Categories
ই-ম্যাগাজিন উৎসব সংখ্যা ২০২০ প্রবন্ধ

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

কলকাতা শ্রমতালুক

সে-সময়ের কিছু লেখা থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরে চার্ণকবাহিনীর ঘাঁটি গাড়ার মুহূর্তে প্রাচীন কলকাতার সম্ভাব্য জনসংখ্যার হিসাব দিয়েছেন কলকাতার প্রথম সেন্সাস ওফিসার শ্রী অতুল কৃষ্ণ রায়। ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালকাটা’-র (১৯০১)-এর ১৩০ সংখ্যক পৃষ্ঠায় হলওয়েল সাহেবের ১৯৫২ সালের সংগৃহীত রাজস্বের আনুপাতিক হিসাব করে শ্রী রায় সিদ্ধান্ত নেন যে, কলকাতার আনুমাণিক জনসংখ্যা ছিল— ১৬৯৬ সাল=(৮০৭৩), ১৭০৪ সাল=(৫১৬০০), ১৭০৮ সাল=(১০৮৭০০)। (স্মর্তব্য যে, ব্রিটিশ বয়ান অনুসারে (প্রারম্ভিক) কলকাতা তিনটি গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল)

প্রোটো-ইন্ডাস্ট্রি বা গ্রামীণ পুঁজি বা ধনবাদী সমাজব্যবস্থার পূর্বসূরি হিসাবে পের্লিন-মেণ্ডেল-মারফানি-ভ্যান বস চিহ্নিত merchant capitalism পর্যায়ের জনবৃদ্ধি, খেটে খাওয়া গরীরগুর্বোর পাশাপাশি অর্থলগ্নিকারী ধনিকশ্রেণির স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানের বাস্তবতা-তত্ত্ব-তথ্যকে অস্বীকার করা সম্ভব কি? উইলসন সাহেব বলছেন— ১৭০৪ সালে শহরের জনসংখ্যা ছিল ১৫০০০ আর জমিদার-শাসিত শহরসংলগ্ন এলাকায় ছিল ৩০০০০। (অর্থাৎ, শহরতলি সে-সময়েই জমজমাট। দ্বিগুণ জনসংখ্যা। উইলসন-তত্ত্বে ১৭০৬ সালে জনসংখ্যার হিসেব ছিল যথাক্রমে, ২২০০০ ও ৪১০০০। ১৭০৮-এ হয় ৩১০০০ ও ৩৬২০০ আর ১৭১০-এ ৪১০০০ ও ৮২০০০। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে হ্যামিল্টন অবশ্য বলেছেন যে, ১৭১০-এর কলকাতায় ১২০০০ লোকের বসবাস ছিল। কলকাতার ভারপ্রাপ্ত রাজস্ব সংগ্রাহক হলওয়েল সাহেবের মতে ১৭৫২ সাল নাগাদ কলকাতার জনসখ্যা ছিল চার লক্ষ নয় হাজার (৪০৯০০০)। ঐতিহাসিক সি.এ. বেইলি মনে করেন ১৭২০ সালের কলকাতায় ১২০০০০ (এক লক্ষ কুড়ি হাজার) মানুষ বসবাস করতেন। ‘ten cities that made an empire’ বইতে Tristram Hunt জানান যে— ‘আঠারো শতকের মাঝামাঝি লালদিঘি এলাকায় এক লাখেরও বেশি বাসিন্দার বাসভূমির গর্ব করতে পারত কলকাতা, যার ফলে কেবলমাত্র লন্ডন ছাড়া আর যে-কোনো ব্রিটিশ শহরের থেকে দীর্ঘকায় ছিল। (সুতরাং, জনপ্রাবল্যের দিক থেকেও আমরা (১৭৫০-এ) লন্ডনের সঙ্গে প্রায় একাসনে বসার গরিমা অর্জন করেছিলাম।) অথচ, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নজরে ১৬৯০-এর কলকাতা একটি গণ্ডগ্রাম হয়েই রয়ে গেছে! বিস্ময়জনক। উপরন্তু, রায়সাহেবের ৮০৭৩ হোক অথবা হ্যমিল্টনীয় বারো হাজার কিংবা হলওয়েলীয় চারলাখ— কোনো সংখ্যার পিছনেই ব্রিটিশ শাসনতান্ত্রিক গরিমা-মহিমা-ভঙ্গিমার কণামাত্রও অবকাশ নেই। সিরাজের কলকাতা অভিযানের মূল কারণ ছিল ব্রিটিশ বণিকের যথেচ্ছাচার, দুর্গনির্মাণ। অর্থাৎ, তখনও তারা প্রজা, শাসকপ্রভু নয়। কোম্পানির খাজনা জমা করতে হত তাদের। অর্থ হয়,— ঘরভরা ফসল, কুশলী কর্মক্ষম দু-টি হাতের সুদক্ষ শিল্পসৃজন ও অমেয় পণ্য ভাণ্ডারটিকে ‘বাজারজাত’ করার তীব্র অর্থনৈতিক চাহিদা, বণিকী তাড়না থেকেই কলকাতার জন্ম। অস্যার্থ, ষোড়শ-সপ্তদশ-আঠারো শতকীয় কলকাতা ‘স্বয়ম্ভু’ ছিল।

হান্ট ‘conurbation’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কেম্ব্রিজ অভিধানে শব্দটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে— ‘a city area containing large number of people, formed by various towns growing around and joining together’: উদাহরণ হিসাবে টোকিও, ওসাকা প্রভৃতি উচ্চারিত হয়েছে। সেই সূত্রানুসারে, প্রাথমিক গ্রাম তিনখানি নয় কেবল, পার্শ্ববর্তী শুঁড়া, কলিঙ্গা, মলঙ্গা, চিৎপুর, দখিনদাঁড়ি, উলটোডীঙ্গি, ব্রিজি, মাগুরা, চৌবাঘা, তিলজলা, ট্যাংরা, শালকে-ব্যাঁটরা, ইত্যাদি আরও ৩৮টি শ্রমঠিকানার জীবনস্পন্দনও তো কলকাতার উত্থানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এবং ১৭১৭-তেই।

মুরহাউস অবশ্য একটি প্রণিধানযোগ্য স্বীকারোক্তিমূলক মন্তব্য করেছেন যে, কলকাতার লাগোয়া যে-হিন্টারল্যান্ড/পশ্চাৎভূমি রয়েছে, সেটাই এর সম্পদকে সর্বদা আরও বর্ধিত আকার পেতে সহায়তা করেছে। (‘that in the first place provided the excuse for Calcutta being here at all’). অর্থাৎ, এখানে কলকাতা সৃষ্টি হবার প্রধান কারণ তো এইসব অঞ্চলগুলোই। সুতরাং, গ্রাম কলকাতা নয়, কলকাতাকে ঘিরে থাকা বিস্তীর্ণ উপকণ্ঠই হল কলকাতার উত্থানের পিছনে মুখ্য চালিকাশক্তি। কিন্তু এই সাযুজ্য-সহধর্মিতা-সমমর্মিতা কি ১৬৯০-এর পরে শেখা? এ-যুগের গার্ডিয়ান পত্রিকার মতে ‘মাঝ অষ্টাদশে, এক লক্ষ বাসিন্দা, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ভারতীয়, সেই জনপ্রাবল্যহেতু শহর কলকাতার রূপরেখাটি ফুটে উঠতে শুরু করে।’ অতএব, গার্ডিয়ান অনুযায়ী, ইংরাজ অধিকৃত অঞ্চলটিই কেবল শহর পদবাচ্য আর স্থানীয় জনতা অধ্যুষিত এলাকায় যাঁরা বাস করতেন, যাঁরা উইলসন সাহেবের ভাযায় শুরুতেই ‘দ্বিগুণ’ কিংবা মুরহাউসের ‘হিন্টারল্যান্ড’ তাঁরা ধর্তব্য নন, ব্রাত্য?।

লক্ষণীয় হল ঐতিহাসিক হান্ট ‘এরাউন্ড লালদিঘি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। ১৭৫০ নাগাদ লালদিঘির আশেপাশেই যদি লক্ষজন বাসিন্দা থাকেন তো সেই সময়ের উপকণ্ঠ যার মধ্যে শিয়ালদহ, বাগমারি, মির্জাপুর, এন্টালি, ধলন্দা ইত্যাদি আরও ৩৮টি গ্রামের বাসিন্দার সংখ্যা আদতে কত ছিল? এ.কে. রায় মহাশয়ের দাখিলা অনুযায়ী ১৭০৬-এর সদ্যভূমিষ্ঠ ‘ব্রিটিশ’ কলকাতায় ৮০০৮টি বাড়ি। উইলসন সাহেবের হিসাবমতো ১৭০৬ সালে ২২০০০ বাসিন্দা। অর্থাৎ, বাড়িপিছু মোটামুটি আড়াইজন বাসিন্দা। ম্যালথাস সাহেবের জনসংখ্যা তত্ত্ব (১৭৯৮) ভূমিষ্ঠ হবার বিরানব্বই বছর আগেই শহর কলকাতায় পরিবার পরিকল্পনার ল্যাবরেটরি স্থাপন করাই কি তবে ব্রিটিশ রাজত্বের প্রথম অবদান? কিংবা, হ্যামিল্টন সাহেবের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী বিচার করলে ৮০০০ বাড়িতে ১২০০০ লোক। অর্থ হয়, বাড়িপিছু গড়ে দেড়জন। গড়ে মাত্র দেড়জন লোক থাকার জন্যে কেন কয়েক হাজার বাড়ি গড়ে উঠবে? ১৬৯৮-এ ব্রিটিশরা জমিদারিত্ব পায়। রায়সাহেব নিজেই দাখিলা দিয়েছেন (এ শর্ট হিস্ট্রি… পৃ-২০৩) যে, প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রিটিশরা তাদের পত্তনিটিকে সুতানুটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, আর ১৬৯৬ সালে বাসস্থান বদল করে পাশের কলকাতা গ্রামটিতে ডেরা বানায়। নিজেরাই যখন থিতু হয়ে বসেনি, তখন অন্যকে বসে পড়ার হুকুমত জারি করেই-বা কী করে? ১৬৯৮-এ কলকাতা ইত্যাদির জাগিরদারি পাওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে কি ৮০০৮টি বাড়ি গড়ে উঠেছিল?

আট বছরে আট হাজার বাসস্থান! বছরপিছু গড়ে এক হাজার, দিনপিছু সাড়ে তিনটি। এতগুলো বাড়ি গড়ে উঠল, সেও এক সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তো বটেই, অথচ এ-ধরনের সামুহিক ক্রিয়াকলাপের বিবরণ সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক তথ্য সহজলভ্য নয় কেন?

১৭০৬-এ তিনটি গ্রামের জমি-জরিপ করায় ব্রিটিশ বাহিনী; সেই জরিপ অনুযায়ী চাঞ্চল্যকর তথ্য হল—
বাজার কলকাতায়— মোট ৪০১ বিঘা এলাকা
ডিহি কলকাতায়— মোট ২৪৮ বিঘা এলাকা
সুতানুটির ১৩৫ বিঘা এলাকা
গোবিন্দপুর ৫৭ বিঘা এলাকা
মোট ৮৪১ বিঘা এলাকা

• অর্থ হয়, নির্মিত বস্ত এলাকার শতকরা (প্রায়) ৪৮ ভাগ অঞ্চল ছিল বাজার-এরিয়ায়।

সুতরাং, বাজার ছিল জীবন-জীবিকা-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান অঙ্গ। বাজার অর্থাৎ, ট্রেডিং বা নিখাদ পণ্য কেনা-বেচা। বাজারে বিক্রি করার জন্য ঘাড়ে করে মাল বয়ে নিয়ে আসতেন খেটে খাওয়া মানুষজন। তাঁরা অবশ্যই সংখ্যায় ‘কয়েকঘর’ অল্প কয়েকজন ছিলেন না। উপরন্তু, বাজার এলাকায় বসতি গড়ে উঠতে পারে না। তাই জনবসতি ছিল সামান্য দূরের ৩৮-টি আধাশহুরে কুটিরগুলোয়, যেখানে তাঁতবস্ত্র বা হস্তশিল্পের বয়ন-বুনট-নির্মাণ হত। সবিশেষ উল্লেখনীয় হল যে, পের্লিন-মেণ্ডেল প্রভৃতি প্রোটো ইন্ডাস্ট্রির প্রবক্তারা সমবেত ঐকতানেই জানিয়েছেন যে, উপনিবেশপূর্ব গ্রামীণ (প্রোটো ইন্ডাস্ট্রিয়াল) অবস্থায়— সে-প্রাশিয়া হোক কিংবা বোহেমিয়া বা ইন্ডিয়া— পরিবারের সবাই মিলে এই ‘পারিবারিক’ কাজে অংশগ্রহণ করত। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক পার্থসারথি প্রসন্ননও জানিয়েছেন যে, দাক্ষিণাত্যে তাঁতি পরিবারের সবাই, ছেলে-মেয়ে-বাড়ির মহিলারা নির্বিশেষে রং লাগানো, সুতো ধোওয়া, সাফ-সাফাই বা সুতোর গুলি পাকানোয় যোগ দেয়।

২) দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এলাকার প্রাচীনত্ব।

রায়সাহেব লিখেছেন যে, খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে কালীক্ষেত্র ১২৮০ একর এলাকা জুড়ে পরিব্যাপ্ত ছিল এবং সতেরো শতকে তা হয়ে দাঁড়ায় ১৬৯২ একর। অর্থ হয়, ব্রিটিশবণিক হাজির হওয়ার মোটামুটি পাঁচশো বছর আগে থেকেই অর্থনৈতিক কাজকর্মের যোগান সামাল দিতে কলকাতার কলেবর ৪১২ একর এলাকায় বৃদ্ধি পেয়েছিল। একইসাথে, লক্ষ করার বিষয় হল যে, হুগলিতে ঘাঁটি গাড়ার পর থেকে ইওরোপীয় বনিকেরা ক্রমশ দখিনমুখী হয়ে পড়েছিল। ফরাসি—চন্দননগর, ডাচ— চুঁচুড়া, দিনেমার— শ্রীরামপুর এবং সবশেষে আসরে নামা ব্রিটিশবাহিনী= সুতানুটি। ভৌগোলিক দিক থেকে শতপ্রতিশত নিয়মতান্ত্রিকতা, স্ট্রেট লাইন মেথডিক সেটেলমেন্ট। সামান্য এক রুরাল বাজার, পের্লিনের ভাষায়, ‘rurban–type’ ‘বিকিকিনির হাট, ক্রমে অসামান্য এক গ্লোবাল বাজার হয়ে ওঠে। মোদ্দাকথায়, এ-জাতীয় ‘degree of specialisation’–এ পৌঁছতে মাসকয়েক বা বছরকয়েক নয়, শতাব্দীর শ্রম-মেধা-মনন প্রয়োজন হয়। স্মর্তব্য যে, মুঘল আমলে কলকাতা একটি মহাল বা পরগনা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল। সুতরাং, ব্রিটিশ আসার সঙ্গে কলকাতার বাড়িঘর গড়ে ওঠা শুরু হওয়ার আখ্যানটিও অনৈতিহাসিক। পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

ষোলো-সতেরো শতকের ভারতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ও অতি দ্রুত কিছু পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের মূল বিশেষত্ব হল স্থানীয় স্তরে merchant capitalism-এর উত্থান, যা উপমহাদেশীয় বিস্তার লাভ করে এবং অর্থব্যবস্থা-রাষ্ট্রবাদিতায় গভীর ছাপ রেখেছিল। এরই প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও পর্যাপ্ত কাঁচামালের কারণে বাণিজ্যিক হুড়হুজ্জত, চহলপহলের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয় বাংলা। সে-সময়ের ভারতীয় অর্থনৈতিকতার বিষয়ে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ইয়ান সেন্ট জন লিখেছেন— ‘what was the character of this India the British encountered in the 17th and early 18th centuries ? It had, to begin with, a vigorous commercial culture. Market systems were well developed and facilitated active trading links both within India itself and beyond to Persia, Africa, China and the spice Islands (latter day Indonesia)…. Calcutta was the company’s most thriving base. Silk, cotton textiles ,sugar and saltpetre were all purchased by the company from across Bengal and shipped towards London and East Asia. Exports to London alone amounted to £400000 per annum in the 1740’s.’ (p-15) vide ‘the making of the British Raj’ by Ian Saint John… সতেরো বা আঠারো শতকের শুরুর দিকে ভারতে পা দিয়ে ব্রিটিশরা কী দেখেছিলেন? শুরুতেই বলা যায় যে, সেখানে এক জোরদার বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপ চালু ছিল। বাজার অর্থনীতি যথেষ্ট উন্নত ছিল যার ফলে ভারতের অন্তর্দেশীয় এলাকায় যেমন সক্রিয় লেনদেন চলত, ঠিক তেমনই বর্হিবাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পারস্যদেশ, চীন, আফ্রিকা আর ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এবং কলিকাতা ছিল সেই কর্মকাণ্ডের কোম্পানির সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী ভিত্তিভূমি। সেন্ট জন একইসাথে দিনক্ষণেরও উল্লেখ রেখে আঠারো শতকের শুরুর দিকের কথা বলেছে। কিন্তু ইতিহাস জানাচ্ছে ১৬৮৮-র গ্লোরিয়াস রেভ্যুলিউশনের পর ভারতে ব্রিটিশ বাণিজ্যের নামমাত্র অস্তিত্ব ছিল। এবং ১৭০৮ সালের পর তা পুনরায় শুরু হয়। সুতরাং, আঠারো শতকের শুরুতেই তো ব্রিটিশবণিকেরা বাণিজ্যকাজে মন দেয়। সেক্ষেত্রে, তৈরি বাণিজ্যকাঠামো-প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য ক্ষেত্র ছাড়াই কি একটি মার্কেন্টাইল কোম্পানির মনপসন্দ জুয়েল=সমৃদ্ধিশালী ভিত্তিভূমি হয়ে উঠতে পারে কি কোনো জায়গা?

সেন্ট জনের ‘জোরদার বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপ’ মন্তব্যটিতে বিশেষ নজর দেব। তাঁর মন্তব্যের পাশেই ঠুসে দিতে চাই মুঘল সম্রাট ঔরংজেবের প্রশংসাবাণী। তাঁর কাছে বাংলা ছিল ‘প্রদেশের স্বর্গ’। ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছাড়াও নিকট চীনসমুদ্র থেকে পারস্য-ভূমধ্যসাগর হয়ে প্রায় সমগ্র পশ্চিম ইওরোপে বাংলার বাণিজ্যসম্ভারের রীতিমতো ঈর্ষাজনক চাহিদা ছিল। অতএব, চার্ণকের দ্বি-প্রাহরিক খেয়ালের বশে হঠাৎই এঁদো জলাভূমিতে কিপলিঙেস্কু একটি শহর-নগর হিসাবে ছত্রাকের মতন কলকাতা গজিয়ে ওঠেনি! ব্রিটিশ লেখকেরাই তো মনে করেন কলকাতার জন্ম হয়েছিল কেবল বাণিজ্যের লক্ষ্যে, ব্যবসায়িক স্বার্থে! স্মর্তব্য— Geoffrey Moorehouse— ‘Nothing but commercial greed could possibly have led to such an idiotic decision; that is, to build a city in the marshland of Bengal.’

শেষ পাতা