প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

কলকাতা শ্রমতালুক

শিল্পবিপ্লব সেই ধারার পরিবর্তন করে দেওয়ার ফলে পণ্যবস্তুর বদলে ভারত থেকে কাঁচামাল যেত ইংল্যান্ডের বাজারে। সোনারূপার পরিবর্তে, ব্রিটিশ পণ্য উপচে পড়ত ভারতীয় বাজারে। এক কথায়, ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল ভারতীয় কুটির শিল্পের মধ্যযুগীয়ত্ব। ইংলন্ডীয় শিল্পবিপ্লবের প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে ভারতবর্ষে অবশিল্পায়নের মতো এক নিকৃষ্টতম মূলগত ফেরবদল দেখা দিলে শ্রমিক শ্রেণি জীবিকা পরিবর্তনে বাধ্য হয়। স্বনির্ভর আত্মনেপদী রুজিরোজগার থেকে তারা নফরতন্ত্রের শিকার হয়ে যায়।

হিস্টোরিক্যাল অ্যান্ড ইক্লেস্টিকাল স্কেচেস-এ এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে যে, এক টাকায় ২৯১ কিলো চাল পাওয়া যেত সে-সময়ের বাংলায়। সন্দিগ্ধজন বলতেই পারেন এ-সবের সঙ্গে কলকাতার কী সম্পর্ক। তাঁদের বলি যে, সুঠাম দেহবল্লরীর সৌন্দর্য স্থানবিশেষে সুন্দর হয় না। তাগড়া বাইসেপ-ট্রাইসেপ-সিক্‌সপ্যাক— সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর, অথচ কাফ মাসলটি ল্যাকপ্যাকে, কব্জি কাঠিসার— কখনো হয় না কি তেমন? একুশের অধ্যাপিকা বললেন— শহরই ছিল না, শহর বানিয়ে নেবার দরকার ছিল! তবে কি তাঁরা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীও ছিলেন? সুঠাম শরীর সমান মাপেই সুবিন্যস্ত হয়। বাংলা তেমনই ছিল— পোর্তো গ্রান্ডা চাঁটগা-সোনারগাঁও-বাকলা টু হুগলী-মালদা-বর্ধমান। নদী সামীপ্যের কারণে চওড়া জলপথনির্ভর হাইওয়ের কোলে একটি নয়, দু-দু-টি বাজার কিংবা প্রাক্‌-ব্রিটিশ সাতটি নগর-বন্দর গড়ে ওঠা কি যথেষ্ট, যথাযোগ্য প্রমাণ নয়? (বর্ডারহীন), প্রি-মর্ডান যুগে, বিদেশিবাণিজ্য কি বিস্ময়জনক আধুনিকতা নয়? সুশিক্ষিত মানুষ তো বরং ‘ব্রেক্সিট’ করে! (৪০০ বছর আগে) কলকাতা সংলগ্ন দু-দুটো বাজার (বেতড়-সুতানুটি) থাকার প্রয়োজনীয়তা কী বা কেন?

ঐতিহাসিক অনিল কুমার দাস ইংরাজ দূতিয়াল টমাস রো-র নজরে দেখা বাংলায় ব্রিটিশবাণিজ্যের সম্ভাবনা সম্বন্ধে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন (সূত্র: ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেস, সংখ্যা ২৮,১৯৬৬) আমি কেবল কপি-পেস্ট করছি— ‘Sir Thomas Roe returned * that Bengalla should be poore I saw no reason; it feeds the countries with wheate and rise, it sends sugar to all India; hath the finest cloth and pintadoes, musek, civitt and amber, (besides) almost all raretyes from thence by trade from Pegu… the number of Portugalls residing is a good argument for us to seeke it, it is a signe there is good thing…’ পাশাপাশি উল্লেখ রাখব ঐতিহাসিক ওম প্রকাশ সম্পাদিত ‘হাউ ইন্ডিয়া ক্লোদড্‌ দি ওয়ার্ল্ড্‌’ বই থেকে একটি উদ্ধৃতির— ‘John Huyghen van Linschoten noted in his Voyage to the East Indies (1598) a “great traffique into Bengala, Pegu, Sian, and Malacca, and also to India”, adding that “there is excellent faire linnen of Cotton made in Negapatan, Saint Thomas, and Masulepatan, of all colours, and woven with divers sorts of loome workes and figures, verie fine and cunningly wrought, which is much worne in India, and better esteemed then silke, for that is higher prised than silke, because of the finenes and cunning workmanship.” লক্ষণীয় যে উদ্ধৃতিটিতে Bengala ও India পৃথকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। (তারিখ ১৫৯৮) চার্ণক প্রতিষ্ঠিত ডেটলাইনের একশো বছর আগে! (সেক্ষেত্রে, প্রশ্ন তুলব না— এই পৃথকীকরণ কেন?)

আর্লি অ্যানালস-এ শেঠ-বসাকদের গোবিন্দপুর অভিযানের কথা বলেছেন সি আর উইলসন। শেঠ মানে অর্থ, শেঠ মানে পুঁজি, অর্থকরী জ্ঞান, ব্যবসায়িক নো-হাউ। সপ্তগ্রাম থেকে গোবিন্দপুরে, ১৫৫১-য়, মানে চার্ণক চলে আসার দেড়শো বছর আগেই অনাগত-ভবিষ্যতের উজ্জ্বলতম নমুনা হয়ে সপ্তগ্রামের চালু ব্যবসা ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন বণিক! অ-ব্যবসায়িক স্বার্থে কি? কোনোরকম প্ল্যান-পোগ্রাম ছাড়াই? প্রসঙ্গান্তর হলেও এমন মনে করা কি অনুচিত হবে যে, জগৎশেঠের পরিবারও ক্ষুরধার ব্যবসায়িক প্রবৃত্তির তাড়নায় বিদেশির পক্ষ নিয়ে সিরাজ-বিরোধিতায় নেমেছিল এবং সেই বাণিজ্যিক প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের প্রতিফল কী হয়েছিল তা সারা উপমহাদেশ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে যে, ‘প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ সে-সব জায়গাতেই সফল হয়েছে যেখানে আগে থেকেই শিল্পের মজুদগি ছিল, যা মূলধন, ব্যবসায়িক উপলব্ধি আর সংযোগের পটভূমি তৈরিতে সাহায্য করেছিল।

(মিল-মেশিনের যান্ত্রিক নিপুণতা-নির্ভুলতা-নির্ভরযোগ্যতার সূত্রে নয়) কর্মক্ষম দুটো হাতের সাহায্যেই কেবল শিল্পসম্মত এবং বিদেশি বাজারকে আকৃষ্ট করার মতো যে-কোনো পণ্য উৎপাদন করার সব চাইতে আগে জরুরি হল অভিজ্ঞতা, যা আদতে বহুদিনের মগ্ন আত্মাহুতি-মনীষীসুলভ নিবিষ্টচিত্ততার ফল, ফসল। সুতরাং, ঢাল-তলোয়ারযুক্ত নিধিরাম সর্দার আসিলেন (১৬৯০), বাকিবকেয়া দু-বছরের জিন্দেগীর পুরো সদ্‌ব্যবহার করে উদাত্ত কণ্ঠে সকলকে আহবান জানাইলেন, দলে–দলে অভিজ্ঞ লোক জড়ো হতেই আশেপাশে ৩৮-টি গ্রাম (মোরল্যাণ্ডের ভাষায়— টাউন) গড়ে উঠল। অমন ধারার চালু ইতিহাসের দাখিলা কন্টিনিউ করে বলা যেতেই পারে যে, সেইসব গ্রামগুলোতে অতঃপর পণ্য উৎপাদিত হইতে শুরু করিল। উৎপাদিত বস্তুগুলো অবশ্য, মেশিনের অভাবে, হাতেই তৈরি হত। এবং ইয়ান সেন্ট জন, ব্রিটিশ ঐতিহাসিক, বলছেন ১৭৪০-এর দশকে কেবল কলকাতা থেকেই (সেদিনের মূল্যমানে) বছরে ৪ লক্ষ পাউন্ডের মাল লন্ডনে পৌঁছত। (একটি ‘রিড্‌ল’-এর আশ্রয় নেব=সে-সময়ে শুধু ইংলন্ড নয়, সারা পশ্চিম ইওরোপেই পণ্য পৌঁছে যেত।) এত বিশাল পরিমাণ পণ্য শুধুমাত্র হাতে তৈরি হতে গেলে তো সবচেয়ে জরুরি উপাদান হল কায়িক শ্রম। অতএব, গাদাগুচ্ছের কর্মক্ষম মানুষ, একত্রে ও একই জায়গায় পাওয়ার অর্থ হল সেই জায়গাটি বা উৎপাদন-স্থলটি বহু প্রাচীন। ২৫% জি.ডি.পি. তো প্লুটো-দূরত্ব, তিয়াত্তর বছরে আমাদের জিডিপি ১০-এর দাগও ছুঁতে পারল না। আর মিল-মেশিনহীন দুনিয়ায় তাঁরা চার-দশকেই শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন? সরল সত্য বরং বহু প্রাচীনকাল থেকেই জাহ্নবীতীরে বসত গড়ে ওঠার রীত-রেওয়াজ ছিল। শ্র্মবিভাগকে মেনেই নিজ নিজ জাতি-বর্ণ-গোত্র অনুযায়ী মালোপাড়া-মুচিপাড়া-বামুনপাড়া-কাঁসারিপাড়া-কুমোরপাড়া-তাঁতিপাড়া গড়ে উঠেছিল। আই রিপিট, এই বিভাজন শ্রমের ঠিকানা বা ধম্মের হিসাব অনুযায়ী ছিল না।! আর এমন সুপ্রাচীনতার কারণেই নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, নগর কলকাতার জনপদ-জনবল-জনবহুলতা নিশ্চিতই চার্ণকের আহবানের অপেক্ষায় থাকেনি।

সুতানুটিতে বড়ো একটা বাজার ছিল। তথ্য বলছে বাজার এরিয়া ৪৮৮ বিঘা। অর্থাৎ, বেশ বড়োই বটে। এতটাই বড়ো যে, ১৭০৩ সালেই কোম্পানির রেকর্ডে চড়ে বসেছে। (সূত্র: পি থঙ্কপ্পন নায়ার, দি লিভিং সিটি, পৃ-২৩২) কিন্তু, বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি কী করে হল? ‘কয়েক ঘর মাত্র লোকের বাস’ (পি.টি নায়ার) ‘অখ্যাত গণ্ডগ্রাম’ (রাধারমণ মিত্র), তাহলে এত বড়ো বাজারের কী দরকার ছিল? উলটো পাড়েই তো বেতড় ছিল! বাণিজ্যের পরিমাণ সাপেক্ষে বেতড় যথেচ্ছ ছিল না? ১৭০৬–এর ব্রিটিশ জরিপ অনুযায়ী ৪৮৮ বিঘা এলাকা জুড়ে কলকাতায় ‘বাজার-এরিয়া’ ছিল। প্রশ্ন তোলাই যায় যে, ৪৮৮ বিঘাতে কতগুলো ইউনিট বসতে পারত? স্থানীয় জনতা, বিশেষত, বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিক্রেতা-আড়তদার-মহাজন-কুলি-খালাসি-যোগানদার ইত্যাদিরা ছাড়া অমন ঢাউস বাজারটি চলত কীভাবে? র‍্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম ছিল কি? যে-বাজারের মধু–মৌতাতের সুবাস সুদূর পশ্চিম ইওরোপে পৌঁছে গিয়েছিল, তা যদি এক গণ্ডগ্রামের অজ পাড়া গাঁয়ে হাটই হত, তবে তো ব্রিটিশের ফোর্ট গড়ারই তো প্রয়োজন পড়ত না। ৫০-৬০ বছর আগেই হুগলিতে ডেরা নিয়েছিল, ওরা দুর্গ বানায়নি তো! অভিধানে দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী বাজার হল একটি সর্বসময়ের বিকিকিনির স্থায়ী জায়গা, হাট হল নির্দিষ্ট সময়ান্তরে বেচাকেনার স্থল আর গঞ্জ হল অঢেল পরিমাণ (নির্দিষ্ট) জিনিসের পাইকারি বেসাতির জন্য চিহ্নিত এলাকা। যে-পরিমাণ ব্যবসা চলত, তা (স্ত্রী-পুত্র-পরিবার সমেত) দু-দশটি ‘straggling’ পল্লিগ্রামের দশ-বারো ঘর গাঁইয়া দেহাতির পক্ষে অবশ্যই সাধ্যাতীত ছিল। সুদৃঢ় বাণিজ্য কাঠামো ছিল, নিশ্চিতই, আর রূপকথা বা মিথে পরিণত গ্রাম কলকাতা সংলগ্ন অঞ্চলের জনবহুল, বলিষ্ঠ সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তিভূমির ওপরই ঘাঁটি গেঁড়ে বসেছিল ইওরোপীয় বণিকদল। বলা বাহুল্য, কেবল সমুদ্রবাণিজ্য নির্ভর (ষান্মাসিক) ব্যবসা চলত না বড়োবাজারের মতন সুপারবাজারে। ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যকথায় কবিকঙ্কণের দাখিলামতো অন্তর্দেশীয় এলাকায় যেমন কর্ণাট-অন্ধ্র-পাঞ্জাব-মালাবার অঞ্চলে অন্তত এক শতাব্দী আগে থেকেই বাংলার পণ্য পৌঁছত।

সলিলকির ঢঙ্গে কে যেন ফিসফিসালো— খ্রিস্টীয় তেরো শতক, ভারতীয় জীবনযাত্রায় ঘটেছিল আমূল পরিবর্তন। যুদ্ধবিগ্রহের পথ থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, চাষাবাদ, বস্ত্র-হস্ত-কুটিরশিল্পের দিকে মন দিল আশ্বস্ত সাধারণ মানুষ। গড়-দুর্গ-সেনানিবাসের বদলে অগুনতি কারখানা। পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ উৎপাদন। গঞ্জ–মণ্ডি-কেন্দ্রীয় বাজার। নতুন নতুন আড়ং। ৩২০০-টি আধা-শহর। ১৫০ মিলিয়ন অধিবাসী। ১৫৩০-১৬৩৫-১৬৭৩; পর্তুগিজ-ডাচ-ফরাসি। তুর্কি-পার্শি-চীনা বণিকের আনাগোনা। ১৫৯৫, আখ্যা পেল পরগণা বা মহাল। নতুন নাম, ডিহি কলকাতা। প্রাক্‌ ১৭৫০ বাংলার নগর-বন্দর গড়ে ওঠা, বণিক শ্রেণির মহাজনী উত্থান, আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস সেভাবে নাড়াচাড়া করা হয়নি। অবশিল্পায়নের ইতিহাস রয়েছে, কিন্তু শিল্পায়নের বাখান নেই। হ্যামিলটনীয় জনবিরলতা থেকে হলওয়েলীয় জন-বহুলতার তত্ত্ব-তথ্যদিও কি সেভাবে প্রাপ্তব্য? লাখ চারেক লোক জড়ো হচ্ছেন মুষ্টিপ্রমাণ এক ‘বিশেষ’ এলাকায়, কেন-কী উপায়ে, কীসের বিনিময়ে— সে-ইতিহাস কোথায়? এ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালকাটা (১৯০১)-য় এ.কে. রায় লিখেছেন (পৃ-২১৬)— ‘beyond that [Chitpore] road… spread jungles and pools, swamps and rice-fields, dotted here and there by the straggling huts and hovels of a small number of fishermen, falconers, wood-cutters, weavers and cultivators.’ আর ওই বইয়েরই ২৩ পৃষ্ঠায় শেঠ-বসাকদের সম্বন্ধে লেখেন যে, তাঁদেরই অনুপ্রেরণায় গোবিন্দপুর ও সুতানুটিতে ‘a large colony of weavers’ বসবাস করতে শুরু করে দেয় এবং ইংরাজ বণিকদের আকৃষ্ট করার মতো জমজমাট সুতোর ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল। আদি কলকাতার জনসংখ্যার সঠিক মূল্যায়নের জন্য এই মন্তব্যের ‘লার্জ’ ও ‘কলোনি’ শব্দ দু-টির মাহাত্ম্য অপরিসীম। পরের লাইনেই লিখেছেন ‘ইট ওয়াজ থ্রু দেম দ্যাট দি রেসিডেন্টস অফ ক্যালকাটা ফার্স্ট গট এ গ্লিম্পস অফ দি পর্তুগিজ ট্রেডিং অ্যাট বেতড়, ফ্রম হোয়্যার দে কেম টু ক্যালকাটা অ্যান্ড এস্টাব্লিশড্‌ এ কটন ফ্যাক্টরি (আলগোদাম)। এই আলগোদামই হচ্ছে আজকের ক্লাইভ স্ট্রিট। ১৫৪০-এ পর্তুগিজরা বেতড় বাজার হয়ে সপ্তগ্রাম চলে যেত। আর ১৬৩০-এ তারা সম্রাট শাহজাহানের রোষে পড়ে বিতাড়িত হয়। সুতরাং, চার্ণকের বহু আগেই কলকাতায়, অর্থাৎ, আজকের কয়লাঘাট/ক্লাইভ স্ট্রিট এলাকায় পা রেখেছিল পর্তুগিজরা।

‘আর্লি অ্যানালস’-এ ব্রিটিশ-বাণিজ্য স্থাপনের আদিপর্বের পর্যালোচনায় সি আর উইলসন-এর বক্তব্যের বঙ্গানুবাদ করেছি এরকম— ‘বহু খানাতল্লাশির পর দু-টি বিশেষ কারণের জন্য চার্ণক সুতানুটি (বা কলকাতাকে) ব্রিটিশ-বাণিজ্যের পক্ষে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা হিসাবে বেছে নেন: ১) সামরিক দিক থেকে জায়গাটির নিরাপত্তা এবং ২) ‘ইট ওয়্যাজ অলসো অ্যান এক্সেলেন্ট কমার্শিয়াল সেন্টার’। অর্থাৎ, এটি একটি উচুঁদরের বাণিজ্য-কেন্দ্র ছিল। ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও লিখেছেন যে— ‘দি সিটি ইজ দি গ্রোথ অব মেনি সেঞ্চুরিজ!’ অর্থ হয়, কলকাতা কিংবা হুগলি নদীর যে-অঞ্চলে এ-সময়ের কলকাতা অবস্থিত, তার একটি পূর্ব-ইতিহাস রয়েছে আর নগরটি বহু শতাব্দীর বৃদ্ধির ফল। নিম্ন-ভাগীরথীর অববাহিকা অঞ্চলের চেয়ে ছোটনাগপুরের এলাকায় জনবসতির ঘনত্ব, উপজ ফসলের অনুপাতে খামতি থাকাই বরং, তর্কাতীতভাবে, একটি আর্থ-ভৌগোলিক সত্য। দুই-তিন ফসলি জমির সুবাদে ভাগীরথী তীরবর্তী এলাকার প্রতি বর্গকিলোমিটার পিছু বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে, অগুনতি লোকের বসবাসের পাকাপোক্ত ঠিকানা হয়ে ওঠা, নিশ্চিতই, অতি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিণতি। আর তারই স্বীকৃতি হিসাবে ১৬৯৮-এর জমিদারি হস্তান্তরের বইনামায় ‘কলকাতা’ নামের ডিহি ও পরগনার ‘যৌথ’ সূচনা রয়েছে। হ্যামিল্টনীয় বারো হাজারের পাশে কবিকঙ্কণের ‘ডানি বামে যত গ্রাম, তার কত লব নাম’ কি খুবই বেমানান?

এ-সময়ের ব্রিটিশ স্থপতি-ঐতিহাসিক মার্টিন বিটি মন্তব্য করেছেন যে— ‘Indian cities were not distinguished conceptually and materially from the countryside’. সপ্তগ্রাম বা হুগলি বড়োসড়ো নগরে পরিণত হয়নি। প্রাগাধুনিক ভারতীয় নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সে-সময়ের গ্রামগুলো আধুনিক ইওরোপীয় ধাঁচের এক ঘনসন্নিবদ্ধ এবং বৃহদাকার নগরাঞ্চলে পরিণত হয়নি; বরং সংলগ্ন থেকেও নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিল। ষোড়শ শতকীয় বাংলার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র (১৫৪০-এর) হুগলি থেকে (জলপথে) কলকাতার দূরত্ব ৩৩ কি.মি. মাত্র। অর্থাৎ, সহজেই প্রভাবিত হওয়ার মতো নৈকট্য। সুপ্রতিষ্ঠিত জনপদ হিসাবে মঙ্গলকাব্যে বা রাজস্বপ্রদায়ী অঞ্চল হিসাবে আইন-ই-আকবরী-তে উল্লিখিত শান্তিপুর-নবদ্বীপ-মাটিয়ারি-মুড়াগাছা-হালিশহর-নইহাটী–ব্যারাকপুর (বর্বকপুর)-খড়দহ কিংবা ত্রিবিণী-মগরা-রিষড়া-শ্রীরামপুর-কোন্নগর-কোতরং অথবা আদিগঙ্গার অববাহিকা এলাকা যেমন ছত্রভোগ-মেদনমল্ল প্রভৃতি এলাকা সন্নিহিত হয়েও নিজ নিজ ভিন্ন সত্তা-আইডেন্টিটি নিয়ে গয়ংগচ্ছতায় ডুবে থেকেছে। ভারতীয় রীতি-নীতির সঙ্গে তালমেল রেখেই যেন রাজধানী, প্রশাসনিক বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রভূমি হিসাবে গড়ে ওঠার কৌলিন্য ব্যতিরেকে কোনো এলাকাই তেমন বৃহদাকার নগরে পরিণত হয়নি। পের্লিন-মেণ্ডেল-মারফানি প্রভৃতি বিদেশি অর্থনীতিশাস্ত্রীরা প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রি বা বাণিজ্যিক মূলধনের সঙ্গে জনবৃদ্ধির, সাধারণের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের কথা পেড়েছেন। জিওফ্রে মুরহাউসের ‘দলে দলে’ শব্দবন্ধটিও তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সুতরাং, প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক পর্বের অর্থনৈতিকতার স্বরূপ উন্মোচনে জনবহুলতার বিষয়টি তাই সর্বাগ্রে বিচার্য: প্রাক্‌-ব্রিটিশ নগর কলকাতা কি সত্যিই ‘অখ্যাত গণ্ডগ্রাম’ ছিল?

‘কেন্দ্রীয় অঞ্চল’ তত্ত্বে ওয়াল্টার ক্রিস্টালার পাঁচ ধরনের জনবসতির উল্লেখ করেছেন। সবচেয়ে ছোটো এলাকাকে গণ্ডগ্রাম বা হ্যামলেট বলা হয়। জনসংখ্যার নিরিখে সেই এলাকাগুলো হল, পর্যায়ক্রমে— ১. গণ্ডগ্রাম; ২. গ্রাম; ৩. আধা-শহর (টাউন); ৪. নগর; ৫. অঞ্চলের প্রধানতম শহর বা রাজধানী।

উপরিউক্ত বিভাগ অনুসারে বলা যায় যে, ১৬৯০-এর কলকাতা, কমপক্ষে, একটি টাউন তো ছিলই, যেহেতু, বাণিজ্যিক কর্মচাঞ্চল্যের কেন্দ্র হিসাবে বড়োবাজারের মতন এক সুপারবাজার ও সেই বাণিজ্য অঞ্চল সংলগ্ন উপযুক্ত জনবসতি সৃষ্টি হওয়ার কারণে একশো বছর আগেই একটি পরগনা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আঞ্চলিক শাসনকর্তার বাসভূমি বা ‘ডিহি’-তে পরিণত হয়েছিল।

তৃতীয় পাতা

Spread the love