জয়ন্ত ঘোষালের প্রবন্ধ

‘এই রহস্যকে সহ্য করতে হচ্ছে’

অন্তর আর বাহির। আশাকরি তাঁর নগ্নতার প্রেক্ষিতটা কেমনভাবে দেখা উচিত কিছুটা বোঝা গেল।

উওমেন স্টাডিস, সোসিওলজি এইসব ডিসিপ্লিনের পোকা মাথায় রেখে লাল দেদের বাক পড়তে গেলে খণ্ড দর্শন হবে। তিনি দল গড়েননি, ভক্তও দলও নন। তিনি মুখে মুখে বাক রচনা করেছেন কিন্তু প্রথাগত ঢং-এ কাব্য লেখেননি। কিন্তু মুখে মুখে যা বলেছেন সেইসব বাকের কাব্য সুষমা বজায় রাখতে একজন সচেতন কবির সৃষ্টির মতোই শব্দের নিপুণ প্রয়োগ করেছেন, ছন্দ বেঁধেছেন। তাঁর বাক গভীর দর্শন ও ভাবের সুতোয় গড়া তবু প্রথাগতভাবে তিনি কবি বলে পরিচিত নন তার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন কবীরও তো দোঁহা বলার কারণে নিছক কবি পরিচয়ে সুখ্যাত নন কিন্তু তাঁর দোঁহা কী কাব্য মাধুর্যহীন? হলে’তো কেবল একজন গুরুর মতাদর্শের দাসত্ব করার কারণেই অনেক আগেই লোকমানসের হৃদয় থেকে ঝরে যেত। লাল দেদ, কবি এবং একজন ইন্টেলেকচুয়ালের সব বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতায় শিশুকাল থেকে একটি নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিনের মধ্যে বড়ো হয়েছেন এবং সেই পরম্পরার টানে সাধিকা হয়েছেন, কিন্তু সেটা ছিল তার জীবনের অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু একজন একাধারে বড়ো কবি ও ইন্টেলেকচুয়াল তো কোনো ডিসিপ্লিনকে নিছক রিপ্রেজেন্ট করে ক্ষান্ত হতে পারেন না, সে-সব বিপ্লবী বা রিফর্মিস্টদের কাজ। এমন মন নিয়ে অনেকেই লাল দেদ, কবীর পড়েন, কিন্তু বিশ্বাসের কাব্যময়তাকে না বুঝে আবোলতাবোল বলেন, লেখেন।

“ইম পাড় লাল্লি ভা’নি তিম হৃদি আঁখ”

লাল্লা যা বলেছে—

“তোমার হৃদকমলে তা আখর চিহ্ন হয়ে আছে”

এরপরে যেটা বলার লাল দেদ গান লেখেনেনি এবং তিনি যে গান গাইতেন এমন কোনো তথ্য কোনো মান্য সংকলনে নেই। অনেক পরে মুখে মুখে চলে আসা তাঁর বাক কাশ্মীরের সুফিয়ানা কালাম-এ গীত হত, তার মানে এই নয় এগুলো গান অথবা লাল দেদ গান গাইতেন। জয়লাল কাউলের কথায়, “কখনো কখন গ্রীয়ারসন বাকগুলোকে, গান বলে উল্লেখ করেছেন। এটা বলা দরকার যে-কোনো পদ এবং সে-প্রেক্ষিতে, বা কোনো টেনে আনা গদ্যাংশও সুর লাগিয়ে গীত হতেই পারে, এবং তা গানে পর্যবসিত হয়, কিন্তু যে-অর্থে নানকের স্তব গুরুবাণী, বা মীরার ভজন বা অন্যান্য ভক্তিবাদী সাধক-কবিদের গান, সেই নিরিখে লাল দেদের বাক গান হিসেবে গীত হবে সেই উদ্দিষ্টের কারণে ‘গান’ নয়। বা বলা যেতে পারে প্রচলিত লোকগান (চকরি) বা কাশ্মীরি ভস্তন গানগুলো যেমন নিজেরাই শিল্পানুগ জিগিরেই গান হয়ে ওঠে, এই বাকগুলো নিজেরাই গান হয়ে ওঠে না। লাল দেদের বাকগুলো প্রধানত ভারী ভাবনার নিগূঢ়তায় আর গভীরতায়, কিন্তু সে-অর্থে সাংগীতিক গুণসম্পন্ন নয়। এগুলো গান হয়ে বিস্ফোট ঘটানোর চেয়ে আমাদের অন্তরের দিকে তাকাতে বলে, বলে চিন্তা করতে আর প্রতিবিম্বিত হতে। যদিও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাকগুলি প্রায়শই আমাদের আতুর অনুভবকে নাড়া দেয়।”

“আমি সাতবার হ্রদটিকে দেখেছি শূন্যে উধাও হয়ে যেতে”

কাশ্মীরি ভাষাকে গড়ে তোলার গড়ার কারিগর হিসেবে, এবং ভাষা ও সাহিত্যে এই দুই ক্ষেত্রে লাল দেদের যা ভূমিকা তার প্রেক্ষিতে আধুনিক কাশ্মীরির জননী হিসেবে লাল দেদকে দাবি করার যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কারণ আছে। কেবল মাত্র কালানুক্রমে নয়, বরং আধুনিক কাব্যের মেজাজ ও শৈলীর নিরিখে তিনি কাশ্মীরি ভাষার আধুনিক কবিদের মধ্যে প্রথমা। তাঁর কবিতা আধুনিক, কারণ তা জায়মান আজও। বস্তুত তিনি কাশ্মীরিদের, তাঁদের মাতৃভাষাকে এবং গণজন হিসেবে নিজেদের আত্মাকে আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছেন। লাল দেদের জীবনকালের পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে কাশ্মীরি ভাষা হয়তো সুলতানদের বা সামন্ত প্রভুদের কৃপা পায়নি, হয়তো এটি সরকারি ও উচ্চকোটির ভাষা, ফারসির, দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও একে দাবিয়ে রাখা যায়নি, কারণ, এর পিছনে ছিল গণজনের সমর্থন এবং লালা দেদের বাকের প্রভাবে, সাধারণ কাশ্মীরি লোকেরা, যারা এতদিন নিজেদের মাতৃভাষায় লেখা পদগুলোকে কেবল গুপ্তবিদ্যা মনে রাখার কারণে, অথবা সেইসব গুপ্তবিদ্যাকে ধরে রাখতে, স্মৃতিবৃদ্ধির ব্যবহারিক হিসেবে লিখত, তাদের গভীরতম ভাবনা আর অনুভবকে নিজেদের মাতৃভাষায় ব্যাক্ত করতে, ব্যবহার করতে শুরু করল। সে-কারণেই হিন্দু কী মুসলমান এমন একজনও কাশ্মীরি নেই যার জিভের ডগায় লালা দেদের কোনো-না-কোনো বাককে খুঁজে পাওয়া যাবে না, অথবা এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তাঁকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে না। লালা দেদের বাকেই প্রথমবার কথ্য ও লৌকিক কাশ্মীরি ভাষা ও বুলি, ধর্মীয় বা রাজকার্যের ধরাবাঁধা পথে নয়, ব্যবহৃত হয়েছিল আকাঙ্ক্ষা, অভিজ্ঞতা ভাবনা ও অনুভবকে ব্যক্ত করতে। জয়কাল কাউলের ভাষায়, “উচ্চকোটির সঙ্গে সাধারণের, বিশেষত সাধারণের নিজেদের মধ্যে, যোগাযোগের তিনি নতুন নতুন প্রণালী খুলে দিয়ে ছিলেন। তাঁর গুরুত্ব কেবলমাত্র ঐতিহাসিক নয়। অন্তর্নিহিত কারণ হল, তিনি কাশ্মীরি ভাষার আজও অবধি মান্য অগ্রগণ্য কবিদের একজন হিসেবে রয়ে গেছেন এবং কাশ্মীরি ভাষার এক কারীগর, যা একজন অসাধারণ মৌলিক কবিই পারেন, এমন একজন কবি যাঁর কবিত্ব, স্যার রিচার্ড টেম্পলের ভাষায় ‘বহ্নিমান, পোড়ায় এমন এক ভাবনার রক্তিম আগুন।” আর গ্রীয়ারসনের বিচক্ষণ পর্যবেক্ষণে, লাল দেদের বাক হল, “পূর্বে কেবল যা তত্ত্বে আবদ্ধ ছিল তেমন এক ধর্মের বাস্তবিক অনুশীলন করে দেখানো, প্রাণবন্ত ও চিত্রল ভাষার এক বিবরণে। ভারতবর্ষের অন্যতম অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রণালীর ভবিষ্যতের ইতিহাস রচনার প্রামাণিকতাকে কায়া দিতে, যা অবশ্যই ভিত্তি গড়ে দেবে, এর অবদান অনন্য। এখানেই আধ্যাত্মিকতার দস্তাবেজ বা প্রমাণ হিসেবে এর স্বাতন্ত্র্য নিহিত, এবং আপনি যদি, একইসঙ্গে কবিতা ও আধ্যাত্মিকতার ব্যবহারিক মূল্যের প্রতি তীব্র অন্বেষী হন, তবে মৌলবী রুমির ভাষায়, নিহিত যা—

“এমন দৃষ্টি দিয়ে, যা বাকের শক্তিকে বৃদ্ধি করে
অনুপ্রাণিত বাক দিয়ে, যা দৃষ্টিকে আরও তীক্ষ্ণ করে।”

এবং এটা আমাদের হৃদয়ের গরাদহীন জানালাগুলো খুলে দেয় আত্মার “পরিরেখাহীন অপরিমেয় দৃশ্যমানতা”-র দিকে।

লাল দেদ কোথায় আলাদা, এটা বুঝতে তাঁর মানস-শিষ্য নুর-উদ-দিন ঋষি বা নুন্দ ঋষির সুরুখ বা বাকের (যা ঋষিনামা বা নুরনামা পুঁথি হিসেবে লিখিত হয় নুন্দ ঋষির মৃত্যুর প্রায় দু-শো বছর পরে, এবং সুফি সাধকদের ক্ষেত্রে এমনটা প্রায়শই হতে দেখা গেছে) সঙ্গে তুলনা করলে দেখব, বিষয়ের দিক থেকে তাঁর সুরুখ ছিল মুখ্যত নীতিমূলক এবং স্বরের দিক থেকে উপদেশমূলক যেখানে তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জীবনের অনিত্যতা নিয়ে বলেছেন, বলেছেন এর সুখময়তা নিয়ে এবং মানুষকে আত্মসংযম ও ভক্তি কীভাবে কর্ষণ করতে পারে সে-ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রাজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি আর বলিষ্ঠ কথনে ঋদ্ধ করেছে ভাষাকে এবং প্রবাদতুল্য হয়ে উঠেছে। রহমান রাহির ভাষায়, “কিন্তু লাল দেদ হলেন আলাদা: এ হল আন্তরকিতার মোহর ছাপ আর রহস্যালোপদ্ধির প্রাবল্য আর কাব্যিক প্রকাশের সত্যতা, যা প্রকাশিত হয়েছে বাগধারার শক্তিতে, এবং ঘরোয়া কিন্তু বাহুল্যবর্জিত বাক্যালংকার আজও অতুলনীয় যা তাঁর বাককে মানুষের মনে ও কাশ্মীরি সাহিত্যে চিরায়ত করেছে… তাঁর বাকে পাই রহস্যময় সত্যের প্রতি এক স্বপ্রত্যয়নকারী প্রগাঢ় চেতনাকে, যা ঈশ্বর-উপলদ্ধিকারী সন্তের পরিচায়ক।” রহমান রাহি, আরও স্পষ্ট তুলনা টেনেছেন তার ভাষায়, “এমনকি শেখ নুর-উদ-দিন’এর বাক, যাকে সুরুখ বলে, ভাবের দিকে ভাসা ভাসা এবং বিষয়বস্তু লাল দেদের বাকের সঙ্গে মেলে, যদিও লালা দেদের বাকের সঙ্গে তুলনীয় নয়। লাল দেদের বাক যাপিত আলিঙ্গন, যেখানে শেখের সুরুখ গতায়ু ছাইয়ের স্ফুলিঙ্গ। উভয়ের প্রেক্ষাপট হয়তো প্রায় এক কিন্তু কাব্যিক ভাষা নির্মাণে, কিছু একটা প্রভাবিত করেছে যা বিরাট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে এই দুই রহস্যবাদী কবির। শেখের সুরুখে যতটা নীতিমূলক ততটা জীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলে না, তাঁর সুরুখ আমাদের মর্মে আঘাত করে হৃদয়ে আলোড়ন তোলে না। যে-উপমা ও রূপক তিনি ব্যবহার করেছেন তা বিশদকারী ও ব্যাখ্যামূলক কিন্তু যাপিত অভিজ্ঞতার প্রাঞ্জল প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি।” “এর বাইরেও, ছন্দোগত তফাত আছে, লাল দেদের বাকের তুলনায়, সুরুখগুলো অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও নির্ভুল, স্পষ্টত ফারসি বাহার (মাত্রিক)-এর ধাঁচায় নির্মিত। লাল দেদের বাকগুলো অনেকখানি নমনীয় ও শিথিল, এবং স্যার গ্রীয়ারসন তাঁর বাকে বাচনভঙ্গির (শ্বাসাঘাতের) ওপর জোর দেওয়াটাকে বুঝতে পেরেছেন, প্রতি প্যারা বা লাইনের ওপর চারবার শ্বাসাঘাত। যদিও লালা দেদের বাকের ক্ষেত্রে যা হয়ছে তা নুন্দ ঋষি বা অন্যদের ক্ষেত্রেও হয়েছে, অর্থাৎ, অনুগামীরা, চারণেরা, নকলনবীশিরা, নুন্দ ঋষির মৃত্যুর সময় থেকে দু-তিনশো বছর গত হবার পরেও যখন সুরুখগুলো নুরনামায় লিখিত হল, সেই একই দূষণ ঘটিয়েছিল। পরিচিত শব্দ দিয়ে মূল শব্দের বদল, এমনকী কখনো আরও ‘উত্তম’ কোনো শব্দ, যেমন, এমনটা একটা শব্দ যা ধর্মীয় গোঁড়ামির পক্ষে বেশি উপযুক্ত, এতে সুরুখটিকে ছন্দের দিক থেকে আরও নির্ভুল করে তোলে, যদিও তা পদটির অন্তর্গতভাবকে উন্নতভাবে প্রকাশ করতে দরকারি ছিল না।

“সুই মাস মে’ লাল্লি কভ পানুনুই বাক”

“আমি, লাল্লা, আমি নিজের বাকের সুরা পান করেছি।”

মানুষ পুরোনো কিছু রাখে না, লাল দেদ প্রাচীন কিন্তু পুরোনো হয়নি, যেমনটা পাহারের গুহার ছবি প্রাচীন কিন্তু পুরোনো হয়নি বলে দেখি, আর এটাই চলমান নতুনত্ব। লাল দেদের কবিতা মধ্যযুগের অন্যান্য ভক্তিবাদী কবিদের বচন বা কবিতা থেকে আলাদা, তিনি কৃষ্ণের বঁধুয়াদের, যেমন দক্ষিণ ভারতের সন্ত অন্ডাল এবং রাজপুতানার রাজকুমারী মীরার প্রেক্ষিতে ছিলেন এক সম্পূর্ণ বিপরীত গোত্রের। তিনি সম্ভবত, আমরা বলতে পারি, সমস্ত ‘স্ত্রী’ ঈশ্বর অন্বেষীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুরুষালী। ভক্তিবাদী কবিতার চেয়ে বরং লালা দেদের অবদান হল আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সংকলনে আর অন্তরদৃষ্টিতে। তিনি লোকজনকে অনায়াসে প্রাপ্ত কোনো ধর্ম দেননি, তিনি যাকে বলে, “অনতিশীল সন্ত-কবি” ছিলেন না। তিনি মধ্যযুগের প্রথম নন বরং প্রাচীন ভারতের সন্তদের শেষ প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁর বাক অনেকখানি উপনিষদের মতো, ডঃ ভি রাঘবন যেমন বলেছেন, “‘মধ্যযুগের সন্ত-কবিদের’ ভক্তিবাদী গানের মতো নয়, বরং প্রবচনাত্বক এমনকী কখনো বিরল আধ্যাত্মিক পর্যবেক্ষণে অঙ্গীভূত রহস্যপূর্ণ।” লাল দেদের বাক যাপিত আলিঙ্গন, মধ্যযুগের অন্যান্য ভক্তিবাদী সন্তদের প্রেক্ষাপট হয়তো প্রায় এক কিন্তু লাল দেদের কাব্যিক ভাষা নির্মাণে, কিছু একটা প্রভাবিত করেছে যা বিরাট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে অন্যান্যদের থেকে। লাল দেদের জীবনের কেন্দ্রীয় ঘটনা হল প্রতিভাস, তার সর্বোত্তম পাওয়া, কিন্তু তিনি সেখানেই থামেন না। তবুও তিনি যেন নিজের সঙ্গে তর্ক জোড়েন, এই রহস্যকে সহ্য করতে হচ্ছে, কিছু একটা আছে, যা আমাদের জানতে হবে। জয়লাল কাউলের ভাষায়, “… তাঁর বাকের ছন্দ অনেক অবিন্যস্ত আর অন্তমিলের বিন্যাস অনেক বেশি অসম। এ-কারণে সম্ভবত অনুমানপূর্বক ঝুঁকি নিয়ে বলা যায় লাল দেদের বাক, এমনি মূলের গঠনেও, কাশ্মীরি ভাষার পুরোনো থেকে নবরূপে রূপান্তরে একটা গুরুত্বপূর্ণ আখর চিহ্ন… নিছক ভাবনা কী মতবাদ বা অভিজ্ঞতা কবিতা নয়। তারা তখনই কবিতা হয়ে ওঠে যখন কবির কল্পনার “শরীরি জোর” থাকে, সেটাই সে-সবকে মূর্ত করে, এবং “আকার দেয়”। এখানে কল্পনা ভিন্ন চেহারায় গভীর আধাত্মিকবোধের শব্দ ও রূপকে আর তাদের দীপ্তিতে একজনের অনুভূত সংবেদনশীলতা দিয়ে প্রকাশিত। এছাড়া অন্য আরেকটা ভাব আছে যা সত্যি। তাঁর বাকগুলো বারে বারে পড়লে, অন্তরে একটা শ্রদ্ধার ভাব উদ্ভুত হয় এবং শোধনের নীরব প্রক্রিয়ায় গহন আত্মোপলব্ধি জায়গা করে নেয়।” সে-কারণেই তাঁর প্রভাব এমন কালোত্তীর্ণ ও সুদূরপ্রসারী, যদিও তিনি কোনো কৌম, উপদল বা সম্প্রদায় গড়েননি, যেখানে তাঁর অগ্রপথিক, মহান শৈব দার্শনিক ও গুরুরা একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ ছিলেন। লাল দেদ এক পৃথক গোত্রের যাঁর কাছে জীবন তার অর্থ হারিয়েছে, আর মৃত্যু হারিয়েছে তার আতঙ্ক। লাল দেদের স্বয়ং এই ব্যাপারে প্রতক্ষ্য উপলব্ধি ছিল, ‘সহজ’, সবকিছুকে নিয়ে, এক সত্তার মধ্যে সার্বিক ঐক্যের একাত্মতা। “তসু না বো না ধ্যায়ে না ধ্যান…” এখানে না সে আছে, না আমি/না, ‘ভঙ্গি চিন্তার’,/না দরকার নেই ধ্যানের,/এমনকী সবকিছুর স্রষ্টাও ভুলে গেছেন।

লাল দেদ সাহিত্যে বা দর্শনে ইচ্ছাকৃত কোনো অবদান হিসেবে বাকগুলো রচনা করেননি, না তিনি গেয়েছিলেন এইসব বাক, না ভক্তিমূলক শ্লোক বা গান কীর্তনের জন্যে কিছু করেছিলেন, যেমনটা করেছিলেন পরবর্তীর সাধক-গায়কেরা। তিনি না ছিলেন ধর্মপ্রচারক বা সংস্কারক। তাঁর বাকগুলো ছিল প্রধানত তাঁর আত্মার প্রসারণ, তাঁর অন্তরের অভিজ্ঞতার এক প্রকাশ, বা কখনো, সেটা যদিও খুবই কম ঘটেছে, তা হল তাঁর চারপাশের বহির্জগতের ঘটমানতা। এ হল আন্তরকিতার মোহর ছাপ আর রহস্যোপলদ্ধির প্রাবল্য আর কাব্যিক প্রকাশের সত্যতা, যা প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনন্যসাধারণ বাগধারার শক্তিতে। ঘরোয়া কিন্তু বাহুল্যবর্জিত, এক অতুলনীয় বিভা তাঁর বাককে মানুষের মনে ও কাশ্মীরি সাহিত্যে চিরায়ত করেছে। তিনি শিব ও শক্তিকে দূর থেকে অমৃত সারসের মতো মিলিত হতে দেখেন কিন্তু তিনি সেখানেই থামেন না। প্রকৃতি আর পুরুষ, নাম আর রূপের সদা পরিবর্তনের প্রকাশ আর স্ব-স্থায়ীত্বের নির্লিপ্ততার সাক্ষী হওয়া, সম্পূর্ণ দুটো অসম বাস্তবতা নয়, না অখণ্ড চিৎ নিষ্ক্রিয়। লাল দেদের ‘স্বয়ং’-এর ব্যাপারে প্রতক্ষ্য উপলব্ধি ছিল, ‘সহজ’। সবকিছুকে নিয়ে, এক সত্তার মধ্যে সার্বিক ঐক্যের একাত্মতা। তিনি বলেন—

“তারপর, আমি ভেতরের আলো বাইরে ঝাড়লাম।”

না, লাল দেদ বিতৃষ্ণা থেকে মানব শরীর অন্তর্নিহিত পাপী এবং দুষ্ট এমন কিছু বলেন এবং না তিনি কঠোর সংযম বা শরীরের রিপুদমনের পরামর্শও দেন, বরং বলেন—

“শীত থেকে বাঁচতে কাপড় চাপাও
খুদা নিবৃত্ত করতে খাবার খাও”

তিনি বলেন শরীর আধ্যাত্মিক বিকাশের এক যান, এটা একটা ধর্মাক্ষেত্র, ধর্মের জমিন।

“যখন বেঁচে, তখন তাঁকে দেখতে পাও না
তবে মরার পর তাঁকে দেখবে কেমনে”

অথবা

“এটাই ঈশ্বরের আবাস
আমি দেখেছি তাঁকে আমার নিজের গেহে”
‘এই যে শরীর’ তিনি বলেন, “এর আলো আর দ্যুতি আছে।”

প্রথম পাতা

জয়ন্ত ঘোষালের প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই