রাজর্ষি রায়ের প্রবন্ধ

গল্পকার হুমায়ূন আহমেদ

লেখক, অধ্যাপক, চলচ্চিত্র পরিচালক, নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের জন্ম পূর্ব-পাকিস্তানের এক সাধারণ পরিবারে। হুমায়ূনের ছেলেবেলা খুব আয়েসে কাটেনি। পুলিসে কর্মরত বাবার ছিল বিচিত্র শখ-আহ্লাদ। কখনো বেহালা, কখনো ঘোড়া, কখনো বই, কখনো ক্যামেরা কিনে মাইনের অর্ধেক টাকাই খরচ করে দিতেন। যার জন্য তাঁদের পরিবারে আর্থিক অনটন ছিল নিত্য সঙ্গী। তবে এই বেহিসাবি শখের খরচই যেন হুমায়ূনের মনে বাবা জীবিত থাকেন চিরকাল। অন্যদিকে তাঁর মার ছিল নানান ব্যাধি। ‘জীবন সংগ্রাম’-এর মধ্য দিয়ে চলতে শিখেছিলেন হুমায়ূন ও তাঁর ভাইবোনেরা। বাল্যকালে ডানপিটে স্বভাবের হুমায়ূন পড়াশোনায় মনযোগী না হলেও সকলকে অবাক করে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতেন। পাক সেনার অত্যাচারে বাবার মৃত্যু হয় মুক্তিযুদ্ধকালে। মা এবং বাকি ভাইবোনদের নিয়ে কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন চালাতে থাকেন তিনি। মেধাবী হুমায়ূনের উচ্চশিক্ষা ঢাকা এবং আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে। জীবনের পথে চলতে চলতে বহু মানুষের সঙ্গে তাঁর আলাপ, বহু ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন, বৈচিত্র্যময় জীবনকে অন্বেষণ করেছেন। এইভাবেই বাংলা ভাষার স্বাধীনদেশে একদিন তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়, হুমায়ূন আহমেদ হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ রচিত হয়।

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের ভাণ্ডারে রয়েছে বহু গল্প, কিন্তু এই আলোচনায় এসেছে কয়েকটি নির্বাচিত গল্প। বৃহৎ ভাণ্ডার থেকে অল্প অল্প করে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ গ্রহণের জন্য ‘হুমায়ূন আহমেদের স্বনির্বাচিত গল্প’ সংকলনটির গল্পগুলি আলোচিত হয়েছে এই প্রবন্ধে। স্বনির্বাচিত সংকলন যে-কোনো লেখকের পক্ষেই বিশেষ। গল্পই হোক বা কবিতা স্বনির্বাচিত সংকলনের ক্ষেত্রে লেখক নিজস্ব ভাবনাকে কাজে লাগান। একদিকে রচনাকারী হিসাবে ভালো বা বিশেষ রচনাগুলিকে তিনি যেমন স্থান দেন তেমনি পাঠকের দৃষ্টিতে ভালো লাগা গল্পগুলিও এখানে স্থান পায়।

সংকলনে মোট ছাব্বিশটি গল্পের মধ্যে প্রথম গল্প ‘শৃঙ্খলা’। গল্পের মূল চরিত্র নসু একজন পাগল। নসুর জীবনযাত্রায় সন্দেহ থাকে না সে পাগল। গ্রামের মানুষ নসুকে তার স্ত্রী শহরে ছেড়ে দিয়ে গেছে পাগলামির জন্য। তার পরিবারের নাম ‘শরুফা’, সন্তান আছে কিনা তার মনে নেই। সে রাস্তায় ঘুমোয় আর ‘নিউ ঢাকা কাবাব হাউস’-এর ফেলে দেওয়া খাবার খায়। নসুর পরনের পোষাক অনেক সময় ঠিক থাকে না তখন লোকে খ্যাপায়, মারে— সে এর কারণ বোঝে না। সে স্ত্রীর নাম কাউকে বলে না এতে নাকি স্ত্রী অসতী হয়, অসতীর মানে সে জানে না কিন্তু স্ত্রীকে সে খুব ভালোবাসে। তার মনে হয় ভালো হলে স্ত্রী তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে গ্রামে। নসুর এক নিজস্ব জগৎ আছে, যেখানে শৃঙ্খলা আছে। সেই শৃঙ্খলা নিয়ে বেশি ঝামেলা তার সঙ্গে মানুষের। মেয়েদের স্কুলের সামনে সে গেলে লোকে কেন মারে তা সে বুঝতে পারে না আবার রাস্তার পুলিস হাত দেখালে কেন সাইকেল দাঁড়ায় না গাড়ি দাঁড়ায় তাও সে বোঝে না। নসুর দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে গল্পকার যেন মানুষের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনকেই পরিহাস করেছেন। মানুষ নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম বানায় নিজেই সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙে, কিন্তু বিশেষ একজন এই শৃঙ্খলা ভাঙলে তাকে অবলীলায় পাগল বলে দেয়। নসুর মনে হয় সে পাগল বলে তার বউ যখন শহরে ছেড়ে দিয়ে গেছে তখন সে সুস্থ হলে নিয়ে যাবে— পাগল বলেই নসু এখনও বিশ্বাস রাখে মানুষের প্রতি, ভালোবাসার প্রতি। পরের গল্প ‘ব্যাধি’। উত্তমপুরুষের দৃষ্টিকোণে শুরু হওয়ার পর গল্পটি এগিয়েছে রকিবউদ্দিন ভুঁইয়া নামে জনৈক এক ব্যক্তির জবানীতে। এখানে দু-টি গল্প পরিবেশিত, প্রথমত গল্প কথক নিজের এক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন আর দ্বিতীয়ভাগে এসেছে রকিবউদ্দিন সাহবের গল্পটি, যেখানে গল্প কথক কেবলমাত্র শ্রোতা। ভুঁইয়া গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্টিজের মালিক রকিবউদ্দিন ভুঁইয়ার সঙ্গে গল্প কথকের কোথায় আলাপ হয়েছিল তা তাঁর মনে নেই, সম্ভবত কোনো এক পার্টিতে। দ্বিতীয়বার তাঁদের দেখা চট্টগ্রামে। বড়োলোক রকিবউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে গল্পকথক কথা বলতে না চাইলেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই তাঁর গাড়িতে চড়েন। এরপর রকিবউদ্দিন সাহেবের গল্পের অবতারণা। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে চালাতে রকিবউদ্দিন সাহেব বলেন তাঁর পিতা মারা যাওয়ার ভয়ংকর কাহিনি, যা তিনি অন্য কাউকে বলতে পারেননি। এ পর্যন্ত সবই ঠিক। কিন্তু গল্পের শেষে তিনি বলেন ‘বাবা সবসময় আমার আশেপাশে থাকেন। এই যে আমি গাড়ি চালাচ্ছি তিনি কিন্তু পেছনের সীটে বসে আছেন।’ রকিবউদ্দিন ভুঁইয়া বাবার গলা শোনার জন্য বিপদসঙ্কুল কাজ করেন, যেমন ভরা রাস্তায় অতি দ্রুত গাড়ি চালান। গল্প কথকের বুঝতে অসুবিধা হয় না রকিবউদ্দিন সাহেব মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তবে রকিবউদ্দিন এ-কথা বিশ্বাস করেন না। তাঁর একটাই অসুবিধা বাবার কথা শুনে তাঁকে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করে দিতে হয়। গল্পের পরিবেশ এবং চরিত্র গল্পটিকে সংকটশীর্ষের দিকে নিয়ে যায়। ভিড় রাস্তায় দ্রুত গতিতে চলতে থাকা গাড়িতে বসে গল্প কথকের সঙ্গে পাঠকেরও মনে হয় গাড়িটি এখনই দুর্ঘটনাগ্রস্ত হবে, কিন্তু হয় না। মনে হয় ছোটোবেলায় চোখের সামনে বাবাকে জলে তলিয়ে যাওয়ার স্মৃতি রকিবউদ্দিন সাহেবকে তাড়িত করে, তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিয়েছে। হুমায়ূনের সঙ্গে পাঠকও এ-কথা বুঝতে পারে। মায়া আর বাস্তবতার মাঝে বিরাজমান গল্পটি পাঠকে বিহ্বল করে রাখে। তৃতীয় গল্প ‘জনক’ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে রচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মানো এক শিশুকে তার বাবা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনায়। মতি নিম্নবিত্ত ঘরের মানুষ, যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। সে-সময়ে তাকে প্রাণে বাঁচায় মনু ভাই, যার নামানুসারে সে ছেলের নাম রাখে মহম্মদ আনোয়ার হোসেন। বারবার সে পুত্রের পুরো নাম উচ্চারণ করে আর অবুঝ শিশুপুত্রকে স্বাধীনতা লড়াইয়ের গল্প শোনায়। মতির মতো মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধ এক বিশাল অনুভূতি নিয়ে আসে, যা সে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চায়। মতি আনোয়ার হোসেনের যেমন পিতা তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ‘জনক’ও সে।

‘রূপা’ গল্পটিতেও দু-টি দৃষ্টিকোণের উপস্থাপনা করেছেন গল্পকার। লেখকের আত্মকথার মতো উত্তমপুরুষের জবানীতে গল্পটি শুরু হয়। একটি স্টেশনে অপেক্ষারত লেখকের সঙ্গে আলাপ করে এক ভদ্রলোক। সুপুরুষ, সাদা পাঞ্জাবি পরা সেই ভদ্রলোক নিজের জীবনের একটি ইন্টারেস্টিং গল্প বলতে চান। লেখক শুনতে না চাইলেও একপ্রকার জোর করেই নিজের গল্প শুরু করেন তিনি। সেই ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ভালোবাসতেন একটি মেয়েকে। মুখে কিছু না বললেও মেয়েটির প্রতি ভালোবাসা দিন দিন বাড়তে থাকে, শেষে একপ্রকার অসুস্থ হয়ে যান। এ-মতো অবস্থায় মেয়েটির ড্রাইভারের কাছ থেকে মেয়েটির বাড়ির ঠিকানা জোগার করে বাড়ির সামনে উপস্থিত হন। বড়ো বাড়ির সামনে বড়ো গেট তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ানকে চিঠি দিয়ে তিনি বলেন বাড়ির বড়ো মেয়েকে দিতে। কিছুক্ষণ পরেই বোঝা যায় বাড়ির সকলে ভালোভাবে এই বিষয়টি নেয়নি। সারাদিন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে, বৃষ্টির জলে ভিজে, লোকের হুমকি খেয়ে ভদ্রলোক যখন জ্বরে অচৈতন্য প্রায় তখন বাড়ির মেয়েটি আসে তাকে নিয়ে ঘরে যেতে। আর এই সময়েই ঘটে আশ্চর্য ঘটনাটি। কলেজে পড়া যে-মেয়ের জন্য ভদ্রলোকটি প্রেমে পাগল হয়েছিলেন সে এই মেয়ে নয়, এ অন্যজন। ড্রাইভার তাকে ভুল ঠিকানা দিয়েছিল। কিন্তু এই মেয়েটি যে ভালোবাসায় তাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায় সেই ভালোবাসাকে উপেক্ষা করতে পারেননি ওই ভদ্রলোক, তাঁকেই বিয়ে করেন, বর্তমানে তার জন্যই স্টেশনে অপেক্ষা করছেন। অচেনা ভদ্রলোকের এই ইন্টারেস্টিং গল্প পাঠককের কাছে প্রেম কাহিনির নতুন ভাবনা নিয়ে আসে। সংকলনের পরের গল্প ‘বুড়ি’ও আত্মকথার মতো করে বলা একটি গল্প। হুমায়ূন আহমেদের মতো এই গল্পের কথক আমেরিকার নর্থ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্র। সে থাকে এক রুমিং হাউসে। ভারত, বাংলাদেশ, কোরিয়া, ফিলিপিনের চার ছাত্র এই হাউসে অতি কম ভাড়ায় থাকে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হাউসের পঞ্চম বাসিন্দা কোনো বিদেশি নয় এমনকী ছাত্রও নয়, সে একজন বয়স্ক আমেরিকান মহিলা। এই বুড়িকে নিয়েই গল্প, তাকে নিয়েই গল্পের শিরোনাম ‘বুড়ি’। আমেরিকার মতো অত্যাধুনিক দেশে অসহায়, নিঃসঙ্গ, অসুস্থ এলিজাবেথ নাম্নী এই মহিলা বেঁচে থাকে সোশ্যাল সিকিউরিটি অনুদানে। প্রথম থেকেই গল্পকারকে সবাই সাবধান করে দেয় এই বুড়ির থেকে দূরে থাকতে, কারণ ‘আমেরিকান সমাজে বুড়োবুড়ির কোন স্থান নেই। তারা খুবই নিঃসঙ্গ। কাজেই কথা বলার কাউকে পেলে বুড়োবুড়িরা তার জীবন অতিষ্ঠ করে দেয়।’ সত্যিই এই বুড়ি অতিষ্ঠ করে লেখক এবং তার বাকি সঙ্গীদের জীবন। কখনো কোকা খাইয়ে রাতে ঘুম নষ্ট করে কখনো ব্যাগপাইপ বাজিয়ে, কখনো পুরোনো দিনের গল্প বলে, কখনো পার্টি করে। কিন্তু গল্পটির শেষে দেখা যায় অসুস্থ সেই বুড়ি দু-মাস হসপিটালে কাটিয়ে যখন ঘরে ফেরে তখন বাকি চারজন তার জন্য পার্টির আয়োজন করেছে। তখনকার পরিস্থিতি জানাতে গিয়ে লেখক বলেছেন, ‘আমেরিকাররা কাঁদতে পারে না— একথা যে বলে সে মহামূর্খ। অনন্ত নাগ যখন ব্যাগপাইপ বুড়ির হাতে তুলে দিল— বুড়ি অবাক হয়ে আমাদের সবার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর শিশুদের মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। কান্নার এমন মধুর দৃশ্য আমি আমার জীবনে খুব বেশি দেখিনি।’ পৃথিবীর আধুনিকতম দেশের মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ তা গল্পটা থেকে যেমন জানা যায়। গল্পের শেষ ক-টা লাইনের ব্যঞ্জনা মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধকে স্মরণ করিয়ে দেন। পরের গল্প ‘একটি নীল বোতাম’। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলে রঞ্জুর সঙ্গে এশার আলাপ। এশার পাশাপাশি তার বাড়ির লোকেদের, বাড়ির সাজসজ্জা সবকিছুই ভালো লাগে রঞ্জুর। কিন্তু রঞ্জু থাকে একটা খুপরি ঘরে, নোলা ধরা দেওয়ালের মাঝে। এশাদের আভিজাত্যময় জীবনযাপন দেখে সে নিজের জীবন বিচার করে। তার বন্ধুদের সঙ্গে, কথাবার্তা তাকে বিব্রত করে। বাস্তব এক ঘেয়েমি জীবন থেকে রঞ্জু মাঝে মাঝে কল্পনালোকে চলে যায়, তাতেই তার মুক্তি, সেভাবে তার ঘরটা পদ্মানদীর নৌকার একটা ঘর, জানলা খুললেই জ্যোৎস্না, এশা তার কাছে আসে। এরকমই একদিন এশার কাছ থেকে আনা একটা বই দেখতে দেখতে সে তার ভেতরে পায় একটা নীল বোতাম, মনে হয় একটা অপরাজিতা ফুল। শেষ পর্যন্ত এশার বিয়ে ঠিক হয় বিশাল শিল্পপতির ঘরে। রঞ্জুর হয়তো এতে দুঃখ হওয়ার কথা কিন্তু রঞ্জু চলে নিজের ঘরে নীল বোতামকে অপরাজিতা ফুল ভাবতে। একদিকে বাস্তব জীবন অন্যদিকে মায়াময় স্বপ্ন এই নিয়ে গল্পটি। রঞ্জুর পক্ষে এশাকে পাওয়া সম্ভব নয় বাস্তবে কিন্তু এশা আর রঞ্জুর জীবনের তারতম্য ঘুঁচে যায় কল্পনায়। পদ্মানদীর নৌকায় জ্যোৎস্নামাখা রাতের স্বপ্নে আনাগোনা করে এশা।

হুমায়ূন আহমেদের গল্পের বিষয় বৈচিত্র্য বড়ো অদ্ভুত। ‘পিঁপড়া’ এরকমই এক গল্প। এক ডাক্তারের কাছে এক রোগী এসেছে। রোগীর জটিল অসুখ, তাকে সবসময় পিঁপড়া কামরায়। যেখানেই শুয়ে বসে থাকে সেখানেই পিঁপড়া চলে আসে, তার শরীরে প্রবেশ করে, ডিম পাড়ে। ডাক্তার ভেবেছিলেন রোগী মানসিক ভারসাম্যহীন। কিন্তু চোখের সামনে পিঁপড়ার সারি দেখে তার ভ্রম দূর হয়। সারি সারি পিঁপড়ার আগমন ঘটেছে তার টেবিলে। ক্রমে জানা যায় রোগীর জীবনবৃত্তান্ত। তার এক ঘৃণ্য অপদাধের পর এরকম পিঁপড়ার আক্রমণ শুরু। যে-অপরাধের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য নানা কাজ করেছে মকবুল হোসেন ভূঁইয়া; তাকে যেন প্রকৃতি শাস্তি দিচ্ছে, সামান্য ডাক্তারের কী করার আছে। নরনারীর জীবনের জটিল রহস্য নিয়ে রচিত ‘অসময়’ গল্পটি। উত্তম পুরুষের দৃষ্টিকোণে লেখাটি রচিত। গল্প কথক ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন হাসু চাচার বাড়িতে থেকে। সেই চাচা অনেকদিন পরে কথকের বাড়ি এসে অসুস্থ হয়ে যান। মেয়ে মিনুর কথা হাসু চাচা বারবার বলতে থাকে। তখনই দেখা দেয় সংকট। কারণ কথকের স্ত্রী বলে ‘মাঝে মাঝে তুমি যখন আমাকে খুব আদর করো তখন কিন্তু আমাকে ‘মিনু’ বলে ডাকো।’ পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না গল্প কথকের মনের কোথায় মিনুর অবস্থান, বিশেষ সময়ে তা মনের অনালোকিত গভীর তল থেকে উঠে আসে। ঢাকা শহরের রিক্সাওয়ালার গল্প ‘অপরাহ্ন’। ইসহাক সাহেব এক দুপুরে এক রিক্সায় ওঠেন, তারপরেই তাঁর চিন্তায় আসতে থাকে রিক্সাওয়ালাদের নানা কীর্তি। রিক্সাওয়ালা এবং রিক্সাযাত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব আমাদের সমাজে খুব পরিচিত চিত্র। দুই তরফের লোকেই ভাবে একে-অপরজন ঠকিয়ে নিচ্ছে। সেই চিন্তা চলতে চলতে ইসহাক সাহেব রিক্সাওয়ালার নাম জানতে চান। আশ্চর্য, তার নামও ইসহাক। তার ঘরবাড়ি নেই, দুই মেয়ে নিয়ে রাস্তায় রাত কাটায়। আশ্চর্য ইসহাক সাহেবেরও দুই মেয়ে। গল্প যত এগোয় ততই দুই ইসহাকের মিল বাড়তে থাকে। কিন্তু হঠাৎ রিক্সাচালক ইসহাকের পেট ব্যথা শুরু হয়। রাস্তার লোকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে, অন্যদিকে ইসহাকের জীবনের একমাত্র সম্বল তার রিক্সাটি ইসহাক সাহেবের দায়িত্বে এসে যায়। ফাঁকা রিক্সা অন্তত পুলিশের কাছে নিয়ে যেতে হবে। ঢাকার রাস্তায় রিক্সা টানতে থাকেন ইসহাক সাহেব। রিক্সাওয়ালার মতো তিনিও রাস্তায় থুতু ফেলেন। জীবন সম্বন্ধে অদ্ভুত এক উপলব্ধি হয় ইসহাক সাহেবের। তাই তিনি পরে যে রিক্সায় চড়েন তার জীবনের খবর নেওয়া শুরু করেন, কিন্তু শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় গল্প করার সময় সামুসর নেই। গল্পের ইসহাক নামে দু-জন ব্যক্তি থাকলেও আসলে যেন ইসহাক একজনেই, অন্যজন তার বিবেক। রিক্সা চড়ার পর একজন যেভাবে ভাবতে থাকে সে ঠকছে সেভাবেই তার মনের আরেকটি দিক রিক্সাওয়ালর প্রতি সহানুভূতি দেখাতে থাকে। মানব মনের বিচিত্র খেলায় কখন কেমন কাজ করে কে জানে। মনের গভীরতর তলের জটিলতা সন্ধান করতে করতে হুমায়ূন লিখেছেন ‘জ্বীন-কফিল’। সাধু পুরুষ কালু খাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া বন্ধু সফিকের সঙ্গী হয়ে গল্প কথক যান ধুন্দুলনাড়ায়। সে এক বিচিত্র জায়গা। ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ রেললাইনের ঠাকুরকোনা স্টেশনে নেমে নৌকা করে হাতীর বাজার, তারপর শিয়ালজানির খাল ধরে দশ মাইল উত্তরে গিয়ে বাকি জলা, ডোবা, মাঠ হেঁটে পৌঁছোতে হয়। শহরের থেকে বহু দূরে এই ধুন্দুলনাড়ার পরিবেশ যেমন অদ্ভুত তেমনি মানুষজনও কেমনতর। সেখানে কথক এবং তার বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয় মসজিদের ইমাম মুনশি এরতাজ উদ্দিনের। ইমাম এবং তার স্ত্রী লতিফার বিচিত্র সংকটময় জীবন কাহিনি শুনে রাত কাটে লেখকের। ইমাম সাহেবের কথায় লতিফাকে জ্বীনে ধরেছে আর তাতেই তাদের জীবনে আঁধার নেমে এসেছে। গল্প পাঠ করতে করতে পাঠকের মনকেও জড়িয়ে ধরে অদ্ভুত এক ভয়ের জড়তা। সেই ভয়মিশ্রিত জড়তা দূর হয় মিসির আলির আগমনে। গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায়ে গল্প কথকের কাছে এই গল্প শোনার পর মিশির আলি ধুন্দুলনাড়ায় গিয়ে সব সমস্যার সমাধান করেন। আসলে লতিফা জ্বীন নয় চরমতম মনোবিকারের শিকার এবং তার জন্যই লতিফা এবং ইমাম মুনশি এরতাজ উদ্দিনের জীবনে একের পর এক সংকট নেমে এসেছে। ‘জ্বীন-কফিল’ একটি চরম বাস্তববাদী গল্প। আজকের দিনেও মনোবিকারের মতো রোগকে বোঝার মানুষের বড়ো অভাব, এখনও সমাজে জ্বীন, পরি, ডাইনি, ভূত, প্রেতের ধারণার বশবর্তী হয়ে বহু মানুষের প্রাণ যায়। মিসির আলির মতো ম্যাজিক জানা মানুষের খুব দরকার যে, বিজ্ঞানের আলোয় এনে সব কিছুকে বিচার করে মনের কোণে কোণে আলো ফেলবে। ‘চোর’ গল্পে মবিন আশ্চর্যভাবে একটি মেয়েদের ব্যাগ পায় রিক্সায় ওঠার সময়। মালিকহীন মেয়েদের ব্যাগটি নেওয়ার পর একদিকে তার নিজেকে চোর মনে হয় অন্যদিকে বেকার মবিনের কাছে ব্যাগটি কিছুদিন অর্থ প্রদান করবে। মানব মনের এক বিচিত্র খেলা এই গল্পটিতেও ধরা পড়েছে।

শেষ পাতা

Spread the love
By Editor Editor প্রবন্ধ