রাহুল ঘোষের প্রবন্ধ

ইসমত চুগতাইয়ের গল্পে নারীদের কথা

উর্দু সাহিত্যের অন্যতম একজন মাইলস্টোন হলেন ইসমত চুগতাই (১৯১৫-৯১)। তাঁর ছ’টি গল্পগ্রন্থ এবং দশটি উপন্যাস রয়েছে। আছে আত্মজীবনীমূলক রচনাও। ইসমত চুগতাই সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় উচ্চতর শিক্ষালাভ করেছিলেন। তিনি একজন প্রগতিশীল লেখিকা, মেয়েদের ওপর অত্যাচারের কথা তাঁর বহু গল্পে আছে। তৎকালীন সময়ে মেয়েদের নিয়ে লেখালেখি করা সত্যিই ছিল সাহসিকতার পরিচয়। মুসলিম সমাজের কিয়দংশ মানুষ চাইতেন মেয়েরা অন্তরালবর্তিনীই হয়ে থাক। ইসমত চুগতাই চেয়েছিলেন মেয়েরা ‘পেশা’ গল্পের কথকের মতো উচ্চশিক্ষিত হোক।
তাঁর বেশিরভাগ গল্পই মেয়েদের কথা। আছে দেশভাগ, দাঙ্গার প্রসঙ্গ, আছে মুসলিম সমাজের বহুবিবাহের কথা। তালাকের পর স্ত্রীদের দুঃখের; কষ্টের কথা। তিনি যেহেতু স্বাধীনচেতা ছিলেন সেহেতু সমাজকে দেখেছিলেন খুব কাছে থেকে। কিছু গল্প পড়তে গিয়ে মনে হয় সেইসব গল্পের কথক তিনি নিজেই; তিনি নিজেই নিজের ঘরের জানা কথা বলছেন। ইসমত চুগতাইয়ের বারাঙ্গনাদের প্রতিও একরকম আকর্ষণ ছিল। কারণ, তিনি জানতেন বারাঙ্গানারাও নারী, তাদেরও এক অন্তরঙ্গ জীবন ও মন আছে। সেই চেতনা ছিল বলেই তিনি ‘বদন কী খুশবু’ অনুবাদে ‘বাদি’ নামে বড় গল্প লিখতে পেরেছিলেন।
ইসমত চুগতাইয়ের গল্পের মধ্যে অন্যতম হল— ‘গেন্দা’, ‘অন্ধ-যুগ’, ‘বিচ্ছু ফুফী’, ‘এক শৌহর কী খাতির’, ‘ভাভী’, ‘আল্লা কা ফজল’, ‘পেশা’, ‘নাহি কী নানী’, ‘কাফের’, ‘ছুঁই-মুই’, ‘অনা খুন’, ‘পকূলী লড়কী’, ‘দো হাত’, ‘লিহাফ’, ‘কালু’, ‘কালু কী মা’, ‘চৌথী কা জোড়া’, ‘কচ্চে ধাগে’, ‘জর্ডে’, ‘কুমারী’, ‘তীসরা দৌরা’, ‘তিল’, ‘ছোটি আপা’, ‘ঘুঘট’, ‘ডাইন’, ‘ঘরওয়ালি’, ‘মুকদ্দম ফর্জ’, ‘ম্যায় চুপ রহা’, ‘থোড়ি সী পাগল’, ‘বদন কী খুশবু’, ‘স্বর্গ’, ‘যৌবন’, ‘এতটুকু প্রাণ’। এর মধ্যে বেশিরভাগ গল্পেই নারীদের কথা খুব করুণ, মমতায় বিবৃত হয়েছে। তাঁর গল্পের নারীরা পরিস্থিতির শিকার। পুরুষের অত্যাচার, পরিবারের অত্যাচার, পুরুষের বহুবিবাহ, নারীধর্ষণ প্রভৃতি ঘটনা কীভাবে নারীজীবনকে বিকৃত করে দেয় তা তার গল্পে আছে। তাই কিছু গল্পে দেখি নারীরা স্বাধীন। নারীদের কথা বলতে বলতে তিনি ঠিক নারীবাদী গল্পকার হয়ে ওঠেননি। তাঁর গল্পে কালুর মতো কিছু ভালো পুরুষের কথা আছে। তবে এটা সত্যি তাঁর বেশিরভাগ গল্পেই তথাকথিত যে স্ট্রাগলের কথা আছে, তা অপূর্ব শিল্পকৌশলে গল্পে ব্যক্ত হয়েছে। তাঁর গল্পের আঙ্গিক উর্দুসাহিত্যে সম্পূর্ণ অভিনব।
‘গেন্দা’ গল্পের কথক মেয়েটি বাল্যবিবাহের শিকার হতে দেখেছে গেন্দাকে। যেহেতু এইসব মেয়েদের বিবাহ হতো বয়স্ক পুরুষের সঙ্গে। অনেক সময় তাই খুব অল্প বয়সেই তারা বিধবা হতো। আর সেই সুযোগ নিত কিছু লম্পট পুরুষেরা। যেমন ‘গেন্দা’ গল্পের কথকের দাদা গেন্দা বলে মেয়েটিকে অত্যাচার করে গর্ভবতী করে দেয়। দাদাভাইয়ের চেহারা তখন গল্প কথকের কাছে ম্লান হয়ে যায় যখন গেন্দার হাতে দাদাভাই চড় খায়। গল্পটি শেষমেষ গেন্দারই জীবনের গল্প হয়ে উঠেছে। শেষে গেন্দা দাদাভাইয়ের ঔরসে জন্ম দেয় লালু নামে শিশুটিকে। যাকে অবশ্য কথকের পরিবার স্বীকার করেনি। ‘বিচ্ছু পিসি’ গল্পে এমন এক মহিলার কথা বলা হয়েছে যার কাছ থেকে আমরা আলাদা একটি স্ল্যাং ডিকশনারি পেতে পারি। এই বিচ্ছু পিসি সারাদিন ধরে বারান্দায় বসে লোককে গালি দেয়; কিন্তু তার মধ্যেও যে ভাইয়ের জন্য এক অসাধারণ মমত্ব জড়িয়ে আছে তারই পরিচয় এক পারিবারিক প্রেক্ষাপটে গল্পকার দিয়েছেন। ভাবলে অবাক হতে হয় পরিবারের সংকট, সামাজিকতা প্রভৃতি সম্পর্কে কতটা সংযোগ থাকলে এইরকম একটি গল্প লেখা যায়। গল্প লেখার এক অসাধারণ কৌশল যে, ইসমত চুগতাই আয়ত্ত করেছিলেন তার পরিচয় এই গল্পে আছে। গল্পের শেষ কথাটি গল্পটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। এর থেকে এই বোঝা যায় ইসমত চুগতাই গল্পের শেষ চমকের এক অন্য প্রকরণ আয়ত্ত করেছিলেন। ‘সত্যি, বোনের অভিশাপ ভাইয়ের গায়ে লাগে না, কারণ তা যে মায়ের দুধে ডোবানো থাকে।

নারীদের কথা বলতে বলতে তিনি ঠিক নারীবাদী গল্পকার হয়ে ওঠেননি। তাঁর গল্পে কালুর মতো কিছু ভালো পুরুষের কথা আছে। তবে এটা সত্যি তাঁর বেশিরভাগ গল্পেই তথাকথিত যে স্ট্রাগলের কথা আছে, তা অপূর্ব শিল্পকৌশলে গল্পে ব্যক্ত হয়েছে।

‘একজন স্বামীর জন্যে’ গল্পটি মজার ছলে পড়া যায়। ইসমত চুগতাইয়ের গল্পে যেমন এক চাপা হাস্যরস আছে ঠিক তেমনই আছে রহস্যের আড়ালে অনেক গভীর কথা বলা। ট্রেনে যোধপুর থেকে বোম্বাই আসা মহিলাটি স্বাধীন থাকতে চায়। আমাদের সমাজ নারীকে পুরুষ ছাড়া যেন একা কল্পনাই করতে পারে না; কোনো নারীকে পুরুষ ছাড়া দেখলেই অনেকে মনে করেন যেমন— ‘আধুনিকা’ বা অনেকে আবার মনে করেন ‘স্বতন্ত্রা’। এই ভ্রান্তি দূর করতেই ইসমত চুগতাইয়ের এই গল্প লেখা।
‘বৌদি’ গল্পটি ইসমত চুগতাইয়ের একটি অন্যতম মুখ্য গল্প। বহুবিবাহ প্রথা মুসলিম সমাজকে এবং তালাক দাম্পত্য জীবনকে কীভাবে ভেঙে দেয়, তারই বিবরণ এই গল্প। ইসমত চুগতাইয়ের গল্প পড়তে পড়তে মনে হয় যেন আত্মজীবনী পড়ছি।
এমনই অধ্যায়ে অধ্যায়ে গল্পগুলি যেন বাস্তব জীবন হয়ে উঠছে। ইসমত চুগতাইয়ের অনেক গল্পই উত্তম পুরুষে লেখা। গল্পকার এই গল্পে দেখাচ্ছেন যে, ভাইয়ার জিন্স আর স্কার্টের ওপর অসম্ভব ঘৃণা ছিল, সেই ভাইয়াই একদিন লোভে শবনমকে বিয়ে করে। এবং তালাক দেয় প্রথমা স্ত্রীকে। বৌদি নাকি স্থূল হয়ে গিয়েছিল বিয়ের পর; ভাইয়ার অনুযোগ। কিন্তু কথক আশ্চর্য মোড়ে গল্প শেষ করছেন যেখানে দেখানো হচ্ছে সেই শবনমও একদিন সেই বৌদির স্থুল রূপ পেল সন্তান জন্মাবার পর। এবার ভাইয়া বারের নর্তকীর প্রতি আকৃষ্ট হয়। যে শবনম একদিন ইচ্ছা করে বৌদির ঘর ভেঙেছিল; সেই শবনমের ঘরও আজ ভাঙতে চলেছে— এভাবেই গল্পের পরিসমাপ্তি।
এভাবে আত্মজীবনীর ঢঙে গল্প বলা ইসমত চুগতাইয়ের গল্পের একটি বিশিষ্ট প্রকরণ। যদিও পরে তিনি গল্প বলার কৌশল পালটেছেন। যেমন ‘পেশা’ গল্পের কথক একটু অন্য ভঙ্গিতেই গল্প বলছেন। গল্পটি প্রথমে এক নেতি সিদ্ধান্তের দিকে এগোলেও শেষে বুঝতে পারি স্কুলশিক্ষক ভদ্রমহিলার ধারণা ভুল, আসলে তার প্রতিবেশী এক সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলা। মহিলাদের চোখে মহিলারাও যে অন্যরূপে অনেক সময় প্রতিভাত হয়— এই গল্পে তার প্রাইমারি দৃষ্টান্ত আছে।
‘নাহির নানি’ গল্পের সূচনাতেই এক অসাধারণ সম্পর্কের বিবর্তন লক্ষ করা যায়। সমাজে অনেকক্ষেত্রেই নারীদের নাম বা আত্মপরিচয়— যে শুধু পরিবারে সম্পর্ককেন্দ্রিকই হয়ে যায়, তার দৃষ্টান্ত এই গল্প। প্রথমে মেয়ে, তারপর কিছুদিন ‘বশীরের বউ’ তারপর ‘বিসমিল্লার মা’, তারপর সেই মহিলাই ‘নাহির নানি’ হয়ে উঠল। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসেও যে-নারীর কথা পাই তার নামও হারিয়ে গেছে সম্পর্কের তলে। ‘নাহির নানি’ গল্পটিতে নাহির নানির বর্ণনায় বীভৎস রসের প্রয়োগ করেছেন লেখক। গল্পটি হয়ে উঠেছে দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি। জয়নুল আবেদিনের ফুটপাতের কাক ও কঙ্কালের ছবি মনে পড়ে যায়।
‘রক্তের সম্পর্ক’ গল্পের শুরু এক অন্য আঙ্গিক এনে দিয়েছে ছোটোগল্প রচনায়। ছোটোগল্পের সূচনা প্রকরণের আলোচনার বিষয়। কিন্তু সেই প্রকরণকে ভাঙা-গড়া শিখতে হলে আসতে হবে ইসমত চুগতাইয়ের গল্পে। বাঁদিদের দুরাবস্থার চিত্র, পতিতাদের দুরাবস্থার চিত্র বারবার তিনি গল্পে এনেছেন। যে-গল্পের জন্য তিনি প্রবল সমালোচিত হয়েছেন, এবং আদালতে যেতেও হয়েছে। সেই গল্পটি হল— ‘লিহাফ’ অনুবাদে ‘লেপ’। লেপ গল্পে বেগমজান ও রব্বর সমকামিতাকে লেপের আবরণে চিহ্নিত করা হয়। আজ সমকামিতা অনেক রাষ্ট্রের মান্যতা পেয়েছে বিশ্বে ঠিকই, কিন্তু ভারতে আজও তা অমান্য। আজ আমরা অনেকাংশে সংস্কার মুক্ত। তাহলে তৎকালীন সময়ে এই গল্প মুসলিম সমাজে কীভাবে আলোড়ন ফেলেছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়। ‘শিকড়’ গল্পটি দেশভাগের যন্ত্রণার এক বিরল প্রতিচ্ছবি। বাউন্ডারি কমিশন হল বাংলা আর পাঞ্জাবের সীমানা নির্ধারণের জন্য। বাংলার জন্যে রোয়েদাদ তৈরি হয় ৯ আগস্ট, পাঞ্জাবের ১১ আগস্ট। ফলে সীমানা হয়ে গেল দেশভাগের নিদর্শন। এই দেশভাগ বাস্তুচ্যুত করতে থাকে মানুষকে; বিনিময় প্রথার কথা আছে ‘শিকড়’ গল্পে। ‘শিকড়’ নামে প্রফুল্ল রায়ের এক অসাধারণ গল্প আছে। আবার ঠিক একইরকম কাছাকাছি সাদৃশ্যযুক্ত গল্প হল— হাসান আজিজুল হকের ‘খাঁচা’। এক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে ‘খাঁচা’ গল্প সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা ঠিক ইসমত চুগতাইয়ের ‘শিকড়’ গল্পের মতোই শুনিয়েছিলেন তিনি আমার কাছে। রূপচাঁদজি গল্পের মহৎ চরিত্র হিসোবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, শেষপর্যন্ত তিনিই বউদির সন্তানদের দেশ ছেড়ে না দিতে দিয়ে নিজের আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনেন।

ছোটোগল্পের সূচনা প্রকরণের আলোচনার বিষয়। কিন্তু সেই প্রকরণকে ভাঙা-গড়া শিখতে হলে আসতে হবে ইসমত চুগতাইয়ের গল্পে।

যেহেতু ইসমত চুগতাই অনেককাল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাই ফিল্মওয়ালাদের জীবন অনেক কাছে থেকেই দেখেছেন তিনি। সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই হয়তো তিনি ‘কুমারী’ গল্পে প্রয়োগ করেছেন। মীরণের বহু পুরুষের সাথে সম্পর্কই এই গল্পে বলা হয়েছে। তাহলে মীরণও পুরুষের কাছে প্রতারিত হতে হতে হাত বদল শিখে নিয়েছে।
ইসমত চুগতাইয়ের রিপোর্টাজধর্মী লেখা হল ‘ছোড়দি’। ক্যালেন্ডারের তারিখের পাশে পাশে কাহিনি ব্যক্ত হয়েছে। ‘ঘরওয়ালি’ গল্পে এক বেশ্যার সামাজিক স্বীকৃতি, বিবাহের পরে আবার তালাক, আবার মির্জার লাজুর সঙ্গে সহবাস যৌন মনস্তত্ত্বের দিকে ইঙ্গিত সুস্পষ্ট করেছে। ইসমত চুগতাই গল্পের সমাপ্তি অনেক সময় কবিতা দিয়ে করেছেন। ‘আমি ছিলাম নির্বাক’ গল্পের সমাপ্তি সেভাবেই হয়েছে।
ইসমত চুগতাই নারীর ওপর পুরুষের অত্যাচারের কথা গল্পে নিদর্শন হিসাবে দেখিয়েছেন ঠিকই কিন্তু অপরদিকে তিনি ছমনের মতো পুরুষ চরিত্র তৈরি করেছেন নিজের হাতেই যে বাদি হালিমাকে নিয়ে নবাব মহলের বিপরীতে গিয়ে সুখে সন্তানসহ সংসার স্থাপন করেছে; মৃত্যুমুখী হালিমাকে বাঁচিয়ে।

সূত্র নির্দেশ:
১। ইসমত চুগতাই, নির্বাচিত গল্প, সংকলন সম্পাদনা ও উর্দু থেকে ভাষান্তর, সঞ্চারী সেন, উর্বী প্রকাশন, তৃতীয় উর্বী, সংস্করণ, এপ্রিল ২০১৭, কলকাতা, পৃ. ৮০।
২। ফ্যান দাও, সম্পাদনা, তসলিমা নাসরিন, পুনশ্চ, সর্বাধুনিক সংস্করণ ২০০১, কলকাতা, পৃ. ৫-১০।
৩। নন্দন, সম্পাদক, অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, জুলাই ২০১৬, ৫১ বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, ইসমত চুগতাই জন্মশতবর্ষ, কলকাতা।
৪। সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেশভাগ— দেশত্যাগ, অনুষ্টুপ, পরিমার্জিত পুনর্মুদ্রণ: জানুয়ারি ২০১৬, কলকাতা।

রাহুল ঘোষের প্রবন্ধ

আমাদের নতুন বই