মলয় রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ

মাতৃত্বের সংজ্ঞায় কুয়াশা

মুম্বাইয়ে প্রতিদিনই সংবাদপত্রে পড়ি, একটি নবজাতককে সমুদ্রের ধারে বা ট্রেনলাইনের পাশে বা বাইপাসের ভেতরে, যে জায়গাগুলো রাতের বেলায় অন্ধকার, কাপড়ে মোড়া পাওয়া গেছে।
এক বা দুই দিনের সেই শিশু ছেলেও হতে পারে বা মেয়েও হতে পারে।
চিনের মতন বা বহু খ্রিস্টধর্মী দেশের গির্জার মতন, আমাদের দেশে অবাঞ্ছিত, অপ্রার্থিত, অনাবশ্যক সন্তানকে লুকিয়ে রেখে যাবার বন্দোবস্ত নেই, যে সন্তানটিকে রাষ্ট্র বা গীর্জা পালন করার দায়িত্ব নেবে।
সন্তান প্রসব করার পরেই মা, এবং তার পরিবারের লোকেরা বা যে পুরুষ তার গর্ভে বাচ্চা আনার জন্য দায়ি, সে ফেলে পালিয়েছে। কোথাও কোথাও সিসিটিভি দেখে পুলিশ শিশুটির মাকে খুঁজে পেলেও, মা অস্বীকার করেন যে শিশুটি তাঁর; ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন মনে করে না পুলিশ কর্তৃপক্ষ, তার জন্য টাকা আর সময়ের অপচয় মনে করে, তাই শিশুটির জায়গা হয় অনাথালয়ে; একটু বড়ো হলে সে যায় অ্যাডপশান সেন্টারে।
সংবাদপত্রে আরেক ধরণের খবরও প্রায়ই পড়ি। সরকারি হাসপাতাল থেকে সদ্যপ্রসূত শিশু চুরি, সে শিশু ছেলেও হতে পারে আবার মেয়েও হতে পারে। কখনও-কখনও, যারা চুরি করে, তাদের পুলিশ ধরে জানতে পারে যে বন্ধ্যা কোনো নারীর জন্যে চুরি করা হয়েছে, শিশুটিকে বিক্রি করা হবে ।
যে মায়েরা শিশু ফেলে পালায় আর যে নারীরা শিশুর খোঁজে চোরেদের কাজে লাগায় তাদের যোগাযোগের কোনো ব্যবস্হা নেই, অ্যাডপশানের নানা আইনি কড়াকড়ি আছে, সেগুলো পুরো করা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়, আবার তারা এমনই গরিব যে গর্ভ ভাড়া করার আর্থিক সামর্থ নেই। পুলিশ দেখেছে যে কয়েকটা ক্ষেত্রে ধর্মের বাধ্যবাধকতার জন্য শিশু চুরি করানো হয়েছে, যেহেতু ধর্মে গর্ভ ভাড়া করার অনুমোদন নেই। সে ক্ষেত্রে হিন্দু মায়ের শিশু চলে যায় কোনো মুসলমান পরিবারে ; মুসলমান শিশু চলে যায় ক্যাথলিক পরিবারে। সমাজের তলায় সত্যিই মনমোহন দেশাইয়ের ফিল্ম কাজ করতে থাকে, তবে ফিল্মের মতন হারিয়ে যাওয়া শিশুদের সাধারণত পাওয়া আর যায় না।
গর্ভনিরোধের ওষুধের কারণে মা হতে চান না অনেকে, যাঁরা উঁচু পদে চাকরি করেন বলে সময় নেই, কিংবা দেহের কাঠামো খারাপ হয়ে যাবার ভয়ে। রাতে সঙ্গম সকালে বড়ি ওষুধের কারণে, একাধিক পুরুষের সঙ্গে সেক্স করার সুবিধা হয়ে গেছে, মাতৃত্বের চেয়ে সেক্স করাটা বেশি আনন্দদায়ক তাঁদের কাছে। তামিলনাডুতে এই ওষুধ নিষিদ্ধ বলে যুবতীরা প্রথম মাসিক বন্ধ হলেই গর্ভপাতের ওষুধ খেয়ে নিচ্ছেন আর জরায়ুর জটিল রোগ ডেকে আনছেন যা সারাবার জন্য শল্যচিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে, তাঁরা মা হতে চান না, যৌনতা উপভোগ করতে চান। আঠারো-উনিশ শতকে দম্পতিদের আট-দশটা করে সন্তান হতো, তাও যৌনতা উপভোগের দরুণ, মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব ফলাবার জন্য নয় ।

দুই
আধুনিক জীবনের খাওয়া-দাওয়া ও জীবনযাত্রার কারণে, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায়, অথবা জন্মগত কারণে কোনো-কোনো দম্পতি একবছর অবিরাম সঙ্গমের পরও যদি সন্তান পেতে অক্ষম হন তাহলে দু-জনের একজনের শারীরিক সমস্যার কারণে তা ঘটে। সাধারণত স্বামীর শুক্রাণু যথেষ্ঠ সংখ্যায় না থাকলে এই সমস্যা দেখা দ্যায়। সে ক্ষেত্রে স্বামীর শুক্রাণু আর স্ত্রীর ডিম্বাণুকে স্ত্রীর দেহের বাইরে নিষেকের মাধ্যমে ভ্রূণ তৈরি করে স্ত্রীর জরায়ুতে স্হাপন করা হয়। স্বামীর শুক্রাণু যদি সন্তান উৎপাদনের উপযোগী না হয় তাহলে ফার্টিলিটি ব্যাংকে অন্যের জমা দেয়া শুক্রাণুকে স্ত্রীর ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষেক করে স্ত্রীর জরায়ুতে স্হাপন করা হয়। এমন নয় যা একবার স্হাপন করলেই তা সফল হবে, সাধারণত কয়েকবার প্রয়াস করার পর সফলতা আসে। প্রতিবারের জন্য লাখ থেকে দুলাখ টাকা খরচ হয়।
এই প্রক্রিয়াটি, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশান নামে খ্যাত, ভারতে যাকে বলে হয় টেস্ট টিউব বেবি প্রক্রিয়া, ১৯৭৮ সালে এর সূত্রপাত, লুইজি ব্রাউন নামে একটি শিশুর জন্মে। ভারতেও ওই একই বছরে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর জন্ম হয়েছিল। দম্পতিদের মাঝে স্ত্রীর শরীরে জরায়ুর সমস্যা না থাকলে আইভিএফ সন্তান পেতে অসুবিধা হয় না। ভারতে দেখা গেছে এই ধরণের ক্ষেত্রে পুরুষের মনে প্রভাব পড়ে, শিশুটির সঙ্গে দূরত্ব গড়ে ওঠে; স্ত্রীকে অবস্হার সামাল দিতে হয় ।
টেস্ট টিউবে ভ্রুণ তৈরি করা আইভিএফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অথবা গর্ভ ভাড়া করে সন্তান পাওয়া, যাকে ইংরেজিতে বলা হয়েছে, সারোগেসি, তার খরচ প্রচুর, তা যোগানো গরিবদের পক্ষে সম্ভব নয়। কতো রকমের মাতৃত্বের দেখা পাচ্ছি আমরা। এক মা তার সদ্যপ্রসূত বাচ্চাকে ফেলে দিয়ে মাতৃত্বের সব দায় থেকে মুক্ত হতে চাইছেন, হয়তো বিয়ে করে নতুন জীবন চান কিংবা আর সন্তানের খরচ পোষাবার মতন আর্থিক অবস্হা নয়। এক মা বাচ্চা চুরি করিয়ে মা হতে চাইছেন। আরেক হবু মা বাচ্চা পাবার জন্যে বিদেশ থেকে পাড়ি মারছেন ভারতে কিংবা ফিলিপিনসে।

তিন
জরায়ু না থাকলে বা জরায়ু ত্রুটিগ্রস্ত হলে অন্যের গর্ভে ভ্রুণ স্হাপন করে নয় মাস বড়ো করাকে বলা হয় সারোগেসি। সারোগেসির জন্য প্রয়োজন একজন সক্ষম যুবতীর সুস্হ ত্রুটিহীন জরায়ু। স্বামী-স্ত্রীর দেহের বাইরে তাদের শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুকে ফাটফিলাইজ করে স্ত্রীর গর্ভে স্হাপন করা হয়, তাকে বলে হয়েছে ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশান পদ্ধতি। আরেকটি পদ্ধতি হল ইনট্রা ইউটেরাইন পদ্ধতি, স্ত্রীর দেহে যখন ডিম্বাণু তৈরি হচ্ছে কিংবা স্ত্রীর জরায়ু যদি ত্রুটিযুক্ত হয় তাহলে অন্য কোনো নারীর দেহে ডিম্বাণু গড়ে ওঠার সময়ে চিকিৎসকরা স্বামীর শুক্রাণু বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় প্রবিষ্ট করান। দুটি ক্ষেত্রেই, তৃতীয় একজন নারীর গর্ভ ব্যবহার করলে তা সারোগেসি হয়ে দাঁড়ায় ।
যিনি ডিম্বাণু দিচ্ছেন তিনি সন্তানের জেনেটিক মা। যাঁর দেহে সন্তান নয় মাস বড়ো হচ্ছে তিনি সন্তানের বায়োলজিকাল মা। শুক্রাণু প্রদানকারী হলেন সন্তানটির জেনেটিক বাবা। যে সন্তান জন্ম নিলো সে জেনেটিক মায়ের ডিম্বাণু ছাড়া অন্য কোনো দেহিক সংস্পর্শ পায় না। জন্মের পরই তাকে সারোগেট মায়ের পাশ থেকে সরিয়ে নেয়া হয় যাতে কোনোরকম আবেগি মাতৃত্বের টান না গড়ে ওঠে।
এই নতুন মা এসেছেন নতুন সংজ্ঞা নিয়ে। শিশুটি তাঁর গর্ভজাত নয়, সে সারোগেট শিশু, শিশুটিকে গর্ভে ধারণ করেছেন ভাড়া-করা মা, বা সারোগেট মা। শিশুটিকে তিনি নিজের দুধও খাওয়াবেন না। সারোগেট মা বলতে প্রতিটি ক্ষেত্রে টাকার লেনদেন বোঝায় না। নিজের মেয়ের যদি বাচ্চা না হয় তাহলে তার বাচ্চার জন্যে মেয়ের মা নিজের গর্ভ ব্যবহার করতে পারেন, অন্য আত্মীয়ারা পারেন, বান্ধবীরা পারেন। তাই দেখা যায় যে ষাট বছর বয়সেও মা হচ্ছেন কেউ-কেউ।
সমকামের স্বীকৃতির পর দুজন পুরুষ একটি শিশুর মা হতে পারেন, দুজনের মধ্যে একজনের শুক্রকে ডিম্বাণু ব্যাংকে জমা রাখা ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষেক করে। দুজন সমকামী মা একইভাবে একজনের ডিম্বাণুর সঙ্গে শুক্রাণু ব্যাংকে জমা রাখা শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেক করে শিশু পেতে পারেন একটি ভাড়া করা গর্ভে।
ভিকি ডোনার ফিল্মে দেখানো হয়েছে শুক্রাণু বিক্রির ঘটনা। একইভাবে ডিম্বাণুও বিক্রি হয়। শুক্রাণু বিক্রি হয় কম দামে, বর্তমানে ভারতে যারা শুক্রাণু বিক্রি করে তারা হাজার-দুহাজার টাকা পায় প্রতিবারের জন্য। কিন্তু ডিম্বাণু যাঁরা বিক্রি করেন তাঁরা প্রতিবারের জন্য কুড়ি থেকে তিরিশ হাজার টাকা পান; ডিম্বাণুকে বের করে আনতে হয়, এবং প্রতিবার একটিই ডিম্বাণু পাওয়া যায়, শুক্রাণুর মতন লক্ষ-লক্ষ নয়। তারা ডিম্বাণু বের করার প্রক্রিয়াটি, যিনি ডিম্বাণু দিচ্ছেন, তাঁর পক্ষে শারীরিকভাবে বেশ যন্ত্রণাদায়ক, পুরুষের মতন তা আনন্দদায়ক ব্যাপার নয়।
মাতৃত্ব নিয়ে যে আবেগি কথাবার্তা এতোকাল বলা হয়েছে, লেখা হয়েছে, সেই পরিচিতিতে ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞান ।

চার
ভারতবর্ষে সারোগেসির বেশ বড়ো বাজার ছিল, কিছুদিন আগে পর্যন্ত, বিশেষ করে গুজরাটের আনন্দ শহরে, যেখানে ‘আমুল’ দুধ সমবায় সমিতির জন্ম ও বিস্তার। ক্ষেত্রসমীক্ষকদের ধারণা যে দুধ সমবায় সমিতির উপস্হিতির কারণে আনন্দের নারীরা গোরুর আর মোষের কৃত্রিম গর্ভসঞ্চারের সঙ্গে বহুকাল পরিচিত, এবং ব্যাপারটি প্রায় তাঁদের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গিয়েছে ; সেকারণে মানুষের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি ততো আকস্মিক হয়ে দেখা দেয়নি আনন্দ শহরে, যেমনটা অন্যান্য শহরে দেখা দিয়েছে। আনন্দ শহরের গরিব পরিবারের পুরুষরা দুধ সমবায়ের কাজে ব্যস্ত থাকেন ও তা থেকে যৎসামান্য রোজগার করেন; দরিদ্র পরিবারে পুরুষদের সঙ্গে মহিলারাও আয় বৃদ্ধির জন্যে গর্ভ ভাড়া দেয়া আরম্ভ করেছিলেন। আনন্দ শহরে সেকারণে সারোগেসি ক্লিনিকের আধিক্য। হিন্দু সংবাদপত্রের সমীক্ষকদের পোয়াতি মায়েরা বলেছেন যে তাঁরা একবার সারোগেট মা হয়ে যা রোজগার করেন, তাঁদের স্বামীরা সারা জীবন কাজ করেও তা রোজগার করতে পারবেন না।
সারোগেসি ক্লিনিকরা পনেরো থেকে কুড়ি লাখ টাকা চার্জ করে যা থেকে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা দেয়া হয় সারোগেট মাকে। সারোগেট মায়ের নয়মাসের চিকিৎসা ও খাওয়া-দাওয়ার খরচও ক্লিনিকই দ্যায়। ক্লিনিকগুলো সারোগেট মায়েদের জন্য পৃথক বাড়ি ভাড়া করে সেখানে তাদের রাখে। বাচ্চা হবার পর যাতে তাদের মনে মাতৃত্বের যাদু কাজ না করে তাই অবিরাম তারা মনস্তাত্বিকদের চিকিৎসাধীন থাকে।
২০১৫ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপীম কোর্ট একটি আদেশ জারি করে বলেছে যে কেবল ভারতীয় দম্পতি এবং কোনো দম্পতির একজন যদি ভারতীয় হন, তাহালে তাঁরাই কেবল গর্ভ ভাড়া করতে পারবেন। এই সারোগেট মায়েরা এবং সারোগেট ক্লিনিকগুলির সংস্হা সুপীম কোর্টকে অনুরোধ করেছে আদেশটি পুনরায় খতিয়ে দেখার জন্য, এবং তাঁদের বক্তব্য শোনার জন্য। ভারতের পার্লিয়ামেন্টে ২০১০ সাল থেকে এই বিষয়টি নিয়ে অ্যাসিসটেড রিপ্রোডাকটিভ টেকনোলজি বিল বিতর্কের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। ঝুলে থাকার কারণ সারোগেসি বাণিজ্য থেকে গুজরাটের রাজনীতিকদেরও আয় হচ্ছে।
ভারতে সারোগাসি বাণিজ্য ২০০২ সালে আরম্ভ হবার পর তা এখন ২.৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপর থেকে সারা ভারতে, বিশেষ করে গুজরাটে, গায়নোকলোজিস্ট ডাকতাররা সারোগেসি ক্লিনিক খোলাকে বেশি রোজগারের সুযোগ মনে করে ভারতে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন। ভারতে সারোগেসি অত্যন্ত সস্তা এবং চিকিৎসার বন্দোবস্তও ভালো বলে বিদেশি দম্পতিরা ভারতে আসা আরম্ভ করেন। ক্লিনিকগুলোও অন্যান্য দেশে এ-ব্যাপারে গ্রাহক দম্পতি যোগাড় করার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়া আরম্ভ করে। দেখা যায় যে সারোগেট মায়ের গর্ভ যাঁরা ভাড়া করছেন, তাঁদের শতকরা ৪৮% বিদেশী।
২০১০ সালে গর্ভ ভাড়া দেয়া নিয়ে বিতর্ক ভারতে আরম্ভ হয়েছিল বেবি মানজি য়ামাদার মামলার কারণে। যে জাপানি দম্পতি গর্ভ ভাড়া করেছিলেন তাঁরা শিশুটি জন্মাবার আগেই ডিভোর্স করে আলাদা হয়ে যান এবং জাপানি মহিলাটি বাচ্চাটিকে নিতে অস্বীকার করেন। শেষে বাচ্চাটিকে গ্রহণ করে জাপানে নিয়ে যান বাচ্চাটির ঠাকুমা।
২০০৮ সালে সারোগেট বাচ্চার নাগরিকতা নিয়ে গুজরাত হাইকোর্টে জান বালাজ মামলায় হাইকোর্ট জানায় যে এই বিষয়ে একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ভারত দ্বৈত নাগরিকতা স্বীকার করে না। জান বালাজ মামলায় এক দম্পতির জন্য জার্মাণ শুক্রাণুর সাহায্যে গুজরাতে একজন সারোগেট মা যমজ বাচ্চা প্রসব করেন। জার্মানিতে সারোগেট বাচ্চার নাগরিকতা স্বীকৃত নয়। শেষে জার্মানির সরকার ও ভারত সরকার বিষয়টি আলোচনা করে বাচ্চা দুটিকে জার্মানিতে যেতে/আনতে সন্মত হয়। প্রথমে বাচ্চা দুটিকে ভারত ‘ওভারসিজ সিটিজেন’ হিসাবে স্বীকৃতি দ্যায়। জার্মান দম্পতি জানান যে বাচ্চা দুটিকে তাঁরা দত্তক নেবেন।
সংসদে বিতর্কের পর আইনটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা-ই এখন দেখার। যতদিন তা পাশ না হচ্ছে ততোদিন সুপ্রিম কোর্টের নভেম্বর ২০১৫-এর আদেশ বহাল থাকবে।

পাঁচ
২০০৯ সালে ভারতীয় আইন কমিশন সারোগেসি বিষয়ক একটি নির্দেশিকা জারি করেছে, তার প্রধান বিন্দুগুলো এরকম :
১) শিশুর জন্মের জন্য যাঁর গর্ভ ভাড়া করা হবে তাঁর সঙ্গে একটি আইনি চুক্তি সই হবে, শিশু পেতে ইচ্ছুক দম্পতি ও ফারটিলিটি ক্লিনিকের যে মহিলা গর্ভ ভাড়া দিচ্ছেন, তাঁর স্বামীকে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সেই চুক্তিটিকে মেনে নিতে হবে। কৃত্রিম গর্ভসঞ্চারের জন্য এবং যতদিন না শিশুটি ভূমিষ্ঠ হচ্ছে, চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সারোগেট মাকে সন্তান পেতে ইচ্ছুক দম্পতিরা দেবেন। সন্তান, এক হোক বা একাধিক, সারোগেট মা ইচ্ছুক দম্পতির হাতে তুলে দেবেন। এই ব্যবস্হাটি কিন্তু বাণিজ্য করার দৃষ্টিকোণ থেকে হবে না।
২) যে আইনি চুক্তি হবে তাতে সারোগেট মায়ের সন্তান প্রসবের আগে ইচ্ছুক দম্পতিদের দুজনের বা একজনের মৃত্যু হলে, বা ডিভোর্স হলে, অথবা সন্তানটিকে তাঁরা নিতে অস্বীকার করলে, সারোগেট প্রক্রিয়ায় জন্মানো শিশুটির লালন-পালনের খরচ ওই দম্পতিকে দিতে হবে, তা জানিয়ে সাক্ষর করবেন ইচ্ছুক দম্পতি।
৩ ) আইনি চুক্তিটিতে সারোগেট মায়ের জীবন বীমা করানো সম্পর্কিত তথ্য দিতে হবে। বীমা অবশ্যই করাতে হবে এবং তার প্রিমিয়াম ইচ্ছুক দম্পতি দেবেন না ফার্টিলিটি ক্লিনিক দেবে তা স্পষ্ট করে দিতে হবে।
৪) দম্পতিদের দুজনের মধ্যে একজনকে ডিম্বাণু বা শুক্রাণু দিতে হবে, কেননা দুজনের একজনের সঙ্গে জৈবিক সম্পর্ক থাকলে শিশুটির প্রতি ভালোবাসা ও শিশুটির সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। অবিবাহিত অথবা দম্পতির একজন মৃত এমন অবস্হায় একজন নারী বা পুরুষ যদি সারোগেট শিশু চান, তাহলে তাঁকে নিজের ডিম্বাণু বা শুক্রাণু দিতে হবে, নয়তো শিশু অ্যাডপ্ট করা ছাড়া অন্য উপায় তাঁর নেই।
৫) সারোগেট শিশুটি যে ইচ্ছুক দম্পতির বৈধ সন্তান তার জন্য আইনি অনুমোদন থাকতে হবে।
৬) সারোগেট শিশুটির বার্থ সার্টিফিকেটে ইচ্ছুক দম্পতির দুজনের নামই থাকবে। অন্য কারো নাম থাকবে না।
৭) যিনি শুক্রাণু বা ডিম্বাণু দিচ্ছেন তাঁর এবং সারোগেট মায়ের পরিচয় গোপন রাখতে হবে।
৮) ছেলে শিশু চাই না মেয়ে শিশু চাই এরকম দাবি ইচ্ছুক দম্পতিরা করবেন না।
৯) স্বাস্হ্যের জটিলতার কারণে গর্ভপাতের প্রয়োজন দেখা দিলে তা করা হবে ১৯৭১ সালের মেডিকাল টারমিনেশান অফ প্রেগনেনসি আইনের আওতায়।

ছয়
এখন দেখার যে এই সন্তানেরা যুবক-যুবতী হবার পর কেমন আচরণ করে, সমাজ তার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক গড়ে তোলে, তার চরিত্রে কোনো প্রভাব পড়ে কিনা, সে তার জেনেটিক মায়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে কিনা। এখন তো সারোগেট শিশুরা ভারতে বয়ঃসন্ধির বেড়া পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছোয়নি।

মলয় রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই