রাহুল হালদারের প্রবন্ধ

ঈশ্বরচন্দ্রের শিক্ষক কালীকান্ত

বিদ্যাসাগর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম ভাগে গোপাল নামে যে সুবোধ বালকের দৃষ্টান্ত দিয়েছিলেন বাঙালি ঘরে ঘরে সকলেই সেই সুবোধ বালকের প্রত্যাশা করেন। তার সঙ্গে তিনি তুলনা টেনেছিলেন রাখাল বালকের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “বিদ্যাসাগর চরিত” লিখবার সময়ে এই প্রসঙ্গটি টেনে ঈশ্বরচন্দ্রে বাল্যকালের কথা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন— “নিরীহ বাংলাদেশে গোপালের মতো সুবোধ ছেলের অভাব নাই। এ-ক্ষীণতেজ দেশে রাখাল এবং তাহার জীবনীলেখক ঈশ্বরচন্দ্রের মত দুর্দান্ত ছেলের প্রাদুর্ভাব হইলে বাঙালিজাতির শীর্ণচরিত্রের অপবাদ ঘুচিয়া যাইতে পারে। সুবোধ ছেলেগুলি পাশ করিয়া ভালো চাকরি-বাকরি ও বিবাহকালে প্রচুর পণ লাভ করে সন্দেহ নাই, কিন্তু দুষ্টু অবাধ্য অশান্ত ছেলেগুলির কাছে স্বদেশের জন্য অনেক আশা করা যায়। বহুকাল পূর্বে একদা নবদ্বীপের শচীমাতার এক প্রবল দুরন্ত ছেলে এই আশা পূর্ণ করিয়াছিলেন।”

ঈশ্বরচন্দ্র ছেলেবেলায় তাঁর তৈরী চরিত্র গোপালের মতো অত শান্ত ছিলেন না। তাঁর ছেলেবেলার সঙ্গে মিল ছিল রাখালের।
“যুগপুরুষ বিদ্যাসাগর” গ্রন্থে বিনয় ঘোষ এদিকেই লক্ষ্য করে লিখেছিলেন “বাংলাদেশে গোপালের অভাব নেই। শুধু গোপাল নয় আমাদের দেশ নাড়ুগোপালের দেশ। এদেশের লোকের ধারনা, ঘরে বসে হাত ঘুরোলেই নাড়ু পাওয়া যায়, নইলে নাড়ু পাওয়া যায় না। গোপাল ও নাড়ুগোপাল পথে ঘাটে অনেক দেখা যায়। স্কুল কলেজের গোপাল, বিশ্ববিদ্যালয়ের গোপাল, কর্মকক্ষেত্রের গোপাল, সংসারের গোপাল, নানাশ্রেণীর গোপাল আছে দেশে। অবশ্য আজকাল রাখালেরও অভাব নেই। কিন্তু তবু ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, যে কোন দেশে সমাজে গোপালের মত ছেলেদের যা দাম, তার চেয়ে অনেক বেশী দাম রাখালের মত ছেলেদের।”
বাস্তবিক, দেশে সুবোধ বালকের মতো রাখাল বালকেরও প্রয়োজন একথা অস্বীকার করি কীভাবে। তবে বিদ্যাসাগর রাখাল বালকের মতো ছেলেবেলায় দুষ্টুমি করলেও “রাখাল পড়িতে যাইবার সময় পথে খেলা করে, মিছিমিছি দেরি করিয়া সকলের শেষে পাঠশালায় যায়। কিন্তু পড়াশুনায় বালক ঈশ্বরচন্দ্রের কিছুমাত্র শৈথিল্য ছিল না। যে প্রবল জিদের সহিত তিনি পিতার আদেশ ও নিষেধের বিপরীত কাজ করিতে প্রবৃত্ত হইতেন, সেই দুর্দম জিদের সহিত তিনি পড়িতে যাইতেন। সেও তাঁহার প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে নিজের জিদ রক্ষা” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

ঈশ্বরচন্দ্রের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তাঁর বিদ্যাশিক্ষার সূত্রপাত হয়। পিতা ঠাকুরদাস বন্ধ্যোপাধ্যায়েরও আর্থিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছিল বড়োছেলের জন্মগ্রহণের পর। সেই সময় বীরসিংহ গ্রামে সনাতন বিশ্বাস নামে একজন পণ্ডিত ছিলেন। সেই পণ্ডিতের একটি দোষ ছিল, তিনি পড়ানোর সময় শিক্ষার্থীদের প্রচন্ড প্রহার করতেন। তাই ছোটো ছোটো শিশুরা পণ্ডিত মহাশয়ের মারের ভয়ে পাঠশালায় যেতে চাইতেন না। এই কারণে ঠাকুরদাস সনাতন বিশ্বাসের বদলে ঈশ্বরচন্দ্রের শিক্ষক ঠিক করেন বীরসিংহ গ্রাম নিবাসী কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে।

কেমন ছিলেন কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়? শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন লিখেছেন “কালীকান্ত, ভদ্রকুলীন ছিলেন; সুতরাং বহুবিবাহ করিতে আলস্য করেন নাই। তিনি ভদ্রেশ্বরের নিকট গোরুটিগ্রামেই প্রায় অবস্থিতি করিতেন,অপরাপর শ্বশুরভবনেও টাকা আদায় করিবার জন্য মধ্যে মধ্যে পরিভ্রমণ করিতেন।” ঠাকুরদাস ঈশ্বরচন্দ্রের জন্য কালীকান্তকে উপযুক্ত ভেবে তাঁর অনুসন্ধানের জন্য প্রথমে ভদ্রশ্বরে তারপর শ্রীরামপুরে গেলেন। সেখানে গিয়ে জানতে পারলেন তিনি গোরুটি গ্রামে তখন ছিলেন। এই সংবাদ পেয়ে ঠাকুরদাস গোরুটিতে গিয়ে কালীকান্তের সঙ্গে সাক্ষ্যাৎ করেন এবং তাঁকে সদুপদেশ দিয়ে বীরসিংহে ফেরত নিয়ে আসেন। বীরসিংহগ্রামে এসে ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কালীকান্তকে কয়েকদিনের মধ্যে একটি পাঠশালা স্থাপন করে দিলে সেখানে বিদ্যাসাগর প্রথম পাঠ নেন।

স্বরচিত “বিদ্যাসাগর চরিতে” ঈশ্বরচন্দ্র লিখেছিলেন “আমি পঞ্চমবর্ষীয় হইলাম। বীরসিংহে কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালা ছিলো। গ্রামস্থ বালকগণ ঐ পাঠশালায় বিদ্যাভ্যাস করিত। আমিও তাঁহার পাঠশালায় প্রেরিত হইলাম।”
কেমন ছিল কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের শিক্ষা দেবার প্রণালী? এ-প্রসঙ্গে শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন “বিদ্যাসাগর জীবনচরিতে” লিখেছেন “কালীকান্ত অত্যন্ত ভদ্রলোক ছিলেন। শিশুগণকে শিক্ষা দিবার বিশেষরূপ প্রণালী জানিতেন এবং শিশুগণকে আন্তরিক যত্ন ও স্নেহ করিতেন; একারণ, ছোট ছোট বালকগণ তাঁহার নিকট সর্ব্বদা অবস্থিতি করিতে ইচ্ছা করিত। এতদ্ভিন্ন তিনি সকলের সহিত সৌজন্য প্রকাশ করিতেন। স্থানীয় লোকগণ কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে আন্তরিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা করিত, এবং সকলেই তাঁহাকে গুরুমহাশয় বলিত।”

তাই স্বয়ং বিদ্যাসাগর নিজের গুরুমশাই সম্পর্কে লিখেছিলেন “চট্টোপাধ্যায় মহাশয় সাতিশয় পরিশ্রমী এবং শিক্ষাদান বিষয়ে বিলক্ষণ নিপুণ ও সবিশেষ যত্নবান ছিলেন। ইঁহার পাঠশালায় ছাত্রেরা, অল্প সময়ে, উত্তমরূপে শিক্ষা করিতে পারিত; এজন্য, ইনি উপযুক্ত শিক্ষক বলিয়া, বিলক্ষণ প্রতিপত্তিলাভ করিয়াছিলেন।”

পাঠশালার শিক্ষায় একবছর পরে শিক্ষায় বাধা আসল। এবার শিশু ঈশ্বরচন্দ্র আক্রান্ত হলেন ভয়ঙ্কর জ্বররোগে। আকস্মিক ভয়ঙ্কর এই শরীর খারাপ যে নিরাময় হবে কেউ তখন আশা করেননি। এর কিছুদিন পরে জ্বরে প্রাণ চলে যাওয়ার আশঙ্খা নিরাকৃত হলেও জ্বরের সঙ্গে যুক্ত হল প্লীহা রোগের। তখন এই সংবাদ শুনে ঈশ্বরচন্দ্রের মা ভগবতী দেবীর বড়ো মামা রাধামোহন বিদ্যাভূষণ বীরসিংহ গ্রাম থেকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান পাতুলগ্রামে। সেখানকার জোটরীনামে গ্রামের এক বৈদ্যের সুচিকিৎসায় তিনমাস বাদে আরোগ্যলাভ করলে রাধামোহন বিদ্যাভূষণ পুনরায় তাঁকে বীরসিংহ গ্রামে নিয়ে আসেন। তারপর সুস্থ হয়ে পুনরায় কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় পড়া আরম্ভ যা দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলেছিল। এই তিন বছরে ঈশ্বরচন্দ্র বাংলা এবং গণিত শিখেছিলেন ভালো ভাবে।

কালীকান্ত ঈশ্বরচন্দ্রকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তাই শুধু পাঠশালার সময়েই নয় দুপুরে যখন তিনি অন্যান্য শিক্ষার্থীদের ছুটি দিতেন তখন তিনি ঈশ্বরচন্দ্রকে নিজের কাছে রেখে দিয়ে সন্ধ্যাবেলায় নামতা আর ধারাপাতের অতিরিক্ত শিক্ষা দিতেন।

একদিন কালীকান্ত ঠাকুরদাসকে জানালেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের পাঠশালাতে যা যা পড়ার বিষয় সেগুলি সমাপ্ত হয়েছে এখন যদি তাঁকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া যায় তাহলে এ ছেলে অনেকদূর পর্যন্ত যেতে পারবে।

যে সময়কার কথা বলা হচ্ছে সেসময়ে গ্রামের ব্রাহ্মণ বালকের পাঠশালা শেষে টোলে পড়বার রীতি ছিল কলকাতায় এসে পড়ার চল ছিল না বললেই চলে। তবুও ঠাকুরদাস নিজেকে দিয়ে বুঝেছিলেন কলকাতায় ছেলেকে পড়ালে বড়ো কাজ পাবে তাই ঠাকুরদাস কালীকান্তের কথায় সম্মতি প্রদান করলেন।

১৮২৯ খৃস্টাব্দ বাংলার ১২৩৫ সনের কার্তিক মাস। ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আট বছরের বালক ঈশ্বরচন্দ্রকে নিয়ে পায়ে হেঁটে চললেন কলকাতার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে পাঠশালার গুরুমশাই কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায় আর আনন্দরাম গুটি। বীরসিংহ থেকে কলকাতার দূরত্ব ছাব্বিশ ক্রোশ পূর্বদিকে। প্রথম দিন পায়ে হেঁটে ছয় ক্রোশ, দ্বিতীয় দিনে দশ ক্রোশ এরপরের দিনে সকালে হাঁটা শুরু করেন শ্যাখালা থেকে শালিখার ঘাট পর্যন্ত দশ ক্রোশ। এই রাস্তাতেই তিনি মাইল স্টোন দেখে পিতা ঠাকুরদাস আর গুরুমশাই কালীকান্তের কাছে প্রথম এক থেকে দশ পর্যন্ত ইংরেজি সংখ্যার চেনা হয়।

সন্ধ্যার পর শালিখার গঙ্গার ঘাট পার হয়ে কলকাতায় জগদ্দুর্লভ বাবুর বাড়িতে আসেন। সেখানে এসে দু-মাস রামলোচন সরকারের কাছে শিক্ষা নিয়েছিলেন কিন্তু রামলোচন সরকার ঈশ্বরচন্দ্রকে নতুব কিছু শেখাতে পারিননি। সেকথা ঈশ্বরচন্দ্র নিজেই পিতৃদেবকে বলেছিলেন। পরবর্তীকালে ছেলেবেলার গুরুমশাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হয়ে ওটার পরেও তাঁর প্রথম শিক্ষককে সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু বলেই মেনে নিয়েছিলেন। নিজের স্বরচিত “বিদ্যাসাগর চরিতে” তাই লিখেছিলেন “বস্তুতঃ পূজ্যপাদ কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায় মহাশয় গুরুমহাশয়দলের আদর্শস্বরূপ ছিলেন”।

Spread the love

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *