মানস শেঠের প্রবন্ধ

‘ডিস্কো’: হারিয়ে যাওয়া সময় ফসিল

তখন বোধহয় ক্লাস সিক্স। থার্ড বেঞ্চে বসে সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক কষতে ব্যস্ত ক্লাসের ফার্স্ট বয়। চক হাতে বিজনবাবু। দুপুরের রোদটা চু-কিত্‌কিত্‌ খেলছে অঙ্কের বইয়ের সঙ্গে। ক্লাসে অঙ্ক পারলে বুকের ভেতর একটা আনন্দ ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। ফার্স্ট বয় ও বা ব্যতিক্রম হবে কেন। সেও অঙ্ক পারার আনন্দে হঠাৎই বলে উঠল ‘পক্যাও’। ব্যাস্‌, সমস্ত ক্লাস তখন হাঁ করে তাকিয়ে আছে অঙ্ক স্যার ও ফার্স্ট বয়ের মুখের দিকে। বিরাট কিছু হবার আগে একটা থমথমে ভাব। স্যার এগিয়ে এসে বললেন— ‘গোল্লায় যাবার পথটা কি এভাবেই শুরু করলে?’ ফার্স্ট বয় বলেই মারটা ছাড় থাকে বোধহয়। ক্লাস শেষের পর আমরা বলেছিলাম, ‘তুইও ‘পক্যাও’ বলিস।’
উত্তর নব্বই সময়ে এইরকম কিছু শব্দ চোরাস্রোতে থাবা বসিয়েছিল বাঙালি জীবনে অভিধান ঘেঁটে এইসবের অর্থ কস্মিনকালেও পাওয়া যায়নি। অবিভাবকদের সামনে উচ্চারণ করা ছিল নিষিদ্ধ পাপের মতো। বাঙালি আটের দশকে বড্ড নিস্তরঙ্গ জীবন পালন করত; গানের জগতে হৈমন্তিক দিনাবসান স্পষ্টতা লাভ করে স্থান করে দিচ্ছিল এমন সব নির্মিতির যাদের ‘গান’ তকমাটাই দিতে চাইত না অবিভাবকরা। বাইরের দুনিয়ার হাল হকিকত্‌ প্রবেশ করত সংবাদপত্রের আয়নায়। বোঝা যাচ্ছিল, ঢেউ উঠেছে সংস্কৃতির দরবারে। এইরকম এক বজ্র আঁটুনির মধ্যে ফস্কা গেরোর মতোই টুক করে ঢুকে পড়েছিল ‘ডিস্কো’ শব্দটি। শুধু কলকাতা নয়, মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে এই শব্দটি বেশ জাঁকিয়ে বসেছিল।

পশ্চিমের সংস্কৃতিকে এখন যতটা আপন করে নিতে পেরেছি, সেই ‘ডিস্কো’র সময় ততটা আপন হয়নি এই সংস্কৃতি। বাঙালি খোঁজারও চেষ্টা করেনি; শুধুমাত্র কৈশরে পা রাখা কিছুজনের মনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল অন-অভিধানিক কিছু শব্দ। আমজনতার সংস্কৃতি না হয়ে ওঠা ‘রক্‌ অ্যান্ড রোল’ বা ‘পপ্‌’ এর মতো ‘ডিস্কো’ কিন্তু ব্রাত্য থাকল না। এইসময় ‘হিপি কালচার’ বলে পশ্চিমী হাওয়া প্রবেশ করেছিল— যদিও ‘ভারতীয় হিপি’ বলে আদিকল্প সেই অর্থে নেই। আমরা জানতে চাইলাম না, ১৯৭০-এর পরবর্তী এই উতল হাওয়ার পিছনে পোস্ট ভিয়েতনাম সিন্ড্রোমের কোনো ভূমিকা আছে কিনা; জানার বাইরে থেকে গেল হিপি প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গ আর সাম্যবাদ নামক ইউটোপিয়ার উদ্বায়ীভবনের নীরব ইতিহাস। এখন যতটা আমরা বিদেশের সঙ্গীত শিল্পীর নাম জানি তখন কি জানতাম ক্যামেরুনের স্যাক্সোফন বাদক মানু দিবাঙ্গোর নাম? অথবা ‘স্যাটারডে নাইট ফিভার’ বা তার নায়ক জন ট্র্যাভোল্টার ইতিহাস? বোধহয় মাথা ঘামাবার প্রয়োজনও হয়নি।
বাঙালি তখন বিদেশি গান বলতে বুঝত শনিবারের দুপুরে লো ভল্যুমে চালিয়ে রাখা ‘মনের মতো গান আর মনে রাখা কথা’-র পরিসরে যদি শোনা যেত রানু মুখোপাধ্যায়ের ‘কুচকুচে কালো সে’— গানের সুরে অবিভাবকেরা বলে উঠত ‘এসব হল পপ্‌ গান’। ‘বিটলস্‌’ বা এলভিস বাঙালির ঘরে ঘরে প্রবেশ করেনি, ‘মহীনের ঘোড়া’ অথবা ‘নগর ফিলোমেল’ দু’চোখে দেখছে অন্যধারার সঙ্গীতভূমিতে বীজ রোপন করার স্বপ্ন। হাতে গোনা কয়েকজন বাঙালির বাড়িতে পাওয়া যেত পাশ্চাত্তের রেকর্ড। তারা জিন্স পরতেন এবং বছরে বা দেড় বছরে একবার নাপিতবাড়ি যেত। টেকনোলজির হাত ধরে পাইরেটেড ক্যাসেটের বাজারে বিক্রি বাড়ছিল ‘ফোরেন ক্যাসেটের— দামও কম আর কিছু কান অপেক্ষা করে বিদেশী স্বরের জন্য। অঞ্জন দত্তও তাই লিখে ফেললেন— ‘মাথার ভিতর ছিল এলভিস্‌ প্রেসলি, খাতার ভিতর তোমার নাম’।
একথা স্বীকার করে উপায় নেই যে, সিনেমার জগতে ১৯৮২ সাল হল এক মাইল ফলক। সেই ফলকটি পোঁতা হয়েছিল এক বাঙালিরই হাত ধরে— নাম মিঠুন চক্রবর্তী। অমিতাভ জামানার একজন অ্যাংরি ইয়ং ম্যান কীভাবে রাগ প্রকাশের ব্যাকরণ বদলে ফেললেন নাচে; সেই বৃত্তান্ত নিয়েই ‘ডিস্কো ডান্সার’। অবশ্য এর মাত্র দু’বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮০-তে ফিরোজ খানের ‘কুরবানি’-তে ঘটে যায় হুংকৃত বিপ্লব। ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব থাকুক না কেন, সেই সময়ে পাকিস্তানের পপ্‌ সিঙ্গার নাজিয়া হাসানের কন্ঠে গেয়ে ওঠা ‘আপ য্যায়সা কোই’ ভারতীয় সংগীত শ্রুতির কনভেনশনে এক ধাক্কা দিয়ে উঠল। ইলেকট্রনিক সাউন্ডস্কেপের সেই যাত্রারম্ভ। বোম্বাই সংগীতের সর্বজনমান্য ওয়েইং ঘরানার ছায়া যে পূর্বগামিনী হতে শুরু করেছে, তা বোঝা গিয়েছিল সেই সংগীত শুরুর ভোরবেলাতেই। বিড্ডু ঘরানাই এই ব্যাপারে পথিকৃৎ কিনা, সে-বিষয়ে সঙ্গীতজ্ঞরা আলোচনা করতেই পারেন। তবে, বিড্ডুই আমদানি করেন সেই ‘প্যকাউ’ শব্দটি। উচ্চারণ করার পথ ছিল বেশ কঠিন ধরনের।
পঞ্চদশী নাজিয়া ও তার ভাই জোহেবের ভারত বিজয় সম্ভবত ছিল ১৯৭১-এর ভারত-পাক সংঘাতের পর দুই দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে প্রথম ঝাঁকি। মেহেদি হাসানের বৈভব ও সুরের যাদুতে তখনও বাঙালি দূরে। গজল তরঙ্গে তখনই ভরেনি আকাশ বাতাস। বিড্ডু সুরকার ছিল ইংল্যান্ড প্রবাসী ভারতীয়, নাজিয়া-জোহেবও বহির্ভারতীয়। ‘আপ য্যায়সা কোই’-র পরিকল্পনা হয়েছিল সেই সাগরপারে বসেই। যদি একটু সংগীতের পথ ধরে হাঁটা যায় তাহলে বেশ কিছু তথ্যও উঠে আসে। ১৯৭৩-এ ‘ইয়োদোঁ কি বারাত’ বা ১৯৭৭-এর ‘হাম কিসিসে কম নহিঁ’-তে দেখা যায়, এদেশে ডিস্কোর ছোঁয়া এসেছিল রাহুল দেব বর্মনের হাত ধরে। ডান্স ফ্লোর, আলুথালু আলো বা ভাঙা বিট্‌ যদি সমস্ত ডিস্কোর মাল মশলা হয়ে থাকে তবে তার রান্নার বামুন ঠাকুরটি ছিলেন রাহুল দেব বর্মন। বিড্ডু ও রাহুলের দর্শক ছিল পৃথক। তাই ‘ডিস্কো দিওয়ানে’ বা ‘আপ য্যায়সা কোই’ আপামর ভারতীয়রা গ্রহণ করতে পারেনি। এই দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানে তখন উঠে এসেছেন তখন বাপি লাহিড়ী। একথাও অনস্বীকার্য, ১৯৮১-র ঊষা উত্থুপের ‘হরি ওম্‌ হরি’ পশ্চিমের ডিস্কো ব্যান্ড ‘ইরাপশনস’-এর ‘ওয়ান ওয়ে টিকিট’ থেকে কপি করার আগেই ‘শান’ (১৯৮০)-এর সাউন্ডট্র্যাকে কপি পেস্ট হয়েছিল ডোনা সামারের ‘আই ফিল ফ্রি’। অথচ দুঃখের বিষয়, বাপি লাহিড়ীর কপালে জোটে কুম্ভীলক বৃত্তির তক্‌মা।

১৯৮০-তে ফিরোজ খানের ‘কুরবানি’-তে ঘটে যায় হুংকৃত বিপ্লব। ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব থাকুক না কেন, সেই সময়ে পাকিস্তানের পপ্‌ সিঙ্গার নাজিয়া হাসানের কন্ঠে গেয়ে ওঠা ‘আপ য্যায়সা কোই’ ভারতীয় সংগীত শ্রুতির কনভেনশনে এক ধাক্কা দিয়ে উঠল।

১৯৮২-এর চলচ্চিত্রর পর বাজারে উপচে ওঠে ডিস্কো জামা, ডিস্কো প্যান্ট এবং ডিস্কো বুট। টি শার্টের তলায় ইলাস্টিক লাগানো জামাই ডিস্কো জামা এবং বর্তমানের জিন্স প্যান্টই ডিস্কো প্যান্ট। এইসময় ঝিকিমিকি এক প্রকার ‘ডিস্কো লাইট’ বাজারে আসে, বিসর্জনের সময় ব্যান্ড পার্টিগুলো যে তাসা বাজাত; তা ছিল ওই লাইটেরই ম্যাক্রো সংস্করণ সহ।
ভুবনায়নের ফলে অনেক কিছুই অস্তমিত সূর্যের মতন। ‘ডিস্কো’ ও তার অনেক রং বদলে হালফিলের হাওয়া লাগাতে চেয়েছে; হারিয়েছে গোধূলিরৌদ্র মাখা গন্ধ। ইউটিউবের দৌলত থাকলেও ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ দেখার মানুষ প্রায় নেই। দূরদর্শনও ফেরায় মুখ। যদি এখনও কোথাও বেজে ওঠে ‘কঁহি ধুঁয়া য়ঁহা নাচে নাচে’— সেই গান এই প্রজন্মর মাথায় কোনো প্রভাবই ফেলে না। নস্টালজিয়াজীবীরা বাঁচে তাদের তাদের স্মৃতিকোটরে। জামা-প্যান্ট এবং জুতো সবই আছে; শুধু নেই ‘ডিস্কো’-র সেই ঐতিহ্য। ১৯৮৩-তে প্রকাশিত ‘রাত্রি চতুর্দশী’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতায় পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল লিখেছিলেন—
“আজ্ঞে, আজ্ঞে ঈশ্বর তোমাকে জানি মলমূত্রবৎ
বিপরীত প্রসূতিসদনে বাচ্চার চিতার কাছে
রূপোর খাঁড়ারা ওঠে, গর্ভগর্ত, নড়ে জিহ্মজিভ
উরুব্যাদানের পল্লি, কহি ধুঁয়া য়ঁহা নাচে নাচে
আউয়া আউয়া…”
মনের জাদুঘরেই থেকে যাবে এই ‘ডিস্কো সভ্যতা’— ইতিবৃত্তর অতীতচারিতায় সে থেকে যাবে ‘পেয়ার করনেওয়ালে’-র মতই। আর কেউ শ্রেণিকক্ষে চেঁচিয়ে উঠবে না ‘পক্যাউ’ বলে।

মানস শেঠের প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই