Categories
ধারাবাহিক প্রবন্ধ সোনালি হরিণ-শস্য

পার্থজিৎ চন্দের ধারাবাহিক গদ্য: সোনালি, হরিণ-শস্য

অষ্টম পর্ব

দৃষ্টিবিভ্রমের হাতি ও বিস্ফোরিত বেদনার কাহিনি

সিঁড়িঘরের অন্ধকারে ফেলে রাখা ফাঁকা বিস্কুটের বাক্সের ভিতর থেকে তুলোর বলের মতো বিড়ালছানার ডাক নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে। মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখা যায় চোখ না-ফোটা সন্তানের কাছে গুটি মেরে বসে আছে সতর্ক মা, নিশ্চুপ— কিন্তু সতর্ক। চোখ দুটো জ্বলছে।

একদিন বিকেল আর সন্ধ্যার মধ্যবর্তী অন্ধকারে দেখা গেল, গলায় দাঁতের কামড় দিয়ে সন্তানদের একে একে দূর কোনো নিরাপদ স্থানে, মানুষের চোখ থেকে দূর কোনো নির্জন কোণে রেখে আসছে মা-বিড়াল।

মাতৃদাঁতের এমনই রহস্যময় ক্ষমতা… সে-কামড় চেপে বসে থাকে সন্তানের গলায়, ঘাড়ে, কিন্তু সে-কামড়ে কোনো ক্ষত তৈরি হয় না। শোনা কথা, বিড়ালের জিভ যেখানে পৌঁছায় না, সেখানে একবার ক্ষত তৈরি হলে তা আর সারে না। বিড়ালের জিভেই লুকিয়ে রয়েছে তার নিরাময় ও আরোগ্য।

দাঁতে ধরে সন্তানদের বয়ে নিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে এক অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠেছিল। যদি কোনোদিন বিন্দুমাত্র অসতর্কতায় মাতৃদাঁতের ক্ষত তৈরি হয় তা হলে সে-ক্ষতের পথ ধরে মৃত্যু অনিবার্য। মাতৃদাঁতের মধ্যেই তখন লুকানো থাকবে সন্তানের মৃত্যু।

কিছু ক্ষত মাতৃদাঁতের ক্ষতের মতো বিশাল… বিনয় মজুমদারের মতো অকল্পিত বিস্তার তার। ‘ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে পুনরায় কেশোদ্গম হবে না’, মাতৃদাঁতের ক্ষতের মতো পবিত্র ও মহাজাগতিক এক ক্ষতের শরীর যেন লুকানো রয়েছে বিনয়ের এই পঙ্‌তিতে।

বিনয়-লিখিত এই পঙ্তিটি আরেকটি রহস্য ও প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের। এক গূঢ় ও অমীমাংসিত প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের অসহায়তা শুরু হয়, ‘‘শিল্প’ ও ‘সত্য’-র মধ্যে সম্পর্ক ঠিক কতটা?’

বিনয়ের এই পঙ্তিটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা ‘সত্য’ হাওয়ার মতো ঘুরে বেড়িয়েছে কতদিন আমাদের কাছে। কিন্তু এই শিল্প ও সত্যের বাইনারির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে এই কবিতার আরেকটি পঙ্তিও, ‘দৃষ্টি বিভ্রমের মতো কাল্পনিক বলে মনে হয় তোমাকে অস্তিত্বহীনা।’

দৃষ্টিবিভ্রমকে দৃষ্টিরই এক বিকল্প অ্যভেনিউ হিসাবে গণ্য না-করলে অস্তিত্বহীনার উপস্থিতি কনক্রিটাইজড হয়ে ওঠে না। কিন্তু বিনয়ের কাছে (ফলত পাঠক হিসাবে আমাদের কাছেও) সে-অস্তত্বহীনা এক চূড়ান্ত বাস্তব। সত্য বা মিথ্যার দ্বিমেরুবিশ্ব এখানে অচল অপ্রাসঙ্গিক। ফলে সে-অস্তিত্বহীনার লুপ্ত বা মৃত হয়ে যাওয়াও সম্ভব। শুধু জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো একটি সাঁকোর উপর ভয়াবহভাবে দোলা খেতে থাকে একটি মাত্র শব্দ, ‘অথবা’।

এবার আরেকবার পঙ্তিটির দিকে ফিরে তাকানো যাক, ‘দৃষ্টিবিভ্রমের মতো কাল্পনিক বলে মনে হয় তোমাকে অস্বিত্বহীনা, অথবা হয়তো লুপ্ত, মৃত’।

এই ‘অথবা’ শব্দটির শরীর থেকে এক ওয়াটারশেডের সূচনা হয়; সে-ওয়াটারশেডের বাম দিকে কাল্পনিক অস্তিত্বহীনার উপস্থিতি এবং ডান দিকে হয়তো লুপ্ত বা মৃত হয়ে যাবার সম্ভাবনা।

যে-মুহূর্তে বিনয় লুপ্ত বা মৃত সম্ভাবনা দু-টির উল্লেখ করলেন সে-মুহূর্তেই যেন সব তারা নিভে গেল। একটিমাত্র নক্ষত্রের ইশারা নিয়েও দৃষ্টিবিভ্রমের সে-অস্তিত্বহীনা জেগে ছিল এতক্ষণ… আটলান্টিকের রাত্রে জেগে ওঠা লাইটহাউসের মতো সে-জেগে থাকা। একটি মাত্র শব্দ ‘অথবা’ সেই জেগে থাকার উপর টেনে দিল ভারী কালো পর্দা।


২০১৮ সালের শীত-ফুরানো এক মধ্য-দুপুর। এ সময় বাতাসে ধুলোর গন্ধ অকারণ মনখারাপ আর বিষণ্ণতার সমাপতন থাকে। উত্তরবঙ্গের এক অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কালো অজগরের মতো পিচের রাস্তা ঢুকে গেছে বনের গভীরে। ওয়াচটাওয়ার থেকে দেখেছিলাম বনের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো উদাসী ময়ূর বাইসন… দূরে ঘাসের জঙ্গলে গণ্ডারের পিঠে বসে থাকা বক।

ফেরবার পথ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছিল গাড়ির সার, জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক হাতির শরীর। বিকেলের মরা আলোয় জঙ্গলের সবুজ ক্রমশ কালো হয়ে আসছে, এক কালোর মধ্যে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে প্যাচিডার্মের নিঃসঙ্গ শরীর ও আত্মা।

সেদিন কি ডিজিট্যাল ক্যামেরার ঝলকানি সমবেত উল্লাস আর চাপা ফুর্তির মধ্যে আমাকে স্পর্শ করতে চেয়েছিল প্যাচিডার্মের নিঃসঙ্গতা আর বিষণ্ণতা?

দৃষ্টির মধ্য দিয়ে স্নায়ুর ভিতর ঢুকে যাওয়া দৃশ্যই একদিন জন্ম দেয় দৃষ্টিবিভ্রমের। আমার দেখা হাতিটি আসলে সালভাদোর দালির দৃষ্টিবিভ্রমের হাতির চিত্রিত রূপ।

শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত নামিয়ে দিতে পারে এমন একটি ঊষর প্রান্তর। দিগন্তের কাছে অদৃশ্য সূর্য, লালাভ রঙে ভরে আছে আকাশ। দিগন্তের কাছে অনুচ্চ পাহাড়, একটি ঘরের আদল। জটিল কোনো টোটেমের রহস্যময়তা নিয়ে এই ঘরটি ছবিটির নাভিবিন্দু— যার দু-দিকে দু-টি দৃষ্টিবিভ্রমের হাতি। হ্যালুসিনেশনের করিডোর পার হতে হতে সে-দু-টি হাতির পা হয়ে উঠেছে আঁকাবাঁকা, শীর্ণ লাঠির মতো। প্রতিটি অস্থিসন্ধিতে ফুটে উঠেছে কঙ্কালের ইশারা। উটের থেকেও লম্বা ও শীর্ণ পায়ের হাতি দু-টির পিঠে একটি করে ওবলিক্স। ছবির বাম দিকের হাতিটির শুঁড় কিছুটা তোলা, ডান দিকের হাতিটির শুঁড় নামানো।

দু-টি হাতির পায়ের কাছে দু-জন মানুষ, তারাও হাতি দু-টির মতো মুখোমুখি। কিন্তু এই বিশাল আর ধূ ধূ প্রান্তরে তারা যেন লিলিপুট।

দালির প্যারানইয়া ক্রমশ গুঁড়ি মেরে ঢুকে পরে ছবিটির দর্শকের স্নায়ুর ভিতর। হাতি দু-টি স্ফীত হতে হতে দখল করে ফেলে সমস্ত ক্যানভাস। ভয়ংকর ভারী কিছু বহন করতে করতে, ক্রমাগত বয়ে নিয়ে যেতে যেতে ভেঙে পড়তে চাইছে হাতি দু-টির পা। হাতির পা-গুলি কি জীবনের অসহ্য ভার বহন করতে করতে ক্লান্ত আর ক্লান্ত হয়ে উঠেছে? নাকি স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ভার ক্রমশ চেপে বসেছে তাদের পায়ের উপর?

আরেকটি সম্ভাবনার কথাও উঁকি দিয়ে যায়। লিঙ্গ নির্মাণের পরিচিত পথ ধরে উদ্ধত হাতির শুঁড় পুরুষ যৌনতার প্রতীক হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এবং যা কিছু অবনত ও গ্রহণে উদ্যত তাকে নারী যৌনতার প্রতীক হিসাবে গণ্য করা হয়। এই ইন্টারপ্রিটেশন হাতি দু-টিকে পুরুষ ও নারীতে রূপান্তরিত করে নিমেষে। উদ্ধত শুঁড়ের হাতিটির (ছবির বাম দিকে) সামনের একটি পা ঈষৎ বাড়ানো। সে যেন কিছুটা বেশিই উদ্গ্রীব তার সামনের হাতিটিকে স্পর্শ করবার জন্য।

কিন্তু হাতি দু-টির পিঠে বহন করা ওবলিক্স দু-টি আরও বেশি রহস্য তৈরি করে। ওবলিক্স দু-টিকে ক্ষমতা শক্তি বা প্যাগানিজমের কোনো ‘দুর্বোধ্য’ অথরিট্যারিয়ান স্মারকচিহ্ন বলে মনে হয়। লিলিপুটের মতো ‘মাস’ কি এভাবেই দীর্ঘ পায়ের অতিকায় হাতির মতো ‘সময়’-এর ছায়ার নীচে অসহায়ভাবে ঘুরে বেড়ায়?

এই ছবিটি দেখতে দেখতে মনে হয় দৃষ্টিবিভ্রমই কখনো কখনো প্রকৃত দেখার করিডোর নির্মাণ করে দেয়। যেমন এখানে হাতি দু-টির দীর্ঘ আর শীর্ণ পা যেন তাদের আরও বেশি বেশি করে ‘হাতি’ (ও প্রকারান্তরে আরও বেশি অসহ্য ভারবহনকারী প্রাণী) করে তুলেছে।

দৃষ্টিবিভ্রমের এই ‘খেলা’ দালির ছবির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দালির আরেকটি অতিবিখ্যাত ছবি ‘সোয়ান্স রিফ্লেক্টিং এলিফ্যান্ট’। ব্যাকগ্রাউন্ডে যে-আকাশ তাকে শুধু মাত্র অ্যজুর (azure) শব্দটি দিয়েই চিহ্নিত করা সম্ভব। সমুদ্রে নৌকার স্পষ্ট উপস্থিতি, সমুদ্রের একটি অংশ ভূ-ভাগের ভিতর কিছুটা প্রবেশ করে খাঁড়ির সৃষ্টি করেছে। চূড়ান্ত শান্ত পটভূমিকায় এই খাঁড়ির ভিতর যেন অভিনীত হয়ে চলেছে এক দুর্জ্ঞেয় খেলা। জলে-ভাসা হাঁসগুলি মুহূর্তে রূপান্তরিত হয়ে চলেছে হাতিতে। হাঁসের গ্রীবার ছায়া জলে পড়ে হয়ে উঠছে হাতির শুঁড়। জল থেকে মাথা তোলা পত্রহীন গাছগুলির শাখাপ্রশাখা মুহূর্তে এক-একটি নিরাবরণ নারী। খাঁড়ির দু-পাশে গাঢ় ধূসর পাথরগুলির মধ্যে গথিক স্থাপত্যের ইশারা। আকাশে দু-খণ্ড মেঘ, মেঘের মধ্যে অতিকায় কোনো ‘উড়ন্ত’ চতুস্পদ প্রাণীর আদল। হাঁসের প্রতিবিম্ব এক দৃষ্টিবিভ্রমের হাতির জন্ম দিয়েছে। হাঁস দৃষ্টিবিভ্রমের হাতি এবং জল থেকে মাথা তুলে থাকা শুকনো গাছের শাখা-প্রশাখা আরেকটি দৃষ্টিবিভ্রমের পথ ধরে জন্ম দিয়েছে বাইসন অথবা নধর বলগা-হরিণের। এবং সমস্ত ছবি ও দুর্জ্ঞেয় রহস্যময় এই আদিম খেলা থেকে চোখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক মানুষ।

— কেন সে চোখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে? ছবিটি দেখার প্রাথমিক অভিঘাতটুকু সামলে ওঠার পর এই প্রশ্ন যে-কোনো দর্শককে তাড়া করে ফিরে বাধ্য। এটি কি সে-মানুষটির রিজেকশন? নাকি সে এই জটিল খেলাটিকে সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করে চিন্তার কোনো অতল তলে ডুবে যাচ্ছে? অথবা সে এই ভয়ংকর দৃশ্যটিকে দ্বিতীয়বারের জন্য আর দেখতেই চায় না! উইলিয়াম ব্লেকের ইনোসেন্স ও এক্সপিরিয়ান্সের জগৎ দু-টি বারবার স্থান পরিবর্তন করতে থাকে এই ছবিটিতে। সমস্ত সম্ভাবনার পরেও আরেকটি সম্ভাবনা মাথা তুলে ধরে এই ছবিতে।

দালির প্যারানোইয়া জুড়ে বারবার ঘুরে ফিরে আসে হাতি। ইম্প্রেসনিজমের আটলান্টিক থেকে ঝড়ের মতো আছড়ে পড়তে থাকে এক একটি গূঢ় ‘ইমেজ’, সবগুলি মিলিয়ে একটি অতিকায় কোলাজ। স্বপ্ন দৃষ্টিবিভ্রম যৌনচেতনা অবচেতনের খেলা— সব মিলেমিশে যাচ্ছে এই ছবিটিতে।

শান্ত, অতি-শান্ত সমুদ্রের জলে ভেসে রয়েছে একটি পাথর খণ্ড। এক নগ্ন নারী, তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে নারীর ঊর্ধ্বাঙ্গের গঠন। দু-টি স্তনব্যতিত সে-ঊর্ধ্বাঙ্গ বেশ ‘পুরুষালি’। একটি বেদানা নারীটির বাম দিকে ভূমিকাবিহীন পড়ে আছে। আর একটি বেদানা নারীটির পায়ের থেকে দূরে সমুদ্রের জলের উপর নিরালম্ব ভেসে রয়েছে। বিস্ফোরিত সে-বেদানা থেকে দু-টি রক্ত-লাল পুরুষ্টু দানা খসে পড়েছে সমুদ্রের জলে।

এখানেও একটি দৃষ্টিভ্রম হতে বাধ্য। প্রথমে চোখ এড়িয়ে যাবে, কিন্তু পরে আবার ছবিটির কাছে ফিরে এলে দেখা যাবে দানা দু-টি সমুদ্রের বুকে খসে পড়েনি, তারাও নিরালম্ব ভেসে রয়েছে জলস্তরের কিছুটা উপরে। কারণ, তাদের ছায়া পড়েছে জলে।

বিস্ফোরিত বেদানা উগরে দিচ্ছে একটি ‘রাক্ষুসে’ মাছ, মাছের মুখটি উগরে দিচ্ছে দু-টি ক্রদ্ধ বাঘ। দু-টি বাঘই এক নিমেষে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে চাইছে ঘুমন্ত নারী-শরীরটিকে।

ছবিটির নাম ‘Dream Caused by the Flight of Bumblebee around a Pomegranate a Second Before Awakening’। ছবিটির নামে উল্লেখিত মাছিটিও আছে, খুব ছোটো একটি মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে বেদানার কাছে।

বিস্ফোরিত বেদানা ভায়োলেট-আভা আলফা-ফিমেল নারী ও যৌনতাকে মনে করাতে বাধ্য। বেদানার কাছে উড়ে বেড়ানো মাছিটি ঘুমন্ত নারীর স্বপ্নে আনয়ন করছে দু-টি ক্রদ্ধ বাঘ। ফ্রয়েডীয় যৌনচেতনার ধারা মেনে সে-বাঘ দু-টি অবদমিত ক্রদ্ধ মর্ষকামের প্রতীক হয়ে উঠতে চাইছে। ছবির বাঘ দু-টি লাফ দিয়েছে বাম দিক থেকে ডানদিকে। একটি বেয়নেট নারীটির ডান-বাহুকে ফুঁড়ে দিতে চেয়েছে। এবং এই সব কিছুর উপর, ছবির ডান দিক থেকে বাম দিকে দীর্ঘ দীর্ঘ পা ফেলে সমুদ্র পেরিয়ে চলে যাচ্ছে একটি সাদা হাতি। এখানেও তার পিঠে একটি ওবলিক্স। এখানেও তার শুঁড় কিছুটা তোলা ও হাতিটির পা উটের গ্রীবার মতো লম্বা ও শীর্ণ। ছবিটি জুড়ে ঘটে যাওয়া বিষয়সমূহের প্রতি, যা আদপে একটি ড্রিম-সিকোয়েন্স, হাতিটির কোনো মনোযোগ নেই। সে দ্রুত দীর্ঘ লম্বা পা ফেলে পেরিয়ে যেতে চাইছে সমুদ্র।

নারীটির ঘুমের মধ্যে এই হাতিটি অনেকাংশেই হাতি এবং স্বপ্নবিভ্রমের হাতি। দু-টিই সত্য। হাতিটির সর্বাঙ্গ হাতির; শুধুমাত্র পা-গুলি ছাড়া। হাতির পিঠে যে-ওবলিক্স তা কি সময়ের কিরীট? অথবা, সময়?

বিস্ফোরিত মাছের হাঁ-মুখ নারী যৌনাঙ্গের ইশারাও রেখে যায়। এবার আরেকটি ইন্টারপ্রিটেশনের দিকে চলে যেতে পারেন দর্শক। বেদানা (কাম) থেকে জন্ম নিতে শুরু করে, জরায়ুর অন্ধকার পার হয়ে নারী-যৌনাঙ্গ (মাছের বিস্ফোরিত হাঁ-মুখ) থেকে উৎক্ষেপিত পুরুষ কী আবার আছড়ে পড়তে চায় নারীর শরীরেই!

এক ঘুমন্ত নারীর স্বপ্নে একটি উড়ন্ত মাছি অগণন কোলাজের জন্ম দিয়ে চলেছে, ‘অ্য সেকেন্ড বিফোর অ্যয়কেনিং’… ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী সময়ে ঘটে চলেছে এই খেলা, অবচেতনের খেলা।

দালির ছবি দালির ‘হাতি’-র কাছে বসে থাকতে থাকতে মনে হয়, এই নারী ঘুম থেকে জেগে ওঠবার পর কী ভেবেছিল!

সে নিশ্চয় আবিষ্কার করবে, তখনও বেদানার পাশে উড়ন্ত মাছিটিকে। মাছিটি নিশ্চিত তখনও খুব বেশি দূরে উড়ে যায়নি। কিন্তু লম্বা ও দীর্ঘ পা ফেলে সমুদ্র পেরিয়ে যাওয়া হাতিটিকে কি সে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে পারবে? নাকি তার কাছে সে-‘হাতি’ অখন দৃষ্টিবিভ্রমের হাতি!

দৃষ্টি থেকে দৃষ্টিবিভ্রমের দূরত্ব ঠিক কতটা?

 

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

চতুর্থ পর্ব

পঞ্চম পর্ব

ষষ্ঠ পর্ব

সপ্তম পর্ব

One reply on “পার্থজিৎ চন্দের ধারাবাহিক গদ্য: সোনালি, হরিণ-শস্য”

পার্থদার এই ধারাবাহিক লেখায় ছবিকে নতুন করে বিশ্লেযণের প্রয়াস লক্ষ্য করি। তার সঙ্গে কবিতার সাংঘাতিক সংযোগ। মনে পড়ে এক্সিবিশনে গনেশ পাইনের ছবির অনুষঙ্গে লেখা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা: তীরে কী প্রচণ্ড কলরব/জলে ভেসে যায় কার শব…লেখা এগিয়ে চলুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *