লেখক নয় , লেখাই মূলধন

গৌতম গুহ রায়ের প্রবন্ধ

জহর সেনমজুমদারের কবিতা, কবিতার অন্তর্ঘাত

গত নভেম্বরে আমরা একসঙ্গে ঢাকা লিট ফেস্টে, তারপর আমাদের বন্ধু কবি শামীম রেজার উদ্যোগে ঢাকা হয়ে কক্সবাজার। সাথী তরুণ ও প্রাণ-উন্মাদনায় ভরপুর কবি জাহিদ সোহাগ, বাংলা কবিতার নতুন বাতাস। এক সন্ধ্যায়, তখন সূর্য ডুবে গেলেও সেই রক্ত আভা সাগরের ঢেউ ধরে রেখেছে। আমরা সেই ক্রমশ ম্লান হয়ে আসা আলো ও সাগরের জলের অদ্ভুত রূপের দিকে তাকিয়ে শুনছিলাম জহরদার কবিতার কথা, কবিতা, সেই সময় বাস্তবিকই এক পরাবাস্তব জগতে হাজির হয়েছিলাম আমরা তিন প্রজন্মের তিনজন, হয়তো বৃষ্টি হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগেই, ভেজা ভেজা চারদিক। জহরদা পড়ছেন,

“সমুদ্রের ঠোঁটের দিকে এইমাত্র সন্দেহবাতিক সূর্য ঝাঁপ দিয়েছে। তোমরা কি
দেখতে পেয়েছ? সবুজ লন্ঠন হাতে উদ্ভ্রান্ত এক প্রেমিক আজও
প্রেমিকার পিঠ থেকে রিপুর দাগ তুলছে তো তুলছেই। এসব কথাই
বলতে চাই আজ। এসব কথাই যেন আত্মজীবনী, দেহের ভেতর
বৃষ্টির যৌন আকুতি ধরে রাখে। মায়ের যোনিতে নীল অপরাজিতা রেখে
তান্ত্রিক বাবা সাধনা করে। আর বালকবৃন্দ সেই অপরাজিতার আদলে
ঘুড়ি তৈরিতে মন দেয়। আমরাও দেব। কিন্তু কোথায় দেব?…”

এক আধোভেজা আলো অন্ধকারে তিন প্রজন্মের তিন অনার্য সন্তান তাঁদের দলপতিকে কেন্দ্রে রেখে শুনছে কীভাবে রচিত হয় কল্পবাস্তবের ভাষ্য। খুব আত্মগত উচ্চারণে দলপতি আক্ষেপে মাথা নাড়ছেন, না, না, কিচ্ছু হচ্ছে না, আমাদের সেই ‘ক্রৌঞ্চদ্বীপ’-এর ছবি আঁকা হচ্ছে না, সেই ভাষ্যের কাছে কোথায় আর পৌছাতে পারছি? এই আক্ষেপ জহর সেনমজুমদারের চালিকাশক্তি, এই অতৃপ্তিই তাঁকে করে তোলে ভিন্ন রকমের। তাই দেখি আশির দশকে প্রকাশিত একাধিক কবিতার বই তাঁর কবিতাযাত্রা থেকে তুলে নিতে। তার থেকে কিছু কবিতার দু-একলাইন পরে রেখে দিলেও প্রায় নতুন করেই পুরোনো কবিতাগুলো আবার পুনর্লিখনে তৃপ্তি খোঁজেন কবি। আবার তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার ‘অন্তর্গত রচনা’ থেকে উদ্ধৃতি দিতে হয়, “লিখবার পর, লেখা হয়ে যাবার পর, প্রথম প্রথম বেশ কিছুদিন, মনে হয়, দারুণ লিখলাম, জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখলাম; কয়েক সপ্তাহ পর, আরও আরও কয়েক পর, যখন কবিতাগুলো আবার পড়লাম, তৎক্ষণাৎ মনে হল— খুব একটা মারাত্মক কিছু নয়, ভালো— তবে ততখানি যেন অন্তর্গত সংরচনায় খুব বেশি ভালো বলে মন যেন মানতে পারছে না; সুতরাং পরিমার্জন দরকার; বেশ কিছুদিন পর, আরও আরও বেশ কিছুদিন পর, পরিমার্জন করতে গিয়েই চৈতন্যে আঘাত নেমে আসে; ঝুঁটি বাধা মন ঝুঁটি নেড়ে বলতে থাকে, না, কিচ্ছুটি হয়নি, কিচ্ছু না;… কালে যাকে লিখিত মুগ্ধতায় শ্রেষ্ঠ কবিতা মনে হয়েছিল, সময়ের পর্বে পর্বান্তরে একসময় শূন্য মনে হয়; সব শূন্য মনে হয়…”। এই অতৃপ্তিই জীবন্ত রাখে কবিকে। জহর সেনমজুমদার তাই জীবন্ত কবি, যে ক্রমাগত লিখে যান এবং সেই লেখাগুলোর মুখোমুখি হন। নিজের মুখোমুখি যে-কবি হন না তিনি পাঠকের মুখোমুখি হতেও ভয় পান, জহর সেনমজুমদার তাঁর কবিতার পাঠকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগে থাকেন। তাই প্রতিটি পাঠক হয়ে ওঠেন তাঁর আত্মীয়স্বজন, কবির ‘আমি’-র সঙ্গে থাকেন পাঠক ‘আমরা’। এক বিষাদ তাকে জড়িয়ে রাখে তাই, ‘আত্মকথা’-য় তাই লেখেন,

“তুমি ভুবনেশ্বরী, আমাকে চন্দ্রত্বক দাও আমাদের চন্দ্রত্বক দাও,
… নুন আর দংশন নিয়ে আমরা প্রতিদিন স্বপ্নের ভেতর শব যাত্রা করি
আঁধার অতৃপ্ত আমাদের ষষ্ঠ আঙ্গুল একদিন আমাদের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ছেড়ে
ঘুমন্ত লেখকের হাতে চলে যায়, আমাদের আত্মকথা কোনোদিন লেখা হয় না
ব্যর্থ এই জীবনের কুহু ও কেকায় আমরা শুধু উথালপাথাল করি
চিরদিন উথালপাথাল করি”

কবিতা যতটুকু উন্মোচিত হয়, কবি যতটা উন্মোচন করেন, তার সমান্তরালে একটা বৃহত্তর উন্মোচনহীন পরিসর রয়েও যায়। এই উন্মোচন না করা পরাজগৎ পাঠকের জন্যে উন্মুক্ত থাকে। এই শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের দ্বিবাচনিকতা; এর ক্রমন্মোচনের রহস্য সমাধানের চাবিকাঠি কবির আদি বয়ানে রয়ে যায়। কবিতা বা কবির গদ্যের মধ্যে প্রচ্ছন্ন অন্তর্নাট্য একাধিক স্তরে ব্যক্ত হয়ে থাকে। আমরা জহর সেনমজুমদারের ‘হৃল্লেখবীজ’ থেকে যে-কোনো যায়গা তুলে আনতে পারি:

“দুর্মর জীবনাবেগে, মানুষ হিসাবে, যখনই কান্না ও ক্রোধের ভেতর দিয়ে নানা সময় পারাপার করি, তখনই মনে পড়ে যায় পাগলা দিলীপকে; কুমোরপাড়া ছাড়িয়ে, বেণুদের বাড়ির পথেই ওর বাড়ি; মাঝে মাঝেই দেখতাম হাঁটতে হাঁটতে ওর পাজামার দড়ি ছিঁড়ে গেছে আর ও জিভ কেটে দাঁড়িয়ে আছে;…
এই দিলীপ, কোথায় গিয়েছিলি?/— অজু মুখার্জির বাড়ি;/— কেন?/কান্না আনতে;/মানে?/— অজু মুখার্জি কাল রাতে মারা গেছে তো… গোপাল গোবিন্দ সক্কলে খুব কাঁদছে… কান্নায় ঘর ভরে গেছে… কান্না আনতে সকাল সকাল ওখানেই গিয়েছিলাম…”

“একবার নয়, দু-বার নয়, পাগলা দিলীপের কাছে থেকে বহুবারই এই একই কথামালার নিঃসংকোচ পুনরাবৃত্তি শুনেছি; যতবার শুনেছি— ততবারই স্তম্ভিত বিস্ময়ে শুধু চমকে চমকে উঠেছি; দরকারে অদরকারে মানুষমাত্রই মানুষের বাড়ি যায় নানা জিনিস আনতে; কিন্তু কোনো মানুষ যে অন্য কোনো মানুষের বাড়ি শুধু কান্না আনতে যায়, যেতে পারে— কোনোদিনও ভাবতে পারিনি;…

আমিও ভেবেছি পাগলা দিলীপের মতো আমিও যদি এইভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কান্না একজায়গায় জড়ো করে আনতে পারতাম, আমিও যদি সাড়ে চুয়াল্লিশ লক্ষ কান্না এক জায়গায় জড়ো করে একান্তে নিজের কাছে রাখতে পারতাম;…” — এখানেও আমরা উল্লেখিত পাঠকৃতির মধ্যে অনবরত এই আত্মবিভাজিত সত্তার দর্পনে যুযুধান জগৎ ও জীবনের ফেনিল ও তীব্র ‘অপরতা’-র উন্মোচন লক্ষ করি। এই যে উন্মোচন ঘটল সেটাই আসলে পাঠকের স্বতন্ত্র স্বেচ্ছা নির্মিত ‘ক্রৌঞ্চদ্বীপ’। রুদ্ধ প্রতিবেদন থেকে মুক্ত প্রতিবেদনে উত্তরণের এই যাত্রা পাঠকের একক নয়, অনুঘটকের ভূমিকায় থাকেন কবি স্বয়ং। পিয়ের মাশারের মতো পাঠকেরও জিজ্ঞাসা থাকে: what it tacitily implies, what it does not say, এই জিজ্ঞাসা থেকেই নিজস্ব পাঠকৃতি গড়ে তোলার অবকাশ পেয়ে যান পাঠক, অবকাশ করে দেন কবি।

জহর সেনমজুমদারের কবিতায় আমরা দেখেছি যে, তিনি কুহকের বাস্তবতা, রহস্যের পরাবাস্তবতার জগৎ তৈরি করলেও সমাজ ও সময়ের গর্ভকেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর নাড়ীর বন্ধনকে ছিন্ন করে ‘তুরীয় নির্মাণে’ ব্রতী হন না, এই বন্ধনকে অস্বীকারও করেন না তিনি। তাঁর কবিতা ও গদ্য জুড়ে তাই রক্তমাংসের, স্নায়ুতন্ত্রের স্পন্দন পাওয়া যায়, নিসর্গ নির্মিতির ক্ষণেও তাই তিনি অনুভব করেন গর্ভযন্ত্রণার কান্না ও খুশী।

আমরা জানি যে, কবিতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যুগে যুগে নানা ফতোয়া জারি হয়েছে। নানা তত্ত্ব নানা ফ্রেমে ও ফ্রেমহীনতার বন্ধনে তাকে বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছে ক্ষমতা, কিন্তু মজার ব্যাপার হল এইসব মৌলবাদী ফতোয়া সত্ত্বেও কবিতা কিন্তু নিজের মতো করে টিকে থাকে এবং সেই টিকে থাকা স্বতন্ত্র, নিজস্বতায় ঋদ্ধ। ভাষা যেমন চলমান বলেই বেঁচে থাকে, স্থবির হলেই তার মৃত্যু, কবিতাও স্বাভাবিকভাবেই এই চলমানতাকে বহন করেই বাঁচে। কবিতার ভাষা চলনের শক্তিতে হয়ে ওঠে কখনো উচ্চকিত কখনো নিজেই সংকেত লিপির মতো সংহত। অস্তিত্ব ও অনস্তিস্ত্বের সেতু বন্ধন করে কবিতা। কবিতা টিকে থাকে মাতব্বরদের ছুড়ি কাঁচির পরোয়া না করে। সে কাউকে রেয়াত না করেই নিজের মতো হেসে ওঠে, বা কেঁদে ওঠে নিঃশব্দে বা সশব্দে। জহর সেনমজুমদারের কবিতা এই ‘ফতোয়া’ উপেক্ষা করে নির্মিত স্বাতন্ত্র্যের উজ্জ্বল পতাকা। তাই তিনি অনায়েসে লিখে ফেলেন,

“…
স্কুল কাকে বলে? স্কুল তো মরা মথ, মরা সাপ, মরা
হৃৎপিণ্ডকে গীটারের মতো বাজায়। অথচ এইতো কদিন আগে
পুকুর থেকে লাফ দিয়ে উঠে এসে একটা মাগুর মাছ
স্কুলের মধ্যে ঢুকলো এবং চোখ উলটে মরে গেলো।
আমি সেই মাগুর মাছটার দুটো সাক্ষাৎকার নিয়েছি।
একটি জীবিত অবস্থায়। অপরটি মৃত অবস্থার।

মৃত অবস্থায় সে প্রথমে কিছু বলতে চায় নি। তারপর
অনেক অনুরোধ-উপরোধের পর মাগুর মাছ বলল:
এ-পৃথিবী আবহমান গাধাদের, ভাঁড়েদের …
স্ত্রীপাখিদের মৃতদেহ থেকে এ-পৃথিবীর জন্ম…
গাধাদের তৈরি হারমোনিয়ামে ফুল ফোটে…
এ-পৃথিবী জামাপ্যান্ট পড়ে কিন্তু আসলে সে মড়া…”

ঋত্বিকের কথামতো, আমাদের সমাজ সঠিক অর্থেই অপ্রেসিভ, ব্রুটাল ও মস্তিষ্কহীন। ব্যবসায়ী, দালাল, পুলিশ, বেশ্যা, মিথাবাদী রাজনীতিক, ষড়যন্ত্রকারী গুপ্তচর বাহিনী ও খবরের কাগজের তুলে আনা প্রাতিষ্ঠানিক কবি-লেখক দ্বারা ধর্ষিত এই অনড় এস্টাব্লিশমেন্ট। তবে গত কয়েক দশকে পশ্চিমের বাংলার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা কবিতা বা সাহিত্যচর্চার কলকাতাকেন্দ্রিক প্রভাব ও প্রতাপশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণরেখার বাইরে বা সমান্তরালে গোটা বাংলা থেকেই অজস্র লিট্‌ল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হচ্ছে। এর একটা বিরাট অংশের লেখকই কলকাতার ওই প্রাতিষ্ঠানিক দাদাগিরিকে অগ্রাহ্য করার সাহস রেখেছে, এক্ষেত্রে উল্লেখ করছি যে, অনেকেই কলকাতার ভৌগলিক বৃত্তের অধিবাসী হলেও এই ‘কলকাতার’ বাসিন্দা নন, তাদের মনন ও যাপনে বাংলার মুক্ত পরিসর রয়ে গেছে। বর্তমানের এই প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের সমান্তরাল প্রতিবাদের ভাষা মুখ্যত কবিতার সম্পূর্ণ জগৎ। প্রতিবাদের এই উচ্চারণ যেন জীবনানন্দ ঘোষিত পথ, “মরণের পরপারে বড় অন্ধকার/এই সব আলো প্রেম ও নির্জনতার মতো” বলেই তাঁর কাছে সমস্ত সৃষ্টির চিৎকারকে মনে হয়েছিল “শত শত শূকরীর প্রসব বেদনার আড়ম্বর”। নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থের দাপটই যে কবির মোক্ষ নয় এ-সময়ের নতুন কবিতার ভাষা অন্বেষণে থাকা পাঠকের কাছে স্বীকৃত জহর সেনমজুমদার বা নির্মল হালদারেরা তার উদাহরণ। যেমন তাঁদের বুকে বুক দিয়ে রয়েছেন শামশের আনোয়ার, তুষার রায়, ভাস্কর চক্রবর্তী, অনন্য রায়েরা।

কবিতার মধ্যে দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে সমান্তরাল অথচ বাস্তবতা থেকে উৎসারিত এক নতুন ও পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পুনর্গঠিত পরাজগতের সঙ্গে এই কবিরা আমাদের পরিচয় করান। “ব্যক্তিচেতন ও যৌথ নিশ্চেতনার দ্বিবাচনিকতায় কর্ষিত কবিতার পরিসর কার্যত স্থাপত্যের প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে। যথাপ্রাপ্ত জগতের আলোআঁধারিতে মধ্যস্থতা করে শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের অন্যান্য নির্ভরতাকে এবং অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির পারম্পর্যকে অভ্যাসের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি দিচ্ছেন ইদানীন্তন কবিরা” (তপোধীর ভট্টাচার্য)। একদিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রাতিষ্ঠানিকতার নিরন্তর প্রতিরোধ এবং অন্য দিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক চেতনার প্রতিস্পর্ধী অবস্থান ও ধারাবাহিকতার সন্ধান— এই দুই দ্বান্দ্বিকতা জহর সেনমজুমদারের মতো কবিদের কবিতায় বিচিত্র উচ্চাবচতা ও কৌণিকতা যুক্ত করেছে। জহরের কবিতার নিরন্তর পাঠ ও পুনঃপাঠের মধ্য দিয়েই চলমান বাংলা কবিতার অনেকান্তিকতাকে অনুভব করতে পারি। বুঝতে পারি কতটা বিপজ্জ্বনক এই কবি, স্থিতাবস্থার পক্ষে। তাঁর ‘বিপজ্জনক ব্রহ্ম বালিকাবিদ্যালয়’-এর শেষ পর্বে পড়ি: “২১ জন ছাত্রী— পেছনে লাল বৃষ্টি। পিছনে পাঁজরপঞ্জিকার খোলা পথ, খোলা বিশ্ব। মায়ের দোকান থেকে ক্রমাগত ঋতু কিনতে কিনতে ক্লান্ত। বলছে— আর কিনবো না। হোক। ঋতুবন্ধ হোক। নেংটি ও ধাড়ির মাঝখানে ক্রমশ ব্যাপ্ত হয়ে যায় বিপজ্জনক গর্ভস্তব্ধ টাইমটেবিল। কেউটে ও হেলের মাঝখানে নিজের শরীরে ডানা লাগায় ব্রহ্ম বিদ্যালয়। সম্ভোগসংক্রান্ত মোম ফেটে যাচ্ছে লকলকে চ্যানেলগুলোর ভেতরে। মহাকাশ চুইয়ে আবার নামছে ছোট ছোট অন্ধকার। ঘুমন্ত অন্ধকার।” এই অন্ধকার ঘিরে থেকে কবিতাকে মুক্ত করার, আলোকিত কবিতায় দ্বান্দিকতায় আমরা খুঁজে পাব কবিকে। এখান থেকেই আমরা প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক জহর সেনমজুমদারের কাছে যেতে পারব।

কবি জহর সেনমজুমদারের বাইরেও স্বতন্ত্র ব্যাপ্তি নিয়ে আছেন প্রাবন্ধিক জহর সেনমজুমদার, অধ্যাপক JSM, খোলা মনের ও অন্তর থেকে পাশে থাকা এক স্বজ্জন মানুষ, বন্ধু জহরদা। ব্যক্তি ও স্রষ্টার এখানে কোনো সংঘাত নেই। জীবনানন্দের কবিতা আলোচনায় তিনি লিখেছেন, “জীবনানন্দ তো সেই জাতের কবি, যিনি স্বয়ং জানেন— একজন কবিকে সব সময় পৃথিবীর সমস্ত দীপ ছেড়ে দিয়ে এক নতুন প্রদীপের কল্পনা করতেই হয়, কবিতাকে ‘নতুন সংস্থানের ভিতর নিয়ে গিয়ে’ প্রদীপকেই পরিবর্তন করে দিতে হয়। যিনি ‘স্বয়ং’ জানেন— ‘কবিও সঞ্চয়ী’। আর সেই সঞ্চয় প্রবণতাই একজন কবিকে পাখির ডানায় ভাসমান করে নিয়ে যায় দূর দেশের কোনো কবির কাছে, কবিহৃদয়ের কাছে।” এই সঞ্চয় কবিকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, যে ‘আত্ম’-বিশ্বাস আক্রমণের ও বিজয়ের শক্তি দেয়:

“দূর থেকে দেখলাম, তোমার শান্ত জল তোমাতেই সারারাত অবলীন হয়ে আছে
তোমার জল, আমি শুধু তার কিয়দংশ ব্যবহার করি, ক্রমশ অন্ধকার
জলে ভরে যায়, একদিন আমিও দেখলাম ভাঙা নৌকায় তোমারই চাঁদকে
লুকিয়ে রেখে আমাদের গ্রামের বোবা বালিকাটি দুই হাত দিয়ে স্তব্ধ এই
বনপথ ক্রমাগত পবিত্র করছে, একটি বনপথ আরও আরও বনপথে পরিণত হয়
তোমার জল তোমার বালিকা তোমার বনপথ দেখতে দেখতে মনে হয়, মৃত্যু এলেও
আমাদের জীবন কোথাও কক্ষনো পালিয়ে যাবে না, চরাচর আমাদের, শুধু আমাদের
চরাচর আমাদের, শুধু আমাদের”

প্রথম পাতা

গৌতম গুহ রায়ের প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই