালীবাড়ির আয়োজনেও। নিবেদনের মুনশিয়ানায় বাস্তবিকই চমৎকৃত হতে হয়।

অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাকেই ওদের এক-আধজনের সময় সুযোগ মতো পাকড়াও করেছি। রামলাখন পাণ্ডে। চোস্ত ইংরেজি বলেন। কোনো স্কোপ যদি পাওয়া যায়, এই আশায় এটা ওটা প্রশ্ন করতে করতে তাকিয়ে দেখি জুটে গেছে আমার মতো অনেকেই। তাঁদের একজন, আগ্রহের অতিশয্যেই সম্ভবত এগিয়ে দেয় এক নামি ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট। এবং সঙ্গে সঙ্গে— ‘না দাদা, বহুত শুক্রিয়া। আই লাইক দিস ভেরি মাচ’ বলেই জামার পকেট থেকে বের করেন আদি অকৃত্রিম একটি বিড়ি। ভিড় হটিয়ে ওঁকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পথে মনে হচ্ছিল, এইভাবেই বোধ করি ওঁরা সবরকম প্রলোভন জয় করে স্বস্থানে আছেন আজও। বাবা আলাউদ্দিনের কাছে শিখেছেন পাণ্ডেজি। কিছু স্মৃতিচারণ আশা করছিলাম। স্পষ্ট জানালেন— ‘না ভাই, বলার মতো তেমন কিছু নেই। দেখলেই পালাতাম। অসম্ভব ভয়। আমিও শিখব না, উনিও শেখাবেন’। বলেই পিঠের দিকে নির্দেশ করেন। বহু চড়-কিল আর অপার স্নেহস্পর্শের দাগ সেখানে। কথার মাঝেই হাজির শৈলেন শর্মা। মধ্য-ত্রিশের ছটফটে ব্যক্তিত্ব। ওঁর নলতরঙ্গ বাদনের মতোই। জানালেন— ‘আমার কিন্তু মনে আছে। বাবা প্রথমে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন সরোদ। তো, কিছুতেই সুর বেরোয় না। আর যা বেরোয় তাই বেসুরো। বাবা হঠাৎ এমন এক প্রশ্ন করলেন যা শুনে আমার মতো অনেকেই হতবাক। শুনবেন সে-কথা? ওঁর প্রশ্ন ছিল, শরীরে দুধ কোথায় থাকে? লজ্জায় কান-চোখ লাল, তবু মার খাওয়ার ভয়ে নির্দেশ অনুযায়ী দেখাই। ব্যাস, অমনি আমার কানটি ধরে বলেন, মা যেমনভাবে দুধ খাওয়ায় ছেলেকে, হাতে সরোদ নিতে হবে ঠিক সেই ভঙ্গিতে। এই হলেন বাবা’। বেশ গুছিয়ে বলে শৈলেন। ওঁকেই প্রশ্ন করি, আপনারা তো লেখাপড়া শিখেছেন, স্বরলিপি-পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তবে কেন এইসব অমূল্য সুরারোপকে নোটেশনে আনছেন না? ভেবেছিলাম, বেকায়দায় পড়ে যাবেন এ-প্রশ্নে। উলটে আমাকেই ফেলে দিলেন বেকায়দায়। পৃথিবীর প্রধান অর্কেস্ট্রা দলগুলির বিষয়ে সুনিশ্চিত খবর রাখেন ওঁরা। তুলনায় এলেন এইভাবে— ‘বাজানোর পদ্ধতি হল দুটো, একটা অ্যাকটিভিটিস, অপরটি আবহন। নোটেশন-ভিত্তিক বিবিধ ক্রিয়াকলাপে গড়ে ওঠে প্রথমে ধরনের পদ্ধতি। আর আমরা স্মৃতির দরজায় ঘা মেরে সুরকে আবাহন করি। দুইয়ের একটা পার্থক্য থাকবে না? এবার আসি আপনার প্রশ্নের উত্তরে। আমরা সকলেই বাজাতে জানি একাধিক যন্ত্র। মানে, আজ আমি যদি অসুস্থ থাকি, কাল রাম সুমন সেতারব্যাঞ্জো ছেড়ে নলতরঙ্গে এসে ঠিক কাজ চালিয়ে দেবে। এছাড়া, প্রতিদিনের অভ্যাসে কোনোরকম ভুলচুক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পণ্ডিতজিও এ-সবের বিরুদ্ধে। স্বরলিপি একবার হয়ে গেলে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে তার পরিবর্তন বিরাট প্রমাণ হিসাবে পরে গণ্ডগোল বাঁধাতে পারে। তার থেকে আমাদের শ্রুতিই বেশি অথেনটিক; আর সত্যি কথা বলতে কি, এতে মেধা বাড়ে, বাড়ে শ্রদ্ধাবোধ, সংগীতকে সর্বদাই ভালোবাসতে হয়। তাই, বাবার যা কম্পোজিশন ছিল তা আজও অটুট আছে। একটি সরগমও পালটে যায়নি। অনেকে বলেছেন, এর জায়গায় অমুক করলে ভালো শোনাত। আমাদের পণ্ডিতজি বলেন, গীতাকে কেউ পালটাতে পারবে? কেউই নয়। বাবার শেখানো সব কিছুই আমাদের কাছে সাক্ষাৎ গীতা। শত চেষ্টাতে তা পারব না পালটাতে’। চমৎকার কথা বলেন গিরিধারীলালও, অথচ কিছুতেই ওঁর সামনাসামনি হতে পারছি না। কোনোমতে পাওয়া গেল অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ৫৭ হরিশ মুখার্জি রোডে দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরেই ধরতে হবে গিরিধারীলালজিকে। খেয়েদেয়ে অনেকে বেড়িয়ে পড়বেন কলকাতা দেখতে। বিশ্রাম নেবেন খালি গিরিধারীলাল। বৃষ্টি মাথায় করে পৌঁছে যাই যথাসময়ে। কিন্তু কোথায় তাঁরা? শুনলাম বাহাদুর খাঁর বাড়ি গিয়েছিলেন সবাই। আর দুপুরে ধ্যানেশ খাঁর ওখানে সকলের নেমন্তন্ন। তবে, গিরিধারীলাল বলে গেছেন, এখুনি ফিরবেন। সুতরাং রকে বসে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা। অতঃপর ধ্যানেশ খাঁর বাড়ি থেকে খবর আসে, বাবা আলাউদ্দিনের দুর্লভ ভিডিয়ো দেখছেন ওঁরা। কেউ আসবেননা এখন। বিফল মনোরথ যাকে বলে। কিন্তু জাগছিল বিস্ময়ও। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় বুঝেছে, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় ছোটো-বড়ো যে-কোনো শিল্পীর আগ্রহ ওপার। এখনও খ্যাতিমান গায়ক-বাদকের ছাপার হরফে কাগজের পাতায় নিজের নাম কিংবা ছবি দেখতে কী কাণ্ডই না বাধান! অথচ, মাইহারে এই মানুষগুলি, টিভি-র ক্যামেরা, সংবাদপত্রের শিরোনাম, বিদেশ ভ্রমণ— এ-সব লোভ থেকে মুক্ত আছেন! পরক্ষণেই ভাবি, বাবা আলাউদ্দিনকে দেখেছেন ওঁরা। এর পাশে যাবতীয় আকর্ষণ তো নিতান্তই তুচ্ছ!

সুতরাং পরদিন আবার দৌড়। দুরদর্শন জোগাড় করেছেন মাইহার সরকারের অনুমতি। প্রসাদ স্টুডিয়োতে করে রাখলেন রেকর্ডিং, তিনটি আইটেমের। তাই ন-টার আগেই বেড়িয়ে পড়েছেন ওঁরা। ভবানীপুরের প্রসাদ স্টুডিয়োতে আজ খালি অডিয়ো-রেকর্ডিং। পরে একদিন ছবি তোলা হবে। উপস্থিত অন্য সকলের সঙ্গে হতবাক হয়ে গিয়েছেন খোদ স্টুডিয়ো-কর্তৃপক্ষও। যে-রেকর্ডিং দিন গড়িয়ে সন্ধে পর্যন্ত নিত্যদিন বিরক্তি উৎপাদন করে, তা শেষ কয়ে গেল লাঞ্চের আগেই। রিহার্সাল দরকার হয়নি, একবারের জন্যেও কোনো যন্ত্র ভুল বাজেনি। তাই প্রথম টেকেই ওকে। সামান্য খাওয়া দাওয়া সেরেই ওঁরা ছোটেন গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে। স্বামী লোকেশ্বরানন্দজির ডাকে আজ বিবেকানন্দ হলে ওঁদের বাজনা। সুতরাং গিরিধারীলালকে আজ ছাড়ার প্রশ্ন নেই। আলাউদ্দিনের বাড়ি ‘মদিনামঞ্জরী’-তেই থাকেন উনি। আর তো কেউ দেখার নেই। সাত বছর বয়সে ধরেছিলেন বাবার হাত। তখন ওঁর সঙ্গী রাজা ব্রিজনাথ সিং। বয়সে ব্রিজনাথ অবশ্য অনেক বড়ো। ছিলেন আমাদের তিমিরবরণও। আর কার কার কথা মনে পড়ে? খানিক ঘুরেই বিস্তৃত করি প্রসঙ্গ। একটু যেন ভাবেন, খানিক থামেনও। তারপর— ‘আনোয়ার খাঁ, রামস্বরূপ, ঝুররালাল, দশরথ প্রসাদ… আউর কেউ কোই’। কীভাবে শেখাতেন বাবা? বলতে না বলতে উত্তর— ‘বহুত পিটতা’। তারপরই খানিক লজ্জা পেয়ে বোধহয়— ‘সকলকেই শিখতে হত সবকিছু। রিহার্সাল হত বাবার বাড়িতে। কেউ হয়তো রিহার্সালে ফাঁকি দিয়ে অন্যত্র গিয়েছে, বাবা ঠিক সেখানে হাজির। বাবাকে দেখে সে দৌড় লাগিয়েছে, দৌড়াচ্ছেন বাবাও। তাঁকে ধরে বকে-মেরে, যন্ত্রের সামনে বসিয়ে শেষে আদর। আর খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকি সর্বক্ষণই শুধু এই বাজনা। বাবা শেখাতেন গান গেয়ে। আমাদের তা তুলতে হত যন্ত্রে, গলাতেও। না পারলে দেখিয়ে দিতেন যন্ত্রেই। ভোরবেলা নিয়ম করে রোজ শুরু করতাম পরপর ‘আহির ভায়রো’ আর ‘যোগিয়া’ দিয়ে।

অনেকের কাছেই আছে এক বড়ো মাপের ভুল ধারণা, মাইহার ব্যান্ডের মোট সদস্য সংখ্যা না কি আশি-পঁচাশি। সে-প্রসঙ্গ তুলতেই ফোকলা দাঁতে হেসে ফেলেন গিরিধারীলাল। মোট পনেরোজন, ঝুররালালই শুধু আসতে পারেননি। মাইহার সরকারের অবশ্য একটা স্কুল আছে। তবে তার সঙ্গে এঁদের সম্পর্ক একেবারেই নেই। সরকার ওঁদের দিয়েছেন রিহার্সালের জায়গা। সেখানে অনুশীলন চলে রোজ, সকাল আটটা থেকে এগারোটা। ছুটির দিনেও। যন্ত্র দেন সরকার। ‘শুধু একটা জিনিসই সেই মাপে পাই না আমরা,’ বলছিলেন দুই তবলিয়া। অনুষ্ঠানের টাকায় তাঁদের কোনো অধিকার নেই। ব্যক্তিগতভাবে বাজানোর ক্ষেত্র কম। সারা মাসের পরিশ্রমের বদলে ওঁরা পান গ্রাসাচ্ছাদনের ন্যুনতম ভাতা— সরকারি স্কেলে। ওঁদের দাবি অবশ্য কিছু বেশিই। এ নিয়ে অসন্তোষ যে ক্রমশ দানা বাঁধছে, তা কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম।

সেতারব্যাঞ্জোর তার পরীক্ষা করছেন রামসুন্দর চৌরাশিয়া। চন্দ্রসারং সারাঙ্গা— এইসব যন্ত্র নিয়ে কথা চালানোর ইচ্ছে। বললেন— ‘বাহাদুর খাঁর বাবা আয়েত আলী খাঁ মাইহারে গিয়ে বাবাকে উপহার দিলেন ওঁর উদ্ভাবন সেতার-সারোদ। একটিই যন্ত্র। বাবা তাতে লাগালেন চামড়া, দিলেন ব্যাঞ্জোর এফেক্ট। তৈরি হল নতুন যন্ত্র সেতার-ব্যাঞ্জো। প্রথমে বাজাতেন রামস্বরূপ। এখন আমি। ‘হেমন্ত’, ‘হেম বেহাগ’, ‘মরাগ মঞ্জরী’— এ-সবই ছিল বাবার প্রিয়। আমিও শিখেছি ওঁর কাছে’। কোনো বিশেষ ঘটনা? মহাজাতি সদনের কথা আগেই জানি। উনি দিলেন আর এক খবর। আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পরে গুরুপূর্ণিমায় সকলে গিয়েছেন ওঁর বাড়িতে বাজাতে। পাণ্ডেজি (রামলাখন পাণ্ডে) হঠাৎ বলে বসলেন, আমরা ‘মেঘ’ বাজালেই বৃষ্টি হয়। ‘অমনি সকলের ধরাধরি। বেকায়দায় ফেলা যাবে, এমনটাও কেউ কেউ ভেবেছিলেন নিশ্চিত। রোদ আর আকাশের নীলে বৃষ্টি বা মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। মুখ কাঁচুমাচু করে বাজনা সুরু করেছি, অর্ধেকও হয়নি বাজানো। এমন বৃষ্টি নামল যে, ঘরদোর সব বানভাসি। অনুষ্ঠানই চালানো যায়নি।’ কী এর ব্যাখ্যা?

সে-প্রশ্নে বা প্রসঙ্গে যাওয়ার কোনো দরকারও বোধহয় থাকে না। বিশেষত, যারা সামনাসামনি শুনছেন মাইহার ব্যান্ড। প্রচলিত রাগ-রাগিণীর অচেনা বন্দিশের পাশাপাশি মাইহার ব্যান্ডের পাঁচ যুগের যত্নসঞ্চিত যক্ষের ধনে আড়াইশোরও বেশি রাগিণী, যেগুলির সৃষ্টিকর্তা বাবা আলাউদ্দিন। কাজে কাজেই এ-সিদ্ধান্তে আসা বোধহয় অনুচিত হবে না। পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্য সংগীতকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এসে তাদের মধ্যে মিলমিশ খাওয়ানোর সাম্প্রতিক যে-চেষ্টা ক্রমবর্ধমান, তা সার্থকতায় সম্পূর্ণ করে গেছিলেন বাবা আলাউদ্দিন খাঁ, তার জন্য গাল বা বগল বাজানোর দরকার পড়েনি। মাইহার ব্যান্ডের এখনকার প্রজন্ম সেই মিশ্রণকে শুদ্ধ এবং অবিকৃত রাখার কাজে দৈনিক মহড়ায় প্রাণপাত করেছেন। আত্মপরিচয়ের গ্লানি ছাপিয়ে সংগীতকেই ওঁরা করে তুলেছেন পরিচয়ের হাতিয়ার। পৃথিবীর গানবাজনার ইতিহাসে এ-উদাহরণ দ্বিতীয়টি মিলবে কি? সেই পরিণাম স্বীকৃতি অবশ্য ওঁরা আজও পাননি। যেমন পাননি বাবা আলাউদ্দিন। আর তাই আলাউদ্দিন খাঁর জন্মের একশো পঁচিশতম বর্ষে সুদূর মাইহার থেকে ছুটে এসে যাঁরা শুনিয়ে গেলেন অবিস্মরণীয় সংগীত, তাঁরা হয়তো দেখেও গেলেন, মহাজাতি সদন অর্ধেক ভরেনি। এই বিস্মৃতির কোনো ক্ষমা নেই।

প্রথম পাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *