শুভম চক্রবর্তীর শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপন

দেবেশ রায়: চিন্তা-ভাস্কর্যের নির্মাতা

বিশিষ্ট গদ্যশিল্পী কমলকুমার মজুমদার নিজের গদ্যভাষা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছিলেন— দৈনন্দিন বহু ব্যবহারে জীর্ণ ভাষা তাঁর গদ্যের মাধ্যম নয়, ভাবপ্রকাশের প্রয়োজনে তাই স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছেন। বাংলা ভাষায় হাতে গোনা যে-কয়েকজনের গদ্য পাঠ করে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে যে তিনি নিজস্ব ভাষা প্রণেতা, তাঁর দ্যোতনা পূর্বাপররহিত, তাঁদের মধ্যে দেবেশ রায় অন্যতম। তাঁর গদ্যের দাঢ্য, নির্মাণ-প্রকৌশল, ভাবগভীরতা এমনই যে মেরুদণ্ড টানটান করে পড়তে হয়, নেতিয়ে পড়লে কিছুই অনুধাবিত হয় না। দেবেশ রায় যেন তাঁর গদ্যে পাঠকের মনোযোগের পরীক্ষা নেন আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পাঠকের হাতে তুলে দেন যাদুপৃথিবীর চাবিকাঠি।

তাঁর জন্ম অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার বাগমারা গ্রামে। ১৯৩৬ সালের ১৭ই ডিসেম্বর। তাঁর পিতামহ কর্মসূত্রে জলপাইগুড়ি এলে, তিনিও পিতামহের সঙ্গে আসেন। জলপাইগুড়িতেই তাঁর ছাত্রজীবন অতিবাহিত হয়েছে। ছাত্রাবস্থাতেই সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত। ১৯৫৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজে পড়াকালীন ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর ‘হাড়কাটা’ গল্পটি প্রকাশিত হয়, আর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই মননশীল পাঠকের মনোযোগ অধিকার করে। এ-ছাড়াও ‘পা’, ‘দুপুর’, ‘পশ্চাতভূমি’, ‘কলকাতা ও গোপাল’, ‘কাল রাতের বেলায় ‘, ‘মানুষরতন ‘, ‘বেড়ালটির জন্য প্রার্থনা’, ‘ইচ্ছামতী’, ‘জোতজমি’, ‘শব্দতত্ত্ব নিয়ে’-সহ অনেক গল্প তাঁর সাহিত্যকৃতীর সাক্ষরবাহী৷

দেবেশ রায়-এর উপন্যাস তাঁর বিশিষ্ট চিন্তা ও কৃতির স্মারক। তাঁর অনেক উপন্যাসে উপজীব্য অতীত, বলা বাহুল্য, ‘নির্বিকল্প’ কোনো অতীত নয় ‘বহুবিকল্প’ অতীত, যার সঙ্গে বর্তমানের সাযুজ্যময় সহাবস্থানেই তাঁর উপন্যাসের আর্কিটাইপ নির্মিত হয়েছে। ‘যযাতি’, ‘আপাতত শান্তিকল্যান হয়ে আছে’, ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’, ‘সহমরণ’, ‘তিস্তাপুরাণ’, ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’, ‘সময় অসময়ের বৃত্তান্ত’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। দেবেশ রায়-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস তিস্তাপারের বৃত্তান্ত। এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট স্থাপিত হয়েছে তিস্তাতীরবর্তী অঞ্চলে। তিস্তাপারের বৃত্তান্তে স্থানিক রং থাকলেও, সেই রং সর্বার্থে আঞ্চলিক উপন্যাসের নয়, তাঁর ‘বাঘারু’, ‘মাদারি’, ‘মাদারির মা’ প্রভৃতি চিরকালের অবজ্ঞাত নিপিড়ীত মানুষের প্রতিনিধি। আত্মপরিচয়হীন, নিরক্ষর এই সব অবহেলিত মানুষ তাঁর উপজীব্য। ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’ উপন্যাসে প্রত্যক্ষ করা যায় দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যোগেন মণ্ডল এবং তাঁর সময়কালের রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের। সুবৃহৎ এই উপন্যাস দেশ-কাল-সমাজের ত্রিবেণীসঙ্গমে, ভাষার বুদ্ধিদীপ্ত জারণে বিশিষ্ট। বাংলা ভাষার এই ঋদ্ধ শিল্পীকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর ঐহিক অবসান হল ঠিকই, কিন্তু রেখে গেল চিন্তা ও মননের মহৎ আয়োজন; যা আগামীর।

শুভম চক্রবর্তীর শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপন

আমাদের নতুন বই