প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

কলকাতা একটি শ্রমতালুক

Truth is such a rare thing; it is delightful to tell it.
— Emily Dickinson

অর্থনৈতিকতার দ্বিবিধ প্রবৃত্তি— আমদানি ও রপ্তানি। তর্কাতীত এবং অনিবার্য এক সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেই এই প্রবন্ধটি শুরু করতে চাই যে— জন্মলগ্ন থেকেই কলকাতা একটি রপ্তানি-ভিত্তিক বাণিজ্যিক শ্রমতালুক হিসাবে গড়ে উঠেছে। অমেয় শস্যভাণ্ডার, উন্নতশ্রেণির কাঁচা মালের সামীপ্য, বহুপ্রসূ কৃষি-ব্যবস্থা, এবং অভাবনীয় কারিগরি দক্ষতার সৌজন্যে বাংলার পণ্যসম্ভার একইসঙ্গে গুণগত সৌকর্য ও স্বল্প-বিনিময়মূল্যের অধিকারী হয়ে ওঠে। উৎপাদন-ব্যয় এতই কম হত যে, ব্রিটেনের তুলনায়, শতকরা পঞ্চাশ-ষাট ভাগ দাম কম রেখেও ভারতীয় সূতিবস্ত্র বিক্রি করে মুনাফা অর্জন সম্ভবপর ছিল। অতি গভীরে নিহিত গ্রামব্যবস্থার সঙ্গে তাঁত-শিল্প যুক্ত হয়ে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর সেই সুবাদে, বাংলার বাকি অংশের সঙ্গে একযোগে, অন্তর্দেশীয় ও বহির্বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমি হয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ পশ্চাৎভূমি-সহ শ্রীময়ী সম্পদশালিনী ষোড়শী, সপ্তদশী কলকাতা। বস্তুত, প্রগাঢ় অর্থনৈতিক চাহিদা থেকেই এ-শহরের উত্থান। সুতরাং, সতেরোশোর কলকাতা একটি অখ্যাত গণ্ডগ্রাম বা পোড়ো শ্মশানভূমি গোছের জনবিরল মরুসদৃশ জনপদ ছিল— এ জাতীয় চালু কহাবত-বক্তব্য-মন্তব্যের ‘স-প্রমাণ’ তীব্র বিরোধিতাই হল এ-প্রবন্ধের মুখ্য চর্চাবস্তু।

এই তো সে-দিন (১৯৭১) কলকাতায় বেড়াতে এসে জিওফ্রে মুরহাউস সাফ জানিয়ে দিলেন যে, চার্ণকের ডাকে সাড়া দিয়েই না কি দলে দলে লোকজন এসে আদি (ব্রিটিশ) কলকাতায় বসবাস শুরু করে। আর সেই সূত্রেই না কি কলকাতার সামাজিক-অর্থনৈতিক-ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন ঘটেছে। তাঁকে ছাপিয়ে গিয়ে লন্ডনের আরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা সমাজবিজ্ঞানী শ্রীমতী এরিকা বার্বিয়ানি, তথ্যপ্রযুক্তির গনগনে দ্বি-প্রহরে (২০০২) লেখেন— “সন ১৬৯০, যে-সময়ে ব্রিটিশরা বাংলায় এসেছিল, তার আগে কলকাতার অস্তিত্ব ছিল না… এই শহর আর তার এমন প্রতিচ্ছবিটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অবদান।” এমনকী, সুখ্যাত অর্থনৈতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ লুই ডুমন্টের মতোন ব্যক্তিত্বও মন্তব্য করেছেন যে, অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বলতে যা বোঝায়, ভারতবর্ষে তা ব্রিটিশের হাত ধরেই শুরু হয়েছে। স্পটলাইটের মতোন এই তিনটি মন্তব্যের নিশানা হল ষোড়শ-সপ্তদশের আদি কলকাতা, তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রাথমিক শিল্পায়ন ও প্রারম্ভিক নগরায়ণ। কিন্তু, শুধু কি বিদেশিরা? কলকাতা বিশেষজ্ঞ শ্রী পি.টি. নায়ার লিখেছেন— “সুতানুটি, কলকাতা ও গোবিন্দপুর ছিল অজ পাড়া গাঁ। কয়েক ঘর মাত্র লোকের বাস ছিল। একমাত্র নাব্য ঋতুতে (জাহাজ আসা-যাওয়ার সময়ে) একটা হাট বসত ও কর্মব্যস্ততা দেখা দিত” (কলকাতার সৃষ্টি ও জবচার্ণক, পৃ. ১৫২)। কিংবা রাধারমণ মিত্রের নজরে ষোলোশো নব্বইয়ের এ-শহর ছিল ‘এক অখ্যাত গণ্ডগ্রাম’। সাধারণের মনেও যেরকম, ঐতিহাসিক অনুসন্ধানেও তেমনই— (ব্রিটিশ প্রচারযন্ত্রের বদান্যতায়) পাকাপোক্তভাবে ডেরা বেঁধেছে এইসব গল্প-কাহিনি। অথচ, প্রাক্‌-ব্রিটিশপর্বে—১) ভরপুর রপ্তানি-বাণিজ্য ছিল ২) ভারতীয়, বিশেষত বাংলার, পণ্যসৌরভের আকর্ষণে ছুটে এসেছিল তামাম পশ্চিম ইওরোপ। আর সেই বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমি ছিল একালের কলকাতার ৩০/৪০ মাইল ব্যাসার্ধের অন্তর্গত ভাগীরথীর নিম্ন-অববাহিকা অঞ্চল। এতদ্‌সত্ত্বেও, আদি কলকাতার প্রাক্‌-ব্রিটিশ শিল্পকেন্দ্রিক অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দিহান হওয়া কি সম্ভব? ১৬৯০-পূর্ব মুঘল কলকাতায় কি যন্ত্র-ভিত্তিক শিল্পায়ণের পূর্বসুরি হিসাবে বুনিয়াদি ‘গ্রামীণ’ শিল্পের চহলপহল-হুড়হুজ্জত কি, বাস্তবিকই, ছিল। যদি থেকে থাকে, তবে কি— চার্ণকের আহ্বান (মুরহাউস) শহরের অনস্তিত্ব (বার্বিয়ানি) অথবা অর্থনীতিহীনতা (ডুমন্ট) প্রভৃতি মন্তব্যগুলো— নিছকই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রটনামাত্র? এইসব জট-জড়তা-জড়িমা-জটিলতাই, বস্তুত, এই প্রবন্ধের চর্চাবস্তু।

পুঁচকে ডিঙি দেখে অভ্যস্ত গ্রামবাসীর চোখের সামনে জলজ্যান্ত বিশাল জাহাজ, তাগড়া-হাট্টাগোট্টা শাদা চামড়া ঢের-গুচ্ছের! সচরাচর— ‘ই বস্তুটো কি?’— প্রশ্ন নিক্ষেপকারী কলকাতাবাসী ‘কয়েকঘর’ শ্রমিক-তাঁতি-চাষিসমাজ বিন্দুমাত্র কুতূহলী না হইয়া কলিযুগের অহল্যাজন্মে ঘুমাইয়া থাকিতেই পছন্দ করিলেন। কেন-না, তাঁহারা স্বপ্নাদিষ্ট হইয়া প্রস্তরীভূত। শ্রীশ্রীরামচন্দ্রের নব-অবতার, চার্ণক নামধারী অভিজ্ঞ কাপ্তেন আসিয়া পাদস্পর্শে তাহাদের ধন্য করিবেন: তাঁহারা কর্মমুখর হইয়া উঠিবেন ইত্যাদি-প্রভৃতি। এই পর্ব থেকেই, বস্তুত, গোরুর কল্পতরুতে ওঠার প্রথম ভাগটির সূত্রপাত। শতকোটি আরব্যরজনী-কাহিনিতে আমরা বুঁদ হয়ে রইলাম। আজও মজে আছি। কিন্তু, ঘুমঘোরে থাকলেও, অনুত্তরিত ছিটফুট চিন্তার একটি-দু-টি মাঝে মাঝেই গেরিলা-আক্রমণ শানায়— যেমন—

• পণ্যের টানে পর্তুগিজ বাহিনী সপ্তগ্রামে এবং শেঠ-বসাকেরা সুতানুটি/গোবিন্দপুরে এসে থিতু হন। বাংলা তথা কলকাতার শিল্প বিকাশের ইতিহাসে এই দু-টি ঘটনা কি কোনো বিচ্ছিন্ন বৃত্তান্ত?
• মালিক (থুড়ি) পয়সা লগ্নিকারী শেঠেরা এলেন ১৫৫১-এ আর শ্রমিক-মুটে-তাঁতি-চাষিরা, চার্ণকের হাঁকডাকে, শয্যা ত্যাগ করিয়া, অকুস্থলে, হাজির হইলেন ১৬৯০-এ? ১৩৯ বছর পরে? এত্ত লম্বা ঘুম?
• ইতিহাসকার (সমস্বরে, দেশি-বিদেশি সবাই) বলছেন একেবারেই গণ্ডগ্রাম ছিল প্রাগাধুনিক কলকাতা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই প্রশ্ন করে বসি— ‘অজ পাড়াগাঁর তাহলে দু-দুটো মুখোমুখি বাজারের (বেতড়-সুতানুটির) প্রয়োজন কি ছিল?’ এই টুকরো তথ্যই কি জোরগলায় দাবি (হ্রস্ব-ই-কার) জানায় না যে, শিল্প-সমৃদ্ধি হামিনস্ত্‌, হামিনস্ত্‌, হামিনস্ত্‌, এখানেই ছিল!

আর্ণল্ড টয়েনবি, বিশ্ববিশ্রুত ব্রিটিশ অর্থনৈতিক-ইতিহাস বিশেষজ্ঞ— ১৭৬০-এ শুরু হয়ে ১৮৪০ পর্যন্ত জারি থাকা ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নাম দিয়েছিলেন শিল্পবিপ্লব। এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় লেখা হয়েছে যে, কৃষি ও কুটির শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিকতা থেকে ভারীশিল্প এবং মেশিনজাত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বদল ঘটাই হল শিল্পবিপ্লব। এরই লাগোয়া সেঁটে রাখতে চাই সতেরো-আঠারো শতকের ভারতীয়/বাংলার শিল্পপ্রগতির ছবি, যার মৌতাতে আকৃষ্ট হয়ে ভারতমুখী হয়েছিল তামাম পশ্চিম ইওরোপ। বৃহৎশিল্প, যন্ত্র, মিল ও মেশিন ছাড়াই সারা পৃথিবীর শতকরা ২৫ ভাগ পণ্য উৎপাদিত হত ভারতবর্ষে। স্রেফ বাংলারই জি.ডি.পি ছিল ১২%। জুনি টং, জন এল এস্পোজিটো আর ইন্দ্রজিৎ রায়ের লেখা বইয়ে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সপ্তদশের মুঘল বাংলা উপমহাদেশের শতকরা ৫০ ভাগ আর বস্ত্র-কৃষি-জাহাজ শিল্পের দৌলতে সারা বিশ্বের ১২% জি.ডি.পি-র উৎপাদক ছিল। (খন্দকার হাশিম, ডেইলি স্টার পত্রিকা— ৩১/০৭/২০১৫) অমন যুগান্তকারী ও অভাবনীয় মাত্রার শিল্পোৎপাদনের চূড়ান্ত বা অন্তিম দিনক্ষণও জানিয়ে দিয়েছেন ঐতিহাসিকেরা— সন ১৭৫০। অর্থাৎ, ইংল্যান্ডীয় শিল্পবিপ্লবের ঢের আগেই শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল ভারতবর্ষে। কিন্তু, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মিল ও মেশিন ছাড়াই, শুধুমাত্র কুঠির ও হস্তশিল্পের দৌলতেই, ভারতবর্ষ অমন উচ্চতাকে ছুঁতে পেরেছিল। প্রখ্যাত অর্থনীতিশাস্ত্রী Coleman বলছেন যে, প্রাক্‌-শিল্পায়নের তিনটি শর্ত রয়েছে— ১) গ্রামীণ শিল্প, ২) বিদেশি বাজারের চাহিদা-সূত্রে রপ্তানি বাণিজ্য এবং ৩) স্থানীয় স্তরে— গ্রামীণ শিল্পের সঙ্গে কৃষিজপণ্যের বাণিজ্যিক তালমেল, যোগসাজস।

প্রধান সমস্যা হল (ইতিহাসসম্মত) প্রত্যক্ষ তথ্যের অভাব। তথ্য নেই— তাই সত্য অনুপস্থিত। কেউ মৃত, কিন্তু লাশ পড়ে থাকার অর্থ তো সে একসময় জীবিত ছিল। অতএব, পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। মজার কথা হল মিথ্যাকে নানান রঙে ছোপানো যায়। সুদর্শন চক্র দিয়ে সূর্যকেও ঢেকে ফেলা যায়। হয়তো কার্যসিদ্ধিও হয়। কিন্তু সত্যকে কাটাছেঁড়া করা যায় না। সে নিটোল, সে অমোঘ। তার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। নির্মল আলোকরশ্মির মতোই সত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। শিল্পে জোয়ার আসিয়াছিল, কিন্তু ৪৮৮ বিঘা একটি বাজার থাকা সত্ত্বেও কলকাতা বেহুঁশ পড়েছিল— অভাবনীয় মনে হয় কি? অতএব, জুলি অ্যান্ড্রুজের ঢঙে নিজেকেই না হয় সাদামাঠা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই— ‘হাউ ডু ইউ সলভ্‌ এ প্রবলেম লাইক মারিয়া’।

শিল্পবিপ্লবের আগে— ইওরোপীয় সোনাদানা জমা হত ভারতীয় সিন্দুকে। পট পরিবর্তিত হয়, উনিশ শতকের শেষভাগে; উৎপাদিত পণ্যের বদলে ভারতীয় কাঁচামাল পৌঁছত ব্রিটিশ বাজারে। প্রশ্ন করব না— কেন? কী কারণে এই ফেরবদল? শহর-নগরের ইওরোপীয় ব্যাখ্যা আর ভারতীয় জীবনচর্যা-নগরায়ণ-শিল্পভাবনার মধ্যে মূলগত পার্থক্য ছিল। খুঁজে দেখব না তা কীরকম? মিল-মেশিনহীন কর্মক্ষমতার চূড়ান্ত যন্ত্রবৎ পারদর্শিতা, ভারত জুড়ে অজস্র কারখানা, কায়িক শ্রমের অশেষ স্রোতোময়তা, পনেরোশো মিলিয়ন জনসম্পদের গরিমা পরিবর্তিত হল কীভাবে অবশিল্পায়নের সরস্বতী-লুনি-হাকরায়: সেই ‘দি লস্ট রিভার’-এর (অ) জনগণতান্ত্রিকতার বিবরণী লিখে রাখব না? তবে, এই অক্ষর-হর্ম্য কেন, সিসিফাস?

(১৮২৯-এ প্রকাশিত ও উইকিপিডিয়ার ডিজিটাইজড্‌ তথ্য সংরক্ষণের সূত্রে প্রাপ্ত হিস্টোরিকাল অ্যান্ড ইক্লেস্টিকাল স্কেচেস, পৃ-১৬য় উল্লেখিত ঘটনাবলি অনুসারে) ১৬৮৮-তে যেখানে চার্ণককে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল, সেই উলুবেড়িয়া গ্রামটি ছিল ‘populous’ এবং কলকাতা থেকে (নীচের দিকে) মাত্র ২০ মাইল দূরে অবস্থিত। কিন্তু, তিন মাস না কাটাতেই চার্ণকের যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল, মন বসছিল না কিছুতেই। তাই (১৮২৯-এ ছাপা বইয়ের) ইতিহাসকার লিখেছেন: ‘obtained a permission to return to Suttanuttee’. ছ্যাঁকা লাগল যেন! ১৬৮৮-তে যার নিজেরই কোনো বসতঘর নেই, পাক্কা হাটুরে, সেই লোকই দু-বছর না কাটতেই তিনটে গ্রামের মালিক, যাকে পারছেন তাকে যেখানে খুশি বসে পড়ার অনুমতি দিচ্ছেন। কলকাতা কি মগের মুলুক ছিল না কি? ডিহিদার-জমিদার-তালুকদার-জাগিরদার-কোতোয়াল-জনসমাজ ইত্যাদি-প্রভৃতি কিছুই ছিল না কি? শাসনতন্ত্র, শাসক=প্রশাসক কিছুই না? তাহলে চার্ণক কার পারমিশন নিয়েছিলেন? কীসের অনুমতি? বেছে বেছে সুতানুটিকেই কেন মনে ধরেছিল কাপ্তেনের? ‘Populous’ উলুবেড়িয়ার চেয়ে কি ১৬৮৮-র সুতানুটি বেশি স্বাস্থ্যসম্মত ছিল? কিংবা এমন অর্থও তো করা সম্ভব যে, ইওরোপীয় নজরে, বিশেষত, আংরেজি শাদা মানুষের বোধবুদ্ধিতে অন্তত (ইউ অট টু আন্ডারস্ট্যান্ড)— সুতানটি সে-সময়ে লিভেবল, থুড়ি, বসতযোগ্য ছিল।

এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য যে, একটি শ্রমতালুক হিসাবেই নিজস্ব ছাপ রেখেছিল কলকাতা। কিন্তু, কবে থেকে সেই প্রশ্ন রেখেই শুরু করি বরং। সূত্রধরের মতন প্রথমেই জানিয়ে রাখি যে, মুরহাউসের উক্তিটিতেই মন্দোদরীর সিন্দুকটি খুঁজে পেয়েছি; ওখানেই তো কলকাতাকেন্দ্রিক মিথকথার মৃত্যুবাণ মজুত। সুস্পষ্ট হল ক্রমে যে, প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন সম্বন্ধে যে-প্রাথমিক বিশেষ শর্তের কথা অর্থশাস্ত্রীরা বলে থাকেন— সেই জনপ্লাবন, আপামর গরিবগুর্বোর যোগদানই তো মুরহাউসের বাণীর নিহিতার্থ, অর্থাৎ, জনপ্লাবন ও গ্রামীণ শিল্পায়ণের নাড়ীর যোগটি, বস্তুত, খুল্লমখুল্লা স্বীকার করা হয়েছে। অতএব, এ-প্রবন্ধের ‘ইতি গজঃ’ অংশের মূল বিচার্য হল

১) পের্লিন কথিত প্রি-কোপারনিকান ফেজ বা কুটির শিল্পের (গ্রাম্য) প্রাথমিকতা ও জনপ্লাবন।
২) বণিকী পুঁজির উত্থান। ‘দেশি’ শিল্পায়ণ এবং প্রাগাধুনিক নগরায়ণ।
৩) (ভারতীয়) অবশিল্পায়ন। চাষি-তাঁতি-সুতোকারবারি থেকে খানসামা-সরকার-খিদমদগার-পাঙ্খাপুলার-হুঁকোবরদারির জীবন।

জুলাই ২০০৪ হয়তো, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় একটা কবিতা লিখেছিলাম, যার প্রথম পঙক্তিটা ছিল— ‘আর ওই শহুরে বকুলগন্ধ জানে কি শ্বেতকেশ ঘামের ইতিহাস?’ ২০২০-র এই সময় হলে, সুররিয়াল অনুষঙ্গ টেনে হয়তো জুড়ে দিতাম— ‘উদোম ভিজেছ কি যন্ত্রের স্বেদ-রক্তে-অনুভবে?’ শিল্পবিপ্লবের ফলে বাজারে এল বড়ো বড়ো মিল-মেশিন। কিন্তু, যান্ত্রিক পারদর্শিতার কাছে মানুষী প্রয়াসের অবর্ণনীয় শক্তি-জিগীষা-জীবনস্পৃহার কি কোনোই দাম নেই? নতুবা, লুই ডুমন্টের প্রাজ্ঞ সুচেতনায় আমরা কীভাবে পাই— ‘No doubt there is in India today a distinct sphere of activity which may properly be called economic, but it was the British government which made this possible.’ প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন অ্যান্ড প্রি-কলোনিয়াল সাউথ এশিয়া প্রবন্ধে প্রখ্যাত অর্থনৈতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাঙ্ক পের্লিন ডুমন্টের ওই মন্তব্যটির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আমরা তো শুনেছি-জেনেছি ব্রিটিশ লুঠতরাজ, পরিকল্পিত কুশাসন ও ব্রিটিশ স্বার্থবাহী নানাবিধ আইন প্রণয়নের জন্য ভারতে ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন বা অবশিল্পায়ন ঘটেছিল। বহু প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষ যে-পণ্যসম্ভার বিদেশে রপ্তানি করত, তা কি শিল্পজাত পণ্য নয়? কুটির বা হস্তশিল্প কি শিল্পের সংজ্ঞা বহির্ভূত? প্রাসাদ-অট্টালিকা থাকলেই তবে শহর হিসাবে গণ্য হবে, অন্যথা নয়?

১.জনপ্লাবন ও গ্রামীণ শিল্পায়ন
পের্লিন লিখেছেন যে— ‘আই শ্যাল সাজেস্ট দ্যাট ইভেন্টস উয়িদিন ইন্ডিয়া নিড টু বি রিকাস্ট”… আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল ভারতীয় (শিল্প) প্রয়াস— ‘in which rural industrialization in Prussia, Bohemia and Bengal are best treated as aspects of single-set…’ উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে যে, ফ্র্যাঙ্কলিন মেণ্ডেল ডক্টরাল থিসিস হিসাবে ‘প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ তত্ত্বটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে গ্রামীণ শিল্পের কথা বলেন। মেণ্ডেল মনে করতেন যে, গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজ বন্ধ থাকার সময়ে (বাড়তি) শ্রমদানের পরিস্থিতি তৈরি হত। সেই (বাড়তি) শ্রম ব্যবহার করে, প্রথম দিকে, গ্রামীণ আয় বাড়ানোর সুযোগ হয়, যা শহুরে সঙ্ঘ-মন্ডিগুলোর একচেটিয়া কারবারের মূলে মারাত্মক আঘাত হানে। পাশাপাশি, জনসংখ্যা বৃদ্ধিরও সহায়ক হয়ে ওঠে। ওই বর্ধিত জনগণের যোগদানের কারণে উৎপাদনের জোয়ার আসে; বাড়তি শ্রমিকশ্রেণি ও গ্রামীণ পুঁজির সহায়তায় শিল্পোন্নয়নের আবহ সৃষ্টি হয়। মেণ্ডেল-এর মতে ‘প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’=বিদেশি বাজারের জন্য উৎপাদিত বাণিজ্যিক কৃষিপণ্যের সঙ্গে গ্রামীণ হস্তশিল্পের আঞ্চলিক বিকাশ। প্রাক্‌-ব্রিটিশ কালখণ্ডের সঙ্গে বাংলার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কী অপূর্ব সাদৃশ্য, ঐকতান। সুলতানি-মুঘল যুগের কালধর্মিতার জেরক্সকপি যেন। কিংবা পের্লিন যেভাবে বলেছেন— ‘Proto-Industrialisation being the first and necessary phase of transition to industrial capitalism… Proto-Industrialisation… has been described in regions which would eventually industrialise and those which would instead stagnate, Japan And England on the one hand, Brittany and Bengal on the other. It concern domestic manufacture before industrialization but also that which coexisted and even rose alongside factory production.’ পের্লিনের মন্তব্য অনুযায়ী আধুনিক শিল্পবিপ্লবের পূর্বসূরি হল ‘গ্রামীণ’ বুনিয়াদি শিল্প বা ‘প্রোটো ইন্ডাস্ট্রি’। তাঁর মতে ইওরোপ-এশিয়ার অগ্রণী কিছু জায়গায় শিল্পায়নের প্রথম পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়। সেইসমস্ত জায়গাগুলোকেও ফের দু-ভাগে ভাগ করেছেন তিনি। ১) যে-সমস্ত জায়গাগুলো শিল্পায়নের পথে এগিয়েছিল যেমন জাপান ও ইংল্যান্ড। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের দেশগুলো হল ব্রিটানি ও বাংলা। তারা অবশিল্পায়নের পথে হেঁটেছিল। পের্লিনের এই মন্তব্যের অর্থ হয় যে, বাংলায় বুনিয়াদি শিল্প বা ‘প্রোটো ইন্ডাস্ট্রি’ ছিল। ব্রিটিশের স্বার্থপরতায় বাংলার শিল্পসম্ভাবনার চারাটি শুকিয়ে গিয়েছিল। বাংলায় তাই পরবর্তীকালে অবশিল্পায়ন দেখা দিয়েছিল। ভারি মজার এক কার্টুন দেখলাম ফেবু-তে। জি.ডি.পি-র টবে কেউ ঝারি দিয়ে জল ঢেলেছিলেন, আর কেউ কেটলি দিয়ে গর্মাগরম চা ঢালছেন। হাঃ, ব্রিটিশ লিনিয়েজ। চাষি-তাঁতি-মুটে-সুতোকারবারি–সেদিনের মেট্রোচালক নাবিক ইত্যাদি দু-এক কোটি পোশাক বদল করে রঙ্গমঞ্চে ফের: সিঁথি-সিলামপুর-ধারাভি-জে.জে.ক্লাস্টার-মাল্লাপুরম-ভায়ন্দর-চারমিনার-বেলেঘাটা বস্তির শ্রীহীন চেতন খিদমদগার, বিপুল (মোটু) খানসামা, কেষ্টা পরামাণিক, গুপি হরকরা, মশালচি ভগমান, বাপু সহিস, নর্মসহচরী রমা, পুটুস হুঁকোবরদার…

হ্যামিল্টনের হিসাব অনুযায়ী ১৭১০-এ বারো হাজার আর জেফানিয়া হলওয়েলের ১৭৫২-য় চার লাখ নয় হাজার। অর্থ হয়, ফি-বছর গড়ে ৯৮০০জন লোক কলকাতা শহরে বাসা বেঁধেছিল। প্রচলিত ইতিহাস যদিও গঙ্গাতীরবর্তী মুষ্টিমেয় কয়টি (ব্রিটিশ প্রভাবিত) জনপদের মধ্যেই এই শহরাঞ্চলকে সীমিত রেখেছে। সেখানে শ্যালদা নেই, বাগমারি বা বেলেঘাটা! ওরা কিন্তু, (১৫৮০-র) চণ্ডীমঙ্গলে ছিল কিংবা (১৫৯৫-এর) আইন-ই-আকবরীতে রয়েছে। চোখ খুলেই যা দেখা যায়, তা আমরা দেখতে পাই না! দেখাশোনার আগেই সুর ভাঁজি— প্রভু দেখেছে কি? ফ্র্যাঙ্ক পের্লিন-এর মতে পূর্বানুমাণ, পদ্ধতিগত প্রচলন, প্রাপ্তব্য ব্যাখ্যা ও তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে পণ্ডিতেরা মনে করেন যে, প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক ভারতীয় অর্থনৈতিকতা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। সেই কারণে প্রাক্‌-ব্রিটিশ পর্বের ভারতীয় অর্থনৈতিক ইতিহাসকে ‘প্রি-কোপারনিকান ফেজ’ অর্থাৎ, মূলগত বা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পূর্বাবস্থার পরিস্থিতি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন পের্লিন। লক্ষণীয় বিষয় হল যে, ইংলন্ডে শিল্পবিপ্লব ঘটার আগে ইওরোপ থেকে সোনারূপা জমা হত ভারতীয় বাজারে।

দ্বিতীয় পাতা

Spread the love