রবিউল ইসলামের প্রবন্ধ

তিরুকুরল: আদর্শ জীবন চর্যার এক পাঠ

তামিল সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ‘দক্ষিণ ভারতের বেদ’ বলে পরিচিত ‘তিরুকুরল’ আনুমানিক খ্রীঃ পূঃ চতুর্থ শতাব্দীর পূর্বে তিরুবল্লুবর রচনা করেছিলেন। এই নিবন্ধের মূল বিষয়ে যাবার পূর্বে ‘তিরুকুরল’ সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন। ‘তিরুকুরল’-এ ১৩৩০টি শ্লোক ধর্ম, অর্থ ও কামকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে। ১৩৩০টি শ্লোককে তিনটি বর্গে ভাগ করা হয়েছে—
১) ধর্মবর্গ:
এই বর্গে ৩৮০টি শ্লোক আছে। ধর্মবর্গের শ্লোকগুলিকে দুটি উপবর্গে ভাগ করা হয়েছে। বর্গদুটি হল— ক) গার্হস্থ্য ধর্ম এবং খ) সন্ন্যাস ধর্ম।
২) অর্থ বর্গ:
অর্থবর্গের মোট শ্লোক সংখ্যা হল ৭০০টি। এই ৭০০টি শ্লোককে তিনটি উপবর্গ— ক) রাজধর্ম, খ) রাজকার্য, গ) সাধারণ কর্তব্য প্রভৃতি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
৩) কামবর্গ:
কামবর্গকে লেখক দুটি উপবর্গে ভাগ করেছেন—
ক) গুপ্ত প্রেম বা বিবাহ বিষয়ক এবং প্রকাশ্য বিবাহ বিষয়ক। এবার আমরা নিবন্ধের মূল বিষয়ের দিকে অগ্রসর হব।
জন্ম এবং মৃত্যু— এই দুইয়ের মাঝে আছে একটি সমগ্র জীবন। প্রাচীন তামিল কবিরা এই জীবনকে অকম্‌ এবং পুরমে বিভক্ত করেছেন কিন্তু উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্য চিন্তাধারায় জীবন চারভাগে বিভক্ত। এই চারটি ভাগ হল— ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ। তিরুবল্লুবর উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্য চিন্তাধারার চতুর্বর্গের (ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ) পরিবর্তে ত্রিবর্গের (ধর্ম, অর্থ ও কাম) মাধ্যমে মানব জীবনকে বাঁধতে চেয়েছেন। তিরুবল্লুবর ‘তিরুকুরল’ গ্রন্থে ধর্ম বলতে গৃহস্থ ও তপস্বী জীবন, অর্থ বলতে রাজনীতি এবং কাম বলতে দাম্পত্যকে বুঝিয়েছেন। এবার আমরা তিনটি বর্গের মধ্যে ধর্মবর্গের নীতিসমূহে কিভাবে আদর্শ জীবন প্রতিফলিত হয়েছে তা আলোচনা করব।

ধর্ম বর্গে আদর্শ জীবন
মানুষ সামাজিক জীব, দলবদ্ধভাবে সমাজে বসবাস করে। সমাজে বাস করার কারণে কিছু লিখিত এবং কিছু অলিখিত নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। যে কোনো সভ্য সমাজে এটাই রীতি। লিখিত নিয়মগুলিকে বলবৎ করার জন্য সরকার সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকে আর অলিখিত নিয়মগুলির চর্চা বংশ পরম্পরায় হয়ে থাকে। অমুক জিনিসটা করতে নেই কিংবা অমুক জিনিসটা করা উচিত— এ সমস্ত শিক্ষা আমরা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পেয়ে থাকি। যাকে নীতিকথা বলা হয়। নীতিকথাতে উচিত আর অনুচিত বিষয়গুলি থাকে আর এর উদ্দেশ্য হল মানব জীবনকে একটি সুনিয়ন্ত্রিত, সুষ্ঠু ও সুখী জীবন প্রদান করা। মানুষের ভিতরে লোভ, লালসা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা প্রভৃতি জন্মগতভাবে থাকে। এই লোভ-লালসাকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি তখন আমাদের সমাজে চলতে অসুবিধা হয়। তাই সমাজে সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য রিপুর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আর সেটি সম্ভব অলিখিত নিয়ম অর্থাৎ নীতিকথা, মূল্যবোধ প্রভৃতি চর্চা করার মাধ্যমে। তিরুবল্লুবর এই দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণ মানুষের জন্য ধর্ম অংশে গৃহস্থ ও তপস্বীদের কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় সে সম্পর্কে বলেছেন।
একটি পরিবার একজন নারী ও একজন পুরুষ নিয়ে শুরু হয়। নারী এবং পুরুষের দাম্পত্য জীবন কেমন হওয়া উচিত, পত্নী কেমন হওয়া উচিত, পিতা কেমন হওয়া উচিত তার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। গ্রামগঞ্জে বাংলাতে একটি প্রবাদ সাধারণত প্রায়ই শোনা যায়, প্রবাদটি হল— ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। অর্থাৎ, একটি সংসারে পত্নীর গুরুত্ব বেশি। তার উপরেই নির্ভর করে সংসারের শ্রী। তিরুবল্লুবরও সংসারে পত্নীর ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে একজন পত্নীর কী কী গুণ থাকা আবশ্যক সে সম্পর্কে বলেছেন। যেমন—
• “যাহার মধ্যে সকল গুণ বর্তমান এবং যে নারী পতির সামর্থ্যের অধিক ব্যয় করে না সে সাধ্বী সহধর্মিনী।”
• “সেই উত্তম সহধর্মিনী যে নিজ ধর্ম্ম ও নিজ মর্য্যাদা রক্ষা করে, এবং ভক্তির সহিত নিজ পতির আরাধনা করে।”
• “চারিটি প্রাচীরের মধ্যে নিভৃত বাসে লাভ কি? ইন্দ্রিয়-নিগ্রহই নারীর ধর্ম্মের সর্বোত্তম রক্ষক।”
• “যদি কেহ সুযোগ্যা স্ত্রী পায়, তবে এমন কোন্‌ বস্তু আছে তাহার হস্তগত হয় নাই? আর স্ত্রীতে যদি যোগ্যতা না থাকে, তবে তাহার কাছে আছে কি?”
• “দেখ, যে স্ত্রী অন্য দেবতার পূজা না করিয়া শয্যা ত্যাগ করিবামাত্র স্বীয় পতি দেবতার পূজায় নিযুক্ত হয়, জলপূর্ণ মেঘও তাহার আজ্ঞা পালন করেন।”
অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে যে তিরুবল্লুবর একজন পত্নীর কাছে অর্থনৈতিক দিক থেকে যেমন সাহায্য চেয়েছেন তেমনি ঘরের নারীরা যেন বেআবরু হয়ে না পড়েন সেজন্য তাদের সম্মান নিজেদের বাঁচানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং স্বামী ছাড়া অন্য কারোর আরাধনা করাকে একপ্রকার নিষিদ্ধই বলেছেন। আর তিরুবল্লুবরের মতে এটাই একজন পত্নীর ধর্ম। উত্তম পত্নী কেমন হওয়া উচিত সেটা নিয়ে তিরুবল্লুবর যা বলেছেন তা নিয়ে আমাদের মনে একটি প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, তাহলে কি সংসারে স্বামীর জন্য কি আলাদা কোনো নির্দেশ নেই? শুধুই কি পত্নীরাই পতির সেবায় নিযুক্ত থাকবে? পতির কি কোনো কিছুই করণীয় নেই? এই প্রশ্নগুলির উত্তর আমরা কুরলে’র পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ ‘পরস্ত্রী-আকাঙ্খা পরিহার’ অংশে পাই। এই অংশে তিরুবল্লুবর বলেছেন—
• “যাহাদের দৃষ্টি ধন ও ধর্ম্মের উপরে থাকে, তাহারা পরস্ত্রীর আকাঙ্খারূপ মূর্খতা করে না।”
• যে পুরুষ সুযোগ পাইয়া নিজ প্রতিবাসীর স্ত্রীকে গল-লগ্ন করে, সে চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হইল জানিও।”
• যে নিজ প্রতিবসীর সৌন্দর্য্য ও লাবণ্যের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না, সেই সদগৃহস্থ।”
তিরুবল্লুবরের এই উক্তি থেকে আমরা সহজেই বুঝে নিতে পারি যে, পরস্ত্রী সম্পর্কে একজন গৃহস্বামীর আচরণ কেমন হওয়া উচিত। আর এতেই প্রমাণিত হয়, তিরুবল্লুবর সংসারে শুধুমাত্র নারীর আচরণ নয় পুরুষের আচরণও সঠিক হওয়া প্রয়োজন।
শুধুমাত্র একজন পুরুষের পুরুষ তার পত্নীর প্রতি কর্তব্য করবে তা নয়। তিরুবল্লুবর পত্নীর পাশাপাশি সন্তানের প্রতিও কী কর্তব্য করা উচিত সে সম্পর্কে ধর্ম অংশে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন—
• “পুত্রের প্রতি পিতার কর্তব্য এই যে তিনি তাহাকে যেন সভার প্রথম পংক্তিতে বসিবার যোগ্য করিয়া দেন।
তিরুবল্লুবর এখানেও ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। একজন পিতার কর্তব্যের পাশাপাশি পুত্রের কি কর্তব্য সেটি নির্দেশ করেছেন—
• “সেই ব্যক্তি ধন্য যাহার সন্তানগণের আচরণ নিষ্কলঙ্ক। সাত জন্ম পর্যন্ত তাহাকে কোন অশুভ স্পর্শ করতে পারে না।”
অর্থাৎ, পিতার যেমন কর্তব্য সন্তানকে সমাজে যোগ্য করে তোলা তেমনি পুত্রেরও কর্তব্য নিজেকে নিষ্কলঙ্ক রেখে পিতার মান রাখা।
ছোটো থেকেই আমরা আমাদের সন্তানদেরকে শিক্ষা দিয়ে থাকি যে, মিথ্যা কথা বলতে নেই, অন্যের অপকার করতে নেই— তিরুবল্লুবর এমনই কিছু নীতিকথা তাঁর ‘তিরুকুরল’-এ তুলে ধরেছেন—
• “যে কথাটিকে তোমার মন মিথ্যা বলিয়া জানে, তাহা কখনও বলিও না, কারণ মিথ্যা বলিলে তোমার অত্মরাত্মাই তোমাকে দগ্ধ করিবে।”
• “শরীরের পবিত্রতা তো জলের দ্বারা নিষ্পাদন করা যায়, কিন্তু মনের পবিত্রতা সত্য ভাষণ দ্বারা সম্পন্ন হয়।”
মিথ্যা সম্পর্কে এই দুটি নীতিকথার মাধ্যমে তিরুবল্লুবর সত্যকে যে কতখানি গুরুত্ব দিয়েছেন তা বোঝা যায়। সাধারণত আমরা যদি কোনো গর্হিত কাজ করে থাকি তাহলে মানুষ হিসাবে আমাদের অনুশোচনা হওয়া উচিত আর যদি কোনো মিথ্যা কথা বলি এবং সেখানে অপরজনের বিপুল ক্ষতি হয়ে যায় তাহলেও আমরা অনুশোচনায় দগ্ধ হই। একজন মানসিকভাবে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের এটাই হওয়া উচিত। কিন্তু দেখা যায় সামান্য স্বার্থের জন্য আমরা মিথ্যা বলে থাকি। তিরুবল্লুবর এই মিথ্যার কী গুরুত্ব হতে পারে তা বুঝিয়েছেন। তবে কোন জায়গায় মিথ্যা বলতে হবে সেটিও তিনি তুলে ধরেছেন—
• “সেই মিথ্যাতেও সত্যের গুণ বর্ত্তমান, যাহার ফলো সম্পূর্ণ হিতকর।”
অর্থাৎ, মিথ্যা তখনই বলা যাবে যখন সেই মিথ্যা দ্বারা অন্যের ভালো হবে। এই বিষয়ে বলা বাহুল্য যে ইসলাম ধর্মে মিথ্যাকে যেমন জঘন্য পাপ বলে বিবেচিত করা হয়েছে তেমনি আবার কিছু কিছু স্থানে মিথ্যাকে জায়েজ অর্থাৎ বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন—
“তিন জায়গা ব্যতীত মিথ্যা বলা বৈধ নয়। স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মিথ্যা বলা,
যুদ্ধে মিথ্যা বলা এবং দু’জনের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ।”
(তিরিমিজি, হাদিস নং-১৯৩৯, সহিহ আল-জামে-৭৭২৩)
এবার আসা যাক অহিংসা প্রসঙ্গে। ‘অহিংসা পরম ধর্ম’— গৌতম বুদ্ধের এই বাণীর সঙ্গে তিরুবল্লুবরের নীতিকথার কিছুটা সাদৃশ্য পাওয়া যায়। তিনি অহিংসাকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম্মের আখ্যা দিয়েছেন। যেমন, তিরুবল্লুবর তাঁর কুরলে বলেছেন—
• “সকল ধর্ম্মের মধ্যে অহিংসাই শ্রেষ্ঠ। জীব হিংসার পশ্চাতে সর্বপ্রকার পাপ লগ্ন থাকে।”
• “ধন্য সেই ব্যক্তি; যে অহিংসা-ব্রত-গ্রহণ করিয়াছে। মৃত্যু সকল ব্যক্তিকে কবলিত করে, কিন্তু তাহার জীবনের দিনগুলির উপর আক্রমণ করে না।”
ক্ষমা মানুষের মহৎ গুণের মধ্যে একটি। তিরুবল্লুবর তাঁর ‘তিরুকুরল’-এর ধর্ম অংশে ক্ষমা সম্পর্কে ১০ টি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
• “প্রতিশোধের আনন্দ একদিনের মাত্র স্থায়ী, কিন্তু ক্ষমার গৌরব চিরস্থায়ী।”
• “যাহারা অনিষ্টের প্রতিশোধ লয়, বুদ্ধিমানেরা তাহাদের সম্মান করে না; কিন্তু যাহারা শত্রুকে ক্ষমা করে, তাহারা স্বর্ণের ন্যায় মূল্যবান বিবেচিত হয়।”
এবার উপসংহারে আসা যাক। তিরুবল্লুবর তাঁর ‘তিরুকুরলে’র ধর্ম অংশে একজন মানুষকে সমাজে কীভাবে চলতে হবে তা নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশগুলি একটি আদর্শ জীবনচর্যারূপে দেখা যেতে পারে। কারণ তিরুবল্লুবরের এই নীতির মাধ্যমে মানুষ মোক্ষে পৌঁছাতে পারে। বলাই বাহুল্য যে, যদি কোনো ব্যক্তি তিরুকুরলের নীতিগুলি মেনে চলে তাহলে তার মোক্ষে পৌঁছতে অসুবিধা হবে না। হয়তো এই কারণেই তিরুবল্লুবর জীবনচর্যায় চতুর্বর্গের পরিবর্তে ত্রিবর্গের কথা বলেছেন।

তথ্যসূত্র:
নলিনীমোহন স্যানাল (অনু.), কুরল, ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদ, কলিকাতা
বিজয়ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শনের মুক্তিবাদ, ১৯৫৪, পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়(প্রকাশক), কলিকাতা
সাওরা ইবন শাদ্দাদ আত তিরিমিযী (রঃ), তিরিমিযী শরীফ, ২০০৫, ঢাকা

রবিউল ইসলামের প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই