সুকান্ত ঘোষের প্রবন্ধ

শিশিরকুমার দাশ: জ্ঞানচর্চার আলোকে (প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য)

  1. একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করব। সময়টা ২০০৮, সাল ট্রেনে করে দিল্লি থেকে বাড়ি ফিরছি। ট্রেনে এক ভদ্রলোক আমায় জিজ্ঞেস করলেন, দিল্লিতে আমি কী করি? তখন আমি এম.এ পড়ছিলাম। আমিও সদুত্তর দিলাম— আধুনিক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে বাংলায় এম.এ করছি। তিনি বলেছিলেন— যে বিভাগে শিশিরকুমার দাশ পড়িয়েছেন তার মান তো অপরিসীম। আমি একটু দ্বিধানি্বতভাবে উত্তর দিয়েছিলাম— হ্যাঁ। কারণ তখন তাঁর কর্মজগৎ ও জ্ঞানজগতের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। এখনো যে খুব একটা পরিচিতি হয়েছে এমন দাবী করছি না। কিন্তু যে সামান্য পরিচয় পেয়েছি তাতে খানিকটা আন্দাজ করতে পারি, নয় বছর আগে সেই ভদ্রলোকের কথার তাৎপর্যখানি।
    ফরাসি দার্শনিক পাস্কেল (Blaise Pascal: 1623-1662) বলেছিলেন সবারই কিছু রেখে যাবার থাকে। সে হোক না দীন বা দরিদ্র। শিশির কুমার দাশ আমাদের জন্য রেখে গেছেন অফুরন্ত জ্ঞান জগৎ ও সীমাহীন চিন্তার বিকাশ। যা শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় আরও একটু প্রসারিত করে বলা যায় বৈশ্বিক স্তরে উত্তীর্ণ। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা এই বিষয়টিকে বোঝার চেষ্টা করবো। প্রথমেই স্বীকার করে নেব, কয়েকটি সমস্যার কথা। প্রথমত স্বল্পবিদ্যা নিয়ে শিশিরকুমার চর্চায় অংশগ্রহণ আমার ধৃষ্টতা। আলোচনাটি অধমের সামান্য প্রয়াস মাত্র। আর দ্বিতীয়ত জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার অনেক রকম সমস্যা রয়েছে। জ্ঞান কী? কীভাবে এটি তৈরি হয়? আর কোন আঙ্গিকে এটি বিচার্য ইত্যাদি প্রশ্নের সাথে জ্ঞানতত্ত্ব বিষয়টি সম্পৃক্ত। এই ধরণের জটিলতায় আমরা যাব না। শুধু শিশিরকুমার দাশের কয়েকটি লেখা অবলম্বনে বাংলা–ভারতবর্ষ-ইউরোপে তাঁর মনন ও চিন্তনের একটি ‘Journey’ কে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
    বঙ্গদর্শন (১৮৭২) পত্রিকাকে আশ্রয় করে বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালির যে মননচর্চার উন্মেষ ঘটান, তা রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত ঐ পত্রিকায় অব্যাহত ধারায় রক্ষিত হয়েছে। তারপর থেকে অনেক নতুন চিন্তাভাবনার উন্মেষ দেখা গেছে নানা বিদগ্ধ মনীষীদের রচনায়। বিশশতকের এক অন্যতম চিন্তাবিদ বিনয়েন্দ্রনাথ সেন বঙ্গদর্শন (আষাঢ় ১৩১৩) পত্রিকায় ‘বর্তমান যুগের স্বাধীন চিন্তা’ নামক একটি প্রবন্ধে লিখেছেন— “আত্মজ্ঞান, আত্মসম্মান, আত্মনির্ভরের গভীর সুদৃঢ় ভিত্তির উপর এই স্বাধীন চিন্তা প্রতিষ্ঠিত; জগৎ সংসার কেবল সেই এক, অখণ্ড অচিন্ত্য জ্ঞানেরই বিকাশ, এই সত্যকে অবলম্বন করিয়া ইহার দিগন্তব্যাপী, অপ্রতিহত প্রসার। ইহা যথেচ্ছাচারী বা অসংযত বুদ্ধি নয়; সহজ মানব প্রকৃতিতে ইহার মূল থাকিলেও, ইহা কঠোর সাধন, শিক্ষা ও অনুশীলন সাপেক্ষ। নির্ভীকতা ইহার প্রকৃতি, বিশ্বরূপদর্শন ইহার আকাঙ্খা; বিভূতিযোগ ইহার সাধনের সামগ্রী। (উদ্ধৃতিঃ আলোক রায়, বাঙালির মননচর্চার ধারা, ২০১০, ৫৫-৫৬)
    বিশ শতকের ষাটের দশকের প্রবাদপ্রতিম চিন্তাবিদ শিশিরকুমার দাশ এই ‘স্বাধীনচিন্তা’ ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর সৃষ্টিশীল রচনা, প্রবন্ধ ও অনুবাদের মাধ্যমে। আর এই চিন্তা ও জ্ঞান ক্রমবিকশিত হচ্ছে বাংলাভাষার কোনোরকম একাডেমিক চাহিদা ছাড়াই রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা। বার বার ফিরে গেছেন কবিতার কাছে। তাঁর অনুবাদ চর্চার মধ্যে এরিস্টটলের ‘কাব্যতত্ত্ব’, সোফোক্লেস-এর ‘রাজা ও ইদিপৌস ও আন্তিগোনে’, এউরিপিদেস-এর বন্দিনী এবং প্রাচীন গ্রীক কবিতার অনুবাদ সংকলন ‘বহুযুগের ওপার হতে’। এই সব অনুবাদগুলি তিনি করেছেন মূল গ্রীক ভাষা থেকে বাংলা ভাষায়। প্রসঙ্গত লেখক নিজেই লিখেছেন— “ সেই গ্রীস লুপ্ত, তবু মানুষের স্মৃতিলগ্ন; সেই গ্রীকভাষা লুপ্ত, তবু তারই পরিবর্তিত রূপ এখনও প্রবহমান। সমস্তই হারায়নি, মানুষের ইতিহাসে সবই আছে; স্মৃতির সুদূরতম তটে এখনও সুদূরতম অতীত প্রাণময়। তাই সেই গ্রীস সুদূর, কিন্তু অনায়ত্ত নয়; প্রাচীন, কিন্তু এ প্রাচীন নয় চিরমৌন। কালের ব্যবধান, চিন্তার ব্যবধান, নানা সমুদ্র নদী প্রান্তরের ব্যবধান সত্ত্বেও এ প্রাচীনের কণ্ঠস্বর এখনও ভেসে আসছে।” [উদ্ধৃতিঃ সৌরীন ভট্টাচার্য, অবুলুপ্ত মননের মধু?, ১৪১০, ৭৮]
    লেখকের বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায় তা হল, প্রাচীনের প্রতি আকর্ষণ এবং মানব ইতিহাসের প্রতি প্রবল নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি বাঙালি পাঠক ও বুদ্ধিজীবির কাছে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন পাশ্চাত্য সাহিত্য সংস্কৃতির জ্ঞানসম্পদকে। ১৯৫৯ সালে প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘মধুসূদনের কবিমানস’-এ তিনি দেখালেন ১৯ শতাব্দীর পরিমণ্ডলে চিরকালীন রহস্যময় ও ‘দ্বন্দ্বসমাকুল’ এক প্রতিভাময় কবি ব্যক্তিত্বকে। এই আলোচনায় তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের একটি ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ইউরোপীয় নবজাগরণ ও বাংলার নবজাগরণের ফলগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রকৃতিগত ভাবে এক এবং ‘মধুসূদন রেনেসাঁসের প্রথম কবি।’ (শিশিরকুমার দাশ, মধুসূদনের কবিমানস, ১৯৮৯, ৬)। এই বক্তব্যকে প্রমাণ করতে তিনি ‘কবিমানস’ কথাটি ব্যাখা করেছেন যেখানে কবির সৃষ্টি ও ব্যক্তিত্ব দুটি মিলিয়ে একজন কবি। “‘কবিমানস’ যাকে আমরা বলি তা ব্যক্তির সামাজিক সত্তার ওপরেই নির্ভরশীল। তাঁর ব্যক্তিত্বের সেই কটি লক্ষণকে জানতে হবে যার মধ্যে তাঁর সমগ্র জীবনের আশা-আকাঙ্খা আবর্তিত হয়েছে।” (তদেব, ১১) কবির এই ‘আশা-আকাঙ্খা’ রেনেসাঁস তাত্ত্বিক উইল ডুরাট এর বক্তব্যগুলি মধুসূদনের সম্পর্কে সম্পূর্ণ মিলে যায়—
    “তীক্ষ্ণমনা, সজাগ, বহুমুখী, প্রতিটিভাব ও Impression- এর প্রতি মন খোলা, সৌন্দর্যে মুগ্ধ, যশোলুব্ধ।” (তদেব, ১৫) এইরূপ দ্বন্দ্বময় শিল্পীমানসের ‘আশা-আকাঙ্খা’-র রূপটি নতুন রূপে বাঙালি পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন এবং যুক্তি দ্বারা প্রমাণ করেছেন মধুসূদন একজন বিশ্বনাগরিক ও ‘বিশ্বপথিক বাঙালী কবি।
    ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ভাষা জিজ্ঞাসা’ বইটির ভূমিকাতে তিনি লেখেন— “ অনেকদিন ধরেই ভেবেছি সাধারণ শিক্ষিত পাঠকের জন্য ভাষাতত্ত্ব সম্বন্ধে বাংলায় একটি প্রাথমিক বই রচিত হওয়া উচিত। এরকম প্রাথমিক রচনা লিখতে পারেন কোন যথার্থ ভাষাতাত্ত্বিক। কিন্তু বাংলাদেশে ভাষাতাত্ত্বিকের অভাব না থাকলেও, তাঁদের সময়ের অভাব আছে। (শিশিরকুমার দাশ, ভাষাজিজ্ঞাসা, ৫ )
    বইটি পড়লে বোঝা যায় এটি কোনো প্রাথমিক ভাষাতত্ত্বের বই নয়। বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিকদের কাছে বইটি ভাষাতত্ত্বের একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। আলোচ্য বইটিতে তিনি ভাষার দুটো দিকের কথা বলেছেন— এক নিয়ম শৃঙ্খলা ও প্রকৃতির শৃঙ্খলার। নিয়ম গুলি কী, তাদের ব্যবহার, প্রতীক কী তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়। আর দুই ‘শিক্ষা সাপেক্ষ’, ‘সংবাদ-বিনিময়ের মাধ্যাম’ এ প্রসঙ্গে ভাষার সামাজিক ভূমিকার কথা আলোচিত হয়েছে। প্রসঙ্গত শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ফের্দিনান্দ দ্য সোস্যুর এর ‘External Linguistic’, ‘Internal Linguistic’ আবার স্যাপির ও হোর্ফ-এর ‘স্যাপির- হোর্ফ তত্ত্ব’ এমনকি প্লেটোর ভাষা চিন্তা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা ভাবনাগুলি সাধারণ বাঙালি পাঠকের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
    ১৯৬০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘তারায় তারায়’ গ্রন্থটিতে মিশরে, চীনে, ভারতবর্ষে, ইউরোপ, আমেরিকায় যে নক্ষত্র কাহিনি গড়ে উঠেছে— ‘ভয়ে,বিস্ময়ে, আর অনুরাগে’, সে গুলিকে বাংলা ভাষায় রূপ দিলেন শিশিরকুমার দাশ।
    ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় শিশিরকুমার দাশের ‘লুকাচের ক্রোধ’ প্রবন্ধটি এবং তিনি লিখেছেন— “এই প্রবন্ধটি বাংলাদেশের কোনো রবীন্দ্রআলোচক এখনও লক্ষ্য করেছেন বলে মনে হয় না।” (শিশিরকুমার দাশ, লুকাচের ক্রোধ, ১৪১০)। প্রজ্ঞান সমালোচক লুকাচের একটি প্রবন্ধটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’–র সমালোচনা। সেই প্রবন্ধটির প্রতিপক্ষে প্রাবন্ধিক শিশিরকুমার দাশ লুকাচের সমালোচনা করে বৌদ্ধিক জগতকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন লুকাচের কোথায় কোথায় ভুল ছিল। তিনি আলোচনা করেছেন লুকাচের মতো ধীমান সমালোচক শুধু নিজের ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেছেন, কোনো যুক্তি বা তথ্য সংগ্রহ করে জানার চেষ্টাও করেন নি। তাঁর (লুকাচ) খারাপ লেগেছিল জার্মান বুদ্ধিজীবী লেখকরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বড়ো মাতামাতি করেছে এই ব্যাপারটি। তাই তিনি বলেছেন— “এটিই জার্মানীর সংস্কৃতিক জীবনের একটা কলঙ্ক, বুদ্ধিজীবীদের শূন্যগর্ভতা।” (তদেব,২৯) শিশিরবাবু যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে লুকাচের সিদ্ধান্ত ভুল, এমনকি তাঁর পড়া রবীন্দ্র অনুবাদ প্রসঙ্গেও সন্দেহ পোষণ করেছেন।
    শিশিরকুমার দাশ তাঁর ‘মধুসূদনের কবিমানস’ গ্রন্থে লিখেছেন— “ আধুনিক কালে আমাদের মনে একটি বিশেষ সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা আজ যদি কেউ নিজেকে বাঙালি ভাবি তাহলে তাকে প্রাদেশিক আখ্যা দিই।” (প্রগুক্ত, ৯৯) উনবিংশ শতাব্দী থেকেই কবি লেখকদের মধ্যে বাংলাকে বৃহত্তর ভারতবর্ষের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস লক্ষ্য করা গিয়েছিল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রঙ্গলাল, মধুসূদন, ভূদেব, বঙ্কিমচন্দ্র সকলের দৃষ্টি হয়েছিল ভারতমুখী। বাংলা ছাড়িয়ে দৃষ্টি পড়েছিল রাজস্থান, উড়িষ্যা, কনৌজ ইত্যাদি স্থানে। শিশিরকুমারও প্রাদেশিকতা ত্যাগ করতে পেরেছিলেন। তাঁর পড়াশোনা কলকাতা ও লন্ডনে। কর্মসূত্রে বেশি সময় কাটিয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই সময় তিনি রচনা করেন— ‘A History of Indian Literature’ Vol: i, 1800-1910 Western Impact: Indian Response (1991) Vol: ii, 1911-1956 The Struggle for Freedom: Triumph and Tragedy 1995 গ্রন্থটি সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে লেখক জানিয়েছেন- “ভারতীয় সাহিত্য যে বহু সাহিত্যের সমাহার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের মধ্যে যে গভীর মিল আছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। ঐক্য এবং বিভিন্নতা, কতগুলি মিলিত পরম্পরা, সমবেত অভিজ্ঞতা ভিন্ন সাহিত্যের অভিঘাতের প্রকৃতি ইত্যাদির কথা ভেবেছিলাম। দেখাতে চেয়েছিলাম আমাদের সাহিত্যের নানা উপাদান, তাদের মিল ও অমিল। একটা বহুভাষী দেশের সাহিত্যের চেহারা কেমন হতে পারে সেটা দেখাতে চেয়েছিলাম শুধু ভাষার নিরিখে, সাহিত্যিকে চিহ্নিত না করে। চিন্তা, আদর্শ, ভাবের নিরিখেও সাহিত্যকে চেনা যায় কিনা এই প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিলাম।” [প্রাগুক্ত, ১৩১]
    বোঝা যায় কী পরিমাণ পরিশ্রম, অধ্যাবসায় ও একনিষ্ঠ জ্ঞানচর্চার ফসল এই দুইটি খণ্ড যা সমগ্র ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর সামনে আলোচনা ও বিতর্কের নব নব ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। আমার শিক্ষিকা নন্দিতা বসুর ‘ভারতীয় সাহিত্য বিদ্যা ও শিশিরকুমার দাশ’ প্রবন্ধ থেকে জানতে পারি তুলনামূলক ভারতীয় সাহিত্যের পঠন পাঠনের ক্ষেত্রে বহু ভাষার সমস্যার বিষয়ে তিনিই প্রথম বুদ্ধিজীবী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করান। প্রসঙ্গত প্রাবন্ধিক শিশিরকুমার দাশের এক অভিভাষণ তুলে ধরেন— “ভারতবর্ষের বহুভাষিক সমাজের বাস্তবতা এইভাবেই কালিদাসের লেখনীতে প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু কালিদাসের কালে নয়। মধ্যযুগের ‘ব্রজবুলি’ সংস্কৃতের সঙ্গে তামিল বা মালায়লম মিশিয়ে মণি প্রবাল রীতি ভারতচন্দ্রের যাবনী মিশাল ভাষা, বন্দেমাতরম গানের মিশ্রভাষা সবকিছুই ভারতবর্ষের বহুভাষিক সমাজের প্রয়োজন থেকে উদ্ভুত। (প্রাগুক্ত, ৯৮)
    কোনো সংকীর্ণ বাঙালি মানসিকতা থেকে এই ধরনের ভারতবর্ষীয় চিন্তা ভাবনা সম্ভব নয়। তাই তিনি শুধু বাঙালি নন, ভারতীয়। বাঙালি কবির বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ সংগীত যেমন সারা ভারতবর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল; তেমনই শিশিরকুমার দাশেরও জ্ঞানদীপ্তি ভারতবর্ষের বৌদ্ধিক সমাজকে আলোকিত করেছে।
    ‘মধুসূদনের কবিমানস’ গ্রন্থে লেখক এলিয়টের ঐতিহ্য বিষয়ক একটি ধারণাকে প্রাধান্য দিয়ে লিখেছেন-“ ঐতিহ্য শব্দটি গভীর অর্থদ্যোতক। ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকার সূত্রে শুধু পাওয়া যায় না, তাকে অর্জন করে নিতে হয় প্রবল পরিশ্রমে। প্রথমতঃ প্রয়োজন ঐতিহাসিকবোধ— ঐতিহাসিক বোধ বলতে বোঝায় একটি ধারণা। অতীতের অতীত্বকে শুধু অনুভব করাতেই তার শেষ নয়। অনুভব করতে হয় তার উপস্থিতি। এই ঐতিহাসিকবোধ জাতীয় ঐতিহ্যের নিবিড় পরিচয় গ্রহণ করে ক্ষান্ত হয় না— তাঁকে বৃহত্তর ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেবার প্রেরণা পায়। [প্রাগুক্ত, ৯৬]
    এই জাতীয় ঐতিহ্যকে লেখক যুক্ত করে দিলেন বৃহত্তর ঐতিহ্যের সঙ্গে ১৯৭১ সালে তাঁর ‘Western Sailors Eastern Seas’ বইটির মধ্য দিয়ে এবং তিনি সম্মানিতও হন ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানির নেহেরু পুরষ্কারে। বইটির বিষয় হল জার্মানি ও ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। অর্থাৎ ইতিহাসের লক্ষনীয় দিকগুলি যা এই দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। “Cultural relationship is a relationship of minds. It grows through mutual admiration and love but not by love alone.” (Das, Western Sailors Eastern Seas, 1971, xii)
    পাশ্চাত্য নাবিকের কাছে ভারতবর্ষের আবিষ্কার মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতোই উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। একদল নাবিক এল ব্যবসা বাণিজ্য করতে মূলত ভারতবর্ষের সম্পদ লুট করতে। অপর একদল এল মিশনারীরা প্রধানত ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে। অন্য আরেক দল যারা মূলত স্কলার, তারা ভারতবর্ষকে ভালোবেসেছেন, প্রাচীন ঐতিহ্য জ্ঞান সম্পর্কিত আলোচনা করেছেন, ভারতবর্ষ এবং বিশ্বের কাছে সেই জ্ঞান সম্পদকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। The Philosophy of History গ্রন্থে হেগেল লিখেছেন— “to the treasures of this land of marvels, the most costly which the earth presents; treasures of Nature… as also treasure of wisdom.” (op.sit,1)
    ব্রিটিশ স্কলার, মূলত জার্মান স্কলার তাঁরা এসেছিলেন ভারতবর্ষের ভাষা ও সাহিত্য, ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে জানতে। প্রথম জার্মান স্কলার ফ্রিডরিচ শ্লেগেল (১৭৭২-১৮২৯) আলেকজান্দার হ্যামিন্টনের কাছ থেকে প্যারিসে গিয়ে সংস্কৃত শেখেন এবং ১৮০৮ সালে লেখেন— ‘The Language and wisdom of India’ ভাষার দিক দিয়ে একটি সুবিধা ছিল— সংস্কৃত; গ্রীক ল্যাটিন ও টিউটনিক ভাষাগুলি একই ভাষাবংশ থেকে উদ্ভূত। শিশিরকুমার দাশ লিখেছেন- “Schlegel’s love for Sanskrit Literature is an outcome of his love for the exotic elements in Literature as well as of his strong insistence on the identity of poetry and morals.” [ibid, 3]
    বোঝা যায় জার্মানদের ভারতবর্ষ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া অনেকাংশে আবেগীয় রূপ ধারণ করেছিল। জর্জ ফস্টার ‘শকুন্তলা’ নাটকটির জার্মানী ভাষায় অনুবাদ করেন এবং বন্ধু জোহান হার্ডারকে একটি কপি পাঠিয়ে দেন। হার্ডার উচ্চ প্রশংসা করে বন্ধুকে লেখেন— “I can not easily find a product of the human mind more pleasant that this one… a real blossom of orient, and the first most beautiful of its kind…” (ibid, 4)। হার্ডারের কাব্যখানি এতটাই ভালো লেগেছিল তিনি এটি গ্যেটের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। গ্যেটে শকুন্তলা পড়ে একটি কবিতা লিখে ফেলেন। এটি ছিল মহান এক ইউরোপীয় কবির কালিদাসের প্রতি প্রথম শ্রদ্ধার্ঘ্য। যে রোমান্টিক ভাব শ্লেগেল ও হার্ডারের মধ্যে দেখা গিয়েছিল, পরবর্তী কালে তা অনেক স্কলারদের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। যেমন— “Heine’s (1797-1856) well-known poem “Auf Fluegeln des Gesanges’ is the finest expression of the Romantic attitude towards India” (Ibid, 6)
    শুধু প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য নয় ভাষাতত্ত্বের ক্ষেত্রেও অনেকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আবিষ্কার করলেন। প্রথম ১৮১৬ খ্রীঃ ফ্রাৎজ বপ এই কাজটি করলেন। তাঁর পরবর্তী জার্মান জেকোব গ্রীম ১৮২২ সালে আবিষ্কার করলেন সংস্কৃত গ্রীক ও জার্মানি ভাষার মধ্যে সম্পর্ক সূত্রটি। যা গ্রীমস্‌ ল (Grimm’s Law) নামে পরিচিত।
    ভারতীয় দর্শনের ক্ষেত্রে জার্মান স্কলাররা ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। প্রত্যেকেই ভারতীয় দর্শনকে জীবনবিমুখ ও আত্মত্যাগের দর্শন বলে মনে করেছেন। সোপেন হাওয়ার উপনিষদ পড়ে অনুভব করছেন সেখানে আছে হতাশা, ব্যাধি, অতৃপ্তিময় একটি ট্র্যাজিক জীবন এবং দীর্ঘ ভোগান্তির পর মৃত্যুতেই তার পরিসমাপ্তি। হেগেল, নিৎসে, কান্ট প্রত্যেকেই ভারতীয় দর্শনের কম বেশি সমালোচনা করেছেন। ম্যাক্স মুলার প্রথম ভারতীয় দর্শনকে বুঝলেন এবং আত্মস্থ করলেন। ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সম্পর্কটি ফুটিয়ে তুললেন। ইতিপূর্বে প্রত্যেকেই ভারতীয় দর্শনকে ধর্মের আদলে দেখছিলেন। ম্যক্স মুলার ভারতবর্ষকে ভালোবেসেছিলেন, শ্রদ্ধা করেছিলেন। বৈদিক-ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত ও পালি ভাষায় ছিল তাঁর অসাধারণ জ্ঞান। তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জানতেন হিন্দুশাস্ত্র। তাই শিশিরকুমার দাশ লিখেছেন— “In this interchange of thought Max Mueller played an important part. Modern India has made the heritage of Europe a part of her own heritage.” [ibid, 28]
    পরবর্তীতে ম্যাক্স ওয়েবরকে দেখা যায় সাংস্কৃতিক সম্পর্কের একজন গুরুত্বপূর্ণ সমালোচকের ভূমিকায়। তিনি ভারততত্ত্ববিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন সমাজতাত্ত্বিক। তিনি হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করেছেন। তাঁর মূল আগ্রহের জায়গা ছিল ধর্ম ও সমাজের অন্তর সম্পর্ক নির্ণয় করা। তিনি তাঁর এই অবস্থানের জন্য প্রাচ্য পণ্ডিতদের কাছে নানাভাবে সমালোচিত হয়েছেন।
    প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানের আদানপ্রদানের ইতিহাস শিশিরকুমার দাশ বিশ্লেষক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন। অনেক ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর কাছে খুলে দিয়েছেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অন্তর সম্পর্কের মনন সূত্রগুলি। জ্ঞানের জগতে তিনি ‘enlargement of taste’– এ বিশ্বাস করতেন এবং একই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতেন— ‘যতই জানি অন্যকে ততই জানি নিজেকে। (প্রাগুক্ত, ১৪০) এই অন্যকে জানার উদ্মাদনা বৌদ্ধিক জগতে তাঁকে বাঙালি থেকে ভারতীয় হয়ে বৈশ্বিক স্তরে পৌঁছে দিয়েছে।

তথ্যপঞ্জি:
১। Sisirkumar Das, 1971, Western Sailors Eastern Sea, New Delhi: Munshiram
Manoharlal.
২। শিশিরকুমার দাশ, ১৪২০ বঙ্গাব্দ, ভাষাজিজ্ঞাসা, কলকাতাঃ প্যাপিরাস।
৩। শিশিরকুমার দাশ, ২০১২, তারায় তারায়, কলকাতাঃ কারিগর।
৪। শিশিরকুমার দাশ, ১৯৮৯, মধুসূদনের কবিমানস, কলকাতাঃ পুস্তক বিপনি।
৫। সুবল সামন্ত(সম্পাদিত), শ্রাবন-আশ্বিন সংখ্যা শারদীয় ১৪১০, এবং মুশায়েরাঃ শিশিরকুমার দাশ+
বাংলা উপন্যাস, কলকাতা।
৬। অলোক রায়, ২০১০, বাঙালির মননচর্চার ধারা, বিশ্বদীপ ঘোষ(প্রকাশক), নিবন্ধ বৈচিত্রের তিন দশক,
কলকাতাঃ অক্ষরবিন্যাস।

Spread the love

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *