ফাল্গুনী ঘোষের প্রবন্ধ

ধাঁধার রূপরেখায় আদি মনস্কতা

গোলকধাঁধা শব্দটি সুপরিচিত। একবিংশ শতকের ফ্ল্যাট কালচারের আবহে দাঁড়িয়ে থাকা আমরা প্রাচীন যুগের শ’দুয়ারি ভাঙাচোরা জমিদার বাড়ির মুখোমুখি হলে মনে মনে অনেকেই বলে ফেলি, কি পেল্লায়! একেবারে গোলকধাঁধা। প্রকৃত অর্থেই গোলোকধাম আশ্চর্য এক ধাঁধা। ধাঁধা কখনও ‘রহস্য’ অর্থে, কখনও জটিলতা অর্থে। পথ খুঁজতে হয় আমাদেরও। বুদ্ধির গোড়ায় শান দিতে বসি তখন। ধাঁধা এতটাই দাবি করে। মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থকে ঝাঁকিয়ে নিতে কোন বুদ্ধিমান মানুষ না চায়। তাই বোধহয় তথাকথিত আধুনিক বুদ্ধিজীবির সংগীতের মূর্ছনায় বেজে ওঠে—

“ধাঁধার থেকে জটিল তুমি/খিদের থেকেও স্পষ্ট।
কাজের মধ্যে অকাজ খালি/মনের মধ্যে কষ্ট”

বছর চল্লিশ পরেও ‘তুমি’ জটিল থাকবে, ধাঁধার চেয়ে। প্রেমের গতি স্বতঃই ধাঁধা।
সুতরাং ধাঁধার প্যাঁচে জিতে বেরিয়ে আসা অবশ্যই পুরস্কৃত হওয়ার যোগ্য। ধাঁধা শুধু বুদ্ধির নিক্তিতে মাপা যায় না, এ এক অনন্য শিল্পও। Riddling is an art. এখন প্রশ্ন, ধাঁধার মতো শিল্পকে শুধু লোকজীবনের গণ্ডিতে ব্রাত্য করে রাখা যায় কি! বাঙালি নিজের শিকড় সম্পর্কে বিস্মৃতপ্রায়। না হলে বিশ্বখ্যাত মাননীয় লেখকেরা ধাঁধাকে কীভাবে বিখ্যাত করে রেখে গেছেন সে গৌরবে পুলকিত হতো বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গুপ্তধন গল্পের বিখ্যাত ধাঁধা বা ফেলুদার ‘ত্রিনয়ন ও ত্রিনয়ন একটু জিরো’— বাংলা সাহিত্যে ধাঁধার ল্যান্ডমার্ক বলেই মনে করি।
এবার আঙ্গুল উঠবে কোথায় ধাঁধার প্রাচীনতা। শিকড়ের অনুসন্ধান জরুরি। বিখ্যাত জার্মান লোকবিজ্ঞানী Friedreich তাঁর ‘Geschichle Des Rathlesels’ গ্রন্থে ধাঁধাকে ‘an indirect presentation of an unknown object on order that the ingenuity of the nearer or reader may be exercised in finding it out’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ল্যাটিন ‘aenigma’ ফরাসি ‘enigme’ এবং ইংরেজি ‘enigma’ গ্রিক শব্দ মূল থেকে গৃহীত। সংস্কৃতে ‘প্রহেলিকা’ আধুনিক হিন্দি উর্দুতে তা ‘পহেলিয়া’ এবং বাংলায় ‘হেঁয়ালি’। সিলেট অঞ্চলে ধাঁধাকে বলা হয় ‘পই’। টাঙ্গাইলে ‘শিলোক’ বা ‘ঠল্লক’। স্পষ্টই উপলব্ধি করা যায় যে প্রাচীনকাল থেকেই এই শব্দের ব্যবহার অর্থাৎ ধাঁধার ব্যবহার হয়ে আসছে।
ধাঁধা রহস্য সম্বন্ধে জর্জ ফ্রেজার প্রথম আফ্রিকার প্রাচীন থঙ্গা বা বান্টু জাতির বৃষ্টি আবাহন উৎসবের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সে-উৎসবে আদিম সম্প্রদায়ভুক্ত নারীরা বৃষ্টিকে আহ্বান জানিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে নাচ গান পরিবেশন করে। কোনো পুরুষ এ সময় সেখানে উপস্থিত হলেই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় ধাঁধা। ধাঁধার উত্তর অপেক্ষাকৃত অশ্লীল ভাষায় দিতে না পারলে সে পুরুষের কপালে জোটে উত্তম-মধ্যম। মধ্য সিবিলিস, ডাচ, ইস্ট-ইন্ডিস, সাইবেরিয়া প্রভৃতি দেশে ও ভারতের মধ্যপ্রদেশ, আসামের অরণ্যচারী নাগা, কুকি, গারো, কোচ, মুরং ও অন্যান্য অঞ্চলের বহু চাষী সম্প্রদায় ফসল পাকার সময় একে অন্যকে ধাঁধা জিজ্ঞেস করে। কেউ ধাঁধার উত্তর দিতে পারলে সবাই সমস্বরে বলে ওঠে: ‘এবার আরও ফসল হোক— মাঠ ঘাট ঘর বাড়ি ভরে যাক ফসলে’।
ফ্রেজারের মতে ধাঁধা এখানে মন্ত্রের কাজ করে। আবার দেখা যায় বছরের কোনো কোনো সময় ধাঁধা বলা একদম নিষেধ। রাশিয়ার বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেউ মারা গেলে ধাঁধা বলে থাকে। তাদের ধারণা ধাঁধা বললে মৃত আত্মা ফেরত আসে না। হঠাৎ কোনো দৈব দুর্বিপাক, বন্যা বা দুর্ভিক্ষ হলে আফ্রিকা এবং অষ্ট্রেলিয়ার বহু আদিম জাতি খোলা প্রান্তরে গিয়ে পরস্পরকে হেঁয়ালি জিজ্ঞাসা করে। রংপুর কোচবিহার অঞ্চলের কোচ রমনীগণ অনাবৃষ্টি হলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে রাত্রে মাঠে গিয়ে ‘হুদুম দেউ’-এর গান করে, সাথে নানারকম ধাঁধা জিজ্ঞেস করে। অনেক সময় নারী পুরুষের যথেচ্ছ রতিক্রিয়ারও খবর পাওয়া যায়। আমাদের দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আগেকার দিনে রথযাত্রা এবং চড়ক পুজোর সময় ধাঁধা বলা হতো। সাঁওতাল, কোল, ভীল, মুন্ডাদের মতো বহু আদিম জাতির বিয়ে পার্বণে ধাঁধার প্রচলন রয়েছে। কারণ, তাদের বিশ্বাস ধাঁধার উত্তর দিতে পারলে তাদের বহু আপদ বিপদ দূর হবে এবং ভবিষ্যৎ জীবনেও তারা অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারবে। তুরস্কের প্রত্যন্ত অংশে এখনও বিবাহার্থী কন্যা ভাবী স্বামীকে বিয়ের আগে ধাঁধা জিজ্ঞেস করে থাকে। বৈদিক যুগের অশ্বমেধ যজ্ঞের সময়ও ধাঁধা বলা হতো। এদিকে প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগবেদের মধ্যেও ধাঁধার যথেষ্ট নজির আছে।

ধাঁধা রহস্য সম্বন্ধে জর্জ ফ্রেজার প্রথম আফ্রিকার প্রাচীন থঙ্গা বা বান্টু জাতির বৃষ্টি আবাহন উৎসবের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সে-উৎসবে আদিম সম্প্রদায়ভুক্ত নারীরা বৃষ্টিকে আহ্বান জানিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে নাচ গান পরিবেশন করে। কোনো পুরুষ এ সময় সেখানে উপস্থিত হলেই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় ধাঁধা।

এখন প্রশ্ন হল লোকে ‘ধাঁধা’ বলে কেন? এর পিছনে সেই অতি আদিম ‘সর্বপ্রাণবাদ’। সর্বভূতে আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার সব প্রাচীন ধর্মেই লক্ষ করা যায়। জীব-জন্তু, গাছপালা, নদী সমুদ্র, অরণ্য পর্বত, মাঠ-ঘাট সবকিছুকেই দেবতা রূপে কল্পনা করা শুরু করে মানুষ। এর পিছনে ছিল প্রাকৃতিক শক্তির প্রতি মারাত্মক ভীতি। পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির প্রতি অহেতুক ভয়। সব মিলিয়ে ঐন্দ্রজালিকতায় (Magic) বিশ্বাস এল মানুষের। মানুষকে এইসব আপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য এলেন পুরোহিত। পার্সি (ম্যাজি) থেকে ইংরেজি ‘ম্যাজিক’ শব্দটির উদ্ভব। এল বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান। এই সকল পর্যায়গুলিই আমাদের ধর্মবোধের উন্মেষ ঘটিয়েছে পরবর্তীতে। কাজেই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যাবে বর্তমান সমাজের ধাঁধা বা হেঁয়ালির বীজ হয় মানুষের সর্বপ্রাণবাদ পর্যায় নয়তো সমপ্রক্রিয়ার ম্যাজিক পর্যায় এবং অন্যান্য আচার অনুষ্ঠান।
অর্থাৎ ধাঁধার ব্যবহার সুপ্রাচীন, ইউনিভার্সাল। লোকমুখে প্রচারিত এবং লোক ঐতিহ্য থেকেই সাহিত্য, সমাজজীবন, ধর্মীয় ক্ষেত্রে প্রবিষ্ট। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ধাঁধার সন্ধান পাওয়া যায় গ্রিসদেশে। জনশ্রুতি এই যে, গ্রিসদেশে থিবসের স্ফিংস নামক রাক্ষস যুবরাজ ইডিপাসকে ধাঁধাটি জিজ্ঞেস করেছিল এবং ইডিপাস ধাঁধাটির উত্তর দিলে সে পর্বত থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যায়। ধাঁধাটির প্রাচীন পাঠ—

“Four feet it has in the morning
Yet first movement is a lacking
With about mid day
He can manage much better
Though he gets at nightfall three
He moves but soft and slow

Ans— human being”

বাংলায় প্রচলিত ধাঁধাটি হল—

“সকাল বেলা চার পায়ে হাঁটে
দুপুরে দুই পায়ে হাঁটে
বিকাল বেলায় তিন পায়ে হাঁটে
দেশে চলে বাবাজি”—

এর উত্তর ‘মানুষ’

বিশ্বের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেদের ঘরের দরজায় কড়া নাড়লে দেখতে পাব, আমাদের স্বীকৃত প্রাচীন বাংলা সাহিত্য চর্যাপদে ধাঁধার বীজ কীভাবে নিহিত রয়েছে। চর্যার ভাষা সন্ধ্যা, হেঁয়ালিপূর্ণ—

“দুলি দুহি পিটা ধরন না জাই।
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাই।।

দিবসহি বহুড়ি কাউহি ডর ভাই।
রাতি হইলে কামরু জাই।।”

অর্থাৎ কচ্ছপ দুহিয়া ভাঁড়ে ধরা যায় না। গাছের তেঁতুল কুমিরে খায়।… দিনের বেলায় বউটি কাক দেখেও ভয় পায়। রাত হলে সে কামরূপ যায়। পূর্বোক্ত ‘কচ্ছপ’ ‘কুমীর’ এবং ‘বউ’টি অধর্মচারীর প্রতীক। এভাবে ‘গোরক্ষবিজয়’, ‘চণ্ডীমঙ্গল’, ‘ধর্মমঙ্গল’ সমস্ত প্রাচীন গ্রন্থে আমরা ধোঁয়াশাপূর্ণ ভাষার ব্যবহার দেখতে পাই।
সাহিত্যে এইরকম বা এর চেয়ে একটু সহজবোধ্য ধাঁধার প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই।

“বিধাতা নির্মাণ ঘরে নাহিক দুয়ার
তাহাতে পুরুষ এক বইসে নিরাহার
যখন পুরুষবর হয় বলবান
বিধাতার সৃজন ঘর করে খান খান।।”

উত্তর— ডিম

এই পর্যন্ত এসে অনেকেই একটু থমকে যাবেন। এতো বেশ খটোমটো! ঠিক, সে কারণেই লোকপ্রিয় নয় হয়তো। এই প্যাঁচানো সাহিত্যের কথা ক’জনইবা শুনছে! তাই তো মানুষ আদর করে নিয়েছে সহজ সুরে, সহজ কথায় বলা এই ধাঁধাগুলিকে।

“একটুখানি ঘরে
চুনকাম করে।”

“জন্ম যখন পাই
আমার নজর নাই।”

দুই ক্ষেত্রেই উত্তর ডিম। এইখানেই সাহিত্য আর লোকজীবনের লড়াই শুরু। কতটা আয়াসে লোকপ্রিয় হওয়া যায়, তার সাধনা যেন! পৌঁছে যাওয়া আদি থেকে আদিমতায়। আমাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে আদি সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক কৌম সমাজ। সেই সমাজের মানুষজন যাদের মধ্যে সাঁওতালদের স্থান অগ্রগণ্য, তাদের সংস্কৃতি ভারতবর্ষের মূল ইতিহাসের লৌকিক সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রবাহ। যেহেতু ধাঁধার বিষয়বস্তু নির্বাচনে জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক জীবনাচরণগত বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে, স্বভাবতই সাঁওতালি হেঁয়ালিগুলো বিশ্লেষণ করলে আমাদের জীবন চেতনার জাগরণ ঘটবে। বাংলার কৃষিকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীর মূল বৈশিষ্ট্য জানা যাবে। সমাজতত্ত্বের দিক থেকে যার মূল্য অনস্বীকার্য।
আদিবাসী বা কৌম সমাজ চিরকালই তথাকথিত শিক্ষিত ট্যাগওয়ালা মানুষের কাছে কৌতূহলের। কখনওবা কৌতুকের। আদিবাসীদের প্রধান সাঁওতাল গোষ্ঠীর গোত্র বিভাগ রয়েছে— হাঁসদা, সরেন, মুর্মু, মান্ডি, বাসকে, বেসরা, হেমব্রম, পাউরিয়া, চঁড়ে, বেদেয়া এদের যে-কোনো উৎসব-অনুষ্ঠান বিয়ে-শাদীতে বসে নাচ-গানের আসর, ধাঁধার আসর।
এই আসরগুলো সাধারণত আখড়া। মজলিস কিংবা সন্ধ্যা আসরে এগুলি জমে ওঠে। ধাঁধা সাঁওতাল জীবনের বিনোদনের একটা উপায়। ধাঁধার সাঁওতালি প্রতিশব্দ ‘কুদুম’। সাঁওতালরা বলে চিলচিল হেঁয়ালি। তাদের ধারণা চিল যেমন কোনো কিছুর উপর ছোঁ মারে। হেঁয়ালি সেরকম মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির উপর ছোঁ মারে। এরকম একটা পরিস্থিতির সূচনা করে সাঁওতালি হেঁয়ালি বা কুদুম বলা হয়। আসর বসে। থাকে নারী-পুরুষ বয়স্কা, বাচ্চা এক কথায় ছেলে বুড়োর আসর।
সূর্য মুখ লুকিয়ে অন্ধকার নেমে আসে। অক্লান্ত ঝিঁঝি পোকার ডাক, হাড়িয়া মাদলের বোলে ঝিমঝিমে রাত নামে। গ্রামে মোড়লের বাড়িতে উঠোনে মাদুর পেতে আখড়া সাজানো হয়। কুপির আলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আদিবাসী মুখগুলো। আশপাশের গ্রাম থেকে আদিবাসী মানুষদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। আসর শুরু করে গ্রামের মোড়ল। কড়ায়া ভাষায় মোড়ল একটি কুদুম ছুঁড়ে দেন।

“কুদুমরে কুড়িৎ কুড়িৎ
রাপুৎওড়ারে কঁ কু ফাদাফুদো
কানা চেৎ”

অন্য গোত্রের চটপটে কেউ উত্তর দিয়ে বসে— ‘খজোরিয়াতা’

অর্থাৎ মা গেছে ছোটোকে বড়ো করতে— ছোটো ছোটো চাল ফুটে সাদা সাদা বড়ো মুড়ি হয়। সেই মুড়িভাজার কথা এখানে বলা হয়েছে। এই উত্তর পেয়ে একটু দমে যান মোড়ল। ভেবে চিনতে আরেকটু কড়া ধাঁধা বলে চলেন—

“কুদুমরে কুড়িৎ কুড়িৎ
মিতটাং বুড়হি সেতা
ক আকান সে কো উমেয়া চলহৌ।”

নাহ, এটার উত্তর কেউ পারে না। মনে মনে হাসেন মোড়ল, খুব তাচ্ছিল্যের সাথে জবাব দেন, ‘এক যে বুড়ি তার তিন মাথা’ অর্থাৎ উনুন
বড্ড সম্মানে লাগে পাশের গ্রামের মোড়ল ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের। কিছু না পেয়ে একটা সাঁওতালি গান ধরেন জমিয়ে। অন্য গ্রামের ঝিমোতে থাকা মোড়ল গান শুনে নড়েচড়ে বসেন। অতঃপর আসরে ছুঁড়ে দেন একটি ধাঁধা—

“কুদুমরে কুড়িৎ কুড়িৎ
রাকো বিররে হেদে ডাংরায় আতিঞ্চা
হয় ভান্ডো জখান দ দারেরয় হাড়ুপকঃ কয়া”
বাঙলাটি হল:

“কাল কাসুন্দার বনে কালো হরিণ চলে
দশ পেয়াদায় ধরে দুই পেয়াদায় মারে।” অর্থাৎ উকুন

মহিলাদের মধ্যে হাসির হুল্লোড় পড়ে। এ ওকে গা ঠেলাঠেলি করে উত্তর দেয়। সেইসাথে মিচকে হেসে কোনো বয়ঃবৃদ্ধা আরেকটি ধাঁধা বলে—

“কুদুমরে কুড়িৎ কুড়িৎ
উমকো সাহিচ মামা
হড়ম পেরেচ জামা—”

পেঁয়াজ নামক অতি আবশ্যক রান্নাশালের সবজিটির কথা বলা হয়েছে।
একটুখানি মামা/তার গা ভর্তি জামা এরকমই সে ব্যাখ্যা।

বাড়তি রাতের সাথে ধাঁধার আসর জমে ওঠে। মাঝে মধ্যে হাড়িয়া খেয়ে নেন ক্লান্ত মানুষগুলি। তখনই নেশা তড়বড়িয়ে ছোটে। সরেন গোষ্ঠীর একজন বলে ওঠে—
‘সিংহ রাপারাপা/নুউমি রাপারাপা/আসুন্ধি লেইমে কুড়ি/কুদুম কুড়িৎ—’ যার অর্থ দিনে পাখা খোলা, রাতে পাখা খোলা। অন্য গ্রামের একদল হইহই করে বলে উঠল ‘বাকাডুলি’ অর্থাৎ ফড়িং। যে-মোড়ল আসর শুরু করেছিল, কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে আরও কড়া একটি ধাঁধা দেয়—

‘কুদুমরে কুড়িৎ কুড়িৎ
ভোঁ ভোঁয় রাগা,
তেরম দয় বাংকানা
হটঃ করে পয়তা তায়
বামরে দয় বাংকানা—

ভোঁ ভোঁ করে ভোমরা নই/গলায় পৈতে বাউন নই—’ এরম জিনিস হল চরকা

এভাবেই অতিক্ষুদ্র জীবনাচরণের জিনিসগুলি, প্রকৃতি, জীবজগৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র সাঁওতালি ধাঁধার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। বিশেষ দ্রষ্টব্য যে-সাঁওতালি ধাঁধার শুরুতেই প্রায় ক্ষেত্রে ‘কুদুম রে কুরিৎ কুরিৎ’ ব্যবহার হয়। সন্ধ্যার মৌতাত জমে ওঠে ধাঁধার সুরে। সে-সুর মিত্রাক্ষর, অমিত্রাক্ষর গদ্য পদ্য যে-কোনো প্রকারে এবং দু’ছত্র, তিনছত্র, চারছত্র হতে পারে। অধিকাংশ হেঁয়ালিই তাদের কাছে সংসার জীবনের অভিজ্ঞতার নির্যাস।
এইসবের মধ্যেই সাঁওতাল সমাজ, জীবন প্রবাহ ও জাতির মনঃপ্রকৃতির নিখুঁত চিত্র পরিস্ফুট। এইরকম রাতের আনন্দই ভুলিয়ে দেয় দিনের চির চেনা দুঃখগুলিকে। নাচ-গান, ধাঁধার ছন্দ তাদের জীবনে আনে নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস। তবে দুঃখের বিষয় একটাই যে, জীবিকার তাগিদে আদিবাসী নারী পুরুষও আজকাল খুব ব্যস্ত। সে-কারণে ধাঁধার আসর প্রায় বসে না বললেই চলে। এছাড়াও যে-সব ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত তারা ধাঁধাগুলির বিশেষ খোঁজখবর রাখে না, খুব একটা আগ্রহীও নয়।

Spread the love

8 Comments

  • বাপরে, এতো দুর্দান্ত ডেডিকেটেড লেখা,

    debiprasad Batabyal,
    • ধন্যবাদ দাদা

      Falguni Ghosh,
  • দুর্দান্ত লেখা। ধাঁধার মতো একটা জিনিস নিতে এতো মনোজ্ঞ একটা লেখা লেখা যায় তাতেই অবাক হয়ে যাচ্ছি। লেখিকাকে কুর্ণিশ !!

    অতনু দে,
    • দাদা, উৎসাহ পেলাম

      Falguni Ghosh,
  • ওরে বাবা!
    ধাঁধার গোলকধাঁধায় একচক্কর দিয়ে রীতিমতো চক্কর খাচ্ছি।
    এমন একটা বিষয় যে লেখার উপজীব্য হ’তে পারে সেটাই কল্পনাতীত তার ওপর এমন গবেষণাধর্মী আখ্যান চমকে দিল।
    ধাঁধা তৈরীর মত সেটাকে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ (dissect) করার মধ্যেও রয়েছে প্রচন্ড বুদ্ধিমত্তা আর লৌকিক আচার সম্পর্কে কান্ডজ্ঞান আর সেটি যদি প্রবন্ধের বিষয় হয়, স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে বিভিন্ন ভাষার মুখের কথা ( dielectric ) সম্পর্কেও অভিজ্ঞান আবশ্যি।

    ‘পাগোল ছাড়ো পা’ র কেন আর কিভাবে পাগলকে পা বাদ দিয়ে কল্পনা করবো সেই ধাঁধা স্কুল পর্বে খুব জটিল ছিল, মাষ্টারমশাই বুঝিয়ে দেওয়ার আগে সেটা নিয়ে বেস একপ্রস্থ জলঘোলা হ’য়েছিল কারণ ‘এডভেঞ্চার’ তখনও চেনা বনজঙ্গলের আনাচে-কানাচেতেই সীমাবদ্ধ ছিল ‘ঈশান বটের কোল’ ঘেঁষে দক্ষিণে যাওয়ার পথের হদিস অধরা ছিল,আজ ধাঁধার ঠিকুজি কুলুজী র এমন রসম্ভর আলাপের স্বাদ সেগুলিকে আবার নতুনভাবে রসেবশে হাজির করছে।

    প্রসঙ্গতঃঃ, সাঁওতালি ভাষায় এতগুলো ধাঁধার পরিবেশন আর তার মমোর্ধার দেখে জানতে ইচ্ছে হচ্ছে ভাষাটিও কি বর্তমানে লেখিকার চর্চা –গবেষণার অঙ্গ!

    বুদ্ধদেব রায়,
    • আজ্ঞে। সাঁওতালি ভাষা জানি না দাদা

      Falguni Ghosh,
  • অসাধারণ হয়েছে, কত তথ্য জানতে পারলাম।

    AninditaDas,
    • থ্যানকু

      Falguni Ghosh,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *