Categories
প্রবন্ধ

গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ও গান

“তুই
ঘুমের মধ্যে জলভরা মেঘ, জাগরণে জন্মভূমির মাটি”

আমাদের, তথাসময়ের তরুণদের কাছের মানুষ বীরেনদা’র আজ শততম জন্মদিন। শতায়ু-প্রবীণ কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এখনো নবীন, টগবগে যুবক, এখনো প্রেমিক, এখনো প্রতিবাদে চনমনে।

১৯২০ সালের দোসরা সেপ্টেম্বর অবিভক্ত বাংলাদেশের ঢাকায় জন্ম। একাদিক্রমে চারটি দশক ধরে কলকাতার রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই-এর সাক্ষী থেকেছেন, ক্রোধে ফুঁসেছেন। তাঁর কবিতায় তিনি এঁকেছেন সেই আন্দোলিত সময়কে।

গান: ১

সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের গান

আমি তাঁর কাছে প্রথম যাই ১৯৭৭সালে আমার পত্রিকার জন্য কবিতা চাইতে। চিঠিপত্রে অবরে সবরে যোগাযোগ ছিল, কিন্তু ১৯৭৯ সালে যাদবপুরে ছাত্রাবস্থায় কোনো কোনো শনিবারের বিকেলে তাঁর ঢাকুরিয়া স্টেশন রোডের বাড়িতে চলে যেতাম। বাইরের ঘরে তক্তপোশে বসে গল্প— যার কেন্দ্রে থাকত ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ, প্রতিবাদী আন্দোলন আর অবশ্যই কবিতা।

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মানে কবিতা, অবশ্যই! কিন্তু, আমার স্মরণ-আবহে থেকে যাবে কিছু গানও। বাম রাজনৈতিক বীক্ষার অথবা এজিট-প্রপের কবি হিসেবে তাঁর কবিতায় গীতিধর্মিতার উদ্ভাস অনুভব করতে পেরেছিলেন বাংলার অসামান্য সঙ্গীতকারেরা। কবির প্রতি শ্রদ্ধায় আর তাঁর কবিতার প্রতি তন্ময় প্রযত্নে তাঁরা কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় সুরারোপ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশন করতেন/করেন সেই সব গান। ভিন্ন প্রথার সেই সব সুরকারদের তালিকায় রয়েছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, কালী দাশগুপ্ত, অজিত পাণ্ডে, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, বিনয় চক্রবর্তী, বিপুল চক্রবর্তী প্রমুখ অতি পরিচিত সুরকারবৃন্দ।

গান: ২

পাথরে পাথরে নাচে আগুন

গানের কথায় মনে পড়ে যায় তাঁর প্রতিবাদী কবিতার সেই অমোঘ পঙক্তিগুলো:

“কেউ কারোকে রাস্তা ছেড়ে দেয় না, যতদিন এই
পৃথিবীতে গান থাকে,
গানের মানুষ থাকে, স্বপ্ন থাকে।”

— তেজোদৃপ্ত এই কবির বুকের মাঝে সুরের খেলা অনুভব করতে কষ্ট হয় না।

কবির শতবার্ষিক পরিক্রমায় অনেক আলোচনা হবে তাঁর যাপন নিয়ে, কবিতার চলন নিয়ে, তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সুকৃতি নিয়ে। এই অবসরে আমরা দেখে নিতে পারি আমাদের প্রিয় কবির কবিতায় কিভাবে গান এসে উঁকি দেয়, কীভাবে একেকটি কবিতা অসামান্য জনপ্রিয় গান হয়ে উঠেছিল! যেমন, ‘একটা পৃথিবী চাই মায়ের আঁচলের মত’ কবিতাটি অজিত পাণ্ডের গানে পৃথক অস্তিত্বে সমুজ্জ্বল।

গান: ৩

এমন একটা পৃথিবী চাই

“প্রেমের গান গাইতে আমাদের গলা কেঁপে যায়,
আপনি আমাদের গান শেখান”

— এমন অসামান্য আকুতি শোনা যায় যে কবির কলমে, তিনি জানেন প্রেম আর প্রকৃতি আর মানুষ যতদিন এই পৃথিবীকে চালনা করবেন ততদিন এই বিশ্বে গান রণিত হবে। তিনি তাই বোধ হয় কলকাতার রাতের আকাশ থেকে হারিয়ে যাওয়া জোনাকির সন্ধানেও নিবিষ্ট থাকেন।

(উল্লেখ থাকুক যে, বাঙলা সংগীত জগতে দারুণ এক শিল্পীর সঙ্গলাভে বঞ্চিত থেকে গেলেও হিমিকা দাশগুপ্তের গাওয়া “এক জোনাকি” গানটা আমার স্মৃতিকে আন্দোলিত করে। কিন্তু ইউটিউব খুঁজে হিমিকার গানটা পেলাম না, পেলাম জনৈকা কনক চাপা’র সুরেলা ও যথাযথভাবে গাওয়া গান।

গান: ৪

এক জোনাকি দুই জোনাকি

বীরেন চট্টোপাধ্যায় সেই কবি যিনি স্বাধীন ভারতে দেশীয় শাসকদের নষ্টামিতে ক্রোধী হয়েছেন, জনগণের সাথে রাজপথে ময়দানে হেঁটেছেন। দু’-দু’বার খাদ্যসঙ্কটের শিকার হয়েছেন এবং খাদ্য আন্দোলনে অগ্রসেনা থেকেছেন। সারা জীবন তাঁকে সেই দিনগুলো তাড়া করে বেড়িয়েছে আর তিনি বিভোর থেকেছেন ভাতের গন্ধে!

“আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে
কারা যেন আজো ভাত রাঁধে
ভাত বাড়ে, ভাত খায়
আর আমরা সারারাত জেগে থাকি
আশ্চর্য ভাতের গন্ধে
প্রার্থনায়, সারা রাত”

শাসক শুধু মুখের ভাত যোগাতেই ব্যর্থ এমন নয়, খাদ্যে বিষ প্রয়োগেও সমান উদ্যত থাকত। কবির স্বাভাবিক ক্রোধের উচ্চারণ শোনা যায়:

“সে অন্নে যে বিষ দেয় কিংবা তাকে কাড়ে
ধ্বংস করো ধ্বংস করো ধ্বংস করো তারে”

নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রায়োগিক কিছু বিচ্যুতি বিষয়ে দ্বিমত জানালেও নকশালদের প্রতি তাঁর সমর্থনে কুণ্ঠা ছিল না। বিপুল চক্রবর্তীর এই গান যেন সেকথাই শোনায়।

গান: ৫

বলো ভুলতে কী পারি

“লাল টুকটুকে নিশান ছিল
হঠাত দেখি, শ্বেত কবুতর
উড়ছে ঊর্ধ্বে, আরও ঊর্ধ্বে
ভুখ মিছিলের মাথার ওপর”

লাল পতাকার প্রতি তাঁর এক অম্লান আনুগত্য ছিল। বন্দিমুক্তি আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকেছেন তিনি। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের এই গানেও লাল পতাকার প্রতি সম্মানের সেই সাক্ষ্যই বহন করে।

গান: ৬

বাইরে এখন হাজার হাজার লাল পতাকা

“কফিগুলিকে ভাজা হবে, রোদে শুকুতে হবে, তারপর গুঁড়ো করতে হবে
যতক্ষণ না তাদের গায়ের রঙ হবে আফ্রিকার কুলির গায়ের রঙে
ঘোর কৃষ্ণবর্ণ।”

আমি আমার বাগানে কফি গাছগুলোর মাঝে দাঁড়ালে অবিকল শুনতে পাই কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠে বহুশ্রুত আবৃত্তি। নিগ্রো কবি আন্তোনিও জাসিনটো-র লেখা ‘সেই মানুষটি, যে ফসল ফলিয়েছিল।’

গান: ৭

কে সেই মানুষটি?

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পূর্বোক্ত কবিতাটি সহ ৫ মহাদেশের বেশ কিছু কবিতার অনুবাদ করেছিলেন, যাঁর অন্তর্ভুক্ত এই কবিতাটিতে সুর দিয়েছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়।

গান: ৮

ছোকড়া চাঁদ

তাঁর গানের রেশ কানে আর মনে নিয়ে এই লেখা শেষ করার সময় বলি আমার প্রিয় কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই অভীপ্সাই যেন চিরসত্য হয়:

“চারিদিকে নবজন্ম, দেশে দেশে শঙ্খ বাজে
দিকে দিকে শোনা যায় মানুষের গান”!

গান : ৯

মৌসুমী ভৌমিকের গান

3 replies on “গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ”

সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা। পড়ে এবং জেনে ভালো লাগল।

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিবাদী কবিতার পাশে যে আরেকটি উজ্জ্বল দিক রয়েছে তার এই প্রবন্ধে জানা সম্ভব হল। অনালোচিত এই দিকটা কবির জন্ম শতবর্ষে উঠে এল ।

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিবাদী কবিতার কথা সবাই জানে। কিন্তু তাঁর গানও এক উজ্জ্বল দিক। এই সম্পর্কে আলোচনা হয় না। কবির জন্মশতবর্ষে এই প্রবন্ধটি একটি মূল্যবান সংযোজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *