লেখক নয় , লেখাই মূলধন

ঝিলিক কর্মকারের প্রবন্ধ

মানবচরিত্র রাম: রবীন্দ্রভাবনায়

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, যা প্রকাশ হয়নি তা সাহিত্য নয়। কিন্তু পরবর্তীতে বললেন প্রকাশই শেষ কথা নয়, শেষ কথা হল মানুষকে প্রকাশ। সমগ্র মানবকে প্রকাশের চেষ্টাই সাহিত্যের প্রাণ। সংগীতে, চিত্রে, বিজ্ঞানে, দর্শনে সমগ্র মানুষ নেই। কিন্তু সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটেছে। অর্থাৎ, সাহিত্যের মানুষ রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘সমগ্র মানব’। তবে ওয়ার্ডসোয়ার্থের ভাষায় বলা চলে সমগ্র মানুষের ধারণা তাঁর যিনি ‘more lively sensibility, more enthusiasm and tenderness’-এর অধিকারী। জনৈক সমালোচক বলেছেন, “ব্যক্তিসত্তার বিশেষ মূল্য সাহিত্যে স্বীকার করে রবীন্দ্রনাথ তার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন সদাজাগ্রত বুদ্ধিদীপ্ত মননশীলতাকে।” (‘বাংলা সাহিত্যে সমালোচনার ধারা’/’রবীন্দ্রনাথ’/পৃ: ৮৪)

প্রকৃতপক্ষে সত্য ও বাস্তব রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে কখনোই সমার্থক ছিল না। এ ধারণা থেকে তিনি ‘ প্রাচীন সাহিত্য’ প্রবন্ধগ্রন্থের ‘ রামায়ণ’ (৫ই পৌষ, ১৩১০) প্রবন্ধে বলেছেন, “মানুষ বলিয়াই রামচরিত্র মহিমান্বিত।” দেবতার মাহাত্ম্য কীর্তন বর্ণনা রামায়ণের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। বাল্মীকি সৃষ্ট রাম আসলে অবতার রূপে বর্ণিত হয়নি। রাম দেবতা রূপে চিত্রিত হলে রামায়ণের কাব্যগৌরব হ্রাস পেত। আদিকাণ্ডের প্রথম সর্গে বাল্মীকি নারদকে বিবিধ গুণাল্লেখ করে রামায়ণের নায়কের সন্ধান চান। নারদ স্পষ্ট জানান, “এত গুণযুক্ত পুরুষ তো দেবতাদের মধ্যে দেখি না”। অতএব তিনি ‘নরচন্দ্রমা’ রামের নাম উল্লেখ করেন। আসলে রামায়ণে দেবতা দেবত্বের বিনাশ ঘটিয়ে মানবে রূপান্তরিত হননি। বরং মানুষই দেবতার ন্যায় Ideal হয়ে উঠেছে।

আবার ‘কাহিনী’ কাব্যের (১৮৯৯ খ্রিঃ) ‘ভাষা ও ছন্দ’ কবিতায় রামচরিত্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বললেন—

“স্বর্গ হতে যাহা এল স্বর্গে তাহা নিয়ো না ফিরায়ে।
দেবতার স্তবগীতে দেবেরে মানব করি আনে।
তুলিব দেবতা করি মানুষেরে মোর ছন্দে গানে।”

নারদ বাল্মীকিকে অযোধ্যার রঘুপতি রামের পরিচয় দিলেও বাল্মীকির মনে সংশয় জন্মায়—
“জানি আমি জানি তারে, শুনেছি তাঁহার কীর্তিকথা—
কহিলা বাল্মীকি,” “তবু নাহি জানি সমগ্র বারতা, সকল ঘটনা তাঁর ইতিবৃত্ত রচিব কেমনে।
পাছে সত্যভ্রষ্ট হই, এই ভয় জাগে মোর মনে।” (ঐ)

এ সত্য বলতে তথ্যের সম্ভার। এ সত্য আসলে বাস্তবের সমগোত্রীয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছে সত্যের ধারণা ছিল কিছুটা অন্যরকম। ‘পঞ্চভূত’-এ তিনি বলেন, ‘সত্য বলিব কিন্তু বানাইয়া বলিব।’ তাই কবি নারদের উক্তিতে উচ্চারণ করলেন—

“সেই সত্য যা রচিবে তুমি
ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি
রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।” (ঐ)

অর্থাৎ কবি ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে’ যা রচনা করবেন তাই হয়ে উঠবে সত্য। অযোধ্যা শুধুমাত্র এক নাম। রামের জন্মস্থানই হল চরমতম সত্য। ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী চরিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন ‘চরিত্রটি সত্যমূলক’। অর্থাৎ, একেবারে বাস্তব নয়। রামচরিত্রকে মানবিক গুণে অঙ্কিত করে তোলার পিছনেও কবির এই মনোভাব কাজ করে চলেছে।

রবীন্দ্রনাথ কাব্যকে মোটামুটি ২ ভাগে ভাগ করেছেন:
১) ‘একলা কবির কাব্য’
২) ‘বৃহৎ সম্প্রদায়ের কথা’

‘একলা কবির কাব্য’ বলতে বোঝায় কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি যখন বিশ্ব মানবের হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ‘বৃহৎ সম্প্রদায়ের কথা’ হল: “যাহার রচনার ভিতর দিয়া একটি সমগ্র দেশ, একটি সমগ্র যুগ, আপনার হৃদয়কে, আপনার অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করিয়া তাহাকে মানবের চিরন্তন সামগ্রী করিয়া তোলে।” এই গোত্রের কবিকে বলা হয় ‘মহাকবি’। মহাকবির রচিত কাব্যকে কোনো ব্যক্তিবিশেষের রচনা বলে মনে হয় না। রামায়ণ-মহাভারত সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথের এরকম মনোভাব ব্যক্ত। তিনি বলেছেন, “যেন জাহ্নবী ও হিমাচলের ন্যায় তাহারা ভারতেরই, ব্যাস-বাল্মীকি উপলক্ষ মাত্র।”

কালের স্রোতে হয়তো-বা রামায়ণ রচয়িতার নাম অন্তরালে গিয়ে ঠেকেছে। কিন্তু তাঁর রচিত বাণী শত শত শতাব্দীব্যাপী ভারতবর্ষের ভূমিকে উর্বর করে রেখেছে। সেকারণেই “মুদির দোকান হইতে রাজার প্রাসাদ পর্যন্ত সর্বত্রই তাহার সমান সমাদর।” আসলে রামায়ণ মহাকাব্যের পাশাপাশি ইতিহাসও। তবে এ ইতিহাস কোনো ঘটনা পরম্পরাকে বর্ণনা করে না। এটি ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস— “অন্য ইতিহাস কালে কালে কতই পরিবর্তিত হইল, কিন্তু এ ইতিহাসের পরিবর্তন নাই।”

‘ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ রামায়ণকে মনে করেছেন জাতি সংঘাতের ইতিহাস। আর্য-অনার্যের মেলবন্ধন— “রামায়ণ কাহিনীতে সেই উদযোগের নেতারূপে আমরা তিনজন ক্ষত্রিয়ের নাম দেখিতে পাই। জনক, বিশ্বামিত্র ও রামচন্দ্র। এই তিনজনের মধ্যে কেবলমাত্র একটা ব্যক্তিগত যোগ নহে, একটা এক অভিপ্রায়ের যোগ দেখা যায়।” আর এই অভিপ্রায়টি হল ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের যোগসূত্র।

সাধারণ ধারণা অনুযায়ী বীর রস প্রধান কাব্যকে এপিক বলা হয়। তার কারণ সময় অনুযায়ী যে-দেশে বীর রস সমাদরণীয় হয়েছে, সে দেশের এপিকও বীর রসকে আশ্রয় করেই রচিত হয়েছে। তবে— “রামায়ণে যে রস সর্বাপেক্ষা প্রাধান্য লাভ করিয়াছে তাহা বীর রস নহে। তাহাতে বাহুবলের গৌরব ঘোষিত হয় নাই, যুদ্ধ ঘটনাই তাহার মুখ্য বর্ণনার বিষয় নহে।” রামায়ণের প্রধান বিশেষত্ব যে এটি শুধুমাত্র রাম রাবণের যুদ্ধকে কেন্দ্রে রেখেই আবর্তিত হয়নি। বরং রাম-সীতার দাম্পত্য প্রেম, পিতা-পুত্রের বশ্যতা, ভ্রাতৃত্ব, প্রজার প্রতি রাজার প্রীতি— ভারতবর্ষের গৃহসমাজকে তুলে ধরেছে। বলা বাহুল্য ব্যক্তিজীবনের পারিবারিক মনস্তত্ত্ব রামায়ণ ব্যতীত অন্য কোনো দেশের মহাকাব্যে এভাবে বর্ণনা করা হয়নি। মহাকাব্যটি যদি আমাদের দৈনন্দিন সংসার সীমাকে ধরতে না পারত, তাহলে জাতি তাকে এভাবে গ্রহণ করতে পারত না।

কিন্তু রামচরিত্র যে আমাদের কাছে আদর্শ মানবের রূপ পরিগ্রহ করেছে তার কয়েকটি কারণ রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন। মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ ভাষায় ছন্দে যতই উৎকৃষ্ট হোক তবু তা ‘লাইব্রেরির আদরের ধন’। কিন্তু রামায়ণে আমাদের সংসার জীবন উল্লেখিত। এটি ‘গৃহাশ্রমের কাব্য’। সম্পর্কের টানাপোড়েন এখানে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। পারিবারিক জীবনের ঘরের কথাকে ব্যক্ত করেছে রামায়ণ। যার জন্য” ভারতবাসীর ঘরের লোক এত সত্য নহে রাম লক্ষণ সীতা তাহার পক্ষে যত সত্য।” (‘রামায়ণ’ প্রবন্ধ)

এছাড়া রামায়ণ মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালীন অপরিবর্তনশীল এক ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ভারতবর্ষ রামায়ণ-মহাভারতে আপনাকে আর কিছুই বাকি রাখে নাই।” (ঐ)

রামচরিত্রটিও দেবতার বর্ম পরিত্যাগ করে ভারতবর্ষের মানুষের পারিবারিক চরিত্ররূপ ধারণ করেছে। আর সেজন্যই রামচরিত্র সুদূর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত ভারতবাসীর কাছে সমানভাবে আদরণীয়।

ঝিলিক কর্মকারের প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই