রাজদীপ সেন চৌধুরীর প্রবন্ধ

আমেরিকান কবি: জয় হার্জো

সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিদের মধ্যে আমি জয় হার্জোকে দীর্ঘ সময় পড়তে গিয়ে দেখেছি তাঁর ব্যাপ্তি সুদূর, এই কারণে যে— তাঁর জন্ম, শৈশব এবং বেড়ে ওঠা যে-সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে সেখানে আদিবাসী জীবন, মাটির গন্ধ, আধ্যাত্মিকতা, সাম্প্রতিক জীবনদর্শনের একটা অদ্ভুত মিশেল রয়েছে। অন্য দিকে তাঁর কাজকে মুল্যায়ন করতে গিয়ে দেখেছি কবিতা ছাড়াও শিল্পের অন্যান্য আঙ্গিকগুলিতে যেমন সংগীত, চিত্রনাট্য রচনা কিংবা চলচ্চিত্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাঁর নিয়মিত যাতায়াত। তিনি জীবনকে যেভাবে শিল্পের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন তাতে তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের যাপনচিত্রটি সুদীর্ঘ। অতএব খুব স্বল্প পরিসরে জয় হার্জোর ৬৯ বছরের যাপনচিত্র আঁকা বেশ কঠিন।

খুব সংক্ষেপে আলোচনা করতে গেলেও জয় হার্জোর জন্মস্থান বা তাঁর বেড়ে ওঠার সামান্য রূপরেখা না দিলে তাঁর কবিতার তাৎপর্যগুলি পরিষ্কার হওয়ার নয়। আমেরিকার ওকলাহামা প্রদেশে ১৯৫১ সালে জন্ম জয় হার্জোর। কিন্তু তাঁর জাতিসত্তা বা কাজের পরিসর ছড়িয়ে সমগ্র মুসকোজি (ক্রিক) অঞ্চল। এই শহরটি মূলত আমেরিকার প্রাচীন অধিবাসী ‘নেটিভ আমেরিকান’-দের বাসভুমি। তামাম দুনিয়া তাঁকে মুসকোজি বা নেটিভ আমেরিকান কবি হিসেবেই জানেন। জয় হার্জো তাঁর কবিতায় ঔপনিবেশিকতায় বেড়ে ওঠা আদিবাসী মানুষের ইতিহাসকে লিখেছেন সম্পূর্ণ দায়বদ্ধতার সাথে। অতএব তাঁর কবিতার নান্দনিকতা আদিবাসী বিশ্বাস এবং লৌকিক আচারকে দৃঢ়ভাবে সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে একীভূত করেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম: ‘Secrets from the Centre of the World’, ‘In Mad Love and War‘, ‘The Creation Story‘, ‘She had some Horses‘, ‘The Woman Who Fell From the Sky’ প্রমুখ।জয় হার্জো কবিতার রূপান্তর বা সার বস্তুর পরিবর্তন দেখিয়েছেন তাঁর কবিতাগুলিতে। সাম্প্রতিককালের কবি হিসেবে তাঁর কবিতাগুলি স্মৃতি দ্বারা আচ্ছাদিত অধিক্রমণকারী সময়সীমাকে অস্বীকার করে; যেখানে শারীরিক বা আধ্যাত্বিক সত্যতা একে-অপরকে খণ্ডন করে এবং কবিতার কথক অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের আমন্ত্রণকারী হিসেবে নিজেকে সুস্পষ্টরূপে উদ্ঘাটিত করেন।

সাম্প্রতিক পৃথিবী যেখানে দাঙ্গা বা আতঙ্ক দ্বারা বিধ্বস্ত সেখানে এর প্রয়োজনীয়তা অসীম। রূপান্তরের কবিতা পাঠক এবং লেখক উভয়কেই ভয়, ঘৃণা, কষ্ট এবং নিষ্ক্রিয়তা থেকে বেরিয়ে আসবার পথ দেখায়।

হার্জো’-র ক্ষেত্রে পথটা (ঐতিহাসিক/পৌরাণিক এবং জাগ্রত/কাল্পনিক এবং অবচেতন বা সচেতন) সহজভাবে অতিক্রম করবার সম্ভাবনার ধারণাটা বেশ সর্পিল ছিল তার কারণ বিভিন্ন সীমারেখার মধ্যে দিয়ে চলমানতা এবং সময় ও অভিন্নতার যুগপত্তাকে মেনে নিয়েছিলেন। এমন যুগপত্তার দ্বারা একজন কবি সৌন্দর্য এবং শক্তিকে একসঙ্গে পেতে সক্ষম হন এবং সেই জায়গায় পৌঁছোতে পারেন যেখানে এই বিষয়গুলি অন্যথায় অপ্রাপ্য। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘The Woman who Fell From the Sky‘-এ পরিষ্কার দেখিয়েছেন শ্বাসত সর্পিলতার মধ্যে দিয়ে চলার পথ নির্ধারণকে। হার্জো তাঁর কবিতাকে জনপূর্ণ করেছেন ব্যক্তিত্বে যেখানে জড়জগৎ আধ্যাত্মিকতার সাথে ম্লান হয়ে গেছে । তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: “এটাকে পার্থিব অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নতার মধ্যে দিয়ে করেতে হবে যেখানে আধ্যাত্মিক এবং জড়জগৎ আলাদা নয় আসলে একই। এখানে জড়জগৎ পৃথিবীর বুকে কেবলমাত্র অন্য একটি অনুরণন… এবং আমি আধ্যাত্মিক জগৎকে স্ব-ভাবতই বেশি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবার চেষ্টা করেছি”। হার্জো’-র ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে বলতে গেলে স্থানচ্যুতি যেমন শরীরবৃত্তীয় তেমন অনেকটাই আধ্যাত্মিক। সেইজন্য পার্থিব জীবনে যদি শারীরিকভাবে প্রত্যাবর্তন সম্ভব না হয়, কবিতার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক প্রত্যাবর্তন সম্ভব। ন্যূনতম আধ্যাত্মিক প্রত্যাবর্তন কবিকে সুন্দর কর্মচাঞ্চল্যের সাথে জুড়ে দিতে পারে। এটা একজনকে সঠিক পথ নির্ধারিত করে দেয়। অন্য একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন: “আমার মনে হয় তোমার মন সর্বদা তোমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়ত প্রধান ভূমিকা নেবে… আমি শিখেছি আমার বাড়ি আমার সাথেই আছে। আমি তাকে সব জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। এটা সর্বদা সেখানে থাকে।”

সমালোচকেরা তাঁর কবিতার অন্তর্বর্তী গতিপথ সম্পর্কে বিশেষ করে শেষ কুড়ি বছরে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি যেমন ‘She had Some Horses’ (১৯৮৩), and ‘The Woman Who Fell from the Sky’ (১৯৯৫) এগুলোর ক্ষেত্রে মনে করেন উক্ত কাব্যগ্রন্থগুলি ভীষণভাবে অন্তরস্থ এবং জটিল একইসাথে অনেক বেশি করে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। তিনি ব্যক্তিগত এবং পৌরাণিক স্থানের মাঝে সমস্ত সীমারেখাগুলিকে ভেঙে দিয়েছেন। তাঁর প্রথম কবিতার ছোট্ট বইটি ‘The Last Song’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালে।

যদিও কাব্যকাল বিবেচনা করে জয় হার্জো-কে মূলত একবিংশ শতাব্দীর শেষের কবি বলেই আখ্যা দেওয়া হয়। দীর্ঘ কবিতাযাপনকালে উল্লেখযোগ্য সন্মাননাগুলি যথাক্রমে: ‘William Carlos Williams Award’ এবং ‘Delmore Schwartz Memorial Poetry Prize.’

জয় হার্জো’-র উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি কবিতার টুকরো স্তবক পড়া যাক।

‘In Mad Love and War’ কাব্যগ্রন্থে দীর্ঘ গদ্যকবিতা ‘Autobiography’-র শেষ কয়েকটি লাইনগুলো হল:

“একটি হামিংপাখি আলাপ করেছিল। তার গানের বহিরাবরনের অভন্তরে ছিল প্রজ্বলিত অদৃশ্য স্মৃতির টুকরো। আমি তারপর জানতাম সেটা ছিল মুসকোজির ক্ষমার ঋতু, নতুন শস্যের সময়, একত্রিত হয়ে নৃত্যের সময়।”

‘The Woman Who fell From the Sky’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা ‘Letter from the End of the Twentieth Century’ কয়েকটি লাইন:

“সে যুবকটিকে তার পচ্ছন্দের প্রিয় নাম দিল এবং তার ভাই
বলে সম্বোধন করল। ঘাতক যুবকটি তারপর কেবল
লজ্জিতই হল না সাথে অনুতপ্ত হল এবং কেঁদে ফেলল
যে কান্নাগুলি সে হাজার বছর ধরে জমিয়ে রেখেছিল।
সে নিজেকে ভালোবাসতে শিখল যা সে কখনো করেনি,
কারণ তার শত্রুর যথেষ্ট কারণ ছিল তাকে ধ্বংস করবার,
তাকে ভালোবাসল।”

‘She had Some Horses’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা ‘I Give You Back’ কবিতার কয়েকটি লাইন:

“আমার সুন্দর এবং ভয়ানক ভয়, আমি তোমায় মুক্তি দিলাম।
আমি তোমায় মুক্তি দিলাম। তুমি আমার স্নেহ এবং ঘৃণায় সহজাত ছিলে,
কিন্তু এখন, আমি তোমাকে আমার বলে জানি না…

তুমি আর আমার রক্তে নেই
আমি তোমাকে সৈন্যদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছি
যারা আমার বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল,
আমার সন্তানদের শিরচ্ছেদ করেছিল,
পায়ুকাম এবং ধর্ষণ সম্পন্ন করেছিল আমার ভাইয়েদের বোনেদের …”

রাজদীপ সেন চৌধুরীর প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই